নোবেল বক্তৃতা: বব ডিলান

ভাষান্তর: সুদীপ ব্যানার্জী

যেদিন প্রথম খবর পেলাম সাহিত্যে আমি নোবেল পুরস্কার পাচ্ছি, ভাবতে বাধ্য হলাম ঠিক কীভাবে আমার গান সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। যোগাযোগটি ঠিক কোথায়, অনুভব করতে চাইছিলাম। চেষ্টা করছি আপনাদের সামনে সেটাই স্পষ্ট করে বলতে। যদিও এই বলাটা হয়তো ঘুরিয়ে বলা হতে চলেছে, কিন্তু আশা করি যা আমি বলব তা সার্থক ও ফলপ্রসূ হবে।

শুরুর দিনগুলিতে যদি ফিরে যাই, মনে হয় বাডি হলির কথা দিয়েই শুরু করতে চাইব আমি। বাডি মারা যায় যখন, তখন আমি আঠারো আর ও বাইশ। প্রথমবার ওর গান শোনার সময় থেকেই ওকে খুব আপন বলে মনে হয়েছিল। আমার মনে হত আমরা যেন আত্মীয়— ও বোধহয় আমার এক বড়ো ভাই। এমনকী, আমার মনে হত আমাকে অনেকটা ওর মতোই দেখতে। বাডি সেই গানই করত যা আমি ভালোবাসতাম— যে-গানের সঙ্গে আমার বেড়ে ওঠা— কান্ট্রি ওয়েস্টার্ন, রক ‘এন’ রোল  আর রিদম এ্যান্ড ব্লুজ। গানের এই তিনটি পৃথক ধারাকে একটি জঁনারে গেঁথে একাত্ম করেছিল সে। একটিই ব্র্যান্ড। আর বাডি যে-গান লিখত— সে-গানে থাকত সুরের মাধুরি আর কল্পনার রঙিন ভাষা। অসাধারণ গাইত ও— বিভিন্ন স্বরে গাইতে পারত। ও-ই ছিল আমার আদর্শ। যা আমি হতে পারিনি বা হতে চেয়েছি। ওকে একবারই আমি দেখেছিলাম, তাও ওর প্রয়াণের মাত্র ক-দিন আগে। ওর গান শুনতে আমি একশো মাইল পারি দিয়েছিলাম, আর আমি হতাশ হইনি।

ও এক বলিষ্ঠ আর রোমাঞ্চকর গায়ক, সাথে ওর দাপুটে উপস্থিতি। মাত্র ছ-ফুট দূরেই ছিলাম আমি। মোহিত করে দিচ্ছিল ও। আমি দেখছিলাম— ওর মুখ, ওর হাত, কীভাবে ওর পায়ের পাতা তালে তাল মেলাচ্ছে, দেখছি ওর বড়ো কালো চশমা, চশমার আড়ালের চোখ দুটো, যেভাবে গিটারটা ধরেছে ও, যেভাবে দাঁড়িয়ে আছে, দেখছিলাম ওর পরিচ্ছন্ন পোশাক। ওর যা যা লক্ষ করা যায় আরকী। ওকে দেখে বাইশের চেয়ে বেশি মনে হচ্ছিল। ওর মধ্যে এমন কিছু একটা আছে, চিরস্থায়ী একটা কিছু— যা আমাকে দৃঢ় বিশ্বাসে পূর্ণ করে দিচ্ছিল। আর তারপরই অকস্মাৎ অপার্থিব ঘটনাটি ঘটল। ও সরাসরি আমার দিকে স্থির দৃষ্টি নিক্ষেপ করল আর কিছু একটা যেন সঞ্চারিত হল আমার ভেতরে। এমন একটা কিছু, যা আমি জানতামই না, সেটা কী। আমি শিহরিত হলাম।

আমার মনে হয় ঘটনাটা ওর প্লেন ভেঙে পড়ার দু-একদিন আগের। আর কেউ একজন— যাকে আগে কখনো দেখিনি— লেডবেলির গানের রেকর্ড, যাতে কটনফিল্ডস গানটা ছিল, আমার হাতে ধরিয়ে দেয়। এই রেকর্ডটিই আমার জীবনে আমূল পরিবর্তন আনে। এমন এক পৃথিবীতে নিয়ে যায় আমাকে যা আগে আমার জানাই ছিল না। যেন একটা বিস্ফোরণ হয়েছিল। যেন আমি অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে হেঁটে আসছিলাম আর হঠাৎ করে সেই অন্ধকার আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল। মনে হচ্ছিল কেউ আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। ওই রেকর্ডটা আমি অন্তত একশোবার বাজিয়েছিলাম।

রেকর্ডটির খাপের ওপর লেখা ছিল সেই গান, যা আমি আগে কখনোই শুনিনি। ভেতরে অন্যান্য গায়কদের গানের একটি বিজ্ঞাপন পুস্তিকা, যাদের গান রেকর্ডটায় ছিল— সনি টেরি আর ব্রোনি ম্যাকঘি, দ্য নিউ লস্ট সিটি র্যাউম্বলার্স, জিন রিচি, স্ট্রিং ব্যান্ড। আমি আগে এদের একজনেরও গান শুনিনি। কিন্তু আমি নিশ্চিত ছিলাম এই ভেবে যে, লেডবেলির সঙ্গে একই রেকর্ডে জায়গা করে নিয়েছেন যখন, তখন এরা অবশ্যই ভালো গান গান। তাই তাদের শোনাটা প্রয়োজন হয়ে পড়ল। আমি এই ধরনের গানের সমস্ত কিছু জানতে চাইছিলাম আর এই ধরনের গানই করতে চেয়েছিলাম। এখনও ওই গানগুলি, যার সঙ্গে আমার বেড়ে ওঠা— তার জন্য একটা আলাদা অনুভূতি জড়িয়ে আছে আমার সঙ্গে, যদিও এই মুহূর্তে গানগুলো আর মনে নেই। এমনকী সেগুলি নিয়ে ভাবিও না এখন। আপাতত, ওগুলো হারিয়েই গেছে, অনেকদিন।

তখনও বাড়ি থেকে পালাইনি, কিন্তু আর অপেক্ষাও করতে পারছিলাম না। এই গানই আমি শিখতে চাই, এই গান-বাজনার মানুষগুলোর সঙ্গেই দেখা করতে চাই আমি। অবশেষে আমি পালালামও, আর এই গানও শিখলাম।

রেডিয়োর যে-গান এতদিন আমি শুনেছিলাম, তার চেয়ে এই গান অনেক আলাদা। আরও প্রাণবন্ত, জীবনের প্রতি আরও সত্যনিষ্ঠ। রেডিয়োর গানে শিল্পীর জনপ্রিয় হতে সৌভাগ্যের প্রয়োজন। কিন্তু লোকগীতির দুনিয়ায় ওটা কোনো ব্যাপারই না। প্রতিটি গানই জনপ্রিয়। আপনাকে শুধু ভালো করে গাইতে শিখতে হবে আর সুরটি বাজাতে জানতে হবে। এদের মধ্যে কিছু গান বেশ সহজ, কিছু গান আবার তা নয়। প্রাচীন ব্যালেড ও গ্রাম্য ব্লুজের প্রতি আমার ছিল স্বাভাবিক টান, কিন্তু বাকি সবই আমাকে শিখতে হয়েছে একদম গোড়া থেকে। অল্পসংখ্যক শ্রোতার জন্য আমি গাইতাম, খুব বেশি না, হয়তো তিন-চারজনের সামনে একটা ঘরে বা রাস্তার ধারে। আপনার গানের সংগ্রহ কিন্তু যথেষ্ট সমৃদ্ধ হতে হবে এবং কোন গান কখন গাওয়ার উপযুক্ত— তা জানতে হবে। কিছু গান মৃদু স্বরে গাওয়ার, আবার কিছু গানে চিৎকার করতে হয়, যাতে সবাই শুনতে পায় গানটি।

অগ্রজ লোকগীতি শিল্পীদের গান শুনতে শুনতে আর নিজে সে-সব গান গাইতে গাইতেই একজন এই গানের নিজস্ব চলনটি ধরতে পারে। আত্তীকরণ করতে পারে। আপনি র্যাাগটাইম ব্লুজ, ওয়ার্ক সং, জর্জিয়া সি শ্যান্টি, আপাচিয়ান ব্যালেড আর কাউবয় গান এই চালেই গেয়ে থাকেন। সমস্ত খুঁটিনাটি বিষয় আপনাকে শুনতে হবে, বিষদে শিখতে হবে।

পুরো ব্যাপারটি কেমন তা আপনার জানা। পকেট থেকে পিস্তল বাইরে আনা, আবার পিস্তলটি পকেটে পুরে রাখা। ভিড়ের মধ্যে, অন্ধকারে কথা বলতে বলতে, দ্রুত কীভাবে নিজের পথ তৈরি করতে হবে— আপনি জানেন, ‘স্ট্যাগার লি একটা বাজে লোক ছিল’ আর ‘ফ্র্যাংপকি মেয়েটা ছিল খুব ভালো’। আপনি জানেন ‘ওয়াশিংটন একটি বুর্জোয়া শহর’ আর জন দ্য রেভেল্যাটরের উচ্চকিত কণ্ঠ শুনেছেন আপনি, দেখেছেন ‘পেছল জলের অতলে, টাইটানিক যায় ডুবে’। ‘দ্য ওয়াইল্ড আইরিশ রোভার’ ও ‘দ্য ওয়াইল্ড কলোনিয়াল বয়’-এর মতো গানের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব হচ্ছে। আপনি দেখেছেন ‘স্বাস্থ্যবান লর্ড ডোনাল্ড ছুরি গেঁথে দিচ্ছে তার স্ত্রীর বুকে’, শুনেছেন আপনার ‘সহযোদ্ধাদের অনেকেই শ্বেতবস্ত্র পরিহিত’।

এইসব গানের কথা আমি লিখে রেখেছিলাম। এগুলোর অলংকার আমার জানা ছিল। কোনো কিছুই দুর্বোধ্য মনে হয়নি— এর প্রকৌশল, শৈলী, গোপনকথা, রহস্যময়তা— এই গানগুলো যে-নির্জন পথে হেঁটে এসেছে— সবই আমার পরিচিত। আমি এর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারতাম, পারতাম সময়ের স্রোতে বয়ে যেতেও। যখন আমি আমার নিজের গান লিখতে শুরু করলাম, আমার জানা ছিল কেবল এই লোকজ ভাষার শব্দভাণ্ডার আর আমি তা ব্যবহার করেছিলাম।

কিন্তু এগুলো বাদ দিলেও আমার ঝুলিতে আরও কিছু ছিল। নৈতিকতা আর চেতনা ছিল, ছিল পৃথিবী নিয়ে তথ্যনিষ্ঠ একটা ধারণাও। বেশ কিছুটা সময় জুড়ে থেকেছে এই ব্যাপারটি। সবই গ্রামার স্কুলে শেখা, ডন কিহোতে, ইভানহো, রবিনসন ক্রুসো, গ্যালিভার’স ট্রাভেলস, টেল অফ টু সিটিস বা এ-জাতীয় অন্যান্য বই থেকে। সাধারণ এক গ্রামার স্কুলের পড়াশোনা জীবনকে দেখার পদ্ধতি সম্পর্কে, মানুষের প্রকৃতি বুঝতে এবং বিভিন্ন বস্তুর মূল্যায়নে যে প্রাথমিক পাঠ দিতে পারে আরকী। যখন গান লিখতে শুরু করি এইসবই ছিল আমার সঙ্গে। আর ওই বইগুলির বিষয়বস্তু, জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে, আমার অনেক গানকে প্রভাবিত করেছিল। আমি এমন গান লিখতে চেয়েছিলাম যা এর আগে কেউ কোনোদিন শোনেনি আর এই বিষয়বস্তুগুলোই ছিল তার ভিত্তি।

কিছু নির্দিষ্ট বই, বহুদিন আগে গ্রামার স্কুলে পড়া, চিরদিনের জন্য আমার মনে স্থান করে নিয়েছে— তার মধ্যে তিনটি বইয়ের উল্লেখ আমি করতে চাই। মবি ডিক, অল কোয়াইট অন দি ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট আর ওডিসি।

মবি ডিক অভিভূত করে দেওয়ার মতো একটি বই, এমন বই যা অতিনাটকীয় দৃশ্য আর নাটকীয় সংলাপে ভরা। বইটি কিন্তু আপনাকে নিংড়ে নেবে। প্লট যদিও সহজ, সরল। রহস্যময় ক্যাপ্টেন আহাব— পিকোড নামের এক জাহাজের ক্যাপ্টেন— একজন অহংকারি, কাঠের নকল পা নিয়ে ছুটে চলেছে তার নিয়তি মবি ডিক নামে বিশাল এক সাদা তিমিকে অনুসরণ করে, যে তার পা কেড়ে নিয়েছিল। আর সে ধাওয়া করে যায় তিমিটিকে আটলান্টিকের পাশে, আফ্রিকার শুরু থেকে সুদূর ভারতমহাসাগর পর্যন্ত। পৃথিবীর দুই গোলার্ধেই তিমিটির পিছু নেয় সে। এ এক বিমূর্ত লক্ষ্য, স্থির বা নির্দিষ্ট কিছু নয়। সে মবিকে সম্রাট বলে ডাকে, দ্যাখে তাকে শয়তানের প্রতিমূর্তি রূপে। ন্যানটাকেটে আহাবের স্ত্রী, সন্তান রয়ে গেছে, তাদের কথা আহাবের প্রায়ই মনে পড়ছে। কী হতে চলেছে আপনি অনুমান করতে পারছেন।

জাহাজের মাঝি-মাল্লারা বিভিন্ন জনজাতির মানুষদের নিয়ে গড়ে তোলা এবং তাদের মধ্যে যে তিমিটিকে দেখতে পাবে তাকেই পুরস্কার স্বরূপ একটি স্বর্ণমুদ্রা দেওয়া হবে। জ্যোতিষ রাশিসমূহ, ধর্মীয় রূপক, বাঁধাধরা গৎ-এর ছড়াছড়ি। আহাব অন্যান্য আরও তিমিশিকারি জাহাজের মুখোমুখি হয়, মবির সম্পর্কে জানতে তাদের জোরাজুরি করে। তারা কি মবিকে দেখেছে? এক জাহাজে ছিল এক পাগল গণৎকার, গ্যাব্রিয়েল, সে ভবিষ্যৎবাণী করে আহাবের সর্বনাশের। বলে, মবি সাক্ষাৎ শেকার ধর্মের এক দেবতার প্রতিমূর্তি, মবির সঙ্গে সামান্য যোগাযোগও আহাবের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। ক্যাপ্টেন আহাবকে সে বলেছিল এ-কথা। অন্য এক জাহাজের ক্যাপ্টেন— ক্যাপ্টেন বুমার— সে মবির কাছে একটা হাত খুইয়েছিল। কিন্তু সে তা সহ্য করে নেয় এবং বেঁচে ওঠার ফলে সে আনন্দিত হয়। গ্যাব্রিয়েল আহাবের প্রতিহিংসাপরায়ণতাকে অনুমোদন করেনি।

কীভাবে একই ঘটনায় ভিন্ন মানুষ ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেয়— এ বই সে-কথাই বলে। অনেক রূপকই ওল্ড টেস্টামেন্ট, বাইবেল থেকে নেওয়া— গ্যাব্রিয়েল, র্যাচেল, জিরোবেম, বিল্ ডাহ, এলাইজাহ। প্রচুর প্যাগান নাম যেমন— টাস্টেগো, ফ্লাস্ক, ড্যাগ্গু, ফ্লিস, স্টারবাক, স্টাব, মার্থার আঙুরক্ষেত— এ-সবের উল্লেখ রয়েছে গল্পটিতে। প্যাগানরা মূর্তি উপাসক। কেউ উপাসনা করে মোমের মূর্তি, আবার কেউ কাঠের প্রতিমা। কেউ আবার অগ্নির উপাসক। পিকোড নামটাও এক রেড-ইন্ডিয়ান উপজাতির নাম।

মবি ডিক আসলে সমুদ্র-ভীতির গল্প। মাঝি-মাল্লাদের একজন, যে স্বয়ং আখ্যানকার, বলছে, “ইসমায়েল নামে ডেকো আমাকে”। কেউ একজন তার কাছে জানতে চায়— সে কোথা থেকে এসেছে। উত্তরে সে বলে, “কোনো ম্যাপে লেখা নেই জায়গাটা। সত্যিকারের জায়গাগুলো কখনো স্থান পায় না ম্যাপে।” স্টাব সমস্ত কিছুতেই নির্বিকার থাকে, বলে সবই নাকি আগে থেকে ঠিক হয়ে আছে। ইসমায়েলের আবার সারা জীবনটাই কেটে গেছে ভাসমান জাহাজে। ও বলে এই ভাসমান জাহাজই তার হার্ভার্ড, তার ইয়েল। লোকজন থেকে একটু আড়ালে থাকতেই চায় সে।

এক টাইফুনের কবলে পড়ে পিকোড। একে শুভ লক্ষণ ভেবে বসল ক্যাপ্টেন আহাব। স্টারবাক এতে অমঙ্গল দেখল, ভাবল এই অমঙ্গলই আহাবকে হত্যা করবে। ঝড় থামতেই মাঝি-মাল্লাদের একজন জাহাজের মাস্তুল থেকে পড়ে ডুবে গেল। এ যেন অবশ্যম্ভাবীর সামনে এক অমোঘ পর্দা নামা। এক শান্তিবাদি কোয়াকার মতাবলম্বী যাজক, যে আসলে এক রক্তপিপাসু ব্যবসায়ী, ফ্লাস্ককে বলে, “আঘাত পাওয়া কিছু মানুষ ঈশ্বরের কাছে পৌঁছায়, আর অন্যরা পৌঁছোয় তিক্ততার কাছে।”

বইটিতে অনেক কিছুর সংমিশ্রণ আছে। সমস্ত মিথ— জুডিয়ো ক্রিশ্চান বাইবেল, হিন্দু পুরাণ, ব্রিটিশ কিংবদন্তি, সেন্ট জর্জ, পারসিউস, হারকিউলিস— এরা সবাই যেন তিমিশিকারী জাহাজের কর্মী। আছে গ্রিক পুরাণ, তিমি হত্যার রক্তাক্ত দৃশ্য। এই বইয়ে বহু বাস্তবও উঠে এসেছে, ভৌগোলিক তথ্য, তিমিমাছের তেল— রাজ্যাভিষেকে এই তেলের ব্যবহার— অভিজাত পরিবারগুলির তিমিশিকার ব্যবসার ইতিহাস। তিমির তেল রাজাদের মাখানোর মতো প্রথার উল্লেখ। তিমির সঙ্গে জড়িত ইতিহাস, করোটিতত্ত্ব, ক্লাসিকাল দর্শন, অপবিজ্ঞান তত্ত্বসমূহ, বৈষম্যের স্বপক্ষে যুক্তি— সব কিছুই জুড়ে দেওয়া হয়েছে একসঙ্গে, যুক্তিবোধের পরোয়া না করেই। যুক্তিবোধের পরোয়া না করেই এই গল্পে আসছে অতি বিদ্বান, গণ্ডমূর্খ, আসছে মায়ার পিছনে ছোটা, মৃত্যুর পিছনে ছোটার কথা, সুবিশাল সাদা তিমির কথা— যে মেরু ভাল্লুকের মতো সাদা, সাদাচামড়ার মানুষের মতো সাদা, আসছে ‘সম্রাট’— নিয়তি, শয়তানের প্রতিমূর্তি হয়ে আর আসছে এক উন্মত্ত ক্যাপ্টেন, যে মবিকে ছুরি দিয়ে আক্রমণের চেষ্টায় অনেক বছর আগে নিজের পা হারায়।

আমরা আসলে শুধুমাত্র বহিরঙ্গটি দেখতে পাই। ভেতরে কী আছে তা আমাদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে নিই। মাঝি-মাল্লারা ডেকের ওপর হেঁটে বেড়াচ্ছে মৎসকন্যার ডাক শুনবে বলে, আর হাঙর আর শকুনের দল জাহাজটিকে অনুসরণ করছে। করোটি আর মুখ এমনভাবে পড়ে ফেলা হচ্ছে যেন আপনি একটা বই পড়ছেন। এই তো এটাও একটা মুখ। আমি আপনাদের সামনে রাখলাম আমার মুখটা। পড়তে পারেন যদি পড়ে দেখুন তো।

টাস্টেগো বলছে সে মরে গিয়েছিল, আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। তার এই অতিরিক্ত জীবন একটা উপহার। যীশু খ্রিষ্ট রক্ষা করেননি তাকে, সে বলে, তাকে রক্ষা করেছিল তারই এক সঙ্গী এবং অবশ্যই সে এক অখ্রিষ্টান। এও পুনরুত্থানের এক প্যারোডি।

যখন স্টারবাক আহাবকে অতীতের কথা ভুলে যাওয়ার কথা বলছে, রাগী ক্যাপ্টেন প্রত্যুত্তরে বলছে, “ওহে, অধার্মিকের মতো কথা বোলো না, সূর্য যদি আমাকে অপমান করে, আমি সূর্যকেও ছাড়ব না”। আহাব নিজেও এক কবি, বাগ্মী কবি। সে বলে, “লোহার খুঁটি দিয়ে পাতা হয়েছে আমার নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর রাস্তাটা, সে-রাস্তা ধরে আমার আত্মা ছুটে যেতে অভ্যস্ত।” বা এই পঙ্‌ক্তিগুলো, “দৃশ্যমান যা কিছু সবই আঠা লাগানো মোটাকাগজের মুখোশ”। উদ্ধৃতিযোগ্য কাব্যিক উক্তি এ-সব— হেলায় ফেলে দেওয়ার মতো নয়।

শেষমেশ, আহাব মবিকে খুঁজে পায়, হারপুন বেরিয়ে আসে। জাহাজ থেকে নৌকা নামানো হয় সাগরে। রক্ত দিয়ে আহাবের হারপুনটি প্রভু যীশুর নামে দীক্ষিত করা হয়। মবি আহাবের নৌকায় আক্রমণ করে ও তা ধ্বংস করে দেয়। পরের দিন আহাব আবার মবিকে দেখতে পায়। আবার সাগরে নৌকা নামে। আবারও মবি আহাবের নৌকায় আক্রমণ করে। তৃতীয় দিন আরেকটা নৌকা নামে। আবারও ধর্মীয় রূপক। আহাব ফিরে ফিরে আসছে। আরেকবারের জন্য মবি আক্রমণ করে তাকে, পিকোডকে দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে ডুবিয়ে দেয়। হারপুন বেঁধে রাখার শক্ত দড়িতে জট পাকিয়ে আটকে পড়ে আহাব, নৌকা থেকে সে পড়ে যায় জলে।

ইসমায়েল বেঁচে যায়। ও একটা কফিন আঁকড়ে সমুদ্রে ভেসে থাকে। ব্যস, সমাপ্ত। এই হল পুরো গল্পটা। এই থিম ও যা কিছু নিহিত রয়েছে এই থিমে, আমার বেশ কিছু গানে তার প্রভাব এসেছে।

অল কোয়াইট অন ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট এরকমই আরেকটি বই যা আমাকে প্রভাবিত করেছিল। অল কোয়াইট অন ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট এক লোমহর্ষক গল্প। এই এক বই যেখানে আপনি নিজের শৈশব হারাবেন, অর্থবহ পৃথিবীর থেকে হারাবেন বিশ্বাস, আর হারাবেন আপনার ব্যক্তিগত সমস্ত উদ্বেগ। আপনি এক দুঃস্বপ্নে ঘিরে থাকবেন। মৃত্যু আর যন্ত্রণার রহস্যময় ঘূর্ণিপাক আপনাকে শুষে নেবে। আপনি নিজেকে বাঁচাবেন ছাঁটাই হওয়ার হাত থেকে। মানচিত্রের পাতা থেকে আপনাকে মুছে ফেলা হচ্ছে। একসময় আপনি ছিলেন এক নিষ্পাপ যুবক, কনসার্টের পিয়ানো-বাদক হওয়ার বড়ো স্বপ্ন ছিল আপনার। একসময় আপনি জীবনকে ভালোবাসতেন, ভালোবাসতেন পৃথিবীকে আর এখন সেই পৃথিবীকেই নিশানা করছেন টুকরো টুকরো করে দিতে।

দিনের পর দিন ভিমরুল কামড়াবে আপনাকে আর, কৃমি সুড়ুৎ করে টেনে নেবে আপনার রক্ত। আপনি একটি একঘরে হয়ে যাওয়া জন্তু। কোত্থাও মানাচ্ছে না আপনাকে। বৃষ্টির ধারা বিরক্তিকর লাগছে। হামলার পর হামলা, বিষাক্ত গ্যাস, নার্ভ গ্যাস, মরফিন, গ্যাসোলিনের জ্বলন্ত স্রোত, খাবারের জন্য ময়লা ঘাঁটা আর আঁচড়ানো, ইনফ্লুয়েঞ্জা, টাইফাস, ডিসেন্ট্রি— শেষ নেই এর। আপনার চারপাশের জীবন মুখ থুবড়ে ভেঙে পড়ছে আর গোলাগুলি শিস দিতে দিতে চলেছে। নরকের একদম শেষ প্রান্ত এটি। কাদা, কাঁটাতার, ইঁদুরে ভরতি পরিখা, মরা মানুষের অন্ত্র কুরে খাচ্ছে ইঁদুরের দল, পরিখাগুলো নোংরা আর গুয়ে ভরা। কেউ একজন চিৎকার করছে, “ও-ই, তোমাকেই বলছি। উঠে দাঁড়াও আর লড়াই করো।”

কে জানে ক-দিন ধরে এই বিভ্রান্তি চলবে? যুদ্ধবিগ্রহের তো কোনো সীমা নেই। আপনি ধ্বংস হবেন আর আপনার পা থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হবে। গতকাল একজনকে আপনি হত্যা করেছেন আর তার মৃতদেহের সঙ্গে কথা হয়েছে আপনার। আপনি বলেছেন এইসব মিটে গেলে আপনি আপনার বাকি জীবন তার পরিবারের দেখাশোনায় কাটিয়ে দেবেন। এখানে কার লাভ হচ্ছে? নেতা আর জেনারেলদের খ্যাতি বাড়ছে, বাড়ছে তাদের অন্যান্য আর্থিক মুনাফাও। কিন্তু নোংরা কাজটা আপনিই করছেন। আপনার সহযোদ্ধাদের মধ্যে কেউ একজন বলছেন, “দাঁড়াও একমিনিট, কোথায় যাচ্ছ তুমি?” আর আপনি বললেন, “আমাকে একা ছেড়ে দাও, আমি একমিনিটেই ফিরছি।” তারপর মৃত্যুর জঙ্গলে ঢুকে পড়লেন আপনি একটুকরো সসেজের খোঁজে। নাগরিক জীবনের আদৌ কিছু উদ্দেশ্য আছে কিনা, তা আপনি বুঝতে পারছেন না। তাদের দুর্ভাবনা, তাদের আকাঙ্ক্ষা— কিছুই বুঝতে পারছেন না।

আবার মেশিনগান গর্জে উঠল, শরীরের আরও টুকরো-টাকরা ঝুলছে তার থেকে, হাত পায়ের টুকরো, মাথার খুলির টুকরো, খুলির দাঁতে প্রজাপতি এসে বসছে— আরও নৃশংস সব ক্ষত, প্রতিটা ছিদ্র থেকে পুঁজ গড়িয়ে পড়ছে, ফুসফুসে ক্ষত, শরীরে মারাত্মক সব ক্ষত, দুর্গন্ধে ভরা মড়া, মৃতদেহগুলো বমির শব্দে ভরে গেছে। সব জায়গাতেই শুধু মৃত্যু। আর অন্য কিছুই যে সম্ভব নয়। কেউ একজন আপনাকে মেরে ফেলবে আর আপনার মৃতদেহটি ব্যবহার করবে নিশানা সাধার অভ্যাস করতে। আপনার জুতো জোড়াটিও ব্যবহার করবে। এটি ছিল আপনার গর্বের সম্পদ, আপনার অধিকার। কিন্তু খুব তাড়াতাড়িই সেটিও অন্য কারো পায়ে শোভা পাবে।

ব্যাঙখেকোর দল (ফ্রেঞ্চরা) গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসছে। নির্মম বেজন্মাগুলো। আপনার বন্দুকের গুলি খতম হয়ে আসছে। আপনি বললেন, “এত তাড়াতাড়ি আমাদের আবার আক্রমণ করাটা ঠিক হয়নি”। আপনার এক সাথি ধুলোয় পড়ে আছেন, তাকে আপনি সেনা হাসপাতালে নিয়ে যেতে চান। কেউ একজন বলে ওঠেন, “আর কষ্ট করে কোথাও যেতে হবে না”। “কী বলতে চাইছ তুমি?”। উলটে দেখো ওকে, বুঝবে কী বলতে চাইছি।”

আপনি অপেক্ষা করছেন খবর শুনবেন বলে। আপনি বুঝতে পারছেন না, যুদ্ধ শেষ হচ্ছে না কেন। পরিবর্ত সৈন্যদলের এতটাই অভাব যে, বাহিনী জোগাড় করে আনছে বাচ্চা ছেলেদের, যাদের যুদ্ধের প্রায় কোনো কাজেই লাগবে না। কিন্তু যেভাবেই হোক এদের জোগাড় করে আনা হচ্ছে, কারণ দ্রুত সৈন্যসংখ্যা কমে আসছে। অসুস্থতা আর অপমান আপনার হৃদয় ভেঙে দিয়েছে। আপনি প্রতারিত হয়েছেন, প্রতারণা করেছেন আপনার বাবা-মা, আপনার শিক্ষকেরা, আপনার মন্ত্রীরা, এমনকী আপনার নিজের সরকারও।

ধীরে-সুস্থে সিগার টানা ওই জেনারেলটাও প্রতারণা করেছে আপনার সঙ্গে— আপনাকে একটা ঠগ আর খুনি বানিয়েছে। আপনি একটা বুলেট ওর সামনেই চালিয়ে দিতেন, যদি পারতেন। কমান্ডারটাকেও। আপনি ভাবছেন যদি অর্থ থাকত তাহলে ওই লোকটাকে যেভাবে সম্ভব মেরে ফেলার জন্য আপনি পুরস্কার ঘোষণা করতেন। আর তা করতে গিয়ে যদি কেউ তার নিজের জীবন হারায়, তাহলে অর্থটা চলে যাবে তার উত্তরাধিকারীর কাছে। ক্যাভিয়ার আর কফি নিয়ে ওই কর্নেলটাও— এও আরেকটি। অফিসারদের বেশ্যাখানায় পুরো সময়টা কাটায়। আপনি চাইবেন একেও পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলা হোক। কিন্তু অন্য টমি ও জনিরা আবার চলে আসবে, বাপের নামে দিব্যি গিলে মদ গিলবে, হুইস্কিতে ভরা থাকবে ওদের গেলাস। এদের কুড়িজনকে আপনি মেরে ফেললে আবার কুড়িজন এসে যাবে তাদের স্থান নিতে। আপনার নাসারন্ধ্র সে-দুর্গন্ধ অনুভব করবে।

আপনি আপনার আগের প্রজন্মকে ঘৃণা করবেন এই পাগলামিতে আপনাকে ঠেলে পাঠানোর জন্য, এই অত্যাচারের চেম্বারে ঠুসে দেওয়ার জন্য। চারপাশে আপনার সহযোদ্ধারা মারা যাচ্ছেন। পেটকাটার জন্য মরছেন, মরছে দু-দু-বার অঙ্গচ্ছেদের জন্য, পাছার হাড় টুকরো টুকরো হয়ে মরছেন আর আপনি ভাবছেন, “আমার বয়স মাত্র কুড়ি, কিন্তু আমি যাকে খুশি মেরে ফেলতে ওস্তাদ। এমনকী আমার বাপকেও— যদি আমাকে আক্রমণ করতে আসে।”

কালকে আপনি একটি আহত বার্তাবাহক কুকুরকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন আর পাশ থেকে কেউ একজন বলে উঠল, “বোকার মতো কাজ কোরো না।” একটা ব্যাঙখেকো (ফ্রেঞ্চ সৈন্য) আপনার পায়ের কাছে শুয়ে গরগর শব্দ করছে। আপনি ওর পেটে ছোরা চালিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু লোকটা তখনও বেঁচে। আপনি জানেন কাজটা শেষ করতে হবে, কিন্তু আপনি পারছেন না। সত্যি সত্যিই যেন আপনাকে লোহার ক্রশে বিদ্ধ করা হয়েছে আর এক রোমান সৈন্য আপনার ঠোঁটে ভিনিগারে ভেজানো স্পঞ্জ বুলিয়ে দিচ্ছে।

মাসের পর মাস কেটে গেল। ছুটিতে আপনি ঘরে ফিরছেন। আপনার বাবার কথা আপনি বুঝতে পারছেন না। তিনি বলেছিলেন, “তোর নাম যদি না লিস্টে দেখি, বুঝব তুই একটা কাপুরুষ”। আপনার মা পর্যন্ত ফেরার সময় দরজার কাছে এসে বলছেন, “ওই ফ্রেঞ্চ ছুঁড়িগুলো থেকে সাবধানে থাকিস”। আরও পাগলামি। একসপ্তাহ বা একমাস লড়াই করে দশ গজ দখল করা হল। আর তারপর, পরের মাসে সেই দশগজই ওরা পুনরুদ্ধার করে ফেলল।

হাজার হাজার বছর আগের সেইসব সংস্কৃতি, সেই দর্শন, সেই বোধ— প্লেটো, এরিস্টটল, সক্রেটিস— কী হল এ-সবের? এগুলোই তো রক্ষা করতে পারত আমাদের এই দুরবস্থা থেকে। আপনার ভাবনা ছুটে ফিরে যাচ্ছে বাড়ির দিকে। একসময় আপনিও স্কুলের ছাত্র ছিলেন, হেঁটে যেতেন লম্বা পপলার গাছের সারির মধ্যে দিয়ে। এক মধুর স্মৃতি। আবারও বোমারু বিমান থেকে বোম পড়ছে মুহুর্মুহু। আপনাকে অবশ্যই এবার সতর্ক হয়ে যেতে হবে। সামান্য ভুল অনুমানের কী পরিণতি হতে পারে তার ভয়ে যে অন্য কারোর মুখাপেক্ষি হবেন, সেটিও চলবে না। গণকবর। তাছাড়া আর কোনো সম্ভাবনাই নেই।

তারপর আপনার নজর পড়বে চেরিফুলগুলোর দিকে, আর আপনি দেখছেন প্রকৃতির ওপর এইসবের কোনো প্রভাবই পড়েনি। পপলার গাছগুলো, লাল প্রজাপতিরা, ফুলের ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্য, সূর্য— আপনি দেখছেন প্রকৃতি কী নির্বিকার। যত হিংসা আর যন্ত্রণা মানুষের। প্রকৃতি এ-সব লক্ষ পর্যন্ত করে না।

আপনি কত একা। তারপর একটা বোমার টুকরো আপনার মাথায় এসে লাগল আর আপনি মরে গেলেন। বাতিলের দলে চলে গেলেন আপনি, নাম কেটে দেওয়া হল আপনার। সমূলে ধ্বংস হলেন আপনি। আমি এই বইটা নামিয়ে রাখলাম, বন্ধ করে রাখলাম। আমি আর কোনো যুদ্ধ নিয়ে উপন্যাস পড়তে চাই না, আর কোনোদিন পড়িওনি।

নর্থ ক্যারোলিনার চার্লি পুলের একটা গান আছে যা এইসব বিষয়কেই ছুঁয়ে যায়। গানটার নাম “তুমি কথা বলছ না মোটেও”। গানের কথাগুলো এরকম—
একদিন হাঁটছি আমি আর
শহরের জানলায় একটা বিজ্ঞাপন দেখেছি।
সেনাবাহিনীতে যোগ দিন
দেখুন তো দেখি বিশ্ব বলছেটা কী।
দেখুন আশ্চর্য স্থান
সঙ্গে একপাল
বন্ধু মজার
দেখা হোক, কী সব লোক,
আর শিখে নিন
মেরে ফেলা ওদেরও।
ওহ! বলছ না তো কথা তুমি,
বলছ না তো কথা তুমি মোটেও।
গুলি মেরে মেরে ফেলা, সে কি মজার
বলছ নাকো কথা তুমি মোটেও।

ওডিসি এরকমই এক দুর্দান্ত বই যার থিম বহু গান রচয়িতার ব্যালেডে নিজের মতো করে স্থান করে নিয়েছে— হোমওয়ার্ড বাউন্ড, গ্রিন, গ্রিন গ্রাস অফ হোম, হোম অন দি রেঞ্জ আর আমার গানে তো অবশ্যই।

ওডিসি যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফেরার চেষ্টায় রত এক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের অদ্ভুদ, রোমাঞ্চকর গল্প। এই বাড়ি ফেরার দীর্ঘ সফরের পদে পদে ফাঁদ আর চোরা গর্ত। সারাজীবন পথভ্রষ্ট হয়ে ঘুরে বেড়ানোর অভিশাপে অভিশপ্ত সে। সর্বক্ষণ সমুদ্র তীর থেকে বয়ে নিয়ে চলেছে তাকে সুদূরে, রক্ষা পাচ্ছে অল্পের জন্য। বিশাল পাথরের চাঁইয়ের ধাক্কায় তার নৌকা দুলে উঠছে। সে রুষ্ট করে ফেলছে এমন মানুষদের যাদের রুষ্ট করা উচিত নয়। তার মাঝি-মাল্লাদের মধ্যেও ঝামেলা পাকানোর লোক আছে। আছে বিশ্বাসঘাতক। তার লোকজন শুয়োরে পরিণত হচ্ছে আবার তারপরে তারা আরও যুবক, আরও সুদর্শন পুরুষ হয়ে ফিরে আসছে। সে একজন ভ্রাম্যমাণ মানুষ, কিন্তু একটু বেশিই থেমে থেমে এগোতে হচ্ছে তাকে।

একবার এক মরুদ্বীপে তাকে নোঙর ফেলতে হয়। সে বেশ কিছু পরিত্যক্ত গুহা খুঁজে পায় আর সেখানেই লুকিয়ে পড়ে। তার সঙ্গে দৈত্যদের দেখা হয়, দৈত্যরা বলে, “শেষমেশ তোমাকে খাব”। সে পালায় তাদের কবল থেকে। বাড়ি ফেরার চেষ্টা করে, কিন্তু বাতাস ছুঁড়ে ফেলে ফিরিয়ে দেয় তাকে। অস্থির বাতাস, হাড় হিম করা বাতাস, শত্রু বাতাস। অনেক দূর পর্যন্ত চলে যায় সে— আবার বাতাস এক ফুঁয়ে ফিরিয়ে দেয় ওকে।

ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্কবার্তা পাচ্ছে সে সবসময়ই। তাও যা স্পর্শ করতে নিষেধ করা হচ্ছে, সে-সবই স্পর্শ করে ফেলছে সে। দুটি মাত্র রাস্তা খোলা তার সামনে এবং দুটি রাস্তাই অমঙ্গলময়। একটি রাস্তা ধরে এগোলে ঘটবে সলিল সমাধি, অন্যটিতে অনাহারে থাকতে হবে। সফেন ঘূর্ণাবর্তে ভরা সংকীর্ণ এক প্রণালীতে সে প্রবেশ করল একদিন আর ঘূর্ণাবর্তটি গিলে ফেলল তাকে। ধারাল বিষদাঁতযুক্ত ছ-মাথা দানবদের সঙ্গে দেখা হল তার। বজ্রপাতে আক্রমণ করল তাকে। ক্রুদ্ধ নদীর হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে নদীর ওপর ঝুলন্ত ডালপালা আঁকড়ে ধরতে সে লাফ দিল। দেব-দেবীরা রক্ষা করছেন তাকে, কিন্তু অন্য কয়েকজন তাকে হত্যা করতে চায়। নিজের পরিচয় সে গোপন করছে। সে পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। ঘুমিয়ে পড়ছে আর অট্টহাসির শব্দ ঘুম ভাঙিয়ে দিচ্ছে তার। সে অপরিচিতদের নিজের জীবনকথা শোনাচ্ছে। বিশ বছর হল সে ঘরছাড়া। কোথাও একটা নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাকে, সেখানেই ফেলে আসা হয়। তার সুরায় বিষ মেশানো হয়েছিল। খুব কঠিন একটা পথ পেরিয়ে আসতে হয়েছে তাকে।

নানাভাবে ঠিক এরকমই অনেক কিছুই আপনাদের সঙ্গেও ঘটেছে। আপনার সুরাতেও বিষের ফোঁটা ফেলেছে কেউ। ভুলভাল মহিলার সঙ্গে বিছানা ভাগ করে নিতে হয়েছে আপনাকেও। মায়াময় কণ্ঠস্বর, মিষ্টি ডাক, অদ্ভুদ সুর মন্ত্রমুগ্ধ করেছে আপনাকে। অনেক দূর ভেসে এসেছেন আপনিও, আবার বহু দূরে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে আপনাকে। একটুর জন্য রক্ষাও পেয়েছেন আপনি। আপনিও রাগিয়ে দিয়েছেন কিছু মানুষকে, যাদের রাগানো ঠিক হয়নি আপনার। আপনিও এই দেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরছেন। আপনিও অনুভব করতে পারছেন সেই মন্দ বাতাসের উপস্থিতি, আপনাকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে এই বাতাস অমঙ্গলের দিকেই। তবে এইখানেই এর শেষ নয়।

বাড়ি ফেরার পরও তার জন্য ভালো কিছু অপেক্ষা করছিল না। তার স্ত্রীর আতিথেয়তার সুযোগে খচ্চরের দল ঢুকে পড়েছে সেখানে। অনেকগুলো খচ্চর। যদিও সে ওই খচ্চরগুলোর চেয়ে সব দিক থেকেই শ্রেষ্ঠ, শ্রেষ্ঠ ছুতোর, শ্রেষ্ঠ শিকারী, শ্রেষ্ঠ প্রাণীবিশেষজ্ঞ, শ্রেষ্ঠ সমুদ্রযাত্রী— তাও তার সাহস তাকে রক্ষা করতে পারছে না, কিন্তু ছলনা তাকে রক্ষা করবে।

এইসব পথভ্রষ্টদের তার প্রাসাদকে কলুষিত করার মূল্য দিতে হবে। সে এক নোংরা ভিখিরির ছদ্মবেশ ধারণ করল, আর এক নীচ ভৃত্য তাকে ঔদ্ধত্য ও মূর্খামির বশবর্তী হয়ে পদাঘাতে সিঁড়ি থেকে ফেলে দিচ্ছে। ভৃত্যের এই ঔদ্ধত্য বিপ্লব আনছে তার ভেতর, কিন্তু সে রাগকে বশে রাখে। একশোজনের বিরুদ্ধে সে একা, কিন্তু তাদের সবার পতন হবে একদিন, যে সবচেয়ে শক্তিমান— তারও। সেও সামান্য একজন হয়ে যাবে। আর সব বলার পর, সব কিছু ঘটে যাওয়ার পর, সে বাড়িতে ফিরবে, স্ত্রীর পাশে বসে স্ত্রীকে তার কাহিনি শোনাবে।

তাহলে এর থেকে কী বোঝা যায়? আমি নিজে এবং অন্যান্য গীতিকারেরা এইসব থিমগুলো দ্বারা প্রভাবিত হয়েছি। এই থিমগুলির নানারকম অর্থ হতে পারে। তবে একটা গান আপনাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে কি না— সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমার জানার দরকার নেই গানটার কী অর্থ। আমার গানে আমি নানান ধরনের বিষয় নিয়ে এসেছি। এগুলোর কী অর্থ— এ নিয়ে আমি ভাবিওনি। যখন মেলভিল তার বইয়ে ওল্ড টেস্টামেন্ট, বাইবেল, বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, প্রোটেস্টান্ট মতামত আর সমুদ্র, ভাসমান জাহাজ ও তিমি সংক্রান্ত তার যাবতীয় অভিজ্ঞতা একটি গল্পে নিয়ে আসছেন, আমার মনে হয় না তিনিও খুব একটা অর্থের পরোয়া করেছেন বা এ নিয়ে ভেবেছেন।

জন ডান, সেই যাজক-কবি, যিনি সেক্সপীয়রের সমকালীন, তিনিও লিখে গেছেন— “ওর বুকের সেস্টোস আর আবিডোস। দুই প্রেমিকের নয়, দুইটি প্রেমের নীড়।” আমি এর অর্থ কী জানি না। কিন্তু শুনতে তো ভালোই লাগে। আর আপনি অবশ্যই চাইবেন আপনার গানগুলি শুনতে ভালো লাগুক।

যখন ওডিসিউস ওডিসি-তে বিখ্যাত যোদ্ধা এ্যাকেলিসের সঙ্গে পাতালে দেখা করতে যায়, সেই এ্যাকেলিস যে সুখ-শান্তিতে পূর্ণ দীর্ঘ জীবনের পরিবর্তে সম্মান আর খ্যাতিতে ভরা স্বল্পায়ু জীবন কামনা করেছিল, ওডিসিউসকে বলছে তার এই কামনা ভুল ছিল। “আমি খালি মরলাম। ব্যস, শেষ”। কোনো সম্মানই প্রকৃতপক্ষে ছিল না। অমরত্বও নয়। আর যদি সম্ভবপর হত, তাহলে এই মৃতদের রাজ্যের রাজা না হয়ে সে পৃথিবীতে ফিরে এক প্রান্তিক চাষীর চাকর হয়ে থাকাটাকেই বেছে নিত। তার সারাজীবনের সংগ্রাম তাকে এই মৃত্যুভূমিতে বাস করার উপযুক্ত করে তুলেছে।

গানও ঠিক এইরকমই। জীবিতের দেশে আমাদের গানগুলি জীবন্ত। কিন্তু গান আবার সম্পূর্ণ সাহিত্যের মতোও নয়। গান তৈরি হয় গাইবার জন্য, পড়ার জন্য নয়। সেক্সপীয়রের নাটকের সংলাপ স্টেজে অভিনয় করার জন্যই লেখা। ঠিক যেমন গানের পদ লেখা হয় গাইবারই জন্য, বইয়ের পাতায় পড়ার জন্য নয়। আমি আশা করি আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ এই পদগুলি যেভাবে শ্রুতিযোগ্য করে লেখা, কনসার্টে বা রেকর্ডে বা যেভাবে মানুষ গান শুনছেন আজকাল, সেভাবে শোনার সু্যোগ পেয়েছেন। ফিরছি আবার হোমারের কাছে, যিনি বলছেন, “গান হয়ে এসো আমার অন্তরে, হে কাব্যদেবী, বলিয়ে নাও আমায় দিয়ে গল্পটি”।

Spread the love
By Editor Editor অনুবাদ 5 Comments

5 Comments

  • অসম্ভব ভালো অনুবাদ

    শতানীক রায়,
  • খুব ভালো লাগলো।

    Mainak Banerjee,
  • খুব ভালো হয়েছে অনুবাদ। প্রশংসনীয় কাজ।

    ঋতো আহমেদ,
  • ধন্যবাদ সবাইকে।

    sudip,
  • খুব ভালো লাগল

    Aditya Malik,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *