করোনার দিনগুলিতে: প্রকল্প ভট্টাচার্য

কিসসা কোরেন্টাইন কা

আমি একজন শান্তশিষ্ট নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ। আইন-কানুন মেনে চলি, বিশেষ করে, তাতে যদি পুলিশের বা প্রাণের ভয় থাকে। তাই লকডাউনের সময় নিজে নিজেই কোয়ারেন্টাইনের আইন মেনে ঘরবন্দী হয়ে আছি। মোটের ওপর, ভালোই আছি। বার-তারিখ গুলিয়ে যায়, তাই একটা হিসেব রেখেছি। সোমবার নিম-বেগুন খাওয়া হয়, তাই সকালে নিমপাতা আনতে নীচের বাগানে যাই। বুধবার কারিপাতা আনা হয়, আর যদি কুমড়োফুল জোটে। শুক্রবার মা লক্ষ্মীর ঘটে আমপাতা বদলায়, তাই পাশের বাড়ির আমগাছ থেকে পাতা, এবং প্রতিবেশীর অনুমতি পেলে এক-দুটো কাঁচা আম নিয়ে আসি পেড়ে। টকডাল আর আমের চাটনি বানানো হয়। শনিবার ছাদে যাই কাকদের দই খাওয়াতে। রবিবার ব্রেকফাস্টে সকলে ম্যাগি খাই। এই হিসেব করে সপ্তাহ কেটে যাচ্ছে দিব্যি। নিম-মঙ্গল-কারি-বিষ্যুত-আম-কাকদৈ-ম্যাগি, সপ্তায় এখন এই সাত দিন। তা ভালো।

প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে দেখি দুধের প্যাকেট রোদ পোহাচ্ছে, পাশে বৌ বসে বসে কাগজ পড়ছে। আমার বৌয়ের কাগজ পড়া মানে কিন্তু পাঠ করা! “কেসেস রাইজ ইন দ্য সিটি— কী ভয়ংকর, চেন্নাইতে আরও ছড়াচ্ছে গো! কোয়মপেডু মার্কেট ক্লোজড— তাহলে আমাদের সবজি আসবে কোথা থেকে! আজই আমাদের সবজিওয়ালাকে বলে দেব বেশি করে বাজার নিয়ে আসতে। কাল থেকে যদি কিছু না পাওয়া যায়! ট্রাম্প আপসেট অন চায়না— এ বাবা ট্রাম্পকে কেমন বুড়ো বুড়ো দেখাচ্ছে, দ্যাখো! পিওপল ডিমান্ড লিকার সাপ্লাই অ্যাট হোম— ঈসস, চাল কেনার টাকা নেই, আবার মদ খাচ্ছে! এক্সামস পোস্টপোনড ইণ্ডেফিনিটলি— আহারে, কী হবে গো ছেলেমেয়েগুলোর!!”

আমার মা নাতিকে প্রতিদিন একপাতা হাতের লেখা করাচ্ছে আর নামতা পড়াচ্ছে। সবাই এক চামচ করে চ্যাবনপ্রাস খাচ্ছি আজকাল প্রতিরোধ বাড়াতে, তো তার আবার ‘সুগার ফ্রি’ ভার্সন! যদি ঘরে বসে বসে খেয়ে মোটা হয়ে যাই!!

ব্রেকফাস্টের পর আমি ছেলেকে নিয়ে পড়াতে বসি, তামিল, বাংলা আর অঙ্ক। পড়া শেষ হতে হতে আমাদের সকলেরই বারোটা বেজে যায়। স্নান, খাওয়া, একটু টিভি দেখা সকলে মিলে, তারপর বিশ্রাম। আমার তখন সময় হয় ফোনপত্তর করবার, লেখালেখি নিয়ে বসবার। বিকেল হলেই সপরিবারে ছাদে যাই, মা-কে আম্পায়ার করে ক্রিকেট খেলা হয়। সন্ধ্যেয় চা-বিস্কুট খেয়ে আবার পড়াশোনা। এবার ছেলের হিন্দি আর অনুবাদ। ডিনারের আগে-পরে সকলে মিলে একটু টিভি দেখা হয়। মহাভারত, গোয়েন্দা গিন্নি, সা-রে-গা-মা-পা, সি-আই-ডি সব খিচুড়ি করে। আমি হামেশাই গুলিয়ে ফেলি কখন কী চলছে; রানি রাসমনি হঠাৎ হিন্দি বলছে কেন, অথবা পরমার বাড়িতে জুন আন্টি কোথায় গেল, এইসব ভুলভাল প্রশ্ন করে ফেলি আর সক্কলে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার খিল্লি করতে।

রান্নাবান্না, বাসন মাজা, ঘর ঝাঁট দেওয়া, জামা কাপড় কাচা, সবই এর মধ্যেই চলে। কাজ ভাগ করে নিয়েছি। সত্যি বলতে কি, সারাদিন বাড়িতে বোর তো লাগছেই না, বরং এত কাজ, যে কুলিয়ে উঠতে পারছি না! তার মধ্যে আত্মীয়দের ফোন, আবৃত্তি-গান ইত্যাদির ভিডিও করে পাঠানো হল গ্রুপ রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে। ফেসবুকে লাইভ আসবার জন্য দাড়িও কামিয়েছি এর মধ্যে দু-দিন, আর ছেলেটার চুল কেটে দিয়েছি একদিন। একবার বারবার হওয়াই যায়, তাই না? আর নিত্যকার নানারকম লেখালেখি তো চলছেই।

তবে যাই বলি না কেন, মনের কোণে কিছু দুশ্চিন্তা তো আছেই! পরিচিত, প্রতিবেশী অনেকেই আর্থিক সঙ্কটে পড়েছেন, শারীরিক এবং মানসিক সমস্যাও বাড়ছে অনেকের। চাকরি নিয়ে চিন্তায় সকলেই, আমারও ব্যবসা সামলাতে হচ্ছে। আমার ওপর তো শুধু আমার পরিবার নয়, এখন আরও কয়েকজন নির্ভর করে আছেন, তাঁদের কথাও ভাবতে হচ্ছে। কিন্তু সবকিছু ছেড়ে এই মুহূর্তে আমাদের সুস্থ থাকতে হবে, সুস্থ রাখতে হবে। অল্প হলেও যথাসম্ভব একে-অন্যকে সাহায্য করতে হবে। মাস্ক তো বটেই, কিন্তু আরও প্রয়োজন মুস্কানের। হাল ছাড়লে চলবে না, ঘুরে দাঁড়াতেই হবে আমাদের! যত তাড়াতাড়ি পারি ফিরতেই হবে আবার সেই পরিচিত নিশ্চিন্ত দিনগুলোতে!! আর ঠিক করেছি, ভীষণ প্রয়োজন না হলে কিছুতেই বাড়ি থেকে বেরোব না।

ভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে এই কোয়ারেন্টাইনই আপাতত আমাদের একমাত্র হাতিয়ার যে!

করোনার দিনগুলিতে: প্রকল্প ভট্টাচার্য

আমাদের নতুন বই