করোনার দিনগুলিতে: পাপিয়া দাস বাউল

লক-ডাউন লোক-ডাউন

সাল ২০২০। মার্চ, এপ্রিল, মে, জুন এবং, আগামীতে আরও কতদিন আমরা গৃহবন্দি থাকব?
আমাদের অজানা।

ভারতের বাইরের বেশিরভাগ দেশই খুলে গেছে। অর্থনীতি শুরু হয়ে গেছে বেশ আগেই! লন্ডন জার্মানি-সহ বহু দেশে মেট্রো, বাস সবই চলছিল, এবং চলছে!

শুনেছিলাম ভারতবর্ষ পৃথিবীর সর্বোচ্চমান গণতান্ত্রিক দেশ।

আমরা যারা শিল্প বেচে পেট চালাই ও সরকারি কর, ইলেকট্রিক বিল, আরও নানান জরুরি মাসিক খরচা দিতে বাধ্য, তারা অনেকেই হয়তো এই লকডাউনের ফলে ধারে ধারে জর্জরিত।

হ্যাঁ, অবশ্যই পেটে খানিকটা বিদ্যে থাকার ফলে আমাদের কয়েকজনের মাসিক আয় বেশি। ঠিক তেমনি মাসিক ব্যয়। হরে দরে তো একই দাঁড়াল। তাই না? সঞ্চিত লক্ষ্মীর ভাণ্ডার আমাদের কিছুটা হয়তো আছে। এটা আমাদের দেশের এক প্রাচুর্য। এটা আমাদের মায়েদের দেওয়া শিক্ষা। সর্ব স্তরের মানুষের ঘরেই কিছুটা লক্ষ্মী ভাণ্ডার থাকে হয়তো এইরকম দুর্দিনের কথা মাথায় রেখেই। তবে সেটা কত মাসেরই-বা হতে পারে? এক, দুই… এরপর…?

হঠাৎ করোনা! হটাৎ লকডাউন! হঠাৎ সবাই বন্দি! হঠাৎ গানের প্রোগ্রাম, শিল্পের প্রদর্শনী, কবিতা পাঠের ডাক, সব শেষ! এমনকী অনেক বন্ধু অভিনেতা ও ডিরেক্টরদের শুটিংও বন্ধ!

তাহলে গতি একমাত্র শিল্পকর্মের মাধ্যমে সৃষ্টিতে ডুবে যাওয়া, যা আমার মতো অনেকেই হয়তো নিয়মিত করে যাচ্ছি, এই তিন মাস!

ফেসবুক, ইউটিউব ও অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া ভাগ্গিস ছিল যারা তারকাশিল্পী ও সাধারণ শিল্পীর তোয়াক্কা করে না!

তবে অর্থ? বেশিরভাগই ফ্রি-তে লিখে, নতুন করোনা কবিতা ভিডিয়ো তুলে আউড়িয়ে, নতুন ছবি এঁকে, নতুন গান বেঁধে, সুর দিয়ে গেয়ে, মনের খিদে মেটাচ্ছি বটে, তাতে তো পেট বা আনুসাঙ্গিক ব্যয় মিটবে না! কতজন শিল্পীকে এই কোয়ারান্টিনে শিল্প সৃষ্টি করার জন্য এখনও অবধি কেউ অর্থ দিয়ে সাহায্যে করেছেন? এই সংস্থানগুলোর কাছেই কি নিজস্ব পুঁজি আছে?

সংবাদপত্র ও টেলেভিসন চ্যানেলের বাছাই করা তারকাশিল্পীর তালিকা তৈরির পদ্ধতি তো আলাদা। এই লকডাউনে শুনলাম এইসব অনেক প্রতিষ্ঠানেরই বারোটা ছাপ্পান্ন হচ্ছে ও হতে চলেছে। জয়গুরু, জয়গুরু। চ্যানেল শিল্পীরাও বলছেন ‘কী যে হবে?’!

আমরা জানি যারা দুস্থ গ্রামের বাউল শিল্পী তাদের অনাহারে মৃত্যুও হতে পারে। মাঝেমধ্যে দেখছি কেউ কেউ তাদেরকে কিছু দ্রব্য দিয়ে সেলফি তুলে ফেসবুকে ফেলছেন। তাদের কাজ ওখানেই শেষ। দুস্থ শিল্পীরা আবার সেই ধুঁকছেন! কলকাতার বাউল অনুরাগীরা তো আসতেই পারছেন না, যারা একটু গানবাজনা শুনে, বাবা সেবন ও সুরা পান করে ওদের কিছু দান করে যান। এখন সেইসব প্রকৃত বাউল শিল্পীদের সংসার চালানো দায়। ওনাদের সঙ্গে নিয়মিত ফোনে যোগাযোগ রয়েছে।

ওনারা ভাইরাস থেকে বাঁচতে গিয়ে অনাহারে মৃত্যু বরণ করতে একেবারেই নারাজ! আমিও সহমত।

যে-লোকশিল্পীদের জমি-জায়গা আছে, তারা সরকারি ও বেসরকারি অনুদানে বেঁচে থাকবেন।

আমরা যারা কলকাতার মধ্যবিত্ত শিল্পী, যাদের কোনো রাজনৈতিক বা বেসরকারি ব্যানার নেই, তাদের খবর বাউলপ্রেমীরা, গবেষকরা, বা পেইন্টিং ক্রেতারা জানতেও চাইবেন না।

হ্যাঁ, কয়েকজন মানুষ অতি-অপ্রয়োজনীয় সময় ব্যয় করে কলকাতার কিছুটা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শিল্পীদের ফাউল ইত্যাদি নাম দিয়ে মস্করা করার জন্য উঁচিয়ে আছেন ও থাকবেন। আমি অবগত যে এই ফাউলরা, বহু সময় ও অর্থ ব্যয় করে, কিঞ্চিৎ লেখা পরা করে, বাউল ঘরে না জন্মগ্রহণ করেও, বাউল চিন্তা ও গান বাজনায় মত্ত। তাদের পদবির পাশে জন্মগত বাউল না থাকলেও তারা তাদের রুজি রোজগার জোটাতে পারতেন। তারা অনেকেই কলকাতার বড়োলোকি সুখ ঐশর্য ছেড়ে গ্রামে-গঞ্জের বাউল আখড়ায় পড়ে থাকেন। তারা তো এমনিতেই ওই বাউল পদবি ছাড়াই স্টেজ ও অর্থ পেয়ে থাকেন। তাদের বাউল গান গেয়ে তারকা হবার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।

শেষপর্যন্ত বাউল ব্যবসার মাইলেজ পান জন্মগত বাউলরাই। বাউল বাবার ছেলেরা। তাদের সন্তানরাও বাউল। এবং এটা জন্ম পরম্পরায় চলছে। সংসারী বাউল। গ্রামের বাড়ি, সুন্দর গাছপালা, হাওয়া, বাতাস, কিছু জমি জায়গা, পুকুর রয়েছে অনেকেরই।
কলকাতার বাবুরা, বিদেশি গবেষকরা ও দেশি গবেষকরা, লেখকেরা এদেরই প্রাধান্য দেবেন, কারণ এরা বেশিরভাগই স্কুল কলেজ যাননি ভাগ্গিস। ইংরিজি শিখলে বা শহরে জন্মালে তো আর বাউল ফকির হওয়া যায় না!

বাউলের বীজ থেকে জন্ম নেওয়া খাঁটি বাউল সন্তানেরা পুঁথিগত শিক্ষায় সময় ব্যয় না করে লহরী ও দোতারা শিখেছেন। মেঠো ভাষায় কথা, ভাব, গান এবং বাজনাতেই সময় দিয়েছেন। এটাই তো পরম্পরা! তাই আমরাও ওনাদের কাছে ছুটে যাই বারবার!

টিভির পর্দায়ও ওনাদের চাহিদা বেশি।

বিদেশেও তাই।

আমি এখনও খুঁজে চলেছি গুরু যিনি শুধুই উদাসী এবং গুরু-শিষ্য পরম্পরায় বিশ্বাসী।

হয়তো আমার দীক্ষাগুরু বাউল সম্রাট পূর্ণ দাস বাউল ও শিক্ষাগুরু সাধন বৈরাগীর কৃপায় পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে কোনো একদিন এক উদাসী ব্রহ্মচারী গুরুর দেখা পেয়ে যাব কখনো! বাউলদের কোনো বিশেষত স্থান হয় বলে আমি মনে করি না। তাই আমি নিজেও বোহেমিয়ায় থাকি কখনো কখনো। জয় মন গুরু।

কিন্তু বাউল, যাঁরা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাবেন, তাঁরাও তো লোকডাউনের কারাগারে বন্দি!
লকডাউন অনৈতিক বলে মনে করছি আমি| আমরা, দেশবাসীরা সিদ্ধান্ত নেব আমরা বন্দি থাকব, নাকি করোনার সবরকম নিয়ম মেনেই কাজ শুরু করবো! বিদেশে ১০০ জন নিয়ে প্রোগ্রাম করা সম্ভব করেছেন সরকার! এখানে কেনো নয়??

আমিও মনে করি যদি পাশ্চাত্যে করোনা আগে আসার পরেও ওদের সরকার ওদের মানুষদের গৃহবন্দি করেননি, তাহলে ভারতবাসীদের কেন এই বদ্ধতায় মরতে হবে?

আমরা গরিব ও মধ্যবিত্তরা কি সাবালক নই? আমরা জানি না কীভাবে ভাইরাসের কবলে না পড়তে হয়? দেশের সরকার আমাদের কি যথেষ্ট সচেতন করেননি?

আমরা কি বাঁচতে চাই না বা বাঁচতে জানি না?

মজার তথ্য হল ছোঁয়াচে ইনফ্লুয়েঞ্জা বা টিবিতে ভারতে ও পৃথিবীতে বহু বহু লোক প্রতিদিন অনেক বেশি মারা গেছেন ও যাচ্ছেন। সঙ্গে অনাহারে মৃত্যু হচ্ছে আফ্রিকা-সহ আরও বহু দেশে। প্রচুর মানুষ হৃদরোগে ও ক্যান্সারে মারা যান রোজ। পরিযায়ী কজন শ্রমিক হাঁটতে হাঁটতে মারা গেছেন তার তথ্য জানা যায় না সম্পূর্ণভাবে।

তাহলে লকডাউন কেন হয়নি এতদিন অন্য ছোঁয়াচে মৃত্যুবাহী রোগের নাম করে? আমার ভয় যে পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতবাসীরা শিকার হতে চলেছি এক কঠিন সময়ের। আমার আজ বারবার পলাশীর যুদ্ধের কথা মনে হচ্ছে! মনে হচ্ছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কথা। এখন পৃথিবীকে শাসন করে নতুন নামের বৃহত্তর সংস্থান ও ব্যাংকগুলো।

আমাদের ভাববার সময় এখন। ত্রাণ পাবার সময়। ইতিমধ্যে ভারতকে গরিব দেশ চিহ্নিত করে সারা পৃথিবী ত্রাণ পাঠাচ্ছে| আমাদের সরকারও ঘোষণা করেছেন আরো ত্রাণ! সবে শুরু হয়েছে এর তোড়জোড়। লকডাউন যতদিন থাকবে ও বাড়তে থাকবে, ততো ত্রাণ! ১৭ মে লকডাউন খুললে নানান ত্রাণ কর্তাদের কতই না সমস্যা হত!

ইতিমধ্যে আমাদের মতো ব্যানার-বিহীন শিল্পীরা মরল না বাঁচলো, তাতে কী-ই-বা যায় আসে! যদি বেঁচে থাকি এবং আমাদের একাউন্টে ঘোষিত অর্থ না আসে, আমাদের আরও আরও সময় ধরে ভাবতেই হবে। কিন্তু অঙ্ক এত সহজও নয়! ত্রাণ আসলেও ভাবতে হবে এই অন্যায্য গৃহবন্দির কারণ! ছোঁয়াচে মারণ ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো শুধুই ছোট্ট ছোঁয়াচে করোনা ভাইরাস, যা বেশিরভাগ মানুষকেই ফিরিয়ে এনেছে হাসপাতাল থেকে, নাকি জল আরও ঘোলা? আমরা টিভির পর্দায় দেখছি শুধুই করোনা মৃত্যু! ডেঙ্গু, হৃদরোগ মৃত্যুর খবর আর নেই তো! তাহলে সেই রোগগুলো উধাও হয়ে গেল?

চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটক বলেছিলেন প্রাকটিস থিংকিং। এখনও সময় আছে। লেটস্ প্রাকটিস থিংকিং।

আমরা ঠিক করতে পারব আমাদের কী করা উচিত। সমাধান ভাবতেই হবে। রবি ঠাকুর বলেছিলেন, দু-বেলা মরার আগে মরব না ভাই মরব না!

জয় মন গুরু

করোনার দিনগুলিতে: পাপিয়া দাস বাউল

আমাদের নতুন বই