করোনার দিনগুলিতে: হাসনাত শোয়েব

বায়োস্কোপে বন্দি জীবন

একটি মুহূর্তের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে অনেকগুলো মুহূর্ত, তার ভেতর ঢুকে যাচ্ছে আরও অনেকগুলো মুহূর্ত। প্রতিটি মুহূর্ত আসে দৃশ্যের ওপর ভর দিয়ে। একটানা সিনেমা দেখার ব্যাপারগুলো অনেকটা এরকমই। অসংখ্য মুহূর্ত একের পর এক জমা হতে থাকে স্মৃতির করিডোরে। যা ক্রমশ অনুভূতির দেয়ালে আঘাত করতে থাকে। হঠাৎ কোনো একদিন অস্তিত্বহীনতার অনুভব যখন প্রকট হয়ে উঠে, তখন সেই অসংখ্য দৃশ্যের ভেতর একটি দৃশ্য খুঁজে বের করে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করা। এটুকু বাদ দিলে সিনেমা, কেবল সিনেমাবাই কেন শিল্পকলার যে-কোনো কিছু নিছক বিনোদন। ভালো লাগে তাই দেখি, তাই পড়ি, তাই শুনি। অনেকটা এরকম।

যাইহোক, ২৬ মার্চ থেকে লকডাউন শুরু হয়েছিল। যদিও চাকরির ধরনের কারণে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন অফিস যেতে হয়েছে। এরপর থেকে বাসায় অফিস। এ-সব সময়ের হিসাব বাদ দিলে আমার সিনেমা দেখা অনেকটা নিয়মিত ঘটনা। মানে হাতে দুই ঘণ্টা সময় আছে ঠিক আছে একটা সিনেমা দেখা যাক। একই সিনেমা একবার, দুইবার কিংবা তিনবার দেখার ঘটনাও ঘটেছে। হয়তো আরও অসংখ্যবার দেখব।

তবে করোনাকালের শুরুর পর থেকেই একটা বিষয় বারবার মাথায় কাজ করছিল, যতটা সম্ভব সময়কে কাজে লাগানো। কিন্তু কাজে লাগানো বলতে প্রোডাক্টিভ কিছু করব এরকম ভাবিনি। মানে যতবেশি পড়া যায় কিংবা সিনেমা দেখা যায়। বিশেষ করে শুরুর দিকে মানসিক চাপ ভুলতে এর চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প ছিল না। বলা বাহুল্য, নতুন কিছু লেখার চেষ্টা যে করি নাই সেটা না, তবে ঠিক সুবিধা করতে পারিনি। আমার মনে আছে শুরুটা করেছিলাম দক্ষিণ কোরিয়ান সিনেমা দেখে। লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ কোরিয়ান তিনজন বিখ্যাত পরিচালক লি চাং ডং, বং জন হো,  চান উক পার্ক চু এর এর মুভিগুলো শেষ করা। যদিও আমার কোরিয়ান সিনেমার প্রথম প্রেম কিম কি দুক। তার প্রায় সব সিনেমাই আগে দেখা হয়ে গিয়েছিল। যে-কারণে এবার অন্যদের ওপর বেশি মনোযোগ দিলাম। সে যাত্রায় আগে দেখা অনেক সিনেমাও দ্বিতীয়বার দেখলাম। যেমন ‘মেমোরিজ অফ মার্ডার’, ‘মাদার’, ‘গ্রিন ফিশ’ এই মুভিগুলো আবার রিপিট করলাম। কোরিয়ান ছবির মাঝে একটা অদ্ভুত প্রশান্তি আছে। ওদের ভায়োলেন্সের মাঝেও একটা শৃঙ্খলা আছে। যেটা শান্তি দেয়।

তবে কোরিয়ার নতুন যে-মুভিগুলো দেখলাম তার মাঝে ‘প্যারাসাইট’-এর কথা বলতে হয়। বেশ আলোচিত মুভি। বেসিক লাইনটা খুব সরল, সামাজিক বৈষম্য। কিন্তু এক্সিকিউশন এবং ইমোশনের কারণে এটা অনবদ্য হয়ে উঠছে। এ জায়গাতে বং বরাবরই অনন্য। একই থিমে নেটফ্লিক্স অরিজিনালের ‘প্ল্যাটফর্মে’-এর কথা বলতে হয়। এটির মূল বক্তব্যও খুব সরল। কিন্তু প্রেজেন্টেশন দারুণ। এই কাজটা আমার অনেকদিন মনে থাকবে। এ জঁরায় বংয়ের দারুণ আরেকটি মুভির কথা মনে পড়ছে সেটি স্নোপিয়ার্সার।

এ যাত্রায় দেখলাম রাশিয়ান পরিচালক আন্দ্রেই ইয়াগিনস্তেভের কথা। তার সিনেমা অনেক অনেক আমাকে তাড়া করে বেড়াবে। তার প্রথম ছবি ‘দ্য রিটার্ন’ ছয়-সাত বছর আগে দেখা। এবার বাকিগুলোও দেখলাম।  ‘দ্য ‘বানিশমেন্ট’, ‘লেভিয়াথান’, ‘এলেনা’ কিংবা ‘লাভলেস’ অদ্ভুত ঘোরে নিয়ে যাওয়ার মতো। বিশেষ করে বানিশমেন্ট মুভিটা স্থায়ী একটা ক্ষত তৈরি করেছে আমার মাঝে। যেমনটা করেছে নুরে বিলগে সেলানের ‘ওয়াইল্ড পিয়ার ট্রি’। সেলানের  ‘ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন আনাতোলিয়া’ এবং ‘উজাক’ আমার সবসময় পছন্দের সিনেমা ছিল। সে-তালিকায় এবার পিয়ার ট্রিও যুক্ত হল।

এই লকডাউনে আমি পুরোনো কিছু ক্লাসিকে নতুন করে ঘুরে বেড়াতে চেয়েছি। যে-মুভিগুলো কৈশোর-তারুণ্যকে বদলে দিয়েছিল। যেমন ‘রেইন ম্যান’। ডাস্টিন হফম্যানের অনবদ্য অভিনয় স্বপ্নেও হানা দেয়। বলা যায় ‘শিন্ডলারস লিস্টে’ লিয়াম নেসনের অসামান্য অভিনয়ের কথা। এই ছবি আমার মনে হয় এ নিয়ে তৃতীয়বার দেখলাম। যতবারই দেখেছি কান্না চেপে রাখতে হয়েছে। তবে নতুন করে আবিষ্কার করেছি ফেদেরিকো ফেলাইনির ‘এইন্ড এন্ড হাফ’। প্রথমবার দেখায় অনেক কিছু মিস করে গিয়েছিলাম। দ্বিতীয়বার দেখে যা নতুন করে ধরতে পারলাম। হয়তো ভবিষ্যতে আবার দেখব। ক্লাসিকে দেখলাম পাসোলিনির ‘ট্রিওলজির অফ লাইফ’-এর তিনটি মুভি ‘দ্য ডেকামেরন’, ‘ক্যাটাবুরি টেলস’ এবং ‘অ্যারাবিয়ান নাইটস’।

সত্যি কথা হচ্ছে গত মাসে যতগুলো মুভি দেখেছি এক লাইন করে বললেও অনেক সময় চলে যাবে। কারণ, প্রতিদিন দুইটা আবার কখনো তিনটা মুভিও দেখেছি। তবে এর মাঝে অ্যামাজন প্রাইমে ‘দ্য টেস্ট: নিউ এরা ফর অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট’ নামের সিরিজটা ছিল দারুণ এক অভিজ্ঞতা। ৮ পর্বের এ-সিরিজ একটানা বসে দেখেছি। ধ্বংস্তস্তূপ থেকে জেগে উঠার দারুণ এক জার্নি। ভালো লেগেছে হিন্দি সিরিজ ‘পঞ্চায়েত’। এই সিরিজটা দেখা ছিল আরামদায়ক। বিশেষ করে রঘুবীর যাদবের অভিনয় দেখাটা সবসময় আনন্দের। বাকিদের কাজও খুব ভালো ছিল। আগে মিস করা সিরিজগুলোর মাঝে ‘মির্জাপুর’ দেখলাম। পঙ্কজ ত্রিপাটির অভিনয় ছাড়া আর কিছু তেমন ভালো লাগেনি।

তবে সব শেষে বলতে চাই আসামি একটা আলোচিত মুভির কথা। ’আমিষ’ নামের সিনেমাটা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে অনেকেই ভিন্ন ধরনের প্রেমের সিনেমায় আটকে দিতে চাইছে এটিকে। আবার কেউ কেউ ইনার ভায়োলেন্স নিতে পারছেন না। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে, এই সিনেমা তুলে ধরেছে হিউম্যান ডিজায়ারের বিষয়টাকে। নিজের ডিজায়ারকে স্যাটিসফাই করার জন্য মানুষ নিজেকে কতটা পুশ করতে পারে সেটিই আমি খুঁজে পেয়েছি এখানে। তেমন ডিজায়ারের কারণে আমাদের আজ দাঁড় হতে হয়েছে ধ্বংসের সম্মুখে। যাইহোক, যা দেখেছি তার খুব সামান্য কয়েকটির কথা এখানে বলতে পেরেছি। বাকিগুলোর কথা হয়তো অন্য কোনো সময় বলা যাবে।

করোনার দিনগুলিতে: হাসনাত শোয়েব

আমাদের নতুন বই