হারুকি মুরাকামির অন্তর্জগৎ

ভাষান্তর: রিপন হালদার

দেবোরা: কেন আপনি রাজি হলেন?
মুরাকামি: তারা আমাকে বলেছিলেন যে আমি ইচ্ছামতো রেকর্ড বেছে নিতে পারি। এবং পঞ্চাশ মিনিট ধরে আমার পছন্দসই কথাবার্তা বলতে পারি। তো আমি ভাবলাম, কেন নয়! বিলি হলিডে থেকে ‘মারুন ৫’ পর্যন্ত সবকিছু থেকে আমি খুব বাছাই সংগীত পরিবেশন করি।

দেবোরা: মনে হয় আপনি একবার বলেছিলেন যে, জাপানে লেখক হওয়া খুব চটকদারি ব্যাপার। ভীষণ প্রকাশ্য জীবিকার প্রেক্ষাপটে আপনি নিজের সাধারণত্বে অবিচল থাকেন। এগুলো আপনি মেলান কীভাবে?

মুরাকামি: সত্যি বলতে শুরুর দিকে জাপানের সাহিত্য জগৎ সম্পর্কে আমি খুব একটা খুশি ছিলাম না। আমি ছিলাম একজন বহিরাগত। একটি কালো মেষ, মূলধারার জাপানি সাহিত্যে অনুপ্রবেশকারী। কিছু লোক বলেছিল যে, আমি জাপানি সাহিত্যে নতুন কণ্ঠ। এবং কিছু লোক আমাকে বাজে বলেছিল। তাই আমি একরকম বিভ্রান্ত ও বুদ্ধিভ্রষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। আমি জানতাম না কী হচ্ছে। আমি ‘ওয়ান্ডারল্যান্ডে এলিস’ এর মতো হয়ে পড়েছিলাম। তাই আমি জাপান থেকে পালিয়ে বিদেশে চলে গেলাম। ইতালি এবং গ্রিসে গিয়ে দুই-তিন বছর কাটালাম। তারপর আমি লিখলাম ‘নরওয়েজিয়ান উড’। জাপানিরা বইটিকে ঘৃণা করেছিল।

দেবোরা: এটা দুই মিলিয়নেরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছিল!

মুরাকামি: এত বিক্রি হওয়া সত্ত্বেও লোকে আমাকে ঘৃণা করেছিল। তাই আবার আমি বিদেশে চলে গেলাম। আমি নিউ জার্সির প্রিন্সটনে গিয়ে উঠেছিলাম। জায়গাটি ছিল বিরক্তিকর। সুন্দর, তবে বিরক্তিকর। তারপরে বোস্টনের টাফট্‌স ইউনিভার্সিটিতে গেলাম। সেখানকার ফেনওয়ে পার্কটি ভালো ছিল।

দেবোরা: ভূমিকম্প এবং সারিন গ্যাস আক্রমণের পরে আপনি কি আবার জাপানে ফিরে যাওয়ার মন স্থির করলেন?

মুরাকামি: হ্যাঁ। ১৯৯৫ সালে আমি অনুভব করি নিজের দেশে ফিরে এসে মানুষের জন্য কিছু করতে পারি কিনা। দেশের জন্য নয়, জাতির জন্য নয়, সমাজের জন্য নয়, আমার বিশ্বাস ছিল জনগণের প্রতি।

দেবোরা: আপনার কাছে দেশ ও জনগণ, এই দু-টি জিনিসের মধ্যে পার্থক্য কী?

মুরাকামি: মানুষ আমার বই কেনে, দেশ না।

দেবোরা: আপনি কি জাপানি হিসেবে আপনার লেখালেখিকে বিচার করেন না পশ্চিমা সাহিত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন?

মুরাকামি: আমি সেভাবে ভাবি না। আমার গল্প আমারই। এগুলো কোনো বিভাগের বিষয় নয়। তবে আমি জাপানি ভাষায় লিখি এবং আমার চরিত্রগুলো বেশিরভাগই জাপানি। তাই আমি মনে করি আমি একজন জাপানি লেখক। আমি মনে করি আমার লেখার শৈলী অন্যত্র থেকে নেওয়া নয়।

দেবোরা: জাপানে আপনার প্রথম দিকের পাঠকেরা বেশিরভাগই তরুণ ছিলেন। তরুণদের মধ্যে আপনার বিরাট প্রভাব ছিল।

মুরাকামি: হ্যাঁ। এটা খুবই অদ্ভুত। আমি যখন লিখতে শুরু করি আমার পাঠকেরা বিশ বা তিরিশের কোঠায় ছিলেন। এবং চল্লিশ বছর পরে আমার পাঠকেরা বিশ বা তিরিশের কোঠাতেই থেকে গেলেন! ভালো কথা হল আমার প্রথম প্রজন্মের কিছু অনুরাগী এখনও আমার বইগুলি পড়ছেন এবং তাদের ছেলেমেয়েরাও সেগুলি পড়ছে। একই পরিবারের তিন-চারজন একই বই পড়ছেন শুনে আমি খুব আনন্দিত হলাম। আমার এক বন্ধু তার অল্প বয়সের ছেলেমেয়েদের সাথে এমনিতে কথা খুবই কম বলে। কিন্তু জেনে খুব ভালো লেগেছে যে, তারা যখন কথা বলে তখন বিষয় থাকে আমার বই।

দেবোরা: ‘কিলিং কমেন্ডটর’ থেকে থেকে একটা দৃশ্য আমি উদ্ধৃত করতে চাই:

কমেন্ডেটর নিজ হাতের তালু দিয়ে দাড়ি ঘষতে লাগলেন যেন কিছু মনে পড়েছে। “ফ্রানজ কাফকা ঢালু স্থান বেশ পছন্দ করতেন”, সে বলল, “সবধরনের ঢালু স্থান তাকে আকৃষ্ট করত। ঢালের মাঝখানে নির্মিত বাড়িগুলির দিকে চেয়ে থাকতে তিনি পছন্দ করতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তার পাশে বসে তিনি ওই বাড়িগুলি দেখতেন। কখনোই এতে ক্লান্ত হয়ে উঠতেন না। প্রথমে মাথাটি একদিকে ঝুঁকিয়ে তিনি বসতেন পরে আবার সোজা করে নিতেন। অদ্ভুত মানুষের মতো ছিল তাঁর আচরণ। আপনি কি এটা জানতেন?” ফ্রানজ কাফকা এবং ঢালু স্থান? “না। আমি জানি না”। আমি বললাম। আমি এরকম কখনো শুনিনি। “তবে এটা জানার পর কি কেউ তাঁর কাজের আরো বেশি প্রশংসা করে?”

দেবোরা: উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমরা যদি আপনার কৌশল জানি যে আপনি ঢালু স্থানের দিকে তাকিয়ে থাকতে পছন্দ করেন, এতে কি আপনার কাজের প্রতি মনোযোগ বাড়াতে আমাদের সাহায্য করবে?

মুরাকামি: ফ্রানজ কাফকা ঢালু জায়গা পছন্দ করতেন, এটি মিথ্যা। এটি আমার তৈরি করা। তবে এটা করে কি ভালো করলাম? খুব সম্ভবত ফ্রানজ কাফকা ঢালু জায়গা পছন্দ করতেন।

দেবোরা: এটা সম্ভব।

মুরাকামি: কিছু লোক এই উদ্ধৃতি দেয়। তবে আমি এটি তৈরি করেছিলাম। আমি অনেক কিছুই তৈরি করেছি।

দেবোরা: কল্পকাহিনিতে আপনি এটা তৈরি করতেই পারেন। যদি আমরা জানতে পারি যে আপনি বিড়াল ভালোবাসেন, এটা কি আমাদের আপনার কাজকে আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করবে?

মুরাকামি: আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করুন।

দেবোরা: তিনি আপনাকে চেনেন বলে কি আপনার কাজকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন?

মুরাকামি: আমি জানি না। সে বলে আমি তাঁর প্রিয় লেখক নই। তবে সে সবসময় আমার কাজকে খুব গুরুত্বের সাথে সমালোচনা করে। সে আমার প্রথম পাঠক। সুতরাং আমি যখন লেখা শেষ করে পাণ্ডুলিপিটা তাকে পাঠাই সে পড়ে এবং দু-শো ত্রুটি-সহ ফিরিয়ে দেয়। এই ত্রুটিগুলো আমি খুব অপছন্দ করি। সে বলে, “তোমার এই অংশগুলো পুনরায় লেখা উচিত!”

দেবোরা: তখন আপনি আবার লেখেন?

মুরাকামি: হ্যাঁ। তারপরে সেটা আবার তার কাছে পাঠিয়ে দিই। এবার সে একশোটি ত্রুটি-সহ পাণ্ডুলিপি ফিরিয়ে দেয়। আগের থেকে কম ত্রুটি থাকে বলে ভালো লাগে।

প্রথম পাতা

Spread the love

1 Comment

  • রিপন হালদার এর অনূদিত সাক্ষাৎকারটি থেকে অনেক শিখলাম।।।।।।।।।।।।

    তীর্থঙ্কর নন্দী,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *