কুন্তল মুখোপাধ্যায়ের কবিতা

মুখ

একটা মুখ আমি খুঁজছিলাম যার চোখে লেগে আছে অনন্তের ঘোর। যেহেতু জানি, চোখের ওইটুকু ঘরে ছায়া পড়ে সমস্ত আকাশের, সুদূর নক্ষত্রের। জানি মহাবিশ্বের অপাঠযোগ্য সংকেত ক্রমশ এসে ফিরে যাচ্ছে। একটা মুখ আমি চাইছিলাম যে মুখে লেগে থাকবে নির্জন জলাশয়ের পদ্মঢেউ। কিন্তু একের পর এক চোখে শুধু দেখেছিলাম পাথরের হাহাকার, অন্ধকারের নৌকাডুবি।

অন্ধের শহরে আমি তাই ফিস ফ্রাইয়ের দোকানের সামনে গিয়ে জলের গভীরতা মাপার চেষ্টা করি, জলের ছায়া পড়েছে এমন কয়েকটা মুখ এসে আমায় আলেয়া হ্রদের কথা বলে। আমার নীল রক্ত ছলকে ওঠে ও সেইসব নেশারুর চোখে আগুন পিছলে যায় ।

একটা সাদা দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে আমি নিজেকে দেখতে পাই, দেখি নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রে ঘুরে বেড়াচ্ছে অসংখ্য ফোটন কণার স্রোত যা আমি একদিন দেখেছিলাম সার্কাসের আগুনবমিতে…

অনন্তের ঘোর আমি দেখতে পেয়েছিলাম বস্তুত এক ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধির চোখে যে একটা বাসের জানলায় বসে দূর দেশে যেতে যেতে প্রাণপণে ভোলার চেষ্টা করছিল তার মেয়ের অশ্রুভরা মুখ

ঘুম

সঙ্গম পরবর্তীকালে তোমার খোলা পিঠ হয়ে যায় আমার ক্যানভাস। বিশাল জলরাশির নীলে একটা জাহাজ ভাসতে ভাসতে নেমে যায়…আমার বিছানায় চারিদিকে সমুদ্রের জল, আলব্যাট্রস উড়ে আসে দিকশূন্যপুরের দিক থেকে

জাহাজের ডেক ধরে তুমি আর আমি দেখছি… সমুদ্রের জলে অজস্র গ্রূপছবি, মরা কাঠ দিয়ে বাঁধানো হাজার হাজার গ্রূপছবি, দূরে ঋতুমতি অসংখ্য নারীরা হাসছে আর ভাসছে

দেখ দেখ বউ এই বিপুল প্রেমের সাগরে ওই যে ভেসে যাচ্ছে জিপিএফ আর মিউচুয়াল ফান্ডের কাগজ দেখ দেখ বউ আমাদের কন্ডোমের ভিতরে ভাসছে সেইসব ইচ্ছে যারা জন্ম নিতে চেয়েছিল… সেইসব জননী যারা যুবতীশরীর থেকে জন্ম নিয়ে হাঁটতে চেয়েছিল দিগন্তের দিকে…

সঙ্গম পরবর্তী ঘুম তোমাকে বলে যায় মানুষ অনেক মৃত্যুর উপরে বেঁচে থাকে। বাঁচাই আসলে এক পিশাচ সাধনা!

মৃত্যু

এমন একটা পত্রিকা যেখানে কখনও লেখা পাঠাইনি নিজের কোনও লেখা প্রকাশিত হবার দূরতম সম্ভাবনাও নেই অথচ সূচিপত্রে তন্নতন্ন করে নিজের নাম খুঁজে বেড়াচ্ছি যদি পাওয়া যায়

একদিন লাইন বাসের মতো চলতে চলতে আমার ঘর পেরিয়ে যেতে থাকলো জনপদ ছোটো গঞ্জ হাটবার… আমার ছেলে খালাসি, সে বলতে থাকল ডাইনে ঠিক ডাইনে ঠিক, আমি ড্রাইভার হঠাৎ পেচ্ছাপ পেল নেমে গেলাম, ঘর দাঁড়িয়ে থাকল অন্ধকার রাস্তায় অত্যল্প আলোয়

হেঁটে যেতে যেতে সুন্দরী বৌদি হঠাৎ একদিন মসজিদ মোড়ে আড়ালে আমাকে টেনে খুলে দিল তার বুক, আমি দেখলাম তার ডান স্তনে আড়াআড়ি একটা সার্জারির দাগ আমি দেখলাম সেই অন্ধকার রাস্তা ধরে আলো জ্বেলে আলো জ্বেলে পেরিয়ে যাচ্ছে রাতে রাতে অসংখ্য ট্রাক… মেয়েমানুষ পাচার হচ্ছে… সীমান্তে গুলির শব্দে চমকে উঠে লুটিয়ে পড়ছে ঘুমিয়ে থাকা পাখিরা

অজস্র গোরুর দল খুরপায়ে ঢুকে পড়ল সন্ধ্যেবেলার শহরে আমার। ট্রাফিক, ব্যাবসায়ী আর আগন্তুকের গালি খেতে খেতে তারা চলতে লাগলো শহরের পেট দিয়ে বুক দিয়ে… এইভাবে তারা এসে পড়ল একটা খালের আর কালভার্টের সামনে—

একহাতে আমার ফুলের গুচ্ছ, অন্যহাতে ঝোলানো রংচঙে প্লাস্টিক পেপারে দুর্গন্ধময় বমি, যদি ফুল দিতে ভুল করে বমি দিয়ে ফেলি জান এই বসন্তদিন কেমন যাবে তোমার

মৃত্যু/দুই

পৃথিবীতে সব কিছুর নামেই একটা দিন থাকে, শুধু মৃত্যুর নামে কোনো দিন নেই , কারণ প্রতিটি দিনই তার একান্ত নিজের। প্রায় প্রতিটি দিনই কারো কারো চলে যাওয়ার দিন। বুকের বেদনা নিয়ে বাল্যবন্ধুর সঙ্গে দেখা হয় আর তারপর স্মৃতিচারণ এক অব্যর্থ অসুখ যা আমাদের মৃত্যুর আঁধার ঘেরা পপলার পাতায় ভরা রাস্তায় নিয়ে চলে। সে একটা হাত তুলে আকাশের দিকে উড়ে যায়। ফলে হাওয়াকে আর শূন্যতাকে প্রশ্ন করতে হয় কত তারিখ আজ।

আপনি কি জানেন মুহূর্তের মৃত্যু হয়? আপনি কি জানেন এই শতাব্দীতে শোকের আয়ু দুই থেকে তিন দিন? আপনি কি জানেন স্যর আপনার সমস্ত অতীত সময় রেখে দিচ্ছে অব্যর্থ এক এক্সটার্নাল হার্ড ডিস্কে? না জানলে এই যে আমাদের কোম্পানির নিজস্ব প্রডাক্ট কিনুন, এর নাম মৃত্যু, এটা গিলতে হয়, আর গিলে ফেললে চব্বিশ ঘণ্টার জন্যে সে আপনাকে নিয়ে যাবে মৃত্যুর পরের পৃথিবীতে। এই গাড়ির ডেলি প্যাসেঞ্জারেরা সবাই আমাকে চেনেন। আমার নাম জীবন।

সত্য

ধরুন একটা ঘরে আপনি থাকেন, কিন্তু আপনি জানেন এই ঘর দলিলে যতই লেখা থাক, সে আপনার নয়, ধরুন সেই ঘরে আপনার সঙ্গে যাঁরা যাঁরা থাকেন ভদ্রভাষায় তাঁদের প্রিয়জন বলা হয় কিন্তু আপনি জানেন সবাই নিজের স্বার্থে আছে, একপ্রকার ধান্দা যদি সঠিক পদ্ধতিতে মুড়ে ফেলা যায় তাহলে তারই নাম হবে সংসার, ধরুন সেই ঘরে আপনার যে ঘরটি আছে, একদিন রাত্রে দেখলেন তার মাথার উপরে ছাদ নেই উন্মুক্ত নক্ষত্রের আকাশ দেখা যাচ্ছে আর কানের কাছে কে যেন বলছে ওহে শরণার্থী শরণার্থী ওহে, ধরুন আপনার নারীটি আপনার প্রতিকৃতি আঁকতে গেলে একটা এটিএম মেশিন এঁকে নেয়, ধরুন আপনার সঙ্গে তার অযৌন জনন, ফুলের মতো শুধু রেণু নিয়ে যায় যে দালাল পতঙ্গ তাকে আপনি ধরতে পারছেন না, ধরুন আপনি জানেন যে আপনার এই অবস্থায় আত্মহত্যা করা নির্বুদ্ধিতা কারণ ওই সিদ্ধান্তটুকুর জন্যে দাঁত পাজিয়ে বসে আছে আপনার প্রিয়জনেরা, তবু আপনি তেতলায় ছাদের কিনারে এসে বারবার দাঁড়াচ্ছেন, আর তখনই ধরুন আচার্য শংকর এসে কানে কানে বলে গেল ইহ জগৎ মিথ্যা আর ধরুন তখনই তাকে বোকাচোদা বলার ইচ্ছে হল আপনার

Spread the love

3 Comments

  • দেহের চেয়ে লম্বা মনের একটা প্রণাম রেখে গেলাম এসব অক্ষরের কাছে।

    Aliuj,
  • অসাধারণ লেখা। খুব ভাল লাগল।

    তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায়,
  • অসামান্য কয়েকটি কবিতা পড়লাম।
    ঘুম এক্সেলেন্ট।
    অনেক ভালোবাসা কুন্তল দা।

    Ranajit Adhikari,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *