আইলিয়া কামিনস্কির সাক্ষাৎকার

ইংরেজি থেকে বাংলায় ভাষান্তর: ঋতো আহমেদ

[২রা এপ্রিল, ২০১৯। জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে কবিতা পাঠের পর ডোরা মালিকের সাথে কথোপকথন হয় আইলিয়া কামিনস্কির। সেই কথোপকথনের সম্পাদিত রূপ এই সাক্ষাৎকার।]

ডোরা মালিক: আপনি এমন একজন লেখক যিনি নিজেও অনুবাদ করেছেন এবং অনূদিতও হয়েছেন অনেক, আর বেশ কিছুদিন আগে একবার বলেছিলেন কোন বিষয়টা অনুবাদ করা যায়,—অনুবাদে কতটুকু ধরা যায় আর কতটাই-বা হারিয়ে যায়।
আপনি সেখানে উল্লেখ করেছেন চিত্রকল্প এমন একটা বিষয় যা অনুবাদের পর টিকে থাকে, আর সম্ভবত কোনো অনুবাদে উপমা এবং ছন্দও উপকরণ হিসেবে অনূদিত হয়ে উঠতে পারে। এর সাথে আমি আর একটু যোগ করে বলতে চাই আখ্যান এবং নাটকীয়তার কথাও। সুর ও সংগীত হারিয়ে যেতে পারে, এমনকী সাংস্কৃতিক উপকরণও হারিয়ে যেতে পারে অনুবাদে। আপনার নতুন বই ‘ডীফ রিপাবলিক’ পড়ে যে জোরালো আখ্যান আর চিত্রকল্প পাওয়া গেছে, আমার মনে হয় তা অনুবাদের পরও সহজে টিকে থাকবে। এর অনেকটাই আমি শুরু করে দিয়েছি, আর অবাকই হচ্ছি জেনে আপনি তেমনই একটা উদ্দেশ্য নিয়ে বইটি লিখেছেন যেন এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অতিক্রম করে যেতে পারে। খুশি হব যদি ভুল বুঝে থাকি তো বলেন। এইসব উপকরণ বা বিষয়কে আপনি কি কোনো লেখার সহজাত শক্তি বা নৈতিক আবশ্যকতা মনে করেন, অথবা সবকিছু নাকোচ করে বলতে চান, ‘না, তেমন কোনো উদ্দেশ্য ছিল না আমার?’

আইলিয়া কামিনস্কি: তুমি কি বিশ্বাস করো তোমার ভেতরে একটি আত্মা আছে? বলতে পারবে সে আত্মাটির অবস্থান শরীরের ঠিক কোথায়? ঠিক তেমনি, অনুবাদ একটি শিল্প যার মাধ্যমে এই ধরনের নিশ্চয়তা/অনিশ্চয়তা সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
অনুবাদ প্রয়োজনীয়: অনুবাদ ছাড়া ইংরেজিতে আমরা বাইবেলকে পেতাম না, হোমারকে পেতাম না, দান্তেকে পেতাম না। কিংবা রাশিয়ান ভাষায়: শেক্সপিয়র, মিল্টন-সহ আরও অনেককেই পেতাম না।
এটি একটি প্রয়োজনীয় শিল্প মাধ্যম।
কিন্তু সেই সাথে অনুবাদ পুরোপুরি সম্ভবও নয়। এজন্যই হয়তো প্রতি বছর নতুন নতুন দান্তেকে পাই আমরা। একটি, দুটি বা তিনটি দান্তের অনুবাদ প্রকাশিত হয় প্রতি বছর।
একটা চলমান কথোপকথন যেন। বলতে গেলে, যেন সারবত্তাকে নিংড়ে তুলে আনার একটি অত্যন্ত মৌলিক মাপকাঠি এটা।
কী সেই মাপকাঠি?
আমি একটু দ্বিমত পোষণ করে বলতে চাই চিত্রকল্পই হচ্ছে সবচেয়ে উপযোগী মাপকাঠি। অনুবাদ সবচেয়ে সহজ হয় যদি কোনো কবিতা চিত্রকল্পে ভরপুর থাকে। স্বরও অনুবাদ করা সহজ, যে-জন্যে সহজ মায়াকোভস্কি, বলতে গেলে, তিনি অনেকটাই সহজ কবি, যেন একজন ম্যান্ডেলস্তেম, যিনি ইংরেজিতে অতি সহজেই বোধগম্য, কারণ মায়াকোভস্কি হচ্ছেন স্বর সর্বস্ব। আমি তাকে বাজে কবি বলছি না, বরং তিনি একজন বিস্ময়কর কবি। কিন্তু ম্যান্ডেলস্তেম = স্বর + ৫৫টি অন্য আরও অনেকগুলো বিষয়। সে-সবই অনূদিত করা যথেষ্ট কঠিন।
আমরা হপকিন্সকে কীভাবে অনুবাদ করতে পারি— ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ চার্জ্ড উইত দ্য গ্রেন্ডার অব গড’— যখন অনেকটাই নির্ভর করছে অনুপ্রাস এবং ধ্বনিসাদৃশ্যের উপর। ব্লেকের কথা ভাবো— ‘টাইগার টাইগার, বার্নিং ব্রাইট/ইন দ্য ফরেস্ট অব দ্য নাইট’; মানুষ একে ঘুমপাড়ানি-গান হিসেবে মনে রাখে, অথবা বাচ্চাদের বইয়ের কবিতা হিসেবে। কিন্তু এটিও একটি অধ্যাত্মিক কবিতা। ‘হোয়াট দ্য হ্যামার? হোয়াট দ্য চেইন?/ইন হোয়াট ফার্নেস ওয়াজ দাই ব্রেইন?’ কবিতার মাঝ বরাবর এসে তিনি একটা অধ্যাত্মিক সংকটে উপনীত হন। তুমি এই কবিতাটি রাশিয়ান ভাষায় অনুবাদ করে দেখো, একটা বড়ো বিড়াল বিষয়ক কবিতা হয়ে যাবে। কবিতাটি এর অন্ত-সুরের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল— এই সুর হচ্ছে এর মৌলিক ভাষার সাথে নির্দিষ্টভাবে সম্পর্কিত। এরপর ধরো, ছন্দও অনূদিত হতে পারে। এইভাবে বলতে পারি… (দ্রুত এবং হালকাভাবে ঘরের চারদিক ঘুরে আসো)। অথবা বলতে পারি… (হেঁটে আসো ধীরে ও গম্ভীরভাবে)। তুমি অন্যের ভঙ্গি নকল করতে পারো। ছন্দকে অনুভব করতে পারো। আর সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিভাগ বলা যায় পদবিন্যাসকে যা অত্যন্ত সহায়ক, প্রকৃতপক্ষে, এখানেই অনুবাদ খুব উপকারী। একটু আগে হপকিন্স-এর কথা বলছিলাম। বড়ো বড়ো কবি এবং সমালোচকগণ বলেছেন, হপকিন্স-এর মহৎ কবি হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ হচ্ছে, গ্রীক ব্যাকরণকে ইংরেজি ভাষায় চালাতে চেয়েছেন, খাওয়াতে চেয়েছেন গ্রীক পদবিন্যাস। অন্তত লুই বোগান এমনই মনে করেন। আর একটি ক্ষেত্রে বলা যায়: পল সেলান এক বিস্ময়কর কবি, নিয়ম অনুসারে গেলে আমরা জানি, অনুবাদে সহজলভ্য নন কিছুতেই। তার সময়ের জার্মান ভাষার সাথে গভীরভাবে সম্পর্কে গ্রথিত ছিলেন। এবং এখনও ইংরেজিতে তিনি অনেকটাই অস্থিতিশীল। পদবিন্যাসের উপর করা তার কাজ একটি কারণ হতে পারে এর, এমনকী হতে পারে পদবিন্যাসের মাধ্যমে ভাষাকে ভেঙে ফেলা, পঙক্তি-ভাঙা আর চিত্রকল্পের সাথে এর সম্পর্কও এর কারণ হতে পারে।
তোমাকে আরও কিছু সূত্র দিচ্ছি: পল সেলান রোমানিয়ার মানুষ ছিলেন। যার স্থানীয় ভাষা ছিল জার্মান। তিনি ইহুদী ছিলেন। তার পরিবার— বিশেষত তার প্রিয়তম মা— জার্মানদের দ্বারা নিহত হন। যদিও তিনি রোমানিয় বলতে পারতেন, ফরাসি বলতে পারতেন, রুশও বলতে পারতেন— বলতে পারতেন অন্য অনেক ভাষায়— কিন্তু কবিতা লিখতেন জার্মান ভাষায়।
তিনি তাঁর মায়ের হত্যাকারীদের ভাষায় লিখে গেছেন।
কিন্তু এটা করতে গিয়ে, তিনি এমন এক জার্মান লিখেছেন যেখানে নাৎসিদের অস্তিত্ব থাকতে পারে না। তিনি ভাষাটিকে নতুন করে আনার চেষ্টা করেছিলেন।
এই পুনর্বিন্যাস অনেক দিক থেকেই নতুন ছিল। এ বিষয়ে এক বিখ্যাত দার্শনিক থিওডর অ্যাডর্নো একবার প্রশ্ন তুলেছিলেন, বলেছিলেন, ‘ভালো কথা, এমন গণহত্যার পর ওই ভাষায় তাঁর লিখালিখি কতটা নৈতিক?’ এ নিয়ে মার্কিন কবি মার্ক স্ট্র্যান্ড কৌতুক করে বলেছিলেন, ‘ঠিক আছে তবে, এমন গণহত্যার পর একটা স্যান্ডউইচ খাওয়াও কতটা নৈতিক?’
কিন্তু ওই প্রশ্নটা ছিল যৌক্তিক। সেলান (অন্য অনেক কবি ভিন্ন ভিন্নভাবে, আর পোলিশ কবিরা সম্পূর্ণ আলাদাভাবে) সারা দেবার একটা পথ পেয়েছিলেন।
এমনকী, অ্যাডর্নো পরে যখন সেলান পড়লেন, বললেন: হয়তো গণহত্যার পর কবিতা লেখা অনৈতিক কথাটা বলে আমি ভুল করেছিলাম।
তবে আমাদের জন্য মনে রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ হল অন্য কবিদের মতো, সেলান কোনো দর্শনের পৃথিবীতে বাস করেননি, তিনি সবসময় বাস করেছেন কবিতার উপকরণের ভুবনে। তার জন্য প্রধান উপকরণ ছিল পদবিন্যাস। তিনি সর্বদা অসম্ভব সব দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কবিতার পদবিন্যাস নিয়ে কাজ করেছেন। এ জন্যই শেষ পর্যন্ত বিখ্যাত দার্শনিক অ্যাডর্নো তাঁর মতো বদলাতে বাধ্য হন। এটি গীতধর্মীতার একটি কৌশল।

ডোরা মালিক: আপনি কি মনে করেন অনুবাদে আমাদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের কিছু নির্দিষ্ট দায়িত্ব রয়েছে?

আইলিয়া কামিনস্কি: এখানে আমি শুধু নিজের জন্য বলতে পারি। ব্যক্তিগতভাবে, আমি যে-অনুবাদগুলো করি সেগুলোকে সংস্করণ বা অনুকরণ বলি। আমি সবসময় সফল হই না, কারণ প্রকাশকদের নিজস্ব এজেন্ডা থাকে, তবে আমি যা করি তা বেশিরভাগই সংস্করণ বা অনুকরণ। এখানে বসে আমি সততার সাথে দাবি করতে পারি না যে আমি মেরিনা স্বেতাভা অনুবাদ করেছি। এটি বললে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলা হয়। আপনি যদি মেরিনা স্বেতাভা অনুবাদ করতে পারেন এমন কাউকে খুঁজে পান, আমি এখানে হাঁটু গেড়ে নত হতেও রাজি আছি, ঠিক আছে? কারণ এটি সম্ভব নয় বলে মনে করি আমি। কীভাবে কেউ হপকিন্স অনুবাদ করতে পারে? স্বেতাভা তো হ্পকিন্সের মতোই কবি ছিলেন, একটি অতি আবেগীয় সুর তৈরি করতে তিনি ভাষাকে ভাষার বিরুদ্ধেই সংঘাতে নামিয়েছিলেন। তবে হপকিন্সের মতো নয়, তিনি বিভিন্ন ধরনের টোনালিটিসে (স্বনতায়) তা করেছিলেন; তিনি অনেকগুলো ধারার গুরু ছিলেন। তিনি পার্থিব রাজনৈতিক কবিতাও লিখতে পারেন, লিখতে পারেন ক্রুদ্ধ প্রেমের কবিতা, প্রার্থনা, মহাকাব্য, কাব্যনাট্য, এবং আরও অনেক কিছুই। আর তিনি সঠিক ভাষা খুঁজে পেয়েছিলেন, পেয়েছেন সেগুলোর জন্য ভাষার বিভিন্ন ধরনের রেজিস্টার।
তাই ব্যক্তিগতভাবে, নিজেকে বিশ্বস্ত বলে দাবি করি না। অন্য কেউ যদি তা হতে পারে ব্যাপরটি সুন্দর হবে। খ্রিস্টান উইমন— আশ্চর্য প্রতিভাধর একজন কবি তার— স্ট্যান্ড এয়ার নামে একটি বইয়ে ম্যান্ডেলস্তেম অনুবাদ করেছেন, যা আমি জোরালোভাবে উল্লেখ করছি। উইমান, তাঁর শ্রবণ-শক্তি দুর্দান্ত। তিনি রুশ ভাষা জানেন না। আর তাই, সাধারণ নিয়মেই আমরা জানি, এটি আদর্শ অনুবাদ হওয়া উচিত নয়। এর অনেকটাই তা নয়ও। কিন্তু এখনও পর্যন্ত, কিছু কবিতা রয়েছে যেগুলো আপনাকে অবাক করে দেবে, ওগুলো মূলের যথেষ্ট কাছাকাছি হয়েছে। আসলে, রাশিয়ান এবং ইংরেজি সমানভাবে ভালো জানা প্রত্যেক ব্যক্তি তাঁর এই অনুবাদ পড়ে বলেন, ‘বাহ, যদিও ম্যান্ডেলস্তেমের সাথে এর কোনো যোগসূত্র নেই, তবুও এটি ম্যান্ডেলস্তেমের সাথে দারুণভাবে সম্পর্কিত।’ এটি কোনো আদর্শ আক্ষরিক অনুবাদ নয়, তবে যেভাবেই হোক ম্যান্ডেলস্তেম যা করছেন তিনি তাঁর অনুবাদে ঠিক তা ধরতে পেরেছেন। এবং ম্যান্ডেলস্তেম ইংরাজিতে যা করছেন তিনি তাঁর বিনির্মাণ করছেন। হতে পারে তা আক্ষরিক অথবা আক্ষরিক নয়,— এবং এটি সেভাবে আদর্শ নাও হতে পারে, তবে এটি কবি ভাষার কাছে, পদ্ধতির প্রতি বিশ্বস্ত।

ডোরা মালিক: আমি আপনাকে ফর্ম সম্পর্কে কিছুটা জিজ্ঞাসা করতে চাই। এর আগে আমাকে বলেছিলেন, যখন আপনি রুশ ভাষায় লিখেন, যখন আপনি একেবারে নবীন ছিলেন, আপনি বেশ আনুষ্ঠানিক কবিতা লিখেছেন। কিন্তু ইংরেজিতে, আমি পড়েছি, আপনার ফর্ম বোধ বেশ স্বজ্ঞাত এবং চিন্তাশীল, কিন্তু অনির্ধারিত। আপনার ইংরেজির পাঠক হিসেবে, আমার কিছুটা ধারণা রয়েছে কোন বিষয়টা আপনার লেখায় সুর নিয়ে আসে। তবে আমার জানার কৌতূহল রয়েছে আপনার যদি কোনো নির্দিষ্ট চিন্তা-ভাবনা থেকে থাকে, কেন এক ভাষায় আনুষ্ঠানিক লেখা লিখেছেন আর অন্য ভাষায় গেছেন ভিন্ন দিকে। আপনার জন্য এই সিদ্ধান্তগুলি কী আকার দেয়?

আইলিয়া কামিনস্কি: এ বিষয়ে কথা বলার একাধিক উপায় রয়েছে। আপনি ইংরেজি ভাষায় ফর্ম সম্পর্কে কথা বলতে পারেন, অথবা আপনি গতানুগতিক-তায় ফর্ম সম্পর্কে কথা বলতে পারেন।
উদাহরণ-স্বরূপ: জাপানি ভাষায় ৪৬টি সিলাবল রয়েছে যার প্রতিটির উচ্চারণ শেষ হয় পাঁচ স্বরধ্বনির একটির মাধ্যমে। ব্যতিক্রম কেবল ‘এন’। আর ক্রিয়া আসে বাক্যের শেষে। কাঠামোর উপর ভিত্তি করে ক্রিয়ার সমাপ্তি পরিবর্তিত হয়। মানে হচ্ছে, মূলত অতীতকালের ক্রিয়া সবসময় অন্য একটি অতীত ক্রিয়ার সাথেই ছন্দবদ্ধ হয়, এইসব।
এর অর্থ হচ্ছে, জাপানি ভাষায় ছড়া সবসময় অবিশ্বাস্যরকম ছন্দবদ্ধ। আর তাই তা আকর্ষণীয় বা উল্লেখযোগ্য নয়। সম্ভবত অনেকগুলি গান রয়েছে যা কৌশলগতভাবে ছড়া, তবে উদ্দেশ্য অনুসারে নয়।
প্রচলিত জাপানি কবিতা সাধারণত বাঁধাধরা নিয়মের উপর ভিত্তি করে লিখিত (উদাহরণ হিসেবে বলা যায় পাঁচ-সাত-পাঁচ সিলাবলে গঠিত হাইকুর কথা), প্রতীকবাদ এবং সংকেত, আর সমুচ্চারিত শব্দের খেলা অথবা তাদের রয়েছে একাধিক পঠন। তাই হাইকু লেখা মানে একটি ছোটো বাঁধা কবিতা যেখানে রয়েছে প্রতীকবাদ এবং সংকেত, আর শব্দের খেলা, এগুলোই, আরও বেশি আকর্ষণীয়। অন্যান্য ঐতিহ্যগুলোতে অন্যান্য পরিস্থিতিও রয়েছে।
এবার বলো ইংরেজিতে কীভাবে তুলে আনবে তুমি এ-সব? বলতে চাচ্ছি, যখন একটা হাইকু অনুবাদ করবে তখন কীভাবে তুলে ধরবে যে তুমি ভাষার একটা খুব কঠিন গঠন নিয়ে কাজ করছ যেখানে ছড়া সত্যিকার অর্থেই সাধারণ, আর এ বিষয়টি কবিতাটির জন্য সত্যি গুরুত্বপূর্ণ। ছড়ায়-দূর্বল ইংরেজিতে কীভাবে তা দেখাবে?
কিন্তু যদি তুমি তা না-দেখাও: ফর্মটি খুব আলাদা মানে অর্জন করে। তখন এটি কেবল একটি অনুশীলন মাত্র যার মধ্যে জরুরী কাজটিই নষ্ট হয়ে যায়।
তাই, যখন আমরা ফর্ম নিয়ে কথা বলি, আমার মতে, আমরা কেবল ছন্দমিল আর এরকম অন্য উপকরণ নিয়ে কথা বলি না, আমরা ধরন নিয়েও কথা বলি, আর সেই উপায় নিয়ে কথা বলি যেখানে এই ধরন আশু প্রয়োজনীয়তাকে তীব্রতর করে।
আমার প্রথম বই ‘ডান্সিং ইন ওডেসা’-য়, আমি বেশ সচেতন ছিলাম। আমি তখনও একজন রাশিয়ান মানসিকতায় বিশ্বাসী ছিলাম, আর আমার আসলেই ইংরেজিতে লেখার কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না, যে-ভাষা আমি তখনও শিখছিলাম। আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষা, বরং, যদি কোনো থেকেও থাকে— আমি ছিলাম কম বয়সী— লিখতে চেয়েছিলাম চিত্রকল্পের ভাষায়। আমি এমন এক ভাষায় লিখতে চেয়েছিলাম যেন আমি তা দেখতে পাই। এটা সম্ভবত করতে হয়েছে এ-জন্য যে আমি এই দেশে না আসা পর্যন্ত আমার কোনো শ্রবণ সহায়তা ছিল না। তাই আমার রুশও সত্যিই ছিল চিত্রকল্পের একটি ভাষা। আর তেমনি ইংরেজিতে লিখতে গিয়ে, যখন আমার কাছে শ্রবণ সহায়তা আছে, সম্ভবত তখনও চাইছিলাম কাগজ-পৃষ্ঠায় শ্রুতিহীন রুশীয় পৃথিবী পুনর্নির্মান করতে।
দ্বিতীয় বইটিতে এসে, আমার মনে হচ্ছিল যদি আরেকটি ‘ডান্সিং ইন ওডেসা’ লিখি, রাশিয়ান কবিতার সমস্ত শ্রদ্ধা-সহ, যদি আবার সেই রাশিয়ান কবিদের কাছেই ফিরে যাই, আমি হয়তো বাজাতে শুরু করব আবারও কোনো রাশিয়ান সুর।
১৯৯৩ সালে আমেরিকায় আসি, আর আমার প্রথম বই প্রকাশ হয় ২০০৪ সালে। অর্থাৎ প্রথম বই প্রকাশের আগে ১১ বছর আমেরিকায় বসবাস করা হয়ে যায় আমার। আমি যে-মহিলাকে বিবাহ করেছি তার সাথেই ইতোমধ্যে ডেটিং করছিলাম, ও আমার স্ত্রী হয়েছিল পরে, আর আমরা বাড়িতে ইংরেজিতে কথা বলতাম। সুতরাং ‘ডীফ রিপাবলিক’ ইংরেজি ভাষায় জীবনযাপন শুরু করার জন্য খুব সচেতন সিদ্ধান্ত ছিল। বলা হয়ে থাকে, ডীফ রিপাবলিক, এখনও, স্পষ্টভাবে কোনো স্থানীয় লেখকের লেখা বই নয়। আমার বেশিরভাগ বন্ধুবান্ধব যারা ইংরেজিতে কবিতা লেখেন তারা বেশ এক ধরনের আবেশী— বিশেষত আমেরিকাতে; ইউকে-তে অবশ্য আলাদা হতে পারে— সবাই অদ্ভুতের ধারণায় আবিষ্ট। এ জন্য কম মনোযোগী হতে পারিনি কেন-না যে-কারণে আমি আমি, ইতিমধ্যে তার জন্যই আমি অদ্ভুত। আমি এখানে যা বলি তা তোমার কাছে অদ্ভুত লাগবে। এটিই এই দেশে অপরিচিত হওয়ার মানে।
তাই আমি মন্ত্রমুগ্ধের ধারণা সম্পর্কে অনেক বেশি আগ্রহী। আমি একটি গল্প-লেখকীয় ঐতিহ্য থেকে এসেছি— আইজাক বাশেভিস সিঙ্গার, আইজাক ব্যাবেল, শোলেম আলেইচেম। এটি পূর্ব ইউরোপীয় ইহুদি গল্প-লেখকীয় ঐতিহ্য। তবে ফর্ম-এর কথায় ফিরে গেলে, কিছু কবিতায় তুমি দেখতে পাবে, আমি মাদার গুজ স্টাইলে আরও বেশি করে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম: ছোটো ঘুমপাড়ানি গান, ছোটো সংগীত, জাদুমন্ত্র, প্রেমীদের পাণিপ্রার্থনা— আমার সুরের ভেতর এই ধরনের প্যাটার্ন রয়েছে।
দাঁড়াও, নিজেকে নিয়ে বলা বন্ধ করে, চলো দৃষ্টিকে আর একটু প্রসারিত করি: রুশ সাহিত্যের শুরুর কথা যদি বলি, ধরো একটা সাল ধরে নিই ১৮২৪, যখন আলেকজান্ডার পুশকিন ‘ইয়েগেনিয় ওয়ানগিন’ লিখেছিলেন, রাশিয়ান সাহিত্যের কেন্দ্র বলা হয় একে। তবে ইংরেজি সাহিত্যের জন্য ১৮২৪ সালটা কি? বায়রন ১৮২৪ সালের মধ্যেই মারা যান, তাহলে বায়রন কে ছিলেন? তুমি তো জানো তার আগেই ছিলেন মিল্টন, ছিলেন সেক্সপিয়র, ছিলেন আরও অনেকে। তোমার— আছে ১৭ শতক! তুমি জানো ইংরেজি সাহিত্যে শুধু ১৭ শতকের দিকে তাকালেই ডজন ডজন অসাধারণ সব কবিতা পাওয়া যাবে।
তাহলে রুশ কবিদের কীভাবে ইংরেজিতে নিয়ে আসবে, এই যেমন জোসেফ ব্রডস্কি, যখন, মানে তার লেখার সময়ে, রুশ ঐতিয্য তো মাত্র ১৫০ বছরের? তাকে কোথায় অনুবাদ করবে? লোএল-এ? এলিয়ট-এ? প্লাথ-এ? দেখ কী বলছি আমি? এখন ব্রডস্কি রাশিয়াতে ইংরেজি পড়ছেন আর অন্ধভাবে লুটে নিচ্ছেন। স্টিভেনস থেকে নিচ্ছেন— যাকে তিনি বলছেন অপছন্দ করেন, কথা প্রসঙ্গে বলছি, তিনি অডেন থেকেও নিচ্ছেন, এলিয়ট থেকে নিচ্ছেন, এবং এমন আরো অনেক আছে, তাই অন্যভাবে বললে অনেক কেনাকাটাই আছে।
কিন্তু তুমি এও দেখতে পাবে তাঁর নিজের করা অনুবাদে প্রতিবার তিনি রুশীয় সুরকে ইংরেজিতে আনার চেষ্টা করেছেন, এটা সামান্য কাজ নয়। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিত। আমিই প্রথম এটা বলছি তা কিন্তু না। অনেকে বহুবার বলেছেন। মিলোজ কিছুটা বলেছেন। তাই, অ-স্থানীয় বক্তা হয়ে যখন কেউ এ-ধরনের সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হয়, তখন তাঁকে প্রশ্ন করতে হয় এই সীমাবদ্ধতার দৌড় আসলে কতটুকু, কীভাবে কাজ করে, কীভাবে আমাকে সাহায্য করতে পারে, কীভাবে অসম্ভব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করে, করে নীরবতা সম্পর্কে প্রশ্ন, রূপক সম্পর্কিত প্রশ্ন? কীভাবে আমি সেই সুর গড়ে তুলতে পারি যা শুনেছি অন্য কোথাও, এখানে নয়? অন্য আর কী কী কাব্যিক উপকরণ বিনির্মাণ করা যেতে পারে যা ইংরেজিকে প্রভাবিত করবে? আসলে এটাতেই আমি আগ্রহী।

ডোরা মালিক: সুন্দর বলেছেন। ধন্যবাদ আপনাকে। এই রেকর্ডিং শুরু হওয়ার আগে আমি যখন জিজ্ঞেস করছিলাম আপনি ডীফ রিপাবলিক লেখার সময় কী পড়ছিলেন আপনি হেসেছিলেন, আমি কল্পনা করতে পারছি আপনি অনেক পড়েছিলেন সব সংগ্রহে আনার জন্য। আমি জানি আপনি অনুবাদ আর সম্পাদনা করছিলেন। তবে এর মধ্যে যদি এমন কিছু থাকে যা ডীফ রিপাবলিক লেখার সময় আপনাকে প্রভাবিত করেছে তো বলবেন, আমি এ-ব্যাপারে খুব কৌতূহল বোধ করছি।

আইলিয়া কামিনস্কি: অসুবিধার অংশ বলতে বই প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতার অংশটুকু বলা যায়— ১৫ বছর লেগেছে— কারণ আমার কোনো মডেল ছিল না। যদি থাকতো তবে ছয় মাসের মধ্যে বই প্রকাশ হয়ে যেতো। মডেল থাকা ভালো। তবে আমি দীর্ঘ সিকোয়েন্স সম্পর্কে কথা বলতে পেরে খুশি, আর দীর্ঘ কবিতা আমি মনে করি উপকারী। রুশ ভাষায়, বেশিরভাগ লোকই একমত হবে যে বিশ শতকের বিখ্যাত দীর্ঘ কবিতাগুলির মধ্যে রয়েছে আন্না আখমাতোভার ‘বিশ্রাম’। অবশ্য, এটিই একমাত্র নয়। এর সাথে রয়েছে ব্লকের ‘দ্বাদশ’, শ্বাতোভার ‘দ্য রেচারার’, জীভাগো থেকে পাস্তেরনাকের কবিতাগুলো (পাশাপাশি তার ১৯০৫ আর লেফটেন্যান্ট শ্মিড্ট সিকোয়েন্সস), জাবোলোটস্কির সিকোয়েন্সস, মায়াকোভস্কির দীর্ঘ কবিতাসমূহ, এবং আরও অনেক অনেক। আর এখনও, আমি নির্দিষ্ট করে বলব ‘বিশ্রাম’-এর কথা কারণ এটি গতানুগতিক কাব্য জগতের বাইরে দাঁড়ানো প্রত্যক্ষদর্শীতার এক মহৎ কবিতা যা একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক ঘটনা হয়ে ওঠে শেষ পর্যন্ত। আখমাতোভাকে এখান থেকে পড়তে শোনার পর, সলজেনিটজন এ কথা বলেছেন বলে জানা গেছে, তাঁর কাছে মনে হয়েছে এই কবিতায় আখমাতোভা রাশিয়ারই প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
ইংরেজিতে, আমেরিকার ইংরেজিতে, আমি রবার্ট হেডেনের ‘মিডল প্যাসেজ’-কে সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করতে চাইব— যাকে সন্মান জানানো হয়েছে অবশ্যই, তবে খুব একটা সেভাবে আলোচনায় আনা হয়নি। রবার্ট হেডেন সাধারণভাবে খুব সম্মানিত। কিন্তু সম্পূর্ণরূপে এই কবি সম্পর্কে কথা বলা হয়নি যাঁকে আমাদের আলোচনায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা উচিত, আর এই কবিতাটি খুব আকর্ষণীয় কবিতা, এটি যেই ধরনটির উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়েছে তা হচ্ছে এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্টল্যান্ড’। তিনি ভাষার বিভিন্ন ধরন অনুসরণ করেন— ঠিক ধরন নয়— তিনি ১৭ শতকের ভাষা গ্রহণ করেন, তিনি দাসধারীদের ডায়েরি থেকে ভাষা নেন, তিনি দাসদের গান থেকে ভাষা গ্রহণ করেন, আর এভাবেই তিনি অবিশ্বাস্যভাবে চলমান বর্ণনামূলক এই কবিতাটি সৃষ্টি করেন, ঠিক মনে নেই, পাঁচ কি ছয় পৃষ্ঠার, কিংবা এর চেয়ে অনেক বড়ো হবে হয়তো— ওই পৃষ্ঠাগুলিতে সত্যিই এটি যেন এক মহাকাব্য।
বছরখানেক আগে এক গল্প শুনেছিলাম, মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাব্লু এইচ ওডেন তখন পড়াচ্ছিলেন, তিনি এলিয়টকে নিয়ে এসছিলেন কবিতা পড়তে, আর হেডেন ছিলেন অডেনের ছাত্র, তিনি শুনেছিলেন এলিয়টের কবিতা-পাঠ দীর্ঘ হয়, দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন আসে তার পাঠ শুনতে। হেডেন তখন বাসায় ফিরে গেলেন আর লিখতে শুরু করলেন ‘মিডল প্যাসেজ’। শেষ করতে অনেক বছর লেগে যায় তাঁর, কিন্তু কবিতাটি খুব সুন্দরভাবে শেষ করেন তিনি। আমি তাই জোরালোভাবেই ওটার কথা বলবো। প্রচুর বই এসছে আমার কাছে। মানে আমরা এখানে অনেক কিছু বলতে পারি। ১৫ বছর লেগে গেছে আমার, এই ১৫ বছরে আমি কী কী পড়েছি ঠিক করে বলতে পারছি না! আমি গিলগামেশ পড়েছি। আমি ওভিডকে পড়েছি। সেক্সপিয়রকে পড়েছি। আমি গোয়েতে পড়েছি,— ইত্যাদি।

ডোরা মালিক: তবে আপনার মতামতগুলি অন্য কয়েকটি সিকোয়েন্সে শুনতে আকর্ষণীয় লাগে। ১৫ বছরের কথা, আমি আসলে সেই সময়সীমার কথা ভাবছি, একটা বইতে যা রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং রাজনৈতিক মতবিরোধের সাথে মোকাবিলা করে। আমি না ভেবে পারছি না যে আপনি আমেরিকায় বসে বইটি লিখেছেন এমন এক সময়সীমায় যা আমেরিকার তিনজন রাষ্ট্রপতিকে কভার করে। আর অবশ্যই কভার করে অনেকগুলো রাজনৈতিক পরিবর্তন আর সারা বিশ্বময় রাজনৈতিক উত্থানপতন। আমি কৌতূহলী ছিলাম যদি আপনি একটু খোলাসা করে বলেন, ‘আমি এই নীতিগর্ভ রচনাটি লিখতে যাচ্ছি, যে সম্ভবত দুঃখের সাথে আমরা যে যুগেই আছি তার সাথে কথা বলবে’, অথবা আপনি আমাদের কিছু রাজনৈতিক মুহূর্ত আপনার বইয়ে নিহিত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন কিনা, যে-বইটি তখন লিখে যাচ্ছিলেন?

আইলিয়া কামিনস্কি: এই প্রশ্নের সম্ভবত দুটি বা তিনটি উত্তর রয়েছে; আমি সংক্ষিপ্ত করার চেষ্টা করব। আমি ইউক্রেন থেকে এসেছি, এবং ইউক্রেনে এখন যুদ্ধ চলছে, প্রায় পাঁচ বছর ধরে যুদ্ধ চলছে। সুতরাং সেই গল্পটিও বইয়ের একটি অংশ; আমি এড়াতে পারি না। গল্পটি স্বামী, স্ত্রী এবং একটি নবজাতকের। মহিলা এবং পুরুষ মারা যায়, তবে শিশুটি বেঁচে থাকে। আরেকজন মহিলা বাচ্চাটিকে দত্তক নেন।
এটি আমার বাবার গল্প। কমবেশি এরকমই ঘটেছে। তবে আমি স্বীকারোক্তিমূলক লেখক নই। আমি কেবল রেগে আছি তাও নয়। স্বীকারোক্তিমূলক লেখকদের বিরুদ্ধে আমার কিছুই বলার নেই। শুধু আমার নিজের গল্প নয় এটা। এ-জন্য আমাকে একটা রূপকথার গল্প লিখতে হয়েছিল। সবটাই মনোরম এবং সবই সত্য, তবে অন্য যে-পর্যায়টি আমার ছিল তা ইংরেজিতে লেখার সাথে সম্পর্কিত। এবং ইংরেজি ভাষায় এই রাশিয়ান ঐতিহাসিক জিনিসটি পাওয়া সত্যিই অসততা বলে মনে হয়েছিল এবং তা ভুলতে পারছিলাম না। কারণ, আমি আর রাশিয়ার ছোটো ছেলেটি নই। আমি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেছি। সুতরাং, ‘ওল্ড ওয়ার্ল্ডে এটিই ঘটে’ প্রকারের কথাটি লিখলে নিজেকে সৎ মনে হয় না। তার চেয়ে, আমি কী, আমি তা জানতে চেয়েছিলাম: শরণার্থী হওয়ার অর্থ কী? আমেরিকা কী, তা বোঝার জন্য,— একজন আগন্তুকের চোখে এটা যে কী বোঝায়? সুতরাং, বইয়ের শুরুতে, একটি নির্দিষ্ট চিত্রের পুনরাবৃত্তি আছে, একজন সৈনিকের হাতে খুন হওয়া একটি ছেলের চিত্র। এবং এটি খুবই আমেরিকার চিত্র। এবং অনেকটা সময় পুরোপুরি নীরব থাকা পুরো পাড়ার চিত্র ব্যাপারটিকে এমনভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে যেন ঘটনাটি ঘটেইনি। এটাও খুব আমেরিকান ধরনের নীরবতা। যখন আমি বইটিতে এটা ব্যবহারের জন্য কোনো উপায় পেয়েছি, বইটিতে এটি চিত্রিত করতে গিয়ে আমি জানতাম যে আমার কাছে গল্পটির একটি স্থাপন ছিল যা আমার কাছে সত্য বলে মনে হয়েছিল। হ্যাঁ, এটি পূর্ব ইউরোপীয়। এবং, এখনও এটি খুব আমেরিকান। এই মুহূর্তে আমি কে, সেই সত্য প্রতিফলিত করে। সুতরাং সেভাবে এটা এক প্রকার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত: এটা এমন একটা পরিস্থিতি যেখানে আপনার কিছু থাকতে হবে, এক ধরনের ছন্দ অথবা নিজের ভেতরের বিভিন্ন অংশের পারস্পারিক প্রতিধ্বনি। তাদের মধ্যকার উত্তেজনা। চিত্র ও সুরের মাধ্যমে এই বইটি সেই উত্তেজনার চারপাশে পৃথিবীকে গড়ে তোলে।

আইলিয়া কামিনস্কি:

কবি আইলিয়া কামিনস্কি সোভিয়েত ইউনিয়নের ওডেসা শহরে ১৯৭৭ সালের ১৮ই এপ্রিল জন্ম গ্রহণ করেন। ঠান্ডা লাগায় চার বছর বয়সে একবার যখন ডাক্তারের কাছে যান তখন তার মাম্পসের ভুল চিকিৎসার কারণে প্রায় সম্পূর্ণ শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। এরপর, অনেক পরে, ১৯৯৩ সালে নিউ ইয়র্কের রচেস্টারে বসতি স্থাপনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তাঁর পরিবারকে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদান করে। আর, ১৯৯৭ সালে তাঁর বাবার মৃত্যুর পর, কামিনস্কি ইংরেজি ভাষায় কবিতা লিখতে শুরু করেন। তিনি অ্যাডিরনড্যাক রিভিউয়ের সাথে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি ইংরাজিকে বেছে নিয়েছিলাম কারণ আমার পরিবার বা বন্ধুবান্ধব কেউই এটি জানত না— কী লিখেছি পড়ে কেউ বলতে পারত না। আমি নিজেও ভাষাটা তেমন জানতাম না। এটি ছিল একটি সমান্তরাল বাস্তবতা, একটি উন্মাদ সুন্দর স্বাধীনতা। এখনও আছে।’

কামিনস্কি জর্জটাওন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বি.এ করেন। আর ক্যালিফোর্নিয়ার হেস্টিংস কলেজ অফ ল থেকে জে.ডি করেন। পালোমা কপাননার সাথে তিনি পোয়েটস ফ পিস সহ-প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা ত্রাণ কাজের পক্ষে বিশ্বব্যাপী কবিতা পাঠকে স্পনসর করে। তিনি জাতীয় ইমিগ্রেশন আইন কেন্দ্র এবং বে এরিয়া লিগ্যাল এইডের কেরানি হিসাবেও কাজ করেছেন।

একই সাথে সরল ও ভাবে আবিষ্ট রূপকথার আশ্চর্য এক ভাষায় কামিনস্কির কবিতাগুলি যুগে যুগে ছড়িয়ে পড়ে এবং জীবনের প্রেম, শোক, আনন্দ আর হাসি ডেকে আনার জন্য কণ্ঠ দেয়। তাঁর কবিতাগুলি মানুষের জীবন অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে চলে। জ্ঞাত এবং অজ্ঞাত, হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর মিষ্টি এবং তিক্ত গল্পগুলিকে সংযুক্ত করে। কামিনস্কি ডান্সিং ইন ওডেসা (২০০৪)-এর লেখক, যিনি টুপেলো প্রেস ডরসেট পুরস্কার, আমেরিকান একাডেমি অফ আর্টস অ্যান্ড লেটারস মেটকালফ অ্যাওয়ার্ড এবং ফরওয়ার্ড ম্যাগাজিনের সেরা কবিতা বইয়ের বর্ষ পুরস্কার জিতেছেন। এবং ফরাসি আর রোমানিয়ান ভাষায় অনূদিত হয়েছেন। ট্রাভেলিং মিউজিসিয়ান (২০০৭) মূলত রাশিয়ান ভাষায় রচিত তাঁর কবিতার একটি নির্বাচিত সংকলন। তাঁর সাম্প্রতিক সংগ্রহটি হচ্ছে ‘ডীফ রিপাবলিক’ (২০১৯), একটি আশ্চর্য বই।

তিনি সুসান হ্যারিসের সাথে আন্তর্জাতিক কবিতা (২০১০)-এর ইকো অ্যান্টোলজির সহ-সম্পাদনা করেছিলেন এবং পোলিনা বার্সকোভা’স দ্য লামেন্টেবল সিটি (২০১০)-এর সম্পাদনা ও সহ-অনুবাদ করেছেন। অনলাইন জার্নাল ইন পোজ রিভিউর সম্পাদক হিসাবেও কাজ করেছেন।

তাঁর পুরস্কারের ঝুলিতে রয়েছে হুইটিং রাইটার্স অ্যাওয়ার্ড, মিল্টন সেন্টার অ্যাওয়ার্ড ফর এক্সিলেন্স ইন রাইটিং, ফ্লোরেন্স কাহ মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ড, কবিতা ম্যাগাজিনের লেভিনসন পুরস্কারের পাশাপাশি তাদের রুথ লিলি ফেলোশিপ, ফিলিপস এক্সেটার একাডেমির জর্জ বেনেট ফেলোশিপ, ল্যানন ফাউন্ডেশনের ফেলোশিপ এবং একাডেমি অব এমেরিকান পোয়েটস্‌ ফেলোশিপ।

তিনি সান দিয়েগোতে বসবাস করেন।

 

Spread the love

7 Comments

  • কামিন্সকির কবিতা পড়েছি আগে। গুছিয়ে পড়তে হবে তোমার এই অনুবাদ। সিঙ্গার অনুবাদ করেছি আগে।কামিন্সকির কবিতাগুলো অনুবাদের অনুরোধ জানাব তোমাকে। অল দ্য বেস্ট।

    Prabhat Mukherjee,
    • আপনার মন্তব্যে অনুপ্রাণিত হলাম দাদা। কামিনস্কি আমার ভীষণ প্রিয়। ওঁর কবিতা অনুবাদের ইচ্ছে এবং পরিকল্পনা আছে আমার। ’ডিফ রিপাবলিক’ বইটার অর্ডার দিয়ে রেখেছি আমাজনে। আশা করছি লকডাউনের শেষে পেয়ে যাবো। আপনার অনূদিত সিঙ্গার পড়ার আগ্রহ অনুভব করছি।

      ঋতো আহমেদ,
  • কামিন্সকির কবিতা ভীষণ ভালো। তোমায় অনুরোধ জানিয়ে রাখলাম । ভালো হয়েছে অনুবাদ । অনেক তথ্য পেলাম । ভালো লাগল।

    Prabhat Mukherjee,
    • অনেক ধন্যবাদ দাদা। শুভকামনা জানবেন।

      ঋতো আহমেদ,
  • বার বার এই রকম লেখা পড়ে
    ঋদ্ধ হতে চাই।
    ধন্যবাদ ঋতো আহমেদ।
    ধন্যবাদ ” তবুও প্রয়াস ” ।

    হেদায়েতুল ইসলাম বাদল,
  • খুব ভালো কাজ।

    শতানীক রায়,
  • ভালো কাজ। তথ্য সমৃদ্ধ, ওনাকে আগে পড়িনি, পড়বার আগ্রহ রইল।

    Rajdeep,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *