অরিত্র চ্যাটার্জি’র কবিতা

ডাইরি ৪৯

আমি ভেবে ছিলাম একটা ছিমছাম কবিতা লিখব
নারকেল পাতার ওপর যেমন নিপুণভাবে কেটেকুটে যায়
বিকেলের ফালি রোদ, অনেকটা সেরকম
হাতের নীলশিরা নিয়ে আজকাল খুব বেশি সচেতন কি আমি?
ছাদের আলসের ধার থেকে ঝুঁকে পড়ে আমি দেখি
পঁয়ত্রিশ ফুট স্মৃতির গভীরে তুমি প্রোথিত হয়ে আছ
এবং গতকালের প্রিয় কবিতাটি আজ নিতান্ত অসহ্য মনে
হচ্ছে… একটি তক্ষক পিতামহের কুলুঙ্গি থেকে সম্মতি জানায়
আমাদের বিগত যাপনচিত্র ওইখানে এঁকে রাখা আছে অনভ্যস্ত
হাতের রেখায়, তেল ও ঘামের গন্ধ দেয়ালে শ্যাওলার মতো
যে মেয়েটি তার খাতায় আমায় ‘প্রিয় মধুবন’ লিখেছিল
তার কথা ভেবে আমি চিঠিতে লিখব ভাবি ‘আশা হারাইওনা’
এবং খেয়াল করি আমাদের পোস্টম্যানের পথ
কেবলই গত দশকের দিকে বেঁকে গিয়েছে
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে সেই দিক বরাবর পঁয়ত্রিশ ফুট
স্মৃতির গভীরে নিজের ছায়া হারিয়ে যেতে দেখেছি আমি

নিরুদ্দেশ সম্পর্কে ঘোষণা

নাও, এইবার গত শীতের তোমার যাবতীয় কাপড়চোপড় ছেড়ে ফেলে
নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাও, ফিরে তাকিও না আর যেখানে হাজার-হাজার
ফুট জল একটা অমোঘ সত্য বই কিছু নয়, পিছন থেকে ভেসে আসছে অস্পষ্ট
ধ্বনি, তুমি পাশ না ফিরেই দেখছ তোমার ছায়া হারিয়ে গেছে নদীতীরে
তোমার ছায়া হারিয়ে গেছে হাজার-হাজার ফুট জলে, গত শীতের সমস্ত
কাপড়চোপড় বুকের কাছে জড়ো করে বিসর্জন দেবে বলে হেঁটে নামছ
কয়েকটা শীতের বেড়াল আজও বারান্দায় খেলছে তোমাকে ছাড়াই
প্রিয় নারীদের হাবুডুবু নিয়ে এত ভাব, নিজস্ব সাঁতার মনে আছে কি ছেলে

তারপর তুমি আজও সন্তর্পণে তার কাগজ আগলে রেখেছ
কাঠের টেবিল, অসমাপ্ত লেখাঝোঁকা, পড়ে-থাকা চশমার খাপ
যে মানুষ হারিয়ে গিয়েছে, সে অতর্কিতে ফিরে আসবে বলে
স্তূপাকার বই, চ্যাপ্টা পৃথিবী সদৃশ হলদে কাঠের টেবিল
গ্রীষ্মের দুপুরে কয়েকটা পিঁপড়ে তার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ মাপছে আজও
ওই বাঁধানো বইটি সেকেন্ডহ্যান্ড, দরাদরি করে ফুটপাথ থেকে কেনা
বাড়ি ফিরে ভিতরে পাওয়া গেল ১৯৮২-র ফ্যাকাশে প্রেমিকের কবিতা
যে মানুষ হারিয়ে গিয়েছে, রেখে দিয়ে ফেলে-যাওয়া চিঠি
জেনো তার ভেসে যেতে ভালো লাগে, ইতস্তত বন্দরে
সানুদেশ থেকে ফিরতিপথে সে তবু হেঁটেছে অনেকদূর
অজানা কিশোরীর সাথে, ধরা যাক তার নাম ওফেলিয়া
অর্ধেক শতাব্দী পর শিথিল বুকে সে আজ তার গল্প বলছে নাতনিদের
যে মানুষের ভেসে-যাওয়া স্বভাব, তুমি তার পুরাতন কাগজ আগলে রয়েছ
কাঠের টেবিল, পড়ে-থাকা চশমার খাপ, ব্যক্তিগত বাচনভঙ্গি… আর কতদিন?

আল বেয়ে চলে যাচ্ছ, এইসব অদ্ভুত প্রতিসম বিন্যাস
যেন অনায়াসে অতিক্রম করো, দু-পাশের ঘাসগুল্ম, পড়ে-থাকা মাঠ
আল বেয়ে চলে যাচ্ছ, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, পরিত্যক্ত সৈকতে
সেইখানে অধুনালুপ্ত বন্দর, বালি চাপা মাস্তুল, কাঁটাগাছ
ঝুঁকে পড়ে দেখা যায় নোনাধরা চ্যাপ্টা পাথরের গা’য়
আবছা খোদাই, ‘আলভারো গঞ্জালেজ, খ্রী:১৬৭৫ – ১৭১৫’
চন্দ্রাহত নাবিক, ফুটকয়েক বালির নীচ থেকে শোনা যায়
অস্পষ্টকান্না, এই পরদেশে কোনও নারী স্বেচ্ছায় হয়নিকো তার
রাখেনিকো ফুল, তার গল্প বলেনি কেউ অন্তঃপুরে, শীতের রাত্তিরে
যে মানুষ শাঁখের ভেতর কান পেতে শুনেছে সমুদ্রের ডাক
স্বপ্নদোষে জলের নারীর কাছে হারিয়েছে তার কম্পাস
আল বেয়ে আজ গ্রাম ছেড়ে সমুদ্র সন্ধানে চলেছ, ওগো, সে নাবিকের
সমাধি খুঁজে পেলে এইসব নদী নালার মেয়েদের গল্প বোলো তাকে

এখন আমার নতুন কোন দুঃখ নেই

পিয়ামনভাবে, জনৈক মেয়ে আমায় পড়তে দিয়েছিল
এইসব আবছা মনেপড়ে, ভাবি তাকে চিঠি-লেখা প্রয়োজন
আংশিক ডিমেনশিয়া; টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে এগোই
মাথার পিছনে এমতাবস্থায় কারা সশব্দে শাটার নামিয়ে দেয়
পোকামাকড়দের অধিক জীবনচিন্তা করা বাতুলতা, বালিশে
হেলান দিই, কয়েকটি ক্লিন্ন পিঁপড়ে যারা সারিবদ্ধভাবে হাঁটছিল
চেনা জল ও মাটির গন্ধে থেমে দাঁড়ায়, নতুন বসতি স্থাপন করে
যেমন করেছিল ইস্ফাহানে, জেরুসালেম থেকে নির্বাসিত নিওলিথ মানুষ
তাদের হাড় ও অবশিষ্ট ছাইয়ের গাদায় আমি দেখি পরিচিত ঠিকানা জমে আছে
এখান থেকেই আবার শুরু করা যাক, সেই মৃতাবশেষ ও আদি দেবতাদল
মাথার ভিতর ফিসফিস করে বলে, টুপভুজঙ্গ আমি নির্দ্বিধায় ঘাড় হেলাই
সর্বান্তকরণে সায় দিয়ে বলি, নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই

নাও, এইবার পানপাত্রে নীল মদিরা ঢালো, প্রবল তরলোচ্ছ্বাসে হাবুডুবু খাক
প্রাচীন মহাদেশ, আঁকুপাঁকু মানুষের খাবিখাওয়ার শব্দ চুঁয়ে চুঁয়ে পড়ুক
মস্তিষ্কের শিরা বরাবর, তোমার এই গতিপ্রকৃতি বিশেষ পরিচিত, ঘুঘু
নেশাখোর, পুরাতন অভিজ্ঞতা অনুসারে এই তরলের নীচে অঞ্জলি পেতেছ
পরম চপলমতি, একই সাথে আদিদেবতা ও লুসিফারের কাছে ভেট পাঠাও
ঠোঁটে মাংসের স্বাদ নিয়ে যোনি-গহ্বর থেকে লুকোনো ধনরত্ন চেঁছে তুলবে
একদিন ভাব, পুনর্মূষিক ভব, ইওহিপ্পাস, অশ্মীভূত সুপ্রাচীন অশ্বতর তুমি,
সেইসব ইওসিন জ্যোৎস্নার রুপোলী ঘাসের ওপর রতিক্রীড়া, মুহুর্মুহু ক্ষুরধ্বনি
ফিরে পাবে বলে যেন চিরন্তন বালিঘড়ির ওলটানোর প্রতি অপলক চেয়ে রয়েছ
এইবার আমায় তুলে ধর, আমার গালে চেপে ধরে রাখ গত জন্মের প্রজাপতি
আমার বরাদ্দ এই নির্দিষ্ট স্থানাঙ্ক থেকে মরা শেকড়বাকড় সরিয়ে আমি দেখি
এই আসন্ন সন্ধ্যায় কেমন পরিচিত যুবতীরা লঘু পায়ে দূর থেকে দুরতর চলে যায়
তাদের সমবেত খিলখিল কোন দুষ্প্রাপ্য শব্দের মত কানে ভেসে আসে

ওরা কি আর চিঠি লিখবে না ?

তোমার, তোমাদিগের সকল মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হউক

Spread the love
By Editor Editor কবিতা 3 Comments

3 Comments

  • অতি পিওর কবিতা। অনেক দিন পরে এরকম ভেজালহীন কবিতা পড়লাম। কবিকে অভিনন্দন।

    Arnab Roy,
    • অনেক ধন্যবাদ

      Aritra Chatterjee,
  • এ কবিতা বেঁচে থাকবে চিরকাল। এ কবিতা অমর অক্ষয় হোক।

    শীর্ষা,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *