Categories
অনুবাদ কবিতা

আদুনিসের কবিতা

ভাষান্তর: শানু চৌধুরী

কবি পরিচিতি

আলী আহমেদ সঈদ এজবার। ছদ্মনাম আদুনিস বা এডোনিস নামেই বহুল পরিচিত তিনি। একজন সিরিয়ান কবি, গদ্যকার ও অনুবাদক। ১৯৩০ সালের ১লা জানুয়ারি পশ্চিম সিরিয়ার আল-কাসাবিন নামের একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বিংশ শতাব্দীর বা আধুনিক যুগের আরবি কবিদের মধ্যে অন্যতম প্রভাবশালী কবি হলেন তিনি। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজগুলো হল— ‘The Song of Mihyar Damascus’, ‘The static and the dynamic’। তাঁর কবিতার ভাষা ও নির্মাণের সাথে কবিতার শিকড়ে জড়িয়ে রয়েছে সমসাময়িক সমাজের প্রভাব ও অবস্থার খতিয়ানের এক আশ্চর্য চেহারা। এই দশটি কবিতার অনুবাদ তাঁর ‘The song of Mihyar Damascus’ বইটি থেকে করা হয়েছে।

আমাদের মাঝে শব্দ নেই
[No Words Between Us]

সমস্ত বালি কি সরে যাবে, আমাদের চোখেরপাতা থেকে?
জলের স্রোত কি ধুয়ে দিতে পারে, শস্যের শীষ?
ওহ্! ভঙ্গুর ও পুড়ে যাওয়া বীজ;
আমাদের মাঝে কোনো শব্দ নেই।
নেই প্রতিধ্বনি!

একটি সেতু ক্ষয়ে যাচ্ছে দ্যাখো
রাস্তার শুরুতে।

তোমার কোনো পছন্দ নেই
[You Have No Choice]

কী? তুমি পৃথিবীর মুখ ধ্বংস করলে!
এবং খোদাই করলে নতুন মুখ
তারপর তোমার কোনো পছন্দ ছিল না
কিন্তু, আগুনের পথ
আর নরকের অবহেলা থেকে শিখলে
পৃথিবী কখনোই গিলোটিন আর ঈশ্বরের তুলনায় বড়ো নয়।

আজ আমার ভাষা আছে
[Today I have my language]

আমি আমার রাজত্বকে ধ্বংস করেছি,
ধ্বংস করেছি আমার সিংহাসন,
দরবার ও নির্মিত স্তম্ভগুলোকে
এবং জন্ম দিয়েছি আবার… নিজস্ব ফুসফুসে

আমি ঘুরছি এক লক্ষ্যে
সমুদ্রকে শেখাচ্ছি আমার বৃষ্টি,
মঞ্জুর করেছি তাদের
নিজস্ব আগুন ও ধূপের দহনকালে
এবং লিখেছি সময় আসবে, আমার ঠোঁটে।

আজ আমার ভাষা আছে,
সীমানা আছে, আছে অমোচনীয় দাগ ও কাছের মানুষ
যারা আমাকে প্রতিপালন করেছে অনিশ্চয়তায়
এবং খুঁজে পেয়েছে আলো
আমার ধ্বংসে ও ডানায়।

লন্ঠন
[The Lantern]

রৌদ্রের ভিতর
বয়ে নিয়ে যাচ্ছে সে, তার লণ্ঠন।
একজন মানুষের মনকে খুঁজতে।

তার চোখে বালির প্রলেপ নেই
এক ধুলোর চটি পায়ে হাঁটছে সে।

ছোট্ট পিপের ভিতর হাঁটছে সে আর
তার হাত লেপের মতো জড়িয়ে সাহায্য করছে তাকে
— এবং, তুমি কী?
— আমার চোখ নেই

আমার ও আত্মীয়ের মাঝে বিবাদ বাড়ছে
আমার ও অন্যান্য লোকের মাঝে বন্যা বইছে গর্জনের

যখন রাত ঘুমন্ত অবস্থায় থাকবে
আমি চুরি করবো রক্ত-পিপাসু কসাইকে সঙ্গে নিয়ে,

আমি হাঁটছি—
আমার পিছনে ধুলো হেঁটে আসছে
কিন্তু আমি কোনো লণ্ঠন বহন করছি না।

পাথর
[The Rock]

আমি সন্তুষ্ট তোমার ইচ্ছেকে নিয়ে:
আমার সংগীত আমার রুটি
এবং আমার শব্দই হল আমার রাজত্ব
ওহ্, পাথর! আমার পা ভারী হয়ে আসছে
ভালোবাসাকে ভোরের মতো আমার কাঁধে বইছি আমি
এবং আমার মুখের দিকে দৃষ্টি হিসেবে আঁকছি তোমায়

একটি দৃশ্য
[A Scene]

বিদ্যুৎ

পাথরকে বলছে
আকাশকে পরীক্ষায় রেখো
পরীক্ষায় রেখো সমস্ত কিছুকেই।
বিদ্যুৎ
স্নান করছে আমার চোখে
এবং একেকটা দিন
আমার হাতে এসে পড়ছে
পুষ্ট ফলের মতন

একটি পাথর
[A Stone]

আমি উপাসনা করেছি সেই শান্ত পাথরের
যার মুখাবয়বে দেখেছি আমার মুখ
এবং আমার হারিয়ে যাওয়া কবিতা

এক ঈশ্বর যে-যন্ত্রণা ভালোবাসে

[A God who loves his suffering]

আমার পায়ের ছাপ বিচ্ছিন্ন হয়েছে ঈশ্বরের কাছে
আমি, সেই বিখ্যাত অভিশপ্ত কবি
নৈবেদ্য গুনেছি মৃতের দেহে
এবং সামিল হয়েছি আহত নেকড়ের প্রার্থনায়

কবরগুলো খুলে যাচ্ছে আমার শব্দের ভিতরে
এবং জড়িয়ে ধরছে আমার ব্যক্তিগত গান
এক ঈশ্বরের সাথে
যে আমাদের ওপর থেকে তুলে নিয়েছে সমস্ত পাথর;
একজন ঈশ্বর; যে ভালোবাসে তাঁর যন্ত্রণা
এবং আশীর্বাদ ছড়িয়ে দ্যায় নরকে;

একজন ঈশ্বর, যে প্রার্থনা করে আমার প্রার্থনায়,
এবং ফিরে আসে আমার জীবনের মুখে
হারিয়ে ফেলে সমস্ত সরলতা।

কথোপকথন
[Dialogue]

তুমি কে? কাকে বেছে নিয়েছ তুমি, ও বিখ্যাত কবি?
তুমি যেখানেই যাও, দেখতে পাবে ঈশ্বর ও শয়তানের রসাতল

এক নরক আসে, আরেক নরক চলে যায়
এবং পৃথিবী পড়ে থাকে পছন্দে।

আমি না বেছেছি ঈশ্বরকে না শয়তানকে
প্রত্যেকটাই একেকটা প্রাচীর
প্রত্যেকেই ঢেকে দেয় চোখ

কেন বেছে নেব একের পর এক প্রাচীর।
যখন আমার বিহ্বলতা আলো দেয়
সব জানবার বিহ্বল রেখায়?

একমাত্র পৃথিবী
[The Only Earth]

আমি আমার অবাক হওয়া শব্দের ভিতর রয়েছি,
যেখানে আমার মুখ আমার সঙ্গী,
এবং মুখাবয়ব আমার একমাত্র পথ

তোমার নামেই, ওহ্, আমার সীমানা
দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে কেবল
মুগ্ধতা ও একাকিত্বে;
তোমার নাম, মৃত্যু,
আমার বন্ধু।

আগুন গাছ
[A Tree of Fire]

একটি পাতার পরিবার বসে আছে বসন্তের কাছে,
আহত চোখের জলের জমিতে
এবং জলের কাছে শিখছে আগুনে বইয়ের অক্ষরজ্ঞান।

আমার পরিবার আমার অপেক্ষা করেনি
তারা চলে গেছে
না আছে আগুন, না তাদের চিহ্ন।

13 replies on “আদুনিসের কবিতা”

অসামান্য সব কবিতা, আর অনুবাদ হয়েছে
একেবারে স্বচ্ছ।
আমি কৃতজ্ঞ অনুবাদক ও প্রকাশকের কাছে।

খুব ভালো অনুবাদ। এবং কবিতাগুলো গভীর ও অন্তর্ভেদী… শানুকে ধন্যবাদ

এই কাজগুলো ইতিহাস হয়ে থেকে যাবে শানুদা।

ওফফ!!!! কি পড়লাম এসব এতোদিন কিচ্ছু লিখিনি মনে হচ্ছে যা লিখেছি সব ছিঁড়ে ফেলি মুছে ফেলি দশটা নয় যেন একটাই কবিতা পড়ছি এ কবিতার থেকে পালিয়ে যাওয়া যায়না নিজেকে লুকানো যায়না বরং নিজে ব্যাপারটাই পালিয়ে পালিয়ে বেরাচ্ছে এবং চরম অনুবাদও বটে

শানু, তোমার অসাধারণ অনুবাদের গুণে পড়তে পারলাম এইসব আশ্চর্য কবিতা। মন ভরে গেল। অনেক অনেক ধন্যবাদ তোমায়।

ভালো লাগল ভাই, অধিকাংশগুলোই। তোমার অনুবাদেও, তোমার কবিতাচিহ্নগুলো রয়েছে। মূল না পড়লে, বোঝা যাবে না, এই চিহ্ন সহায়ক হয়েছে, না বিরুদ্ধে গেছে। তবে পড়তে ও রসগ্রহণে অসুবিধা হয়নি, দু-তিনটে ছাড়া।

অসম্ভব ভালো লাগার মুহূর্ত গুলো পেলাম ।
অসাধারণ অনুবাদ।
আসলে
অনুবাদ পড়েই সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই কেন, জানিনা ।

প্রতিটা কবিতাই খুব ভালো লাগলো।অন্যরকম জার্নির এক্সপেরিয়েন্স।খুব ভালো ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ

খুব ভালো লাগলো শানু দা। অনুবাদ করা অনেকের কবিতা পড়েছি। সেভাবে টানেনা। তোমার কবিতা নির্বাচন এবং অনুবাদ দুটোই খুব পছন্দ হলো। আরোও পড়তে চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *