Categories
কবিতা

অমিতরূপ চক্রবর্তী’র গুচ্ছকবিতা

২৫ শে জানুয়ারী

এমনই একদিন ঝুরি ঝুরি রোদ আর স্বাভাবিক লতাপাতার মধ্যে ইচ্ছের সংজ্ঞা বদলে যায়। তীর্যক হাত এসে পড়ে থাকে আরেকটি হাতের সীমায়। পাখি ডাকে। কামাতুর রং ছড়িয়ে পড়ে পশমের মতো রোদের মধ্যে। মাথায় টিনের টোপর পরা সব ঘরবাড়ি, গাঢ় দাগ রেখে বয়ে যাওয়া দুর্দিন— সুদিন, যোনি আর লিঙ্গের বোঝাপড়া। এমনই একদিন ন্যায্য— অন্যায্য তর্কের মধ্যে ইচ্ছের সংজ্ঞা বদলে যায়

খাদের আড়ালে চলে যাওয়া দৃষ্টি চোখের মধ্যে ফিরে এসে চকচক করে জ্বলে। হরিণ ছালের মতো কী এক উপোসী কথার বস্তু দূরে দূরে জানালার কাচ কালো করে ফেলে। একে আসন্ন বৃষ্টিও বলা যায় না, বলা যায় তীব্র গতিতে উঠে আসা জ্বর। আঙুলের ধোঁয়াটে দিগন্তে সূর্য ক্ষতবিক্ষত আর লাল হয়ে আছে। নীচে যে বিহ্বল খেত, তার গায়ে শিউড়ে ওঠা সব রোমকূপ। লোকালয়ে বিপদের কথা হয়। আগন্তুক ঘোড়ার কথা হয়

চুল থেকে ঝরে ঝরে পড়ে তেজস্ক্রিয় মহাজাগতিক পোকা। তোমার ঠোঁটের গায়ে, আমার চোখের মণির ওপরে সেইসব পোকা। তীর্যক হাতের অসংখ্য আঙুল আমার চলমান শিরা, লবণাক্ত জল আঁকড়ে ধরলে এক অকাট্য কাঁকড়ার দেশ নড়ে ওঠে। যেখানে আদিগন্ত চুষে ফেলা ছাড়া, বিটিং দ্য বুশ-এ ভয় পেয়ে উড়তে থাকা মৃত্যুর আলোকবিন্দু ছাড়া

আর কিছু নেই

কুহক

বিরামচিহ্নের ভেতরে একটি খোলা জানালার আংশিক। শাড়ির কুহক সরিয়ে একটি হাত
কিছু বললো। চারপাশে পারমাণবিক ধোঁয়া। দু-পাশে মৃদু গাছ, জঙ্গল রেখে আমি শাণিত রাস্তায়
আলোকপ্রাপ্ত হতে হতে সেই দৃশ্যটিকে এড়াতে পারি না। বিরামচিহ্নের ভেতরে আমি আরও কিছু
উসখুস আছে এমনই মনে করি। যেমন গলার মোচড় অথবা ভোর ভোর আবিষ্ট কুয়াশা

পোশাক বদলে সন্ধে নামে। প্রথমে বাইরে তারপর মাথার ভেতরে, চোখের খাঁচায় ঝলমল করে
আলোর দোকান। এই দোকানগুলো আসলে সীমানা। ডানে— বাঁয়ের মধ্যে টানটান এক দাগ, যাকে
ফলো করার সময় শুধু মনে রাখা উচিত এক উদ্বিগ্ন ঘোড়ার কাম, যে ক্রমেই স্ফিতাকার হচ্ছে
আর সিঁড়িতে শুয়ে থাকা অজস্র কিলবিলে পোকার তিক্ততা

আংশিক জানালাটি বিরামচিহ্নের ভেতর একসময় সচকিত হয়। পর্দা টেনে দেয়। শাণিত রাস্তার
ওপরে হু হু করে উড়ে যাওয়া উল্টোমুখী হাওয়া। কখনো গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। আমার হাতের ঘেরাটোপে
আমার টুকরো,  তার সুগঠিত কাঁধ ও পেশী, সারাদিনের অর্জিত ঘামের গন্ধ আর রক্তপ্রবাহ

আমি বিরামচিহ্ন নিয়ে, দু-পায়ে ভর দিয়ে আংশিক জানালার ওপারে উঁকি দিতে দিতে কখন যে গ্রিল ভেদ
করি, অপরিকল্পিত এক জলের উৎসে গিয়ে আয়নায় নিজেকে দেখি, শাসন করি— তখনও আংশিক ওই
জানালার আলো, দূরের নক্ষত্রজগৎ থেকে আসা আলো— আমার মুখের সর্বত্র লেগে থাকে। ভাবায়।
চারপাশের পারমাণবিক ধোঁয়ার মধ্যেই আমার জন্য চা ও যৌনতা আসে

খোদাই

পাতা ঝরার শব্দ হচ্ছে। পাতা ঝরার শব্দ হচ্ছে আমাদের ভেতর। বড়ো বড়ো হলুদ সেগুন পাতা, আরও অনেক আকৃতির পাতা ঝরে পড়ছে। পাতা ঝরার শব্দ হিংস্র চুম্বনের মতো, চোখের সুড়ঙ্গে আঙুল ঢুকিয়ে দেবার মতো। অথবা দাঁত দিয়ে চেপে ধরা বুকের মাংসের মতো। পাতা ঝরার শব্দ হচ্ছে। অলস একটা বিদ্যুতের তার ঝুলে আছে আমাদের ওপর। আকাশের ঊরুতে লেগে থাকা ঘাম অবধি দেখা যাচ্ছে

মানুষের মাথার ওপর দিয়ে বৎসরান্তের মেঘ উড়ে যায়। দরজার হাতল কিম্বা লোহার রেলিং-এর গায়ে মোটা করে বাঁধা থাকে আয়ু। কিছুটা স্বল্পবাস প্রশ্নের আগে আমাদের এই একদিকে কাত হয়ে থাকা উভচর বেঁচে থাকা, ক্রুদ্ধ পাখসাট এবং কোনও অগভীর রাতে জ্যোৎস্নার গড়িয়ে আসা— এইসব, শক্ত কাপড়ে বাঁধানো বইয়ের মতো আমাদের সঙ্গে কবরে যায়। রূপোর শিশুকে নির্জনে ভয় দেখায়

মানুষের মাথার ওপর দিয়ে বৎসরান্তের মেঘ উড়ে যায়

ঘোড়াকে সমুদ্রে ফেলে আমরা নির্ভার ভাল থাকার কাছে আসি। তার কচি ঘাসে পা রেখে শিউড়ে উঠি। শিহরিত হয় আমাদের সঙ্গে একইভাবে বেঁচে থাকা গাছ, পাখির লুকোনো স্তন এবং পরাকাষ্ঠা নামক এক চতুস্কোণ ত্বকের অসুখ। সামান্য কাম, চিনির টুকরোর মতো

পাতা ঝরার শব্দ হচ্ছে। কঙ্কালে হেলান দিয়ে চোখ বুজলে তার শব্দ ও কাচ— কাঁপানো প্রতিধ্বনি স্পষ্ট শোনা যায়

বুলেভার্ড

কোনো কোনো দিন আমার জন্য তোমার অসাড় ঝুলে পড়া হাতটি অপেক্ষা করে। কোনো কোনো দিন পথ যায় নিঃসঙ্গ সবুজ গাছের মধ্যে দিয়ে। লাল ইঁটের একটি বাড়ি ফাঁকা মাঠের মধ্যে এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকে যেন তোমার আমার সেইসব লতা ফুলে উপচে যাওয়া সময়। আমাদের অদূরে ঝোড়ো বাতাসের এক সৈকত, কিছু নোঙর ধরার জন্য উদগ্রীব মানুষ। তাদের ভিজে ওঠা পোশাক, আরও বেশি ভিজে যাওয়া আত্মা,  দৈব ইশারার মতো তাদের সাদা ছাই রঙের টুপি। কোনো কোনো দিন আকাশে প্রত্যাশার চাইতেও বেশি বড়ো নক্ষত্র হয়, চারদিকে শুধু মুচড়ে ওঠা ঢেউ

জানালার ওপারে জল। এই জলে মানুষের অন্তর্ভেদী ছায়া পড়ে।  আমাদের যেমন পড়েছে। তোমার পাহাড় লুকিয়ে রাখা চোখের, আমার অন্ধকার মুখের। সরু গলি দিয়ে হেঁটে আসা অবোধ জন্তুর, যে শুধু ঘ্রাণ চিনতে পারে, অক্ষত কামড় চিনতে পারে। নারকেল গাছের জাফরি অথবা উদ্দাম বেলুনের হাত এখন কর্কশ পাথর আর থোকা থোকা চকচকে নৈঃশব্দ ছুঁয়ে দেখছে। ব্রীজের অনেক নীচে চাঁদ, আমাদের পা বা হাতের দৈর্ঘ্য অতদূর পৌঁছয় না

যতবার শ্বাস নিচ্ছি হাওয়াতাড়িত বনের শব্দ হচ্ছে। আমার মুখের একটি ভাঁজ আরও কিছুটা এগোলে হয়তো একটা স্টেশন পাবে। তার মাথায় অসংখ্য কথার পাতা নিয়ে ফুটে থাকা এক গাছ। তারও মাথায় একটি নক্ষত্র জ্বলছে, প্রত্যাশার চাইতেও অনেক অনেক বড়ো। তার জ্বলজ্বলে চোখে দিগন্ত অবধি চলে গেছে এমন এক গমখেতের ভাষা আর কাক আর নোঙর ধরার জন্য উদগ্রীব মানুষগুলো, যাদের দৈব ইশারার মতো সাদা ছাই রঙের টুপি, তাতে বাতাসের ঝাপটা লাগছে

তোমার আমার সেইসব লতা ফুলে উপচে যাওয়া সময়

হাঙর

আলো ততখানিই আলো, যতখানি অন্ধকার তাকে গিলে খায়। তোমার ঝিকমিক চোখ এইমাত্র কথাটা আমাকে বুঝিয়ে হাওয়ায় চুলের গন্ধ রেখে চলে গেল। প্রাণহীন ভোমরার মতো এই দুপুর, এই বিকেল অবধি আয়ুষ্মান দুপুর আমাকে ঘিরে গুমোট হয়ে আছে। তার নাভিদেশ আকাশের একটা অংশ ছুঁয়ে আছে। খসে পড়া কাপড়ের ব্যাপ্তি দিয়ে দুপুরের আদিষ্ট যৌবন দেখা যায়

আমি ততকালই ভাবি বা বলা যায় অপেক্ষা করি, যতবার তোমার মুহূর্তের উঠে যাওয়া ঘটে। যেখানে বসেছিলে, সেখানে গোল অবতল চাঁদের মতো দাগ। ভাসমান নক্ষত্রের গুঁড়ো। সহাস্য যোনির কিছু চিলরেখা। স্ফটিকের মতো একটি জলের গ্লাসে আমার আধখানা ডুবে থাকা জাহাজ

নিজের সীমানায় গিয়ে দাঁড়ালে ওপারের সীমানাকে রঙিন কৌচের মতো লাগে। শাণিত স্তনের পাশে কত দীর্ঘ ফুলের গুচ্ছ দাঁড়ানো। সোনালি জালের মতো এক সুরেলা নদীর পাশে দেহকোষ দেওয়া— নেওয়া হয় , স্পটলাইটের মতো গ্রীবার আকাশ থেকে আলোর টুকরো পড়ে ঝোপ জ্বলে ওঠে

এ ঠিক কতটা অন্ধকার, আমি বুকে চিবুক নামিয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *