Categories
কবিতা

অরূপ চক্রবর্তীর প্রবন্ধ

বেজে ওঠে পঞ্চমে স্বর

আজ থেকে ঠিক ৮০ বছর আগেই আমাদের এই প্রিয় শহর, প্রাণের শহর, গানের শহরে জন্মেছিলেন এক কিংবদন্তি মানুষ শরীরে যাঁর ছিল রাজবংশের নীল রক্তের ধারা, হৃদয় ও মস্তিষ্কে যাঁর ছিল মাটির গন্ধ মাখা সেই মেঠো সুরের সুপ্ত বীজ। সেই কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বটি হলেন সারা ভারতবাসীর একান্ত ভালোবাসার ও শ্রদ্ধার মানুষ, রাহুল দেব বর্মন। আপামর ভারতবাসীর একান্তই “পঞ্চম দা”, যাঁর সুরের যাদু দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মহলে খ্যাতি অর্জন করতে সমর্থ হয়েছিল।

প্রখ্যাত সুরকার ও গায়ক কুমার শচীন দেব বর্মন ও গীতিকার শ্রীমতি মীরা দেব বর্মনের একমাত্র সন্তান রাহুল ১৯৩৯ সালের ২৬শে জুন পৃথিবীর আলো দেখেন। শৈশবে তাঁর মাতামহের দেওয়া ‘টুবলু’ নামেই তিনি বাড়ির সকলের কাছে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু জন্মসূত্রে যাঁর ধমনী ও হৃদয়ে সুরের স্রোত বইছে কানে ভেসে আসছে নানান রস ভাব ছন্দের গানের ধ্বনি, সে কেন নিজেকে টুবলু নামে আবদ্ধ রাখবে? তাই শিশুর কান্নার আওয়াজ ছিল সুরেলা। জানা যায় শিশু টুবলুর কান্নার সুর ছিল পঞ্চমে বাঁধা (জি শার্পের)। এই কান্নার আওয়াজের সূত্র ধরেই তিনি সকলের প্রিয় পঞ্চম হয়ে ওঠেন।

কলকাতায় শৈশব কাটানোর কারণে তাঁর প্রথাগত শিক্ষা শুরু বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে ও পরবর্তীতে তীর্থপতি ইনস্টিটিউশনে। এর পরে বাবার সাথে তিনিও মুম্বাই পাড়ি দেন। সংগীতে প্রথাগত তালিম নেন উস্তাদ আলী আকবর খানের কাছে (সরোদ) ও তবলা শিখেছিলেন পণ্ডিত সামতা প্রসাদজীর কাছে।

এই সময় থেকেই তিনি বাবার সৃষ্টির সাথে নিজেকে ধীরে ধীরে জড়াতে শুরু করেন। খুব অল্প বয়সে তিনি কিছু সুর করেন পরবর্তীতে যা শচীন দেব বর্মন ফানটুস (১৯৫৬) ও প্যাসা (১৯৫৭) ছবিতে ব্যবহার করেন। শচীন দেব বর্মনের সহযোগী হয়ে উনি চলতি কা নাম গাড়ি (১৯৫৮), কাগজ কে ফুল (১৯৫৯), তেরে ঘর কে সামনে (১৯৬৩), বন্দিনী (১৯৬৩), জিদ্দি (১৯৬৪) ও গাইড (১৯৬৫) ইত্যাদি ছায়াছবির সাথে জড়িত ছিলেন এবং গানের প্রয়োজনে হারমনিকা বাজানোর কাজও করেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া বিখ্যাত গানে “হ্যায় আপনা দিল তো আওআরা” (ফিল্ম: সোলভা সাল) রাহুলের বাজানো মাউথ অর্গান একটা আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছিল।

এককভাবে প্রথম সুরারোপ করেন জনপ্রিয় হিন্দি ছায়াছবির কমেডি চরিত্রাভিনেতা মেহমুদ পরিচালিত “ছোটে নবাব” (১৯৬১) ছবিতে। কিন্তু সাফল্য আসে নাসির হুসেন পরিচালিত “তিসরি মঞ্জিল” (১৯৬৬) ছবি থেকে। সেই সময়ে এই ছবির দুটো গান (‘আ যা আ যা ম্যায় হু প্যার তেরা’; ‘ও মেরি সোনা রে সোনা রে’) লোকের মুখে মুখে ফিরেছিল। এরপর একে একে “বাহারোঁ কা সপনে’, “প‍্যার কা মৌসম” প্রভৃতি ছবির গান পায়ের নীচের মাটি আরও শক্ত করে দেয়। ইতিমধ্যে বাবাকে “জুয়েল থিফ”, “আরাধনা” ও “প্রেম পূজারী” ছবির কাজে সহায়তা করেন।

এরপরেই এল সেই সোনালি অধ্যায়। আর ডি বর্মন ও রাজেশ খান্না জুটির সঙ্গম যার সূচনা “কাটি পতঙ্গ” ছায়াছবি দিয়ে। এই জুটির ৩২টা ছায়াছবির গান কম-বেশি সুপারহিট হয়েছিল। সেই বছরেই মুক্তিপ্রাপ্ত “ক্যারাভান” ছবিতে ‘পিয়া তু অব তো আ যা’ গানে আশা ভোঁসলে ও আর. ডি জুটির সাথে হেলেনের ক্যাবারে নাচ জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছায়। ১৯৭১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত দু-টি ভিন্ন ধারার ছবির গান রাহুল দেব বর্মনের সাংগীতিক প্রতিভাকে আরও বিকশিত করে তোলে। অমর প্রেম ছবিতে কিশোর কুমারের কণ্ঠে ‘কুছ তো লোগ কহেঙ্গে’ ও লতাজির গাওয়া রাগাশ্রিত গান ‘র‍্যায়না বিতি যায়ে’ যেমন সমঝদার শ্রোতার তারিফ আদায় করেছিল তেমনই বিপরীত ধারার ‘হরে রামা হরে কৃষ্ণা’ ছবির পাশ্চাত্য রক কালচারের গান তরুণ প্রজন্মের মধ্যে একটা উন্মাদনা সৃষ্টি করেছিল।

একে একে “সীতা আউর গীতা”, “রামপুর কা লক্সন”, “মেরে জীবন সাথী”, “বোম্বে টু গোয়া”, “আপনা দেশ”, “পরিচয়”, “ইয়াদোঁ কি বারাত”, “আপ কী কসম”, “খুশবু”, “শোলে”, “কিনারা”, “আঁধি”, “ঘর”, “গোলমাল”, “খুবসুরত”, “বেমিশাল”, “সনম তেরি কসম”, “রকি”, “লাভ স্টোরি”, “মঞ্জিল”, “অনামিকা” ইত্যাদি ছবির গানে সারা দেশ মাতোয়ারা। অনামিকা ছবিতে আশাজির গাওয়া সেই বিখ্যাত গান “আজ কী রাত” সাথে হেলেনের মাদকতাময় ক্যাবারে আবারও নতুন করে দর্শকের মনে হিল্লোল তুলেছিল। সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্যায়নে জালাল আগা ও হেলেনের শোলে ছবির নাচ ও আর. ডির নিজের কণ্ঠে গাওয়া “মেহবুবা মেহবুবা” আবার নতুন করে দর্শকদের মাতিয়ে তুলেছিল।

ইতিমধ্যে শচীন দেব বর্মন সেরিব্রাল এ্যটাকে পঙ্গু হয়ে পড়েন ও কোমাতে চলে যান। তখন রাহুল বাবার “মিলি” (১৯৭৫) ছবির অসমাপ্ত কাজ শেষ করেন।
১৯৭৭ সালে “হাম কিসিসে কম নেহি” ছবিতে রাহুলের সুরে ‘ক‍্যা হুয়া তেরা ওয়াদা’ গানের জন্য মহঃ রফি জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হন।

গায়ক অভিজিৎকে তিনি মেজর ব্রেক দেন “আনন্দ আউর আনন্দ” (১৯৮৪) ছবিতে। হরিহরনজি “বক্সার” (১৯৮৪) ছবিতে, মহঃ আজিজ “শিবা কে ইনসাফ” (১৯৮৫) ও অনুপ ঘোষাল “মাসুম”(১৯৮৫) ছবিতে গান গেয়ে সর্বভারতীয় শ্রোতাদের সাথে পরিচিত হন।

রাহুল দেব বর্মনের সুরে “ইজাজত” ছবির ‘মেরা কুছ সামান’ গানের সূত্রে আশা ভোঁসলে ও শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসাবে গুলজার ভূষিত হন।

বাংলা গানের শ্রোতা রাহুল দেব বর্মনের সুরে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় প্ৰথম গানটি শুনতে পান লতা মঙ্গেশকারের কণ্ঠে ‘আমার মালতীলতা ওগো কী আবেশে দোলে’ (১৯৬৫)। এরপরে ১৯৬৯ সাল থেকে কিশোর কুমার, আশা ভোঁসলে ওঁর সুরে প্রতি বছর পুজোর সময় বাংলা আধুনিক গান গেয়েছেন। উনি নিজের গাওয়া দু-টি গান নিয়ে ১৯৬৯ সালে শ্রোতাদের সামনে এলেন। গান দু-টি হল ‘ফিরে এসো অনুরাধা’ ও ‘মনে পড়ে রুবি রায়’। সময়ের নিরিখে দুটো গানই অনেক এগিয়ে থাকায় ততটা সমাদর পায়নি। এই গানের গীতিকার ছিলেন রাহুলের প্রিয় বন্ধু ও চিত্রনাট্যকার শচীন ভৌমিক। ‘মনে পড়ে রুবি রায়’ গানটা নিয়ে একটা ঘটনা শচীন ভৌমিক বলেছিলেন।

রাহুল ও শচীন দুই অন্তরঙ্গ বন্ধু রোজ যখন আড্ডা দিতেন তখন এক মহিলা ছাতা মাথায় দিয়ে অফিসের বাস ধরার জন্য বেস্ট (Bombay electric suppy & transport)-এর স্ট্যান্ডে অপেক্ষা করতেন। মহিলার নাম ছিল ছবি রায়। বেশ কিছুদিন এমন চলার পর মহিলাটিকে আর দেখা যেত না। পরে জানতে পারেন যে, ওনার অন্যত্র বিয়ে হয়ে গেছে। এই ঘটনাটি এই গান রচনার উৎস।এছাড়াও আর. ডি অনেক বাংলা ছায়াছবিতে সুর করেছিলেন। “রাজকুমারী” থেকে শুরু, তারপর “ত্রয়ী”, “অন্যায় অবিচার”, “একান্ত আপন”, “আপন আমার আপন” ইত্যাদি অনেক ছবিতে তাঁর সুর সৃষ্টি অমর হয়ে আছে, থাকবে।

বিদেশি গানের সুর থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি বেশ কয়েকটা হিন্দি ছবির গান সুর করেন। যেমন— ‘মিল গ্যয়া হাম কো সাথী’, ‘আও ট‍্যুইস্ট করে’, ‘মেহবুবা মেহবুবা’, ‘দিলবর মেরে কবতক মুঝে’ ইত্যাদি।

সাউন্ড প্রোডাকশনের জন্য তিনি এমন কিছু জিনিস করেছেন যা আমাদের বিস্মিত করে। শিরীষ কাগজ ঘষে, বাঁশের টুকরো ঠুকে, বিয়ার বোতল বা কাপ ডিশ দিয়ে। পড়োশান ছবিতে ‘মেরে সামনেওয়ালে খিড়কি মে’ গানটিতে rough surface-এ চিরুনি ঘষে এক অনবদ্য শব্দতরঙ্গ সৃষ্টি করেছিলেন।

এত কিছুর পরেও তাঁর সংগীত জীবনে দুর্দিন এসেছিল। ১৯৮০ সনের পর থেকে র জনপ্রিয়তায় ভাঁটার টান আসতে শুরু করে। পর পর ছবি ফ্লপ হওয়ায় ও গান জনপ্রিয় না হবার দরুন কাজের সংখ্যা কমতে থাকে এবং উনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। যার ফলে হৃদয়ঘটিত অসুস্থতা এবং ১৯৮৮-তে বাইপাস সার্জারি হয়। কিছুদিন পরে কাজ শুরু করলেও গান আর সেই আগের মতো হিট করছিল না। ওঁর শেষ কাজ ১৯৪২-এ “লাভ স্টোরি”। কুমার শানুর সেই প্রথম আর. ডি. বর্মনের সাথে কাজ করার সুযোগ আসে। ছবিটি সুপার ডুপার হিট হয় এবং এই ছবির গান জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ওঠে। কিন্তু এই সাফল্য উনি দেখে যেতে পারেননি। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার আগেই ৪ঠা জানুয়ারি ১৯৯৪ উনি সুরলোকে চলে যান। পিছনে ফেলে যান তাঁর অজস্র সৃষ্টি যা তাঁকে আজও শ্রোতার হৃদয়ে অমর করে রেখেছে।

এই ছবির গানের সুবাদে তিনি ফিল্ম ফেয়ার award পেয়েছিলেন। কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে এই অসামান্য সংগীত ব্যক্তিত্ব কোনো চলচ্চিত্রের জাতীয় পুরস্কার বা পদ্মশ্রী ইত্যাদি কোনো উপাধিতে ভূষিত হননি। অবশ্য জীবনের সেরা পুরস্কার হল নিজের সৃষ্টি ও মানুষের ভালোবাসা যা তিনি পেয়েছেন এবং আজও পেয়ে চলেছেন।

4 replies on “অরূপ চক্রবর্তীর প্রবন্ধ”

খুব সুন্দর হয়েছে লেখা,অনেক নতুন কিছু জানতে পারলাম।

কতকিছু যে জানতে পারলাম.. ❤️ ভালোবাসা প্রণাম অরূপ দা..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *