ইনগমার বার্গম্যানের সাক্ষাৎকার

দোটানায় ইনগমার বার্গম্যান

সাক্ষাৎকার গ্রহীতা: ভিলগোট স্যোম্যান (১৯৫৭)
ভাষান্তর: বিদিশা

সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটা। জানালার বাইরের ম্লান সূর্যের মতোই মহড়া কক্ষের পরিবেশটাও বেশ থমথমে। মহড়া আজকের মতো শেষ। সবাই যে যার বাড়ি গিয়েছে নৈশভোজের জন্য। একে আর যাই হোক রোমাঞ্চকর পরিবেশ বলা চলে না।

ক্যাফেটেরিয়া কার্যতঃ ফাঁকা। একটা ফাঁকা টেবিলে নাইমা উইফস্ট্র্যান্ডের খাওয়ার আওয়াজ। একজন থিয়েটার কর্মীর ফোনে স্ত্রীর সঙ্গে বাক্যালাপ–এ সবের মধ্যেই গাঢ় হয়ে আসা সূর্যাস্তের সময় ইনগমার বার্গম্যান ঘরে ঢুকলেন। তিনি এক দূর্বল কুশীলবকে দেখতে গিয়েছিলেন। দাঁতের ডাক্তার দেখিয়ে উল্টো দিক থেকে এলেন ম্যাক্স ভন সিডো।
“তোমাকে সে কী করেছে?”, বার্গম্যান জিজ্ঞেস করেন।
ম্যাক্স ভন সিডো বলেন, “দাঁতের উপর দিয়ে ফুটো ক’রে, সে নার্ভ রুটটা বের ক’রে আনে। সেই জায়গাটার গন্ধ গরগনজোলার মতো।”

নৈশভোজের প্রস্তুতি শুরু হয়। শূন্যতা ও আলস্যে ভরা পরিবেশ। ভন সাইডো উঠে চলে যান। এক ঘন্টার মধ্যে তাঁকে সেজে ফেলতে হবে পীয়র গায়েন্টের সাজে। বার্গম্যান চেয়ারেই বসে আছেন। আজ তাঁকে একটু ক্লান্ত দ্যাখাচ্ছে।

বাড়িটাকে খণ্ডহরের মতো দেখায়। থিরেটারের লম্বা রাস্তা, দেয়াল ও দেয়াল জোড়া কাঠে আঁচড়ের দাগ এবং বড্ড এবড়ো-খেবড়ো। এক বহু পুরোনো পরিচিত ঢঙে নাটকটা শুরু হয়। সেই কালো বোর্ডে মোড়া গোল মঞ্চ, যার পেছনে দ্যাখা যায় কালো কাপড়ের পুঁটলি, হ্যাগেস্টা খামার আর বুড়ি অ্যাসের কুঁড়ে ঘর। এখানেই দু’ঘন্টা পর মারা যাবে বুড়ি অ্যাসে। মঞ্চের পাশে পর্দা ঘেরা অংশটিতে বসে আছেন স্বয়ং আলোক পরিচালক, এই বিষময় ঘটনার আবিষ্কর্তা। এর ঠিক পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে মঞ্চে হাততালি দিয়ে অভিবাদন জানানো হবে তাঁকে, যিনি এই টানা পাঁচ ঘন্টার অবিচ্ছিন্ন আলোক পরিবর্তনের জাদুকর। আরো একজনের জন্য আজ দর্শকমহল বরাবরের মতোই অপেক্ষা করবে। তিনি পীয়র গায়েন্ট, শ্রমিক-ব্যাপারী।

এখন রাত ১১টা। ভন সাইডো শেষবারের মতো অন্ধকার নরওয়েজিয়ান সামুদ্রিক পথের অলিন্দ দিয়ে হেঁটে গেলেন। এই সময় পীয়র গায়েন্টকে দ্যাখা যাবে হাত ছেড়ে পড়ে থাকতে কায়রোর এক অ্যাসাইলামে আর সেই নোংরা পা-ওয়ালা নীতম্বী অনিত্রার সঙ্গে মৃদু মৃদু হাসতে। আজ বার্গম্যান হলের পেছন দিকে বসেছেন, দেখে নিতে চাইছেন পরিবর্ত শিল্পীর শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। পীয়র গায়েন্টের চরিত্রে খাপ খাইয়ে নিতে প্রস্তুত শিল্পী। আজ এই অন্ধকার হলের কোনো এক কোণ থেকে পরিচালক বুঝে নিচ্ছেন কুশীলবদের চলনভঙ্গি।
“ম্যালমো বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ শহর,” বার্গম্যান বলে ওঠেন, যদিও তিনি খুব বেশি সময় সেখানে কখনো কাটাননি। আসলে তিনি এই রঙ্গমঞ্চ থেকে দূরে বেশি সময় থাকেন না, আর যদিও কখনও বাইরে থাকতে হলে তিনি কষ্টের মধ্যে থাকেন। “আমি যদিও স্টুডিও ছেড়ে থাকতে পারব। কিন্তু আমি রঙ্গমঞ্চ ছেড়ে একদমই বাঁচতে পারব না।”

থিয়েটার কারুর কাছে মননের ওপর রাখা স্বচ্ছ আতশ কাচ হতে পারে। কিন্তু বার্গম্যানের এটাই রুটি রুজি, গৃহের ওম। এর মধ্য দিয়েই তিনি অনুভব করেন যে, তিনি সমূহের অংশ হয়ে আছেন।

প্রতিটা মানুষেরই ভেতর এবং বাইরের মুখ থাকে। বারগম্যানও এর থেকে আলাদা নন। সমস্ত সফল মানুষের মতো বা তাদের থেকে বরং একটু বেশি, প্রচলিত কথায় যাকে বলে প্রচারোন্মুখ। বার্গম্যানের এতে আপত্তি নেই। বাস্তবে কি কোনো শিল্পী আত্ম-প্রচারের চাহিদা থেকে নিজেকে উদাসীন রাখতে পারেন? এটাই তো সেই অনুঘটক যা সর্বদাই শিল্পীর ভেতরের খিদেটাকে বাঁচিয়ে রাখে। বার্গম্যানের স্বপ্ন ঠিক এখানেই স্বতন্ত্র। তিনি চান শিল্পীর সাধারণীকরণ। কথাটা বিপরীতধর্মী শোনালেও এক শিল্পী যতক্ষণ না চরিত্রের রঙে নিজেকে রাঙিয়ে নিজের স্বতন্ত্র গণ্ডি অতিক্রম করতে পারছে ততক্ষণ সে সাংস্কৃতিক সমূহের অংশ হয়ে উঠতে পারে না। শিল্পীর সঙ্গে সংস্কৃতির যোগটা হওয়া উচিত কাপড়ের সঙ্গে সুতোর সমবায় সম্পর্কের মতো। বার্গম্যানের আক্ষেপ, “গতানুগতিক সংস্কৃতি থেকে থিয়েটার বরাবর নিজেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন রেখেছে।”
মধ্যযুগীয় ফ্রান্সে থিয়েটার ছিল চার্চের অধীন। স্বাভাবিকভাবেই নাটক তখন অন্তর্নিহিত অর্থযুক্ত না অন্তঃসারশূন্য— সে বিষয়ে কেউ ভাবিত ছিল না। এর উদ্দেশ্য ছিল একমুখীন— ঈশ্বর বন্দনা। বার্গম্যান যখন হালসিনবর্গস সিটি থিয়েটারের দায়িত্ব নেন তখন একটি নাটক পরিচালনা করেন, যার বিষয়বস্তু ছিল চার্টারস ক্যাথিড্রালের পত্তন। দ্যাখানো হয়েছিল কীভাবে ছুতোর, রাজমিস্ত্রি, শিল্পী এক দশক ধরে নিজেদের নির্যাসটুকু দিয়ে দাঁড় করিয়েছিল এই ক্যাথিড্রাল। আজ তাঁরা কেউ নেই, তাঁদের নামও হারিয়ে গেছে কালের কবলে। জেগে আছে শুধু ক্যাথিড্রালটি।

নামহীন ক্যাথিড্রালটি বানানোর এই সমূহ তাগিদ মিলিয়ে দেয় ‘দ্য সেভেন্থ সীল’ চলচ্চিত্রের সেই নাইটের সঙ্গে। যার জীবনে উত্থান-পতন আছে, নেই শুধু নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা অর্থ। থিয়েটার এবং চলচ্চিত্রের কাজ হওয়া উচিত সেই ক্যাথিড্রাল চার্চ নির্মাণের মতো। একমাত্র তবেই থিয়েটার এবং চলচ্চিত্র নিজের ক্ষুদ্র গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে উঠবে কালজয়ী।

এই ক্যাথিড্রালের স্বপ্ন বার্গম্যানের কাছে খুবই অর্থপূর্ণ। এ বিষয়ে সমালোচক ও দর্শকের প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবে তিনি সচেতন থাকছেন। ‘দ্য সেভেন্থ সীল’ চলচ্চিত্রটি তৈরি করার পর তিনি জানতেন এটি একটি সফল চলচ্চিত্র। কিন্তু অনিবার্যভাবে চলচ্চিত্রটি প্রথম চিত্রায়নের এক সপ্তাহ আগে থেকে সেই পুরোনো মানসিক টানাপোড়েন তাঁকে বিদ্ধ করতে থাকে, “যদি আমি যা, তার চেয়ে বেশি বোঝাতে পারি— যদি তাদের জোটবদ্ধ হাত বানাতে পারে দর্শকদের মনন-উপযোগী সেই বস্তু, যা কি না দর্শকদের মনে স্থান পাবে— তবে এবং একমাত্র তবেই সম্ভব সমালোচকের তির, মানসিক উচ্ছাস এবং সম্মানের অতি অভীপ্সাকে এড়িয়ে যাওয়া।”

এই টানাপোড়েন বার্গম্যানের বহুমুখী মননের পরিচায়ক। তাঁর সন্তুষ্টি, অসন্তুষ্টি–এই সবটাই তাঁর জাগতিক নাম-গোত্রহীন সামগ্রিক কাজের মধ্যেই নিহিত। চিত্র পরিচালক হিসেবে নৈপুণ্যতার স্বাক্ষর বহন করুক তাঁর কাজ— মৃৎশিল্পে যেমন অনুচ্চারিতভাবে প্রকাশ পায় শিল্পীর পরিচয়। বার্গম্যানের চলচ্চিত্রে আমরা অনুধাবন করতে পারি এক স্বতন্ত্র ধর্মীয় বিশ্বাসকে।

বার্গম্যান এই সময় সবচেয়ে দক্ষ চলচ্চিত্রকার। তিনি যেমন একাধারে ‘দ্য মেরী উইডো’ বড় পর্দায় দেখাতে পারেন তেমনি কাফকার ‘দ্য ক্যাসেল’ও মঞ্চায়িত করতে পারেন। আলো-আঁধারির রহস্যকে অঙ্গুলি হেলনে পরিচালনা করেন। তিনি বাস্তবধর্মী এবং হাস্য কৌতুকধর্মী উভয় ধরনের চলচ্চিত্র তৈরি করে থাকেন। “থিয়েটারকে হতে হবে এই থিয়েটার হলে স্থিত নারীমূর্তির মতো, যাঁর দুই হাতে দুটি মুখোশ— হাস্য ও করুণ। সে কোন মুখোশ পড়ে আছে সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়, সে যা-ই পড়ে থাকুক, তাঁর কাছে উভয় মুখোশই গুরুত্ব পায়।”

সবশেষে মঞ্চের পাশের পর্দা থেকে খালি স্টেজের দিকে হাঁটতে হাঁটতে তিনি বলে ওঠেন সুরক্ষার কথা যা থিয়েটার সবসময় তাঁকে দিয়েছে। “চলচ্চিত্রে খুব কম সময়ের মধ্যে প্রচুর কাজ এবং আলোর রোশনাই দ্যাখা যায়। সেখানে যা কিছু ঘটে সবই পরিচালককে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে। কিন্তু থিয়েটারে পরিচালক মুখ্য নয়। গৌণ। সে থিয়েটারের অধীন। এর সঙ্গে যুক্ত সকলের ওপর সে নির্ভরশীল।”

যদি বার্গম্যানের চিত্র আঁকা যায় তবে তা ঠিক কেমন হবে? তাঁর চোখ দুটোকে কীভাবে আঁকবে শিল্পী? কারণ স্বভাবতঃ বার্গম্যান মোটেই পরনির্ভরশীল নন। তিনি যখন রসুন্ডা ফিল্ম সিটি কিংবা মালমো সিটি থিয়েটারের ভেতর দিয়ে হেঁটে যান, হঠাৎ মাথাটা সামান্য ওপরের দিকে তুলে তাকান, সেই দৃষ্টিতে একাধারে মিশে থাকে রহস্য ও সারল্য, জ্ঞানের খিদে, চাঞ্চল্য ও পূর্বনির্ধারিত ধারণা; তখন তাঁকে একজন দক্ষ নেতা ছাড়া অন্য কিছুই মনে হয় না। যাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যান, তারাই বাকরুদ্ধ হয়। তাঁর চেহারাটাই এমন— তিনি এলে লোকজন খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলেও একবার তাঁকে দ্যাখে। নতুন কিছু শুরুর প্রাথমিক পদক্ষেপ তাঁরই পরিচালনায় নেওয়া চলে। সেই এক লহমায় সমস্ত অলিন্দটা বিদ্যুৎচালিতের মতো সচকিত হয়ে ওঠে। আর মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত অঞ্চলটা হাসি, ঠাট্টা, উল্লাসে ফেটে পড়ে— যেন কোনো উচ্চতারের জার্মান নাটক। অবশ্য ঠিক তামাসা বলা চলে না; বলা চলে পরিপূর্ণ, সুন্দর, আনন্দময় পরিবেশ। তারপর হঠাৎ করে অলিন্দটা শান্ত, ধীর-স্থির হয়ে যায়। দেখে মনেই হয় না এখানে একটু আগেই এত হাসি ছিল।

এটা হল বার্গম্যানের বাইরের দিক, যাকে অনুধাবন করতে পারে মঞ্চসজ্জা কর্মী, আলোক কর্মী কিংবা সাধারণ কোনো দর্শনার্থী।

বার্গম্যানের অভিনেতারা জানে তাঁর ভেতরের দিকটা। যারা এটা খুব ভালোভাবে জানে তারাই বার্গম্যানের সবচেয়ে কাছের এবং বিশ্বস্ত লোক। তারা তাঁর কাজের সমস্ত খুঁটিনাটির হিসেব রাখে। এটা তাঁদের কাজের স্বাধীনতাবোধ, যা কাজটাকে চমৎকার এক খেলার অঙ্গ করে তোলে। বার্গম্যানের শৈলী তাঁর ২০ বছরের দীর্ঘ নাট্যচর্চার ফসল। সেই দিন থেকে এর যাত্রা শুরু যেদিন তিনি সাহিত্যের ইতিহাসের ওপর মার্টিন ল্যামের বক্তৃতা শুনেছিলেন এবং সেখানে মাস্টার ওলো’ সগার্ডেনের লেখা একটি নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন।
বার্গম্যানের শৈলী দীর্ঘ ২০ বছরের নাট্যচর্চার ফসল। সেই দিন থেকে এর যাত্রা শুরু যেদিন তিনি সাহিত্যের ইতিহাসের ওপর মার্টিন ল্যামের বক্তৃতা শুনেছিলেন এবং সেখানে মাস্টার ওলোফসগার্ডেনের লেখা একটি নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন। বার্গম্যান সমস্তরকম মঞ্চে নাটক মঞ্চস্থ করেছেন, জরাজীর্ণ থেকে শুরু করে ঝাঁ-চকচকে পেশাদার মঞ্চ অব্দি। কাজ করেছেন প্রায় সবরকম সৌখিন এবং মহৎ শিল্পীদের সঙ্গে। তাঁর অনুভূতিকে সজাগ রেখে সর্বত্র তিনি সততা এবং মহত্ত্বের সন্ধান করে বেরিয়েছেন। তিনি অভিনয় প্রতিভা খুঁজে পাওয়ার মধ্যে এক অনাবিল গর্ব বোধ করেন : তা কোনো সুপ্ত শিশু প্রতিভাই হোক বা কোনো অভিনয় স্কুলের শিক্ষারত ছাত্রই হোক বা চাপা পড়ে থাকা সম্ভাব্য, অনালোকিত প্রভিতা।

তিনি নাট্য পরিচালনার পাশাপাশি অনেক চলচ্চিত্রের জন্য চিত্রনাট্য লিখেছেন। আজও সেভেস্ক ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির চিত্রণ বিভাগের সদস্যা স্টিনা বার্গম্যান সেই দিনটি ভুলতে পারেন না যেদিন স্যাগোটিটার্ন থেকে এক তরুণ পরিচালককে অপমানিত হয়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল। সেদিন জীবনের প্রথম লেখা চিত্রনাট্যের ওপর টিপ্পনী ও সে নাটকের অদল-বদলে জর্জরিত হয়ে ক্রুদ্ধ, বিরক্ত, বিব্রত বার্গম্যান ছুটে বেরিয়ে এসেছিলেন স্টিনার ঘর থেকে। ফলস্বরূপ বয়ঃসন্ধির দোটানায় পড়া এক নব্য যুবকের গল্প থেকে গড়ে উঠেছিল ‘টরমেন্ট’।
এর ঠিক পরেই একটি বড় পদক্ষেপ : চলচ্চিত্রকার হিসেবে চলচ্চিত্রের জগতে আসা।

‘টরমেন্ট’-এর পর তেরো বছর কেটে গেল বার্গম্যান চলচ্চিত্রের পর চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন। অনেকে সমালোচনা করে বলেছেন, তিনি অনেক বেশি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন। তখন তাঁর কাছে অনেকগুলো উত্তর প্রস্তুত থাকে : এ তো কোনো বই লেখা নয়, যে এক জায়গায় বসে থেকে লিখেই চলো। তবে বেরোবে এক কালজয়ী উপন্যাস। এ হল চলচ্চিত্র। একটা উৎপাদন। প্রতিদিনের ছোটো-বড় সামগ্রীর এক সুন্দর উপস্থাপনা। যাঁরা বিশ্বাস করেন শিল্পীদের ধীরে কাজ করা উচিত, তাঁরা জেনে অবাক হবেন যে, কত চলচ্চিত্র বার্গম্যান বানিয়েছেন যা কোনোদিনই চিত্রায়িত হয়নি।

তাঁর ভেতরের সত্তা অবশ্য ভিন্ন দুশ্চিন্তা প্রকাশ করে যা তাঁর আচরণে প্রকাশ পায়, উত্থান-পতনের দোলাচলে পাক খেতে খেতে বেশিরভাগ চলচ্চিত্র পরিচালকেরা দ্রুত হারিয়ে যায়। তাঁরা হঠাৎ বিখ্যাতও হয়। একটা সময় ইতিহাস তাদের মুছে ফেলে। পরিচালকেরা কি অদ্ভুত ভারসাম্য বজায় রেখে চলে! দর্শক যদি চলচ্চিত্র দেখতে প্রেক্ষাগৃহে না আসে তবে প্রযোজকরা আমার পরের ছবির জন্য আর এগিয়ে আসবেন না। কী মনে হয়? দর্শক দেখবে? নিশ্চই! এই একটি কথায় পরিচালক সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে দর্শকদের ওপর। এই নির্ভরশীলতা চামড়ার কোন গভীর পর্যন্ত বীজ বপন করে তার হদিস ঔপন্যাসিক বা সাহিত্যের সমালোচক কোনোদিন পান না।

এত কিছুর পর বার্গম্যান বিশ্রাম করেন কখন? তাঁর বেশিরভাগ বিদেশ ভ্রমণই তো শেষ হয় চূড়ান্ত হতাশা আর বাড়ির টানে। সপ্তাহ খানেক পরে দেশে ফিরেছেন। উঠেছেন পার্ক অ্যাভেনিউ অথবা সিলজান্সবার্গের এক হোটেলে। সারাদিনের পরিকল্পনা এবং নতুন চিত্রনাট্য লেখার কাজে ব্যস্ত।

লেখা শেষ হওয়ার পরে স্টকহোমে গেলেন। সেখানে প্রযোজকের সম্মতি পেলে তাঁর চারপাশে তখন দিস্তা দিস্তা কাগজের পরিমাণ বাড়তে থাকে। প্রযোজনার ডিজাইনার পি.এ. লুন্ডগ্রেন এবং চিত্রগ্রাহক গান্নার ফিস্চার আসেন। দৃশ্যপটের ছবি আঁকেন। চলচ্চিত্রের প্রতিটা মুহূর্তের ছবিকে একটা একটা করে এঁকে জীবন্ত করে তোলেন। চলচ্চিত্রায়নের প্রক্রিয়া চলতে থাকে।

“থিয়েটারের জাদু? না, থিয়েটারের সমস্ত রহস্যই আমার কাছে উন্মোচিত হয়েছে। থিয়েটার এখন শুধু পরিচালকের ভূমিকা, প্রযুক্তি আর অভিজ্ঞতার সুনিপুণ খেলা। কিন্তু চলচ্চিত্র আমার কাছে এখনও তার রহস্য বজায় রেখে চলেছে।”

অবিশ্বাস্য এবং অযাচিত কিছু চলচ্চিত্রায়িত করতে গিয়ে একমাত্র অবর্ণনীয় কিছু ঘটে যেতে পারে।
“‘দ্য সেভেন্থ সীল’ চলচ্চিত্রে যখন চোর রাভাল মারা যায়, তখন আমার স্বভাববশত ক্যামেরাটাকে আমি কিছুক্ষণ চালু রেখেছিলাম। ঠিক সেই মুহূর্তেই সূর্যটাকে পাইন গাছের মাথায় দ্যাখা যায়। ম্লান দৃশ্য, যেহেতু ছবিটা আবছা আলোর ভেতর তোলা, তবুও অসাধারণ এসেছিল। বনের অন্ধকারের মধ্যে যখন তাঁর মৃত্যু হচ্ছিল, তখন হঠাৎ সূর্যের আলো তাঁর মৃত্যুর পর মুখে এসে পড়ল।”

এই ঘটনা বিরল যা কখনো কখনো ঘটে থাকে। পরিচালকের কোনো নিয়ন্ত্রণ এর ওপর থাকে না। এটাই চলচ্চিত্রের জাদু।

টেলিভিশনও বার্গম্যানকে আকর্ষণ করেছে। টি.ভি. অনেকটা চলচ্চিত্রের মতো অনাবিষ্কৃত।
বার্গম্যানের ছবিটা ততক্ষণ সম্পূর্ণ হবে না যতক্ষণ না আমি তাঁর বিরক্তিকর ও কাজগুলোর উপর আলোকপাত করি।

কোথাও যেন থিয়েটারের সঙ্গে বিশ্বাস মিশে যায়, ঈশ্বর আর ভণ্ডামি। এর সত্যতা কি আদৌ আছে? মানুষ বিশ্বাস করে পারেন না, এই উভয়ের অবিমিশ্রতাকে। স্বতন্ত্র ঈশ্বর বিশ্বাস এবং থিয়েটারের যোগাযোগ একটা স্বাভাবিক বার্গম্যানীয় অলংকার। ওনাকে বুঝতে হলে এই উভয়কে সঙ্গে মিশিয়ে দেখতে হবে।

একবার তিনি এক মেয়ের গল্প লেখেন। মেয়েটার নাম বির্গিতা ক্যারোলিনা। সে এমন একটি জগতের মধ্য দিয়ে গেছে যেন সে বেঁচে আছে একটি নৈতিক বাস্তবতায়; সমস্তরকম খারাপ, ভালো, উদ্ভট, অনুশোচনাময়, কাব্যিক পরিবেশের মধ্যে থেকেও। শেষ দৃশ্যে সে স্যালভেশন বাহিনির পোশাক পরে গান গেয়েছিল।

শিল্পের নিরিখে দেখতে গেলে এরকম প্লট পুরোপুরি ভ্রান্ত। হারবার্ট গ্রেভেনিয়াস এটাকে বলেছিলেন, “ধার্মিক সংবেদনশীলতা,” এমন রূঢ় সমালোচনা ভাবনাতীত যখন বার্গম্যান তাঁকে স্ক্রিপ্ট দেখিয়েছিলেন। বার্গম্যান ওনার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়েছিলেন এবং চলচ্চিত্রটি শেষ করেছিলেন মেয়েটির আত্মহত্যা দিয়ে।

যে ‘প্রিজন’ চলচ্চিত্রটি দ্যাখেনি, সে এই আত্মহত্যার অর্থ খুঁজে পাবে না। আত্মহত্যাকে যথাযথভাবে দ্যাখানো হয়েছে চলচ্চিত্রে–তার সংবেদনশীলতা থেকে বেরিয়ে এসে।

বার্গম্যান চিরকাল সমালোচনাকে গ্রহণ করে এসেছেন। তিনি কোনোদিন এমন কোনো চলচ্চিত্র পরিচালনা করেননি যার মধ্যে শুধুই ধার্মিক নীতিবোধ এবং শিশুসুলভ আবেগ প্রকাশ পায় যা কি না তাঁর কল্পিত বিশ্বাস আর দ্বিধা থেকে স্বতঃস্ফুর্তভাবে উঠে আসে। এই দ্বন্দ্ব থেকেই যায়। ‘দ্য সেভেন্থ সীল’ এরকমই একটি কাব্যময়তা।

আর বার্গম্যানের মানসিক ধোঁয়াশা?
বার্গম্যান নিয়মিত নতুন কাহিনির নির্মাণ করে চলেছেন, তার কারণটাই হল তাঁর জীবনের নৃশংসতা আর ভয়। তাঁর চলচ্চিত্রের দর্শক তাঁর কাজ দেখে একপ্রকার শান্তি অনুভব করে যা স্বয়ং বার্গম্যানও একই শান্তি অনুভব করেন। কেউ যদি তাঁর অন্তরের এই খিদাকে কেটে বাদ দিতে পারে তাহলে তাঁর সৃজনশীলতাও অনেকটা ক্ষীণ হয়ে যাবে।

আর যারা ভাবে বার্গম্যান তাঁর চিত্রনাট্যের সংলাপ বড় অগোছালো ও সাধারণভাবে পেশ করেন, তার ভেতর কোনো চমক নেই তবে তারা জানেই না তিনি নিজের ভেতরে কী পরিমাণে কাটা-ছেঁড়া করেন সংলাপগুলো নিয়ে। ডাইনি মেয়েটির কথা মনে করুন, ‘দ্য সেভেন্থ সীল’ চলচ্চিত্রে যাকে জঙ্গলে নিয়ে আসা হয়েছিল পুড়িয়ে মারার জন্য, সেই দৃশ্যে কোনো বাগাড়ম্বর ছিল না। বরং ছিল এক স্বাভাবিক ঋজুতা। বার্গম্যানের ভাষায়, “সেখানে কোনো অপ্রাসঙ্গিক, উত্তেজক কোনো ঘটনার ভিড় নেই। তবুও কেন জানি না আমি ভেতর থেকে নড়ে উঠেছিলাম।” বিখ্যাত এক মন্ত্রীর পুত্র, বার্গম্যান এ বিষয়ে তাঁর পিতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন : “আমার মনে হয় প্রাপ্তবয়স্কদের যন্ত্রণা আমি বুঝতে পারি। কেবল বুঝতে পারি না ঈশ্বর কি করে শিশুদের যন্ত্রণায় নীরব থাকতে পারেন!” এই দৃশ্য যেন তারই চাক্ষুষ বিবরণ। অবশ্য এর পরেও এতে কিছুটা অস্পষ্টতা থেকেই যায়, বার্গম্যান যেটার মীমাংসা এখনও করতে পারেননি।

ভয়ংকরের প্রতি এই দুর্বলতা মানুষকে কিছুটা বিপথে ঠেলে দেয়, যেমনটা হয়েছিল পীয়র গায়েন্ট চরিত্রের সঙ্গে যখন বার্গম্যান কাইরোর পাগলাগারদের দৃশ্যে যুক্ত করেছিলেন কিছু নির্বোধ, অসুস্থ, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষের চরিত্রকে। নাটকের ভাষায় এই দৃশ্য ছিল অপূর্ব। কিন্তু রচয়িতা ইবসেন এই দৃশ্যের জন্ম দিয়েছিলেন আত্মম্ভরি ও কঠিন মেজাজের লোকগুলোকে হাস্যকৌতুকে পরিণত করার জন্য। কিন্তু বার্গম্যানের মতে যথার্থ অসুস্থ ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষ নিজেকে যেমন সর্বময় কর্তা ভাবে আবার পাশাপাশি ইবসেনের গল্পের শ্রমিক ব্যাপারীর মতো অনিচ্ছাকৃত নিষ্ঠুরও হয়ে ওঠে।

এই মুহূর্তে বার্গম্যান জানেন, যে অঞ্চল তিনি গল্প বলার জন্য বেছে নিয়েছেন যা কোনোভাবেই সামাজিক বা বাস্তবিকভাবেই মনস্তাত্ত্বিক নয়। তাঁর ভাষায়, “স্বপ্নের সহজাত কাঠামো।” এই সময়ে দাঁড়িয়ে তিনি এমন এক চলচ্চিত্র তৈরি করতে চান যা আদতেই হবে একটি বাস্তব স্বপ্ন। আর যেহেতু অনেকেই তাঁকে সমালোচিত করে “দাম্ভিক” বলে, তাই তিনি এই মুহূর্তে সবচেয়ে কঠিন কাজটি করতে চান— “শিল্প যেন হয়ে ওঠে সত্যিকারের দাম্ভিক।”

তিনি এই বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে থাকেন যে, তিনি একাই পৃথিবীতে দাম্ভিক নন। তিনি মনে করেন ‘পীয়র গায়েন্ট’ একটি অসাধারণ নাটক। এর ভেতর সম্ভবত তিনি খুঁজে পেয়েছেন তাঁরই অন্তরের বোধকে : ভণ্ডামি, লড়াই আর পাপবোধ। শেষ দৃশ্যটি বহু অপেক্ষার পরেও সাধারণ বুদ্ধির কাঙ্ক্ষিত হয়ে ওঠে না— “এই একটা জায়গায় পিতা ইবসেন আমারই মতো দাম্ভিক।”

চিরকাল বার্গম্যানকে একটি সমালোচনা তাড়া করে বেড়ায়, আর তা হল, তাঁকে চলচ্চিত্র পরিচালনায় মনোনিবেশ করা উচিত, চিত্রনাট্য লেখায় নয়। এটি মনে হয় সর্বকালের সর্বাধিক নক্কারজনক ও অন্তঃসারহীন সমালোচনা। এটাই সম্ভবত সমালোচকদের সর্বশেষ অস্ত্র। সমালোচকরা যতই সর্বস্বতা দিয়ে সমালোচনা করুক, বার্গম্যানের কিন্তু পরিচালক হিসেবে যতটা না ভাবের অভিব্যক্তির প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন লেখক হিসেবে।

এই ধরনের দোটানার ভেতর দিয়েও বার্গম্যানকে কাজ করে যেতে হয়।

ইনগমার বার্গম্যানের সাক্ষাৎকার

আমাদের নতুন বই