শিবাশিস দত্তের স্মৃতিকথা

গ্রামজীবনের আত্মা’ হয়ে উঠেছিলেন তারাপদ সাঁতরা

তাঁকে আমি জেনেছিলাম সেই ১৯৯৮ সালের গোড়ায়। তারাপদ সাঁতরা— বিরল মনের এবং মানের এক পুরাতত্ত্ববিদ। গ্রামের পর গ্রাম চষে বেড়িয়েছেন, তীব্র প্যাশন আর গভীর জিজ্ঞাসার টানে যেন হয়ে উঠেছিলেন ‘গ্রামজীবনের আত্মা’। ‘আত্মা’ কথাটা সচেতনভাবেই ব্যবহার করছি কারণ, মুখাবয়ব, বেশ, ভঙ্গি, কিংবা কথাবার্তায় শহুরে ঠাট বা অধ্যাপকীয় চাতুর্য— এর কোনোকিছুই তারাপদদাকে স্পর্শ করতে পারেনি। গবেষকসুলভ পণ্ডিতি নয়, গ্রামজীবনের আঁতের কথা তিনি জানতেন। পরনে ধুতি আর রোগা পাঞ্জাবি, চোখে কালো ডাটির সেকেলে চশমা, কাঁধে ঝোলা— নিরন্তর পায়ে-হাঁটার জীবনভর অভ্যাসকে কী কৌশলে রপ্ত করেছিলেন কে জানে ! পায়ের কষ্ট ছিল, স্বাভাবিক চালে পা ফেলে হাঁটতে পারতেন না— তবুও। ১৯৯৬-৯৭ সালের কথা। শহুরে মনন দিয়ে গ্রামীণ মনকে বুঝতে হবে— এ ধরনের তাগিদ থেকে তখন গ্রামগঞ্জে ঘুরে বেড়াচ্ছি, অভিজ্ঞতার কথা লিখছি। বেশ কিছুদিন লেখালেখির পর মনে হল, ইতিহাসের উপাদান, পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন কিংবা ছড়া-প্রবাদের পরতে পরতে যিনি গ্রামজীবনের গবেষণাকে ধ্যানজ্ঞান করে তুলেছেন সে সাধকের কাছে একবার যাওয়া দরকার। মতলব একটা ছিল বই কি! গ্রামজীবন-বিষয়ক লেখাপত্রগুলি তাঁর সামনে হাজির করা। সে ধান্দা মেনেই একদিন হাজির হয়ে গেলাম তাঁর কাছে। পূর্ব-পরিচয় নেই, তাতে কী! গম্ভীর স্বভাবের অধ্যাপক বা জনপ্রিয় লেখক-কবি তো নন যে দুরু দুরু বুকে হাজির হতে হবে। সাক্ষাৎ লাভের পর অনুমান সত্য হল। বাকচাতুর্য নেই, পণ্ডিতি ভাব নেই, খোলা মনের মানুষ বুঝে বন্ধুভাবে মতলবের কথাটা বলেই ফেললাম:

— ‘এ লেখাগুলো দু-মলাটে বাঁধতে চাই। আপনি পড়ে দেখুন। ভালো লাগলে বইয়ের একটা ভূমিকা কিন্তু লিখে দিতে হবে। না বলবেন না যেন।’
তারাপদদা লেখা পড়তে সম্মত হলেন। তবে ভূমিকা লেখা প্রসঙ্গে খোলামনে বললেন: আমি তো নামী লেখক নই, আমি লিখলে তাতে কাজ হবে না। নামী কাউকে দিয়ে লেখাও, তাতে তোমার বইয়ের প্রচার হবে। এ ভুল কোরো না।’
আমি নাছোড়বান্দা, বললাম : অন্য কাউকে দিয়ে লেখাবার কথা ভাবছি না। আপনি না লিখলে বিনা ভূমিকায় বই ছেপে বেরোবে।’
শেষমেশ রাজি হলেন এবং চমৎকার ভূমিকাসহ বই প্রকাশিত হল।
শুধু সাহিত্যগত প্যাশন আর কঠোর পরিশ্রম দিয়ে কতদূর এগোনো যায়? সাধকের গৌরব যদিও বা অর্জন করা যায়, নামী লেখক হওয়া যায় না। পণ্যসমাজই ঠিক করে দেয় কে লেখক আর কে লেখক নয়। বাজারসফল না হলে সে কলমচির লেখক-প্রতিপত্তি গড়ে উঠবে কেমন করে? লেখক ব্যক্তিটি যদি সাহিত্যের বাজারে নিজেকে মেলে ধরবার কৌশল বা ছকপ্রণালী (push tactics) না জানেন, তবে তাকে গণ্ডিবাঁধা লেখক হয়েই বাঁচতে হবে। এ এক ধরনের স্মার্টনেস, যা এ যুগের লেখক-কবিকে আয়ত্ত করে পসার গড়তে হয়। তারাপদদার লেখক-সত্তায় এ স্মার্টনেস ছিল না, এ সবের পরোয়াও করেননি।
তাঁর লেখা বইগুলোর সঙ্গে যাদের পরিচয় আছে তারা মন্দির-ভাস্কর্য কিংবা গ্রামজীবনের ছড়া-প্রবাদ নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণধর্মী বইগুলোর কথা জানেন। কলকাতার মন্দির-মসজিদ : স্থাপত্য-অলংকরণ-রূপান্তর, এ বই তো এক আকরগ্রন্থ।অপর গ্রন্থগুলি হল: ‘বাংলার দারু ভাস্কর্য ‘, ‘মেদিনীপুর সংস্কৃতি ও মানবসমাজ।’ তবে তাঁর ‘ছড়া-প্রবাদে গ্রামবাংলার সমাজ ‘ বইটি পড়ে বোঝা যায় শুধু তথ্যসমৃদ্ধ নয়, রসসমৃদ্ধ গ্রন্থ রচনায়ও তিনি ছিলেন সমান দক্ষ। এ বইতে পড়ি :
ছড়া ১.

‘ফিলজফার=বিজ্ঞলোক, প্লৌম্যান= চাষা
পামকিন=লাউ-কুমড়ো, কুকুম্বার=শশা’
ছড়া ২.

‘বাকি, বাক্য, বাটপাড়ি এই তিনে দোকানদারি’
ছড়া ৩.
‘দুলোল হল সরকার অক্রুর হল দত্ত
আমি রইলাম যে কৈবত্ত সে কৈবত্ত?’
(পদবি পরিবর্তন করে অ-কায়স্থ থেকে কায়স্থ সমাজে যে অনুপ্রবেশ তারই আক্ষেপ করে এ ছড়া রচিত)
এ বইয়ের দশম পৃষ্ঠায় লেখক লিখেছেন:
‘সামাজিক কারণে অর্থবান ও প্রতিপত্তিশালীদের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গোক্তি করে যেসব ছড়া-প্রবাদ রচিত হয়েছিল, সেগুলি থেকে আমরা সেকালের সমাজজীবন সম্পর্কে একটা ধারণা করতে পারি।’
তারাপদদার অন্য এক পরিচয় জানেন লিটল ম্যাগাজিন জগতের প্রবীণ সম্পাদক ও পাঠকমহল। কেননা তিনি ছিলেন ‘কৌশিকী’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক। পত্রিকার ‘বিশেষ রোমন্থন সংখ্যা’য় (১৯৯৭) ‘আমার বন্ধু পূর্ণেন্দু ও কৌশিকী’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন অতীত জীবনের কথা। একসময় সক্রিয় আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিলেন, কৃষক আন্দোলন নিয়ে প্রবল ব্যস্ততায় দিন কেটেছে। পরে রাজনৈতিক দলের বন্ধন ছিন্ন করে ইতিহাস,প্রত্নতত্ত্ব আর মিউজিয়াম তৈরি নিয়ে মেতে উঠলেন। পূর্ণেন্দু পত্রীর সঙ্গে বলাগড় গ্রামে যান নৌকো তৈরির শিল্প ও শিল্পীদের সঙ্গে পরিচিত হতে। গ্রামের পর গ্রাম ঘুরেছে— শরীরের ভালোমন্দ নিয়ে ভাববেন সে ফুরসত কোথায়? কলকাতায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রাজ্য ভাষা কমিশনের চাকরিতেও বহাল ছিলেন। লিখে লেখকের সম্মানদক্ষিণা পাননি, এমন ঘটনারও উল্লেখ আছে এ প্রবন্ধে। আর একটি ভিন্ন গোত্রের বইয়ের কথা বলা দরকার। তিনি একটি প্রেমের উপন্যাসও লেখেন এবং সে বই আমায় উপহার দিয়েছিলেন। লোক-জানাজানি যাতে না হয়, সে সতর্কতা মেনেই তিনি এ বই আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। প্রচারবিমুখ হয়ে থাকার যুক্তিতেই এমন সতর্কতা অবলম্বন করতেন তিনি। এ ঘটনা থেকেও ব্যক্তি তারাপদ সাঁতরার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আন্দাজ মিলবে।
মৃত্যুর কিছুদিন আগের কথা। হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, ফোনে খোঁজ খবর নিতাম। একদিন ফোনে জিজ্ঞাসা করলাম, এখন কেমন আছেন?
উত্তর: ‘শোনো, এখন তুমি আমায় দেখলে চিনতেই পারবে না। গায়ের রং এখন মেমসাহেবদের মতো গোলাপি হয়ে গেছে।’
তারাপদদা কি রক্তাল্পতা রোগে ভুগে ভুগে মেমসাহেবীয় গাত্রবর্ণের অধিকারী হয়ে উঠেছিলেন?

Spread the love

0 Comments

Your email address will not be published. Required fields are marked *