Categories
উৎসব সংখ্যা ২০১৯ কবিতা

ইশরাত তানিয়ার গল্প

একটি শব্দের পোস্ট রিয়েলিটি

চিত্র: রেনে মাগরিত

দক্ষিণের জানলার দুটো পাল্লা হাট করে খোলা। ঘটনাটা তেমন কিছু না— তবে কি, আবহাওয়ার মন বুঝে জানলাটার বন্ধ থাকারই কথা। হয়তো ঘরে কেউ ঢুকেছিল। স্যাঁতস্যাঁতে গুমোট কাটাতেই ওই মেলে দেয়া। কী একটা ঝুমুর ঝুমুর শব্দ সেখানে খেলে যায়। অস্পষ্ট। কয়েকটা দ্রুত আর ছোটো নিঃশ্বাসই যেন পড়ল কারো। তৃপ্তির না অতৃপ্তির বোঝা যায় না।
জানলার বাইরে মধ্য অগাস্টের আকাশটা ধূসর মেঘে ছাওয়া। আলোটা হয়েও যেন হচ্ছে না। ধোঁয়াসা বৃষ্টি বেয়ে এমন আলো নেমে এলে, বেলা ঠিকঠাক বোঝা যায় না। বিশাল আকাশের নীচে জলমগ্ন পথঘাট। সেখানে স্থির পানিতে মেঘের ছায়া ঘনিয়ে এসেছে। সময়টাকে হয়তো মধ্যাহ্ন বলা যায়।
তুমুল বৃষ্টি হয়ে গেছে কয়েক ঘণ্টা আগে। এই বৃষ্টি ভূমি স্পর্শ করে দেদার কাদা ছড়িয়ে দিয়েছে তিনতলা বাড়ির পোর্চে। পায়ে পায়ে কাদা উঠে এসেছে একতলার বারান্দায়। সেদিকে তাকিয়ে ভুরু দুটো কুঁচকে যায় গোলাপির। শরীরের ম্যাজম্যাজে ব্যথা নিয়ে একটু আগেই বারান্দাটা ধুয়েছে সে। আবার মুছতে হবে। সে কথা ভেবেই কোমরে দু’হাত ঠেকিয়ে একটু জিরিয়ে নেয়। কিছুক্ষণ আগে একতলার দু’টি ঘরে নতুন বোর্ডার এসেছে। কাদার কীর্তি যে এদেরই জুতোনিঃসৃত সে আর বুঝতে বাকি নেই গোলাপির।
গেস্ট হাউজে মাছ তরকারি কুটাবাছা আর ঘর ঝাড়ামোছার কাজ করে গোলাপি। ওর স্বামী রিকশা চালায়। আট বছরের ছেলেকে একটা এনজিও’র স্কুলে দিয়েছে। বাঁশবাড়ি বস্তির কাছেই। সেখানে একবেলা খাবার পায় ছেলে। হাঁপানির জন্য ওর স্বামী দিনের পর দিন কামাই দেয়। দু-চারদিন রিকশার চাকা যদিওবা ঘোরে, মহাজনের কাছে টাকা জমা দিয়ে যা থাকে, পুরো টাকাটাই মদ আর জুয়ায় ভেসে যায়। গোলাপি টাকা দিতে না পারলে চুলের মুঠি ধরে বেদম মার মারে।
তরকারি কাটার সময় প্রায়ই কলাটা মূলাটা হাপিশ করে দেয় গোলাপি। গরম মশলা এমনকী মসুরের ডাল পর্যন্ত পলিথিনে মুড়ে চালান করে দেয় ব্লাউজের ভেতর। শাড়ি না পরলে পানের বাক্সে। এটাকে সে চুরি মনে করে না। এই খাবারে তার হক আছে বলে বিশ্বাস করে। মিন্টু বাবুর্চি এসব ব্যাপারে উদার। দেখেও দেখে না। বিনিময়ে গোলাপি পান খাওয়ায়, হেসে হেসে গল্প করে। মিন্টু এই প্রশ্রয়ে গোলাপির সরু কোমরে হাত রেখে কাছে টেনে নেয়। পটলের মতো হাবাগোবাকে পাত্তা দেয় না গোলাপি। ওর সামনেই আজ গোলাপি এক টুকরা মাছ পানের বাক্সে রেখে দিল।
চোখের সামনে দিয়ে হাতি চলে গেলেও পটল খেয়াল করে না। করলেও কিছু বলে না। পটলের সামনেই একেকদিন বেপরোয়া হয়ে ওঠে মিন্টু। গোলাপির বরং মায়াই লাগে পটলের জন্য। প্রায় সমবয়সী হলেও মনে মাতৃভাব জাগে। এক আধ দিন মিন্টু চা খেতে দিলে সে পটলের জন্যও চেয়ে নেয়। এতেও পটলের চোখ খুশিতে ঝিকিয়ে ওঠে না। চা না খেলেও হয় এমন একটা ভাব চোখে ভাসে। কাপে ছোটো ছোটো চুমুক দিয়ে চা শেষ করে ফেলে।
পটল সকাল সকাল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাজার করে এনেছে। জায়গা মতো গুছিয়ে রেখেছে আলু, বেগুন, রুটি, নুডলস আর ডিম। চাইলে কেয়ারটেকার হারুনের চোখ এড়িয়ে দু-টাকা এদিক ওদিক করতে পারে পটল। কিন্তু করা দূর এসব চুরিচামারির কথা সে ভাবতেই পারে না। টাকার হিসেবে কোনোদিন গড়বড় হলে অস্থিরতা আর হতাশায় সে শার্টের বাঁ দিকটা তুলে দু-হাতে রোলের মতো পাকাতে পাকাতে বুক অব্দি তুলে ফেলে।
ন্যাকড়া বালতির পানিতে ডোবায় গোলাপি। ঘর মোছে। ওর ভরপুর বুকের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে মিন্টু বাবুর্চি। তারপর ম্যাগি নুডলস ভরা বাটি ট্রেতে তুলে দিয়ে পই পই করে পটলকে বুঝিয়ে দেয়।

মিন্টু বাবুর্চি এসব ব্যাপারে উদার। দেখেও দেখে না। বিনিময়ে গোলাপি পান খাওয়ায়, হেসে হেসে গল্প করে। মিন্টু এই প্রশ্রয়ে গোলাপির সরু কোমরে হাত রেখে কাছে টেনে নেয়।

—এই পটলা, ম্যাগি আর চা যাবে দোতলায় আর অমলেট একতলায়।
—আচ্ছা।
—উলটাপালটা করিস না।
দু-কাপ চা আর দু-বাটিতে রান্না করা নুডলস নিয়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটা দেয় পটল। ট্রেতে আরও দুটো প্লেটে সোনালি অমলেট।
মিক্সিতে আদা রসুন ঢালে মিন্টু। পেস্ট বানায়। গোলাপি বালতির স্বচ্ছ পানি ঢেলে দেয় বারান্দায়। পুরো বারান্দা মপ দিয়ে মুছে নেয়। মিক্সির ঘররর শব্দটা থেমে যেতেই গোলাপির কানে মৃদু অথচ সুরেলা শব্দটা ঢুকে যায়। একবারের জন্য হাত থমকে যায়। কতদিন আগের কাচের চুড়ির রিনঝিন মনে পড়ে। তখন স্বামীসোহাগী গোলাপির হাত জুড়ে বাহারী চুড়ির সমাদর।
—বউ রে, খিদায় প্যাট কামড়ায়।
সামান্য ভাত-সালুনের আয়োজনে বেজে ওঠে চুড়ি।
—গোলাপি রে, গতরে বিষ ব্যাদনা। রিকশা চালাইয়া শরীলে জুইত পাই না।
চুড়ি বেজে ওঠে স্বামীর শরীরে সরিষার তেলের ঘষায়।
সুখের দিনগুলোই যেন ঝনাৎ ঝনাৎ করে বাজত গোলাপির চলন-বলনে। এখন নেশা-পানির টাকা না দিলেই মার। শরীরে কালশিটের সঞ্চয় বাড়ে। চোখে অন্ধকার ঘনায়।
বারান্দা মোছা শেষ হয়। আনমনে মপ হাতে বসার ঘরে ঢোকে গোলাপি। মাথার ওপর বোঁ বোঁ করে ফ্যান ঘুরছে তবু ঘেমে উঠছে কালচে ধূসর সিমেন্টের মেঝে।

পটলের জীবনের সবই ঢিলেঢালা এমনকী এই ট্রে হাতে হেঁটে যাওয়াটাও। দোতলার সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় ওর মনে হয় অমলেট দুটো হয়তো একতলার নতুন বোর্ডারের। পর মুহূর্তেই অবশ্য এই চিন্তা বাতিল করে দেয়। একতলায় বোর্ডারদের মধ্যে ১ নাম্বার রুমে উঠেছে একজন মধ্য বয়স্ক পুরুষ। অফিসের কাজে শহরে এসেছে। ২ নম্বর ঘরে উঠেছে তিনজন যুবক। একজন আর তিনজনের এই হিসেবের সাথে অমলেটের দুটো প্লেট মেলে না।
দোতলায় আছে তিনটা ঘর। উত্তর দিকে ৩ নম্বর আর দক্ষিণ দিকে পড়েছে ৪ আর ৫ নম্বর ঘর। এক দম্পতি উঠেছে ৩ নম্বরে। ছোটো একটা মেয়ে আছে ওদের। ৪ নম্বরে আছেন দু’জন তরুণী বোর্ডার। ওরা ছবি তোলে।
শিল্পকলা একাডেমিতে তাদের আলোকচিত্র প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচিত হয়েছে। সেই প্রদর্শনী চলবে আরও তিনদিন। একদম দক্ষিণের ঘরটি ফাঁকা।
গেস্ট হাউজের তিন তলায় থাকে বাড়ির মালিক। আবদুল খালেক সাহেবের বয়স হবে ষাটের ধারে কাছে। স্ত্রী প্যারালাইজড। বছর পাঁচেক হল বিছানায়। দু-ছেলের একজন বিদেশে থাকে। আরেকজন গেস্ট হাউজের ব্যবসা দেখে। শখের ছবি আঁকিয়ে। খালেক সাহেব কুকুর পালেন। তাঁর দিন কাটে কুকুরের দেখভালের চিন্তায়। শুধু পোষা কুকুর নয়, প্রতিদিন দুপুরে এলাকার কুকুরগুলো বিশাল বাটিতে রেখে দেয়া ডালভাত খেয়ে যায়।
একতলা-দোতলার বোর্ডারদের সংখ্যা এবং দুটো অমলেটের সম্ভাব্য ভোক্তা কারা সেটা মেলাতে গিয়ে পটলের মাথার ভেতরটায় তালগোল পাকিয়ে যায়। হাতে ট্রে থাকায় শার্টের কোনা গোটাতে পারে না। মনের এমন একটা বেকায়দা অবস্থায় ওর পা দুটোর গতি আরো মন্থর হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত হিসাব নিকাশের ঝামেলায় না গিয়ে পটল ধরেই নেয়, অমলেট দুটো দু-জন নারীর জন্যই এমন সুবাস ছড়াচ্ছে। এমন একটি মীমাংসায় এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে পটল।
এহেন মা মরা, বাপ খ্যাদানো, ভাই তাড়ানো পটলের গতি করেছে কেয়ারটেকার হারুন। একই গ্রামের মানুষ ওরা। কোনো কাজই ঠিক মতো করতে পারে না পটল। হারুন তবু হাবাগোবা এই পটলকেই ঢাকায় নিয়ে এল।
সেবার খালপাড় ভেঙে মাটির রাস্তার কিছুটা ধসে গিয়েছিল। হারুনের রিকশা তাই মাঝপথে থেমে গেল। বাকি পথটুকু হেঁটেই বাড়ি ফিরতে হল। রাস্তার ধসে পড়া জায়গায় পরদিন মাটি ফেলছে হারুন। দু-তিনজন জোয়ান ছেলে জুটিয়ে নিয়েছে মাটি ভরাটের জন্য। নিজেও নেমে পড়েছে কোদাল হাতে। নরম পলি কোদালের এক এক কোপে আলগা হয়ে আসছে। টুকরিতে সেই মাটি ভরে রাস্তায় ফেলছে একজন। আরেকজন পায়ে মাড়িয়ে, কোদাল চেপে চেপে সেটা সমান করছে। এক সময় ক্লান্ত হয়ে হিজল গাছের নীচে বসে হারুন। হাঁটু পর্যন্ত লুঙ্গি তুলে সিগারেটের মুখে আগুন দেয়।

খালেক সাহেব কুকুর পালেন। তাঁর দিন কাটে কুকুরের দেখভালের চিন্তায়। শুধু পোষা কুকুর নয়, প্রতিদিন দুপুরে এলাকার কুকুরগুলো বিশাল বাটিতে রেখে দেয়া ডালভাত খেয়ে যায়।

আকাশটা ঝকঝকে, ফিনফিনে হাওয়ায় উত্তাপ নেই। খালপাড় ধরে হাঁটছিল পটল। একটা ছেলে ডাক দিলে, মাটি বোঝাই টুকরিটা মাথায় তুলে দিল। এসে বসল হারুনের পাশে। দুই হাঁটুর ওপর দুই কনুই রাখায় ওর হাত দুটো সামনে ছড়িয়ে যায়। ছেলেদের মাটি কাটা দেখে পটল। কিছু বলে না।
সিগারেটে টান দিয়ে হারুন বলে— ঢাকা যাবি রে পটলা?
—কাজ কাম কিছু জানি না।
—মোটে ফাইফরমায়েশ খাটবি আর লিস্টি ধইরা ডেলি বাজার করবি। পারবি না?
কিছু না বলে তাকিয়ে থাকে পটল। ওর চাহনিতে কোনো চিন্তার রেখা খেলা করে না বরং কেমন উদাস দৃষ্টি। সেই চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে হারুন। শহরের পানি পেটে পড়লেও, পটল যে বুদ্ধিতে আড়েবহরে চিচিঙ্গা হয়ে উঠবে না, সেটা আঁচ করে ফেলে। এই যুগে এমন বেপতার কিন্তু সৎ মানুষ পাওয়া কঠিন।
—গ্যারামে তরে খাওয়াইব ক্যাডা? ঢাকা গেলে তিন বেলা খাবি আর ফিরি থাকবি। মাস গেলে ট্যাকা পাবি।
পিরানের বাঁদিকটা দু-হাতে গোটাতে থাকে পটল। কী বুঝল কে জানে? মাথা নেড়ে সায় দেয়। বলে— যামু আম্‌নের লগে।
পটল সামান্যতেই তৃপ্ত। কোনো কিছুতে আক্ষেপ নেই। নিজের নির্বুদ্ধিতা নিয়ে ওর কোনো ভাবনাও নেই। গেস্ট হাউজের বোর্ডাররা সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ে। হাতে কাজ নিয়েই আসে সবাই। তাই দুপুরের আগে পটলের কাজ ফুরিয়ে যায়। তখন সে চুপচাপ ঝিম মেরে বারান্দায় বসে থাকে। যেন সে কত কিছু ভেবে ফেলছে। আসলে মগজের ঢিলামির জন্য সেভাবে কিছু ভেবে উঠতে পারে না। বিয়ের বয়স হলেও বিয়েশাদী করা হয়ে ওঠেনি। সেও এই ঢিলামির জন্যই। কেউ ডেকে কথা না বললে তেমন কিছু বলে না। ওর কিছু শোনারও নেই।
তবু সে এক শব্দ শুনতে পেল। ট্রে হাতে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে সে। তক্ষুনি শুনল হালকা শব্দ। ইটকাঠের শহরে চাঁনমিয়া আবাসিক এলাকার এক গেস্ট হাউজ। তিনতলা দালানের একতলা দোতলার মাঝামাঝি নির্জন সিঁড়িতে এই ভরদুপুরেও চমকে উঠল পটল। অপূর্ব এক ঝনৎকার কত দূর দেশ থেকে ভেসে আসছে। অবাক হয় পটল। কোথাও এক জলপরী সাঁতার কাটছে। এক ঝড়জলের রাতে নানীর কাছে গল্প শুনেছিল, এই পরীর নাচে আকাশ ভেঙে মেঘ নামে। মেঘের সুরমা চোখে মেখে পরী নামে পদ্মদিঘিতে। টইটুম্বুর নীল জলে সাঁতরে বেড়ায়। স্নান শেষে হুঁশ করে আসমানে উড়ে যায় ডানা মেলে।

সেই শব্দ থেকে অনেকটাই দূরে হারুন। এখন জায়নামাজে বসে আছে। সপ্তাহে একদিন শুক্রবারে সে মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়ে। আজ বৃষ্টির জন্য বেরোতে পারল না। বাঁ দিকে সালাম ফেরাতেই দেখে গোলাপি মপ হাতে ঘরে ঢুকছে। কোনোরকমে মোনাজাত শেষ করে উঠে পড়ে হারুন। পোড়া মরিচের ঝাঁঝ শ্বাসনালিতে ঢোকার আগেই বারান্দায় বেরিয়ে আসে। সারা ঘর মরিচের ঝাঁঝে ভরে গেছে! বিরক্ত হয়ে মিন্টুকে গালি দেয়। বিড় বিড় করে— হারামজাদা করছে কী!
গোলাপির ঝামেলা আসলে হারুনকে নিয়ে। হারুনের চোখ ফাঁকি দিয়ে মশা মাছি গলবার জো নেই। ঝড়তি-পড়তি কিছুতেই হাত দেয়া যায় না। আজ গোলাপির জিনিসপাতি আমদানি বন্ধ। গোটা তিনেক আলু নিতে পারলে ভর্তা বানিয়ে ভাতের সাথে খেতে দিত ছেলেটাকে। হারুন ঘরেই যোহরের নামাজ পড়ল। তাই আলুর ভর্তায় বালি। হারুনের নামাজের সময়টা সদ্ব্যবহার করা যেত কিন্তু আজকেই চারজন নতুন বোর্ডার এল, দু’বার করে বারান্দাটা ধুতে হল। এত সব হাঙ্গামায় আলুর কথাটা মনে ছিল না গোলাপির।
ঘরে ঢুকে পোড়া মরিচের ঝাঁঝে চোখে পানি চলে আসে ওর। মিন্টু ডালে ফোড়ন দিচ্ছে। ছ্যাঁতছোঁত শব্দ শোনা যাচ্ছে। আঁচলে নাক মুখ চেপে ধরে গোলাপি রান্না ঘরে ঢুকে যায়।
বারান্দায় এসে লম্বা শ্বাস নেয় হারুন। দু’দিন হল বউ বাচ্চার সাথে কথা বলেনি। বুড়া বাপ-মাকে ওর স্ত্রী দেখে শুনে রাখে। বাড়িতে মোবাইল করা দরকার। বসার ঘরে ফোন চার্জে দেয়া। মরিচের ঝাঁঝ কমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে হারুন আর ভাবে এই গেস্ট হাউজে তেমন কোনোরকম ঝামেলা নেই। ভালোই চলে। রেফারেন্স ছাড়া কোনো বোর্ডার নেয়া হয় না। সাইনবোর্ড নেই। আলাদা ট্যাক্সও দিতে হয় না। শুধু কাজের লোকজন পাওয়া মুশকিল।
বারান্দার পাশে এক চিলতে বাগানে অযত্নেও দোপাটি ফুটেছে। বৃষ্টির পানি পেয়ে দোলনচাঁপা সাদা সাদা পাপড়ি মেলে দিয়েছে। মুগ্ধ চোখে সেদিকেই তাকিয়ে ছিল হারুন। হঠাৎ কী একটা শব্দ, একটানা নয়, থেকে থেকে কেউ যেন মন্দিরা বাজাচ্ছে। কিছুদিন আগে পাশের বিল্ডিং-এ কেউ হারমোনিয়াম, তবলা কিনে এনেছে। একটা মন্দিরা কিনে নাই, এ কথা হলফ করে বলা যায় না। হারুন মন্দিরা চিনেছিল কৈশোরে। কীর্তনিয়াদের কাছ থেকে। পৌষ মাসের মাঝামাঝি গ্রামের নিতাই গৌর সেবা আশ্রম মন্দিরে কীর্তন হয়েছিল। দূরদূরান্ত থেকে এসেছিল নামী সব কীর্তনিয়ারা। তিন দিন তিন রাত টানা সে কীর্তন শুনেছিল। কুয়াশা ভেজা খড়ের গাদার ওপর বসে। ঢোল, খরতাল, মন্দিরা বাজিয়ে গান সেই প্রথম শোনা। শব্দটা এতদিন বাদে কৈশোরের কুয়াশাঘোর আর এই ঝিরঝিরে বৃষ্টির সাথে মিশে ধোঁয়াটে হয়ে যায়।

এরই মধ্যে পটল খালি ট্রে হাতে ফিরে এসেছে। জলপরীর সাঁতারের শব্দটুকু মুছে গেছে সিঁড়িকোঠায়। চুড়ির টুং টাং ভুলে ব্লাউজের ভেতর দুটো পেঁয়াজ গুঁজে নিয়েছে গোলাপি। পানের বাক্সে মাছের টুকরার পাশে ঢুকিয়েছে তিনটা আলু।
হারুন চার্জার খুলে মোবাইল হাতে নেয়। মন্দিরার কুয়াশাচ্ছন্নতা থেকে বেরিয়ে দুনিয়াদারির কথা বলে বউয়ের সাথে। সাদা মেঘের আকাশ থেকে ঢিমা লয়ে বৃষ্টি ঝরে যায়। আর শব্দটা, যেটা প্রত্যেকের কানে ঢুকে গেছিল ব্যাখ্যার ভিন্নতা নিয়ে, সেই শব্দও এক সময় থেমে যায়।
বিকেল পেরিয়ে গেলেও বৃষ্টির বিরাম নেই। হাওয়া কোনো দূর মুল্লুক থেকে সাদা মেঘ তাড়িয়ে আনছে কে জানে? হারুন বসার ঘরের দুটো লাইট জ্বেলে দেয়। বোর্ডাররা কেউ বেরোতে পারেনি। রাতে সবাই গেস্ট হাউজে খাবে।
গোলাপি বৃষ্টির মধ্যেই বেরিয়ে যেত। মিন্টু এসে ওর সামনে দাঁড়ালো। বলল— মাছ সবজি কুইট্টা দিয়ে যা। আর দুপুরের থালাবাডিগুলা ধুইয়া দিস।
—অহন ক্যামনে কী করমু? যাওয়ার টাইমে?
—চারজন নতুন বোর্ডার আইছে। তোর বিবেচনা নাই?
—আগে কইলা না ক্যান?
—পটলরে তো কইছিলাম তোরে থাকার কথা কইতে।
—হ্যায় কিছু কইছে আমারে? জিগাও দেহি!
—এই পটলা এই, কী রে, গোলাপিরে কিছু কস নাই?
পটল সব ভুলে বসে আছে। গোলাপিকে কিছু বলেনি। হারুন ক্যাঁচাল শুনে এগিয়ে আসে। আসলেই আজকে স্টাফ কম। বৃষ্টির জন্য ধোয়াপালির বুয়া আসেনি। গোলাপিকে অনুরোধ করে হারুন দু’ঘণ্টা থাকার জন্য। দু’টা বেগুন দেবে আর রিকশা ভাড়া বাবদ দেবে পঞ্চাশ টাকা।
বৃষ্টি সামান্য ধরে আসছে। কিছুক্ষণ পর হয়তো থেমে যাবে। হেঁটেই বাড়ি ফেরা যাবে ফলে নগদ লাভ হবে পঞ্চাশ টাকা। এসব ভেবে গোলাপি ধোয়াপালি করার জন্য রান্না ঘরের দিকে যায়। মিন্টু আর হারুন নিশ্চিন্ত হয়ে রাতের মেন্যু নিয়ে কথা বলে। ভাত আর রুটির সাথে বেগুন ভাজা, সবজি, রুইয়ের দোপেঁয়াজি, কচু-চিংড়ির ভুনা আর ডাল।
হঠাৎ থমকে দাঁড়ায় গোলাপি। কয়েক সেকেন্ড পর চোখ দুটো বড়ো করে। ভ্রূ উঁচিয়ে বলে— একটা আওয়াজ শুনতাছেন?
মুহূর্তে নীরবতা নেমে আসে বসার ঘরে। বলা থামিয়ে সবাই শব্দ শোনার চেষ্টায়। মিন্টুই আগে মুখ খোলে।
—আন্দাজে কী কস? কী শুনোছ না শুনোছ।
—এখনও তো হইতাছে।
—কীসের সাউন্ড?
—কাচের চুড়ি এক গাছি বাজে যেমুন। হেমুনই লাগে।
হারুন ডান কানের লতি চুলকাতে চুলকাতে বলে— একটু আগে শুনছিলাম বারান্দায়। কী জানি মন্দিরা বাজে।
—আমি কিছুই শুনতাছি না। কী কইতাছেন হারুন বাই?
ভয়ে কেঁপে ওঠে পটল। সিঁড়িঘরে সেও অদ্ভুত একটা শব্দ শুনেছিল আর শব্দটা ছিল অবিকল জলপরীদের সাঁতার কাটার শব্দ। এই দীর্ঘ বাক্যটি সাজিয়ে তৈরি করে বলতে যাবার আগেই গোলাপি মুখ নাড়ায়— কীয়ের মন্দিরা। মন্দিরা কিতা?
—মন্দিরা চিনবি কেমতে?
আলগা হয়ে আসা শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে গোলাপি— এইডা চুড়ির শব্দ। হারুন ভাইয়ে বিশ্বাস যায় না।
—আ’ লো গোলাপি, চুপ যা।
—কীয়ারে? যেইডা সইত্য হেইডাই কইলাম।
মিন মিন করে পটল বলে— আমিও হুনছি একটা আওয়াজ। সিঁড়িঘরে। দোতলায় যাওয়ার কালে।
—এইবার বুজলা কিছু? মিন্টুর উদ্দেশে কথাগুলো ছুঁড়ে দেয় গোলাপি।
মহাবিরক্ত হয় মিন্টু— বুঝমু কী?
—খোদা! এমুন ঠসা হইলা কবে?
দু’জন যুবক বোর্ডার বসার ঘরে ঢোকে। খিদায় ওদের পেট চোঁ চোঁ করছে। একজন প্রশ্ন করে— কীসের আওয়াজ?
একসাথে তিনটি শব্দ উচ্চারিত হয়— চুড়ি, মন্দিরা, জলপরী।
অপ্রত্যাশিত শব্দগুলো শুনে ভারী অবাক হয় ওরা।
—কী বলেন? এত কিছুর শব্দ?
স্বাভাবিক গলায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে হারুন— এইসব কিছু না। আপনেরা বসেন। খানা প্রায় রেডি।
হেসে ফেলে আরেকজন বোর্ডার। বলে— আফটার ইফেক্ট অফ ক্ষুধিত পাষান। এটা হল ক্ষুধিত গেস্ট হাউজ। মেহের আলীর বদলে হারুন আলী। সব ঝুট হ্যায়। তফাৎ যাও… হা হা হা।
—ন্যায্য কইতাছি। আওয়াজ হইছে। চুড়ির আওয়াজ।
গোলাপির আকূলতা শোনে সবাই। কেউ কিছু বলে না। বাইরে খালেক সাহেবের কুকুরগুলো একসাথে ডেকে ওঠে। বৃষ্টি অবিরাম ঝরছে। থামতেই পারছে না সারাদিনে। কমছে-বাড়ছে। এই ঘোর দুর্যোগের সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে, যেন এক আধিভৌতিক অন্ধকার মাটিতে বুক ঘষে উঠে আসে। ঘর জুড়ে বসে থাকে কুণ্ডলী পাকিয়ে। সেই অন্ধকারে একটি অতৃপ্ত শব্দ ঘূর্ণি খায় ঘরের বাতাসে। কেউ শুনতে পায়, কেউ পায় না।
পটল কিন্তু এবারও সেই শব্দটা শুনতে পেয়েছে। এত বাকবিতণ্ডায় আগ বাড়িয়ে আর বলে না, পদ্মদিঘিতে জলপরী নামে। সাঁতরে বেড়ায় নীল জলে। শুধু এইসব চিন্তাভাবনায় শার্টের কোণা গুটিয়ে সে বুক বরাবর তুলে ফেলে।
দোতলার একদম দক্ষিণের বদ্ধ দরজায় কান পাতলে তখনও হয়তো শব্দটা শোনা যেত। বিছানায় শুয়ে আছে আলোকচিত্রী। তার নগ্ন পায়ের ওপর আঁকিয়ের মুখ ঝুঁকে আছে। উজ্জ্বল শ্যামলা দু’টি পায়ে রুপার নুপূর। নূপুরে বকুল ফুলের মোটিফ। ফুলের মাঝে লালরঙা পুঁতি।
একটি পা বুকের কাছে তুলে নেয় আঁকিয়ে। দীর্ঘ আঙুলে নূপুর বাজায়। ঠোঁট রাখে পায়ের আঙুলে। পা থেকে ক্রমশ ওপরে এগোলে, থেকে থেকে নিক্কণ তোলে নুপূরের একেকটি বকুল। জানলা খোলা পেয়ে মৃদু সেই ঝুমুর ঝুমুর শব্দ বহুদূরে উড়ে যায়। কয়েকটি উষ্ণ নিঃশ্বাস সাথে নিয়ে।
চার্জ লাইট জ্বালিয়ে বসার ঘরে সেন্টার টেবিলের ওপর রাখে হারুন। বড়ো বড়ো ছায়া খেলে দেয়ালে আর মেঝেতে। এমন অন্ধকারে শব্দের উৎস খোঁজ করা যায় না। বিদ্যুৎ ফিরে আসার অপেক্ষায় সবাই বসে থাকে।

4 replies on “ইশরাত তানিয়ার গল্প”

খুব ভালো লাগলো তোমার গল্প তানিয়া ! শেষটা আরও সুন্দর !

গল্প পাঠের জন্য অনেক ধন্যবাদ নীতা দি! সতত শুভেচ্ছা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *