করোনার দিনগুলিতে: অমিতাভ মৈত্র

সিংহ, উট, মরুভূমি

ইচ্ছে ছিল না আক্রমণ করার, কেন-না ক্ষুধার্ত ছিলাম না আমি। বিকেলে মরুঝড়ের ভেতর দিয়ে দুলতে দুলতে, ঝড়ে প্রায় অদৃশ্য। আকার হারালে কোনো বস্তুর মতো, কোনো ওভারকোট বা ভ্রমণ পত্রিকা বিক্রেতার মতো দ্বিধাগ্রস্ত এগিয়ে আসছিল আর প্রথমে আমার মনে হয়েছিল বিরাট এক হাওয়া-ঠাসা বেলুনের পুঞ্জ সে। তারপর হাওয়া-হারানো বেলুনের মতো সংকুচিত ও দুর্বল হয়ে যায় সেই পুঞ্জ, আর প্রথম একটা উট এসে শুয়ে পড়ে আমার সামনে আর হারিয়ে যায় সেই বেলুন।

আমি একটা সিংহ যে মাঝে মাঝে ছায়া হয়ে যায়। ছায়া হয়ে এগিয়ে আসা উটকে তাই প্রথমে আমার বেলুন মনে হয়েছিল। বেলুন আমার বিষয় নয়। কিন্তু উটের রক্ত ভালো লাগে আমার। আমি সহজভাবে তাই এগিয়ে গিয়েছিলাম তার দিকে। তখন সে হঠাৎ নীল হতে শুরু করে সূর্য-ডোবা আকাশের মতো তার দিকে তাকিয়ে আমি ধারণা নিতে চেষ্টা করি সন্ধ্যা কখন নামবে আর আমি কামড়ে ধরতে পারব তার গলা। আশা করা যায় এর মধ্যে আমার খিদে চাঙ্গা হয়ে উঠবে। আবার, আর উটও সম্মত থাকবে, যাকে আমার মনে হয় প্রেরিত এবং প্রাণিত। আমার এমন মনে হয়েছিল শিকার বিষয়ে তার দেওয়া কিছু অদ্ভুত ভাবনা থেকে। যখন তাকে বলি তাকে পুঞ্জীভূত বেলুন মনে হয়েছিল, প্রথমে সে বলেছিল কোনো শিকারকেই এমন মেদুর দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয় শিকারি প্রাণীর। বাইরে থেকে দেখা আঁকাবাঁকা রূপকে অনুসরণ করতে গেলে শিকার তার মূল আকারের মধ্যে অন্তর্হিত হবে। প্রত্যেকটি বস্তুর একটা মূল আকার থাকে। শিকারের দিকে দৌড় শুরু করার আগে একটু দূরে দাঁড়িয়ে তোমার সব কিছুকে একজোড়া চোখ করে তোলো আর মনে করো তুমি একটা ছবির সামনে দাঁড়িয়ে। তখন দেখবে তোমার শিকারের মূল আকার, রং, আলো-ছায়া একটা পিরামিডের আকার হয়ে তোমার চোখে আসছে। তোমার চোখের কাজ শুদ্ধতার সঙ্গে এই পিরামিডকে গ্রহণ করা। পরিপ্রেক্ষিতের গোড়ার কথা এটাই।

স্বভাবে, আত্মায়, শরীরে সিংহ হলেও আমি হয়তো বাতাসে ভেসে যাওয়া অনন্ত পিরামিড ছাড়া আর কিছু নই। আমার শরীর থেকে বাতাস ও আলোর মধ্যে প্রতি মুহূর্তে বেরিয়ে আসছে পিরামিডের নানা আকার, এরা কাটাকাটি করছে পরস্পরকে, নতুন জাল বুনছে আর নতুন পিরামিড সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু কেউ কারো পথ আটকায় না। বাতাস সবার জন্য রাস্তা খুলে দেয়।

উট বলেছিল শিকারের সামনে আমি যেন আমার অন্তর্দৃষ্টির ভার সবটুকু নামিয়ে দিতে শিখি। শিকারের অস্তিত্বের মৌল চরিত্র যেন রক্ষা করি সবসময়। তার পরিপূর্ণ ত্রিমাত্রিকতাকে রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমি ভাবছিলাম কথাগুলো।

এবার মনে হল খিদে পাচ্ছে। রাতের আকাশে ঝকঝক করছে তারারা। এগিয়ে গেলাম ধারণা থেকে, উটের গলার দিকে। আর বিস্মিত হয়ে দেখলাম মধ্যরাত্রি-নীল একটি অস্তিত্ব হয়ে উঠেছে সে এর মধ্যেই, যার মধ্যে দ্রুত অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে একটি উট। আমি এগিয়ে গেলাম আরও কিছুটা আর সে বলল জানি আমার রং গাঢ় হয়ে গেছে, কিন্তু তুমি জানো না তুমিও এখন মিডনাইট ব্লু একটা সিংহ হয়ে গেছ। আমাদের প্রাকৃতিক রঙের আর চোখের মাঝখানে বাতাস যত উজ্জ্বল হয় ততই নীল হয়ে যাই আমরা। তবু আমি এখনও যে কিছুটা হলেও উট আর তুমি কিছুটা হলেও সিংহ রয়ে গেছ তার কারণ আমাদের দু-জনের থেকে বেরিয়ে আসা আলোর অসংখ্য রেখার মধ্যে সংঘাত আছে। এবং পরস্পরের সাথে মিশে যায়নি তারা।

যখন তার গলা কামড়ে ধরেছিলাম কোনো রক্তধারা আমি টের পাইনি আমার মুখে এবং সে বলেছিল কোনো দাঁত তার গলায় অনুভব করেনি। তবু আমার খিদে শমিত হয়েছিল আর কিছু রক্তাল্পতার সমস্যা ফুটে উঠেছিল উটের মধ্যে। আবার সে অসংখ্য সাদা কুচিতে ছেয়ে যাওয়া ঘন নীল বেলুনের মতো হয়ে আকাশে উড়ে যায় যতক্ষণ পর্যন্ত না সে রাত্রির আকাশে মিশে যাচ্ছে আর আকাশ হয়ে উঠছে তার সম্প্রসারিত অস্তিত্ব।


ইচ্ছে ছিল না আক্রমণ করার, কেন-না ক্ষুধার্ত ছিলাম না আমি। আমার শেষ খাবার গ্রহণ ছিল সেই মধ্যরাত্রি-নীল রঙের উটের অদ্ভুত রক্তে। শিকারকে মারার আগে নিজেকে সর্বাংশে একজোড়া চোখ করে তুলতে হয় যেন তুমি কোনো ছবির সামনে দাঁড়িয়ে— সে বলেছিল। আর শিকার করি না আমি। শুধু রুদ্ধশ্বাস আনন্দে মূল এক আকার খুঁজে বেড়াই, বস্তুর ত্রিমাত্রিকতা রক্ষা করি। সামঞ্জস্যপূর্ণ অনুপাতগুলো বুঝতে চাই।

বরফের মতো সাদা উজ্জ্বল চাঁদ নীল রাত্রিকে স্নান করিয়ে দিচ্ছে। রাত্রির শীতল মরুভূমি যেখানে দিগন্ত ছুঁয়েছে, সেখানে পলির স্তূপ ভয় দেখানো সাদা রঙের। এক ভবঘুরে কালো মানুষ, রামধনু রঙের পোশাক পরে গভীর ঘুমে ডুবে আছে। পাশে ম্যান্ডোলিন, জলের কুঁজো। আমি শুনলাম বাতাসের স্রোতের ভেতর দিয়ে ম্যান্ডোলিন তার নীচু সুর পাঠিয়ে দিচ্ছে রাত্রি আর চাঁদের কাছে, জল একা একা কথা বলছে কুঁজোর সঙ্গে। এই শান্ত নিথরের মধ্যে যে-গাঢ় সম্মোহন— আমি অনুভব করছিলাম তাকে। দেখছিলাম ভবঘুরে মুখ, ম্যান্ডোলিন, আর জলের পাত্র রাতের আকাশের মতো নীল হয়ে আছে।

ভবঘুরের নিদ্রিত দু-হাত সহসা জড়িয়ে ধরল আমার গলা। আমি ভারী দংশন টের পেলাম, গড়িয়ে নামা রক্তস্রোত টের পেলাম আর বললাম তাকে— তুমি!

করোনার দিনগুলিতে: অমিতাভ মৈত্র

আমাদের নতুন বই