বইমেলার ডায়েরি: ২০২০— সেলিম মণ্ডল

বইমেলার ডায়েরি

২৯.০১.২০
আজ কি কলকাতার মনখারাপ? সে কি পারত না আলো হয়ে আরও বেশি ঝুঁকে পড়তে? নাকি, বইমেলা একদিন এগিয়ে আসায় মানুষ প্রস্তুত হয়নি? বিদ্যাদেবীর কী ভূমিকা ছিল আজ?


বইমেলা চত্বর অনেকটা ফাঁকা। লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নেও সবাই টেবিলে পত্রিকা সাজিয়ে বসেননি। তবুও হইহই করেই কেটে গেল, প্রথম দিন। টুকটাক বিক্রিও হল। ফারেনহাইট অনেকেই এসে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। ফারেনহাইট পত্রিকা আমার কাছে নতুন আন্দোলন। বিপ্লবদা, মানে কবি বিপ্লব চৌধুরীও কিনলেন ফারেনহাইট। প্রশংসা করলেও গোপাল ভাঁড় সংখ্যার কাজ। প্যাভিলিয়নে দেখা হল কনিষ্কদা, অমিতাভদা (প্রামাণিক), রাহুলদা (গাঙ্গুলী), অনিমিখদা, সঙঘমিত্রাদির সঙ্গে। ওপার থেকে এসেছেন কবি বন্ধু মাহফুজ রিপন। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ও সম্পাদিত পত্রিকা উপহার পেলাম।

আজ কেন জানি না, মনে হচ্ছিল— মানুষ খুব তাড়াতাড়ি বুড়ো হয়ে যাচ্ছে। গত এক বছরে যেন আরও বেশি বুড়ো হয়ে গেছে সকলে। বইমেলাতেও তেমন চোখে পড়ল না সদ্য প্রেমে পড়া লাজুক প্রেমিক-প্রেমিকা যুগল। দেখতে পেলাম না গতবার প্যাভিলিয়ন জুড়ে নীল আলো ছড়িয়ে দেওয়া মেয়েটিকে।

অক্টোবর থেকে কঠোর পরিশ্রম আর লড়াই চলছে। যে মানুষটি কোনোবার বইমেলা মিস করে না, কলকাতায় থেকেও ঘর বন্দি। এই ধুলো আর কোলাহল থেকে ঘর বন্দি হয়ে থাকাই ভালো। যদিও পরিস্থিতি এখন অনেকটা অনুকূল। তবে স্বার্থপরের মতো একা রেখে এসেছি। এমনই সন্তান আমি!

অনেকগুলো বই প্রেসে। একে একে হয়ত চলেও আসবে। ততদিনে বইমেলা জমে উঠবে আরও। জীবন এমনই অপেক্ষার আধার। যাকে ছুঁয়েই বা ছুঁতে চাওয়ার আছিলায় ভিতরে তুমুল ঝড় বয়। উড়ে যাওয়ার কী যে আনন্দ… বাতাসই তা জানে না…

৩০.০১.২০
মেলার দ্বিতীয় দিন শুরু হয়েছিল ভীষণ সংকটপূর্ণভাবে। কিন্তু বেলা বাড়তে পরিস্থিতি অনেকটা অনুকূল হয়। দুপুরে ধ্যানবিন্দুর লাইভ আর মারুফদার পোস্ট দেখার পর ভীষণ কান্না পাচ্ছিল। প্রকৃতি কি এত নিষ্ঠুর হতে পারে? এত অক্ষর, শব্দ, বাক্যকে খুন করে, ঠিক কোন রাজত্ব স্থাপন করতে চাইছে? গিল্ড না ডেকরেশন ব্যাবস্থা, কাদের এই গাফিলতি?

দেবোত্তম ছুটতে ছুটতে পৌঁছে গেছে বইমেলা। আমি ছেঁড়া চপ্পল পরেই বেরিয়ে পড়েছি। কমবেশি বইপত্র ভিজেছে। তবে যতটা আশংকা করেছিলাম ঠিক ততটা নয়।

কলকাতা বরাবরই কলার তুলে বলতে শিখেছে, তুই কে বে? সে প্রাকৃতিক অরাজগতা হোক বা কোনো রাজনৈতিক দুর্নিতীর বিরুদ্ধে আন্দোলন… পাঠক ঠিকই পৌঁছে গেছে মেলাপ্রাঙ্গণ। কমবেশি সকলের বেচাকেনাও হয়েছে। বনগাঁ থেকে বিশ্বজিৎদা এসেছিল। সঙ্গে আরও দু-জন। বিশ্বজিৎদা ‘তবুও প্রয়াস’কে কেন এত ভালোবাসে জানি না। সামনে কেউ প্রশংসা করলে লজ্জা লাগে বইকি। তবে ‘তবুও প্রয়াস’ বরাবর এই পাঠককেই ভরসা করে যাঁরা লেখকের নাম না, টেবিলে এসে বই ঘেঁটে ঘেঁটে বই কেনেন। আজ টেবিলে এসেছিলেন লেখিকা তন্বী হালদার। প্যাভিলিয়নে ঘুরতে ঘুরতে দেখা হল দুই গৌতমদার সঙ্গে। গৌতম বসু ও গৌতম চৌধুরী।

প্রথম দশকের প্রায় অধিকাংশ বন্ধু এসেছিল। সবাই নিজ নিজ প্রফেশনে এখন ব্যস্ত। এখন দেখা বলতে এই মেলার অপেক্ষা৷ সবাই কাউন্টারে সিগারেট টান দিয়ে আকাশ করে তুলছিল সাদা, মনে হচ্ছিল এরপর আর কোনো মেঘ আকাশে থাকবে না। একটু আফশোস হচ্ছিল, ভাবছিলাম একবার কাউন্টার নিলেই বা ক্ষতি কি?
সন্ধ্যার দিকে মনখারাপ করছিল। মুনাই কি এবার বইমেলায় আসবে না? সে কতদিন অভিমান করে থাকবে? আমাদের অভিমানের বাড়িতে যে সাদা খরগোশটি রোজ পুষছি, তার লাল চোখের দিকে তাকিয়ে কতদিন চষে যাব যন্ত্রণার ফসল। লবণ খেত কি শুধুই আমার? জোনাকি কি পারে না আলো হয়ে, বইপোকা হয়ে ঝুপ করে গায়ে এসে বসতে?

৩১.০১.২০
সকাল থেকে ঠান্ডা বাতাস বইছে। যতই চেষ্টা করি না তাড়াতাড়ি ঘুমানোর, রাত সেই গড়িয়েই যায়। রাতের আর কী দোষ! অভ্যাস মানুষকে এমনই দাস বানিয়ে ছাড়ে। ডাক্তারখানা, প্রেস হয়ে তারপর মেলা… শরীর টলছে… বিশ্রাম দরকার। তাপসদার প্রেসে গিয়ে দেখি— ভ্যানভর্তি বই বাইন্ডিং খানা থেকে এসেছে। দেবোত্তম বইগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে দেখে ওর মধ্যে অন্যান্য বইয়ের সঙ্গে আমাদের ‘সুন্দরী ফাঁফারলো’ আছে। বেলা অনেকটা গড়িয়ে গেছে। অরূপদা ঘড়ির কাঁটাকে কীভাবে যে নিজের গোলাম করেছে কে জানে… কখনো দেখিনি তার পৌঁছানোর সময় কাঁটা পেরিয়েছে।

বাঁকুড়া থেকে মনোজ, মালদা থেকে বিপ্লবদা, মেদিনীপুর থেকে অমিতদা, নতুনদা চলে এসেছে। ফোন আসছে। তখনও শিয়ালদা। আজ গোটা মেলায় অন্তত বাষট্টি বার হাই তুলেছি। টেবিল থেকে ঘুরে গেল সুব্রতদা। মানে কবি সুব্রত সরকার। লেখালেখির শুরুর দিকের বন্ধু রুচিরা এসেছিল, বই কিনবে কিন্তু কোনো এটিএমে ক্যাশ পাইনি… প্রায় হাফ যুগ পর দেখা হল অনির্বাণদার সঙ্গে। জীবন অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি— জড়িয়ে ধরলে মানুষ যতটা পাখি হয় তার থেকে বেশি গাছ হয়ে ওঠে।

সংগীতাদি সুন্দর সেজে এসেছে প্যাভিলিয়নে। রোহনদাকেও প্যাভিলিয়নে দেখলাম প্যান্ট-শার্ট-বুট পরা আপাদমস্তক ভদ্রলোক। খিদে পাচ্ছে খেতে ইচ্ছে করছে না। বইমেলার ক-দিন পঙ্কজদা শ্বশুর বাড়ি থেকে লুচি আলুর দম বানিয়ে খাওয়াবে বলেছে। আজ আর লোভ সামলাতে পারলাম না। মাঝে মাঝে চুঁয়া ঢেকুর উঠছে। শালির লুচি-আলুরদম কে ছাড়ে?

মনটাকে কিছুতেই খুশি করতে পারছি না। মুখটা, মাথা ব্যথায় পাঁচের প্যাঁচের মতো চুপসে। এই সময়টা সেলিব্রেট করা দরকার। দেড় ঘণ্টা হেসেছি। হাসার কারণটা দিলীপ ঘোষ জানলে খুশি হতেন। খাটালের মালিক ও শ্রমিকেরা নাকি বাংলা কবিতার দিকে নাকি ঝুঁকে পড়ছেন…

আজ অপেক্ষাকৃত কম লোক। সবার বেচাকেনাও কম। সবার আশঙ্কা আগামীকালও ব্যাঙ্ক স্ট্রাইকের জন্য হয়ত বেচাকেনার ভাঁটা পড়বে। প্যালিভিয়ন থেকে বেরিয়ে একটা রসরাজ পান মুখে পুরে নিলাম। দই মিষ্টি যতই হোক না কেন শেষ পাতে যদি পান না হয় বাংলা ও বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে সুবাসটুকু কী থাকবে? এটুকুই আমাদের অহংকার। এই অহংকার যত লাল হয়ে ওঠে ততই ভাষার শরীরে জন্ম নেয় শিরা-উপশিরা…

০১.০২.২০
সকালে ঘুম ভেঙেছিল বিশ্রি একটা স্বপ্ন দেখে৷ এমন স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে বহুবার যেতে যেতে বুঝেছি বাস্তবের হাড়গোড় সাজিয়ে হৃষ্টপুষ্ট একটা মাংসের দিন আনা আদৌও কঠিন না। ঠিক করেছি, অরূপদার দু-মিনিট আগে হলেও আজ আমি মেলায় পৌঁছাব। দেবোত্তম প্রেস হয়ে আসবে। মোহিত যা ল্যাদারু ওকে সঙ্গে নিয়ে চলা মানে একটা ট্রেন মিস হওয়াটা সহজাত। একাই বেরিয়ে পড়েছি স্টেশনের দিকে।

শনি-রবি মানে মেলায় একটা উটকো ভিড় থাকে। খাবার স্টলে কন্ট্রোল দোকানের মতো লাইন। পাঠক বা ক্রেতা আসে না তা নয়। আজ ভিড়ও অস্বাভাবিক।

বহুজন এসেছিল টেবিলে রাজদীপদা (পুরী), রত্নাদি, নীলাব্জদা, শুভংকরদা, অমিতাভ দা অনেকে। সবার নাম বলতে গেলে একটা প্যারা হয়ে যাবে। অমিতাভদা বহরমপুর থেকে ছুটতে ছুটতে এসে এক ঘণ্টার মধ্যে ছুটতে ছুটতে আবার বেরিয়ে গেল। অমিতাভদা হল আমাদের সত্তরের তরুণ।

ওপার বাংলা থেকে বন্ধু হাসান এসেছে। বইমেলায় এক সপ্তাহ থাকবে। সবথেকে আনন্দের হল ও থাকবে খড়দায় আমাদের সঙ্গে।

গতকাল এক প্রকাশককে দেখলাম। ওঁর ভাব কবির কবিতা বই প্রকাশ করেছেন মানে কবিকে দয়া করেছেন। বেশ কয়েকবছর এই লাইনে থেকে দেখেছি ভীষণ নোংরা লাইন। লিটল ম্যাগাজিন না করা কোনো প্রকাশক কবিতাকে অবিবেচ্য বাতিল কোনো বস্তু ছাড়া কিছুই ভাবেন না। বইটা করেন তার মিথ্যা সুবাসটা পাঠকের কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। ২-৩ বছর পর আমি নিজেই সরে যাব। ‘তবুও প্রয়াস’ অন্য কেউ সামলাবে। লেখকদেরও এত অযৌক্তিক কোয়ারি… ভাবা যায় না!

পঙ্কজদা আজ আর শালির আলুরদম খাওয়ায়নি। খাইয়েছে রসরাজ পান। এই পান খেলে নাকি যৌবন মাথায় উঠে নাচবে। আর আমাদের বলতে হবে না ‘আমাদের নাচতে দাও’।

আগামীকাল রবিবার। অপেক্ষা থাকবে সুন্দরী নারীদের ইষৎ লাজুক ঠোঁটের ওপর বাঁকা চাঁদের ওপর।

০২.০২.২০
আজ বইমেলায় উপচে পড়া ভিড় ছিল। মানুষে গমগম করছিল লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়ন। একটু ঘুরে বেড়াব, সুন্দরী মেয়েদের দেখব তারও উপায় ছিল না। তবে না বেরোলে কী শাশ্বতীদি দি, বহতা দি, সংঘমিত্রা দি, শুভশ্রীদি, পল্লবী, রশ্মিতার সঙ্গে দেখা হল টেবিলেই। উজানের ষড়ৈশ্বর্য দার সঙ্গে আলাপ হল। ভারী মিষ্টি মানুষ। ফারাহ্ দি এসেছে আমেরিকা থেকে। তার নতুন গল্পগ্রন্থ ‘ফারিচকা’ হাতে তুলে দিলাম। উপহার পেলাম অনেকগুলো চকলেট।

রবিবারের বইমেলা আমাদের কাছে সেই মিলনক্ষেত্রে যেখানে মনে হয় শুধু আমরা নয়, অস্তিত্বগুলোও আরও বেশি স্নায়বিক হয়ে ওঠে। কান না পেতেই আমরা শুনতে ঝিল্লি বিশ্লেষণের শব্দ।

দুটো নতুন বই এল। তারমধ্যে একটির বাইন্ডিং ভুল। এই সময়টা প্রেস লাইনের সমস্ত মানুষগুলো আর মানুষ থাকে না। হয়ে ওঠে রোবট। রোবটের কি ব্যথা থাকে জানি না? পাঠক ভাবেন? লেখক ভাবেন? প্রকাশক ভাবেন?

বইমেলায় আশ্চর্য রকম কিছু মানুষ আসে। গতকাল দেখলাম একজন পঞ্চাশ টাকার বই নিয়ে ৫০% ছাড় দেওয়ার জন্য জোরাজুরি করছেন, আরেকজন মিনিট পনেরো ধরে নানা পোজে বই হাতে ছবি তুলছেন, সঙ্গের লোকটি কিছুতেই তাঁর মনের মতো ছবিটি তুলতে পারছেন না…

কাল একশো টাকা নিয়ে একজন এমন একটি কবিতা বই গছাল যা হয়ত কোনোদিন এক পাতাও ওলটাবো না। সবাইকে কেন কবি হতে হবে? অতি বাজে মুদ্রণ, অতি বাজে পেজ কোয়ালিটি আর লেখা? থাক… তবে প্রিন্ট ১০০ই ছিল…

০২/০২ মানে দেবুর জন্মদিন। পাঁচবছর ধরে প্যাভিলিয়নে আমরা জন্মদিন পালন করে চলছি। কেক নিয়ে এসেছে অরূপদা আর শাশ্বতীদি। গতকাল ভিড় সামলে অনেকটাই লেট। তবুও বিরাট একটা ফ্রেম নিয়ে দেবুর জন্মদিন হালকা ঠান্ডার ভিতর উষ্ণ হয়ে উঠল আর আমরা তাতে হাত সেঁকে আরও গভীর স্পর্শের জন্য হাত বাড়ালাম… মানুষজন্ম যতই পাখি হতে চাই, পাখি পালাবে কোথায়? আকাশ একটাই!

০৩.০২.২০
ভিড় কম ছিল। এর থেকে বেশি ভিড় আশাও করিনি। কিছু স্টলও ঘুরলাম। বই কিনব না কিনব করে কেনাও হয়ে যাচ্ছে প্রচুর। সব যে পড়া হয় তা নয়। তবে পড়ব এই অপেক্ষাতেই যে রোদ জ্বলে তা আমাদের দূরের কোনো পথ অবধি নিয়ে যায়। এই পথ হয়ত কোনোদিন আবিষ্কার করব অথবা এই পথ কোনোদিন দরজা হয়ে উঠবে এমনটাই ভাবি।

হাসান এসেছে ওপার থেকে। বইমেলার সময় যা অবস্থা ওকে কিছু রান্না করে খাওয়াব তার উপায় নেই। তবে ও, স্পেশাল ডিমচানা ও মাসির হোটেলে খেয়ে বিশাল মজা পেয়েছে।

টেবিলে এসেছিল, অনির্বাণ দা, পল্লবী, সন্তুদা, সোহার হরিণ অনেকেই। অনির্বাণদা দারুণ একটা ক্লিক করেছে। হাফ গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে। প্যালিলিয়নের বাইরে দেখা হল অগ্নিদার সঙ্গে৷ সৃজিত মৃখার্জীকে দেখলাম প্যাভিলিয়নের সামনে দিয়ে হেঁটে গেল। বইমেলা এমনই সেলিব্রিটি বা সাধারণ সবার চলার পথ একটাই।
করুণাময়ীতে যতই যোগাযোগ ব্যাবস্থা ভালো হোক। একটু রাত হলেই মুশকিল। আবার ওলা, ওয়েবেরও ভাড়া দেখায় কয়েকগুন বেশি। অটো বুক করে ফিরলাম। ফেরার সময় চারিদিক থেকে কানে আসছিল সানার বাজাই শব্দ। এই শব্দ আনন্দ না দুঃখের কে জানে? সারা রাস্তা এই শব্দে আমাদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছিল। ফেসবুকে স্কল করতে গিয়ে চোখে পড়ল বিপ্লবদার ‘কাম’ বইটি কিছু অশিক্ষিত মানুষ ট্রোল করছে। বইটি আমারও একদম ভালো লাগেনি। আমরা কানে নাচি। কান আমাদের এতটা দূর পারমিশন দেয় কীভাবে কে জানে? হয়ত আমাদের ছেঁড়া হেডফোনও শব্দকে এতটা রসময় করে তোলে যে একটি বই বা একটি লেখা দিয়েই আমরা শুরু করি বিচার!

এখন ২-৩ দিন ভিড় কম থাকবে। টুকটাক করে কিছু বইও কিনব। ফতুর হব। এই ফতুর হওয়ার মধ্যে বিরাট আনন্দ আছে। যারা ফকির হতে চেয়ে ফকির হতে পারেনি পরিস্থিতির চাপে, তাদের কাছে মুহূর্তের বা সাময়িক ফতুর হওয়ার যে কী আনন্দ তা একজন রাজা, মহারাজ জানে না… এই আনন্দটুকু থাকবে বলে বইয়ের পাহাড়ে থেকে পড়ে মাটিতে ঝাঁপ দিতে চাই। পাহাড় ও মাটি এই দৃশ্য দেখবে আর আমি আমার রক্তাক্ত দেহের ওপর ধুলোর অক্ষর সাজাব এই স্বপ্ন দেখি।

০৪.০২.২০
মেলায় ভিড় কম, তবে ক্রেতা বেশি। ফিশফিঙ্গার বা কাটলেট খাওয়ার লোক বইমেলায় যত কম ঢোকে ততই মঙ্গল। কতকাতা বইমেলা কত লোক যে শুধু খেতে আসে তার হিসেবে করে শেষ করা যাবে না।
‘ছাদ পেটানোর গান’ হাতে পাব বলেও পাওয়া গেল না। জানি না, এত লোক এই বিষয়ে কেন আগ্রহ দেখাচ্ছেন। অন্তত মেলাচলাকালীন ৪০-৫০ জন লোক ফিরে গেছে। বইটি নিয়ে টানা দু-বছর খেটেছি। আগামীকাল হাতে আসবে। কী যে আনন্দ হচ্ছে! রবিউল থাকলে সেও ভীষণ আনন্দ পেত।

শতানীক ওর পত্রিকায় লেখার জন্য সাম্মানিক দিল। ছোটো পত্রিকার এই কলেবরটা দেখলে মনে হয়, লেখা শুধু উড়ে আসা মৃতের সাদা খই নয়। আসলে শরীর ও শ্রম দিয়ে যে সাদা পাতা অজস্র কালো কালো ঈশ্বরে পরিণত হয়, তার মাংসে লেগে থাকা আলোচ্ছটা আমাদের অস্তিত্ব।

মেলার শেষ দিকে বহুক্ষণ ফাঁকা প্যাভিলিয়নের দিকে তাকিয়েছিলাম। ভাবছিলাম— শূন্যতা আসলে কী? আমরা কেবল ছায়ার ভিতর স্বপ্ন আঁকি না; স্বপ্ন, ছায়া হয়ে আমাদের কাছে এসে দাঁড়ায়? কত মানুষ আসে আবার ফিরে যায়; শূন্য প্যাভিলিয়ন দাঁড়িয়ে থাকে। অপেক্ষার আরেক নাম কি শূন্যতা?

০৫.০২.২০
মেলার বিদায় ঘণ্টা বাজার দিন বাজতে শুরু করেছে। দিন যত এগিয়ে আসে ভিতরটা হু হু করে। সারাবছরের অপেক্ষা থাকে এই কটা দিন হইহই করার। আমাদের কোনো উৎসব নেই, শুধু বইমেলা আছে। এগরোল, মোগলাই, চাউমিন না— নতুন বইয়ের ঘ্রাণ আমাদের বলে জীবন এত ছোটো নয়, এই দ্যাখো আকাশ…
বহু প্রতীক্ষিত, দীর্ঘ পরিশ্রমের বই ‘ছা দ পে টা নো র গা ন’ হাতে এল। বইটা যখন হাতে নিলাম চোখের কোণটা চিকচিক করে উঠছিল। সামলে নিলাম। সন্তুদা বা তাপসদা না থাকলে বইটি এই মুহূর্তে বেরোত না।
ভিড় বা ক্রেতা খারাপ ছিল না। ভালো লাগছিল স্কুল ড্রেস পরা বাচ্চারা প্যাভিলিয়নে ঢুকে পত্র-পত্রিকা দেখছে। চমৎকার একটি দৃশ্য ক্যামেরা বন্দি করলাম— বাবা কোলে করে তার ছানাকে নিয়ে প্যাভিলিয়নে বই দেখছে, ওর চোখে মুখে তখনও ঘুম… তবে আশ্চর্যের ব্যাপার, কী দীপ্তময় চোখ! ঢুলুঢুলু চোখে এদিক-ওদিক বইয়ের দিকে তাকাচ্ছে, মনে হচ্ছে ঘুম ভাঙলে সব বই ও গোগ্রাসে গিলে নেবে।

তৃপ্তিদি, অভ্রদীপ, নীললোহিতদা আরও অনেকে টেবিলে এল। এদের সঙ্গে দেখা বলতে একমাত্র বইমেলা। সে আজও আসেনি। হয়ত আসবেও না। অপেক্ষার এই আলোতে সলতে হতে পারলে কোনো অন্ধকার আর ছুঁতে পারে না। একটা একার সেতু, একার পারাপারে, একাই সহজ রাস্তা হয়ে ওঠে।

০৬.০২.২০
পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেই তিনটে বেজে যাচ্ছে। এবার ক্লান্তিকে ঘুম পাড়িয়ে আমি কি হয়ে উঠব মা? ‘চাঁদমামা, চাঁদমামা টিপ দিয়ে যা’ বলে আমি কি আঁচল বিছিয়ে দেব শরীরে? যা ফুরোবার নয়, তাই-ই তো ফুরিয়ে যায়! আর তো তিনদিন… এরপর বিষ বা বিস্বাদ ছাড়া কিছুই কি পারবে জড়িয়ে ধরতে?

মেলায় একবার দুপুরের দিকে আরেকবার সন্ধ্যার দিকে ভিড়ের ঝটকা আসে৷ অরূপদা, দুপুরটা একাই প্রায় সামলে দেয়। গতকালও টেবিলে অনেকে এসেছিল অরিনিন্দন দা, সৌরভ মাহান্তি, ঈশিতাদি, রাজদীপদা, অমিতরূপদা অনেকেই। বর্ধমান থেকে নিয়াজুলদা, দীপ্তিদা, সাদ্দাম। আসাম থেকে এসেছিল কান্তারদা। লন্ডন থেকে ওয়াসিমদা এসে সংগ্রহ করল ‘ছাদ পেটানোর গান’।

কয়েকদিন বিরতির পর ফুল টিমে হাজির পঙ্কজদা, জয়নগরের মোয়াসহ। মিতালিদি দায়িত্ব নিয়ে সামলে দিচ্ছে একশো আশি ডিগ্রি, সর্বনাম আর দশমিকের যৌথ টেবিল। মিতালিদির টেবিলের সামনেই দেখা গেল স্নিগ্ধ একটি মেয়েকে। গত কয়েকবছরে এমন স্নিগ্ধ কোনো মেয়ে চোখে পড়েনি। মেয়েটি হতে পারে সুপর্ণা অথবা বনলতা…

মিলনমেলা হোক বা সেন্ট্রাল পার্ক, ফেরার সময় ঝামেলা পোহাতেই হয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ক্যাবে পৌঁছালাম শিয়ালদা।

হাসান ফিরে যাবে আগামীকাল। মেলা ছাড়া কোথাও ঘোরাতে পারিনি। খাওয়া-দাওয়াও বাইরে বাইরে সেই তাড়াহুড়োতে। মেস-হোস্টেল করে যে জীবনটা বয়ে বার্ধক্য হচ্ছি, হাসানও ব্যতিক্রম নয়। সপ্তাহটা দ্রুতই শেষ হল। বন্ধু কোনো কুটুম নয়। বন্ধু হল নতুন বই, তার স্পর্শ বা গন্ধই বইমেলার হুল্লোড়…

০৭.০২.২০
সকালটা শুরু হল বন্ধুকে ট্রেনে তুলে দিয়ে। আকাশে ঘন মেঘ। নিউজ ফিডে বারবার দেখাচ্ছে, কলকাতায় আছড়ে পড়বে তুমুল বৃষ্টি। সকাল থেকে ভাবছি, মেলায় লোকজন আসবে তো? কলকাতা বরাবরই যেকোনো প্রতিকূলতা টেক্কা দিয়েছে। মেলায় যথেষ্ট ভিড়। প্যাভিলিয়নের ভিড়ও দেখার মতো।

টেবিলে দেখা করতে এসেছিল দুই মিষ্টি বান্ধবী শ্রীজিতা ও স্বেয়তী। আলাপ হল আরও দুই মিষ্টি মেয়ের সঙ্গে অমৃতা ও মাম্পীর সঙ্গে। মাম্পীর থেকে উপহার পেলাম তার সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। বনলতা সেন আজ আসেনি।

টেবিলে অনেকেই এসেছিল। অর্কদার সঙ্গে টেবিলে বেশ কিছুক্ষণ কথা হল। ওপার থেকে আসা দুই তরুণ ওপারে ইমতিয়াজদার ‘কালোকৌতুক’ না পাওয়ায় নিল টেবিল থেকে। আজ দুটো ঘটনা বেশ নাড়া দিল—
১. শক্তিনাথ ঝা-কে আমার খুব ভালো লাগে। বইমেলায় ঢুকেই প্রথম আমায় কল করে প্যাভিলিয়নে ঢুকলেন। প্রকাশ করলেন ‘ছাদ পেটানোর গান’ বইটি। সরল মনের এই পণ্ডিত মানুষটি কেন জানি না খুব অল্প সময়ে বড়ো কাছের হয়ে উঠেছে।

২. বেশ কয়েকজন কমবয়সি ছেলেমেয়ে, সকলেই কমবেশি লেখালেখি করে। সবার দাবি, তবুও প্রয়াসের সব বই-ই কিনতে ইচ্ছে করে। এত বই কিনব কী করে?

‘তবুও প্রয়াস’ আমার প্যাশনের জায়গা। প্রকাশনীকে পেশা করা কী কঠিন তা অনেকেই জানেন। অনিশ্চিত লাইফ। ছেয়ে থাকা আকাশে কালো মেঘের মতো। কখন চিকচিক রোদ উঠবে সেই আশাতেই নিজেকে ঝলমল করে থাকা, আর কী!

০৮.০২.২০
ভিড় ছিল দেখার মতো। প্যাভিলিয়নে এবারে যা ভিড়, গত কয়েকবছরে হয়েছে বলে হয় না। এর প্রধান কারণ, শুধু পত্র-পত্রিকা নয়; বহু গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশ করছে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশনীগুলো… নতুন নতুন বহু পাঠক আসছে। গত দু-বছর একটা বাঁক বদল ঘটেছে বাংলাসাহিত্যে। এখন নতুন লিখতে আসা ছেলেমেয়েগুলো শুধু জয়-শঙখ নয়, পড়তে চাইছে অমিতাভ মৈত্র, পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল, ফল্গু বসু…

বহুজন টেবিলে এসেছিল। বহুজনের সঙ্গে সেলফি-ছবি হল। গৌতমদা ফোনে জানাল ‘বৃত্তান্ত ফেরিওয়ালা’র প্রোডাকশন চমৎকার হয়েছে। যদিও এই কৃতিত্ব আমার না। তাপসদার। এবার সব থেকে বেশি চাপ ছিল। ব্যক্তিগত, পারিবারিক। এরপরও সবগুলো বই মেলায় প্রকাশ পেয়েছে। দেবোত্তম, শতানীক, অরূপদা, মোহিত সবার সহায়তা না থাকলে একেবারেই সম্ভব ছিল না। মেলার ২০ দিন আগেও আমি হাসপাতাল বাড়ি করছিলাম…

চারিদিক থেকে ফোন আসছে, বই মেলায় কী হয়েছে? সত্যি বলতে, কী হয়েছে আমরা একটুও টের পাইনি… প্যাভিলিয়নের ভিতরে থাকলে আত্মীয়তার সাদা সুতোগুলো এত বেঁধে বেঁধে থাকে আর এত ঝলমল করে, বাইরের কোনো অন্ধকারের দিকে চোখ যায় না। বলা যায়, চোখকে পারমিট করে না। চোখ আমাদের অলস দূরবীন। দেখতে না চাইলে দূরের কিছুই দেখা যায় না। ক্যা ক্যা ছিঃ ছিঃ এর বইমেলা আমাদের নয়। আমাদের মেলা মুঠো খুলে আঙুলগুলোকে আঙুলের দিকে এগিয়ে দেওয়ার…

০৯.০২.২০
মৃত্যুঘণ্টা তো সত্যিই বাজল, এবার আপনি কী বলবেন? আকাশের চোখে যে তুমুল বর্ষা এল আর আমরাও বারবার হোঁচট খেলাম তার কী হবে? অরূপদা, মনখারাপ নিয়ে রাতের খাবার পর্যন্ত গলা দিয়ে নামাল না…
কারো কি কোনো শাস্তি হবে?

প্যালিলিয়ন জুড়ে ছলছল চোখ। কেউ কাউকে জড়িয়ে ধরে ছাড়তে চাইছে না। এদেশে কে করবে এন.আর.সি?

ব্যাঙ্ক স্ট্রাইক, বৃষ্টি, ট্রেন লাইনের সমস্যা— সবকিছুকে অতিক্রম করেও এবার মেলায় পাঠকের ঢল ছিল দেখার মতো। পাঠক বদলাচ্ছে। সিরিয়াস পাঠক বা ক্রেতার সংখ্যাও বাড়ছে। ই-বুককে বলে বলে গোল দিল এই মেলা। ছোটো ছোটো প্রকাশনীগুলোও টেক্কা মেরেছে বড়ো প্রকাশনীকে…

এবছর ছিল আমার কাছে বিরাট চ্যালেঞ্জিং। বইমেলার আগে কী যে পরিস্থিতিতে কাটিয়েছি শুধু আমি জানি। সব বইও বেরিয়েছে ঠিকঠাক। ফলত, এই বইমেলার প্রতি মায়টাও ছিল বেশি। এবার কাঁদিনি। একটুও কাঁদিনি। আকাশকে জড়িয়ে ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম, জোছনা আছে কিনা… গোল থালার মতো চাঁদ, তারও মনখারাপ। প্রেমিকার ব্যাজার করা মুখের মতো। তার মাথায় আমিই হাত বুলিয়ে বলছিলাম: পাগলি, মনখারাপ কেউ করে? চল, মুভি দেখব… গঙ্গার পাড়ে পা দুলিয়ে বসব… আকাশ আমার ভিতর আরও প্রসারিত হচ্ছিল… বইছিল হিমবাতাস… আমার খাড়া হওয়া লোমে আমি টের পাচ্ছিলাম শেষ বলে কিচ্ছু হয় না। একটি শেষ আরেকটু শুরুকে কুটুমের মতো আমন্ত্রণ করে। আমরা যে চোখের জলে ধোয়ালাম কুটুমের পা, তা পরবর্তী অধ্যায়ের আপ্যায়ন।

Spread the love

0 Comments

Your email address will not be published. Required fields are marked *