জহর সেনমজুমদারের গুচ্ছকবিতা

সন্ধ্যা

থাকবে না

থাকবে না, এইখানে আর কোনো পিঁপড়ে থাকবে না; থাকবে না, এইখানে আর কোনো ফড়িং থাকবে না; মধু নেই নুন নেই চিনি নেই;  মুখে সস্তা পাওডার মেখে বসন্ত ও কোকিল একই সঙ্গে ভাঙা রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে;

তুমি মর্গ  থেকে তাল তাল মাংসপুঁজ কেন ছুঁড়ে মারছ আমাদের দিকে? আর আমাদের ঋতুচক্রে প্রতিদিন হিংসা ঢেলে দিয়ে লাভ কী তোমার? আমরা আজও জানি না কেন তুমি সন্ধ্যার ফেরিঘাটে একশৃঙ্গ গণ্ডারের মতো বসে থাকো; পারাপার করবার সময় আমাদের পাগুলো খসে পড়ে ভয়ানক জলের ভেতর; সারারাত পা ভেসে যায়—শুধু ছেঁড়া ছেঁড়া পা—ঘুঙুরের পা নূপুরের পা- থাকবে না; এইখানে আর কোনো পা থাকবে না…

টিয়া

থাকবে না

থাকবে না, এইখানে আর কোনো চিরনতুন ডাকবক্স থাকবে না; ওগো বালক ওগো বালিকা, তোমরা আর ডিম ফেটে বাইরে এসো না; ভাঁপা পেয়ারা চিবোনোর আগেই পৃথিবীর সকল পেয়ারা গাছ তার যাবতীয় পেয়ারাসহ তোমাদের চোখের সামনেই উড়ে উড়ে চলে যাবে দূরে বহুদূরে; সমুদ্রের তলায় ডাঁই হয়ে পড়ে থাকবে কর্ণপিশাচীর ত্রস্ত নীলিমা; আমরা জানি এই সবকিছুর পেছনেই তুমি আছ; তুমিই হত্যা করেছ আমাদের টিয়া ও টোটেম, তুমিই হত্যা করেছ আমাদের কোকিল ও কৌমজীবন; কেন করলে এইসব? আমি তূষ্ণীরাম, মরা এই দেশ পাহারা দিতে দিতে আমার কাঁধ থেকে গামছা খসে পড়ে; চোখ দুটি আস্তে আস্তে অন্ধ হয়ে যায়…

প্রাণ

থাকবে না

থাকবে না, এইখানে পেট  থেকে সোনার হরিণ বার করে আনবার জন্য আর কোনো ধাত্রী-মা কোথাও থাকবে না; গোধূলির কাদায় ডুবে যাবে সব সাইকেল; আর কোনো চড়াই আগুন নেভাতে আসবে না; আর কোনো মাছরাঙা মুখাগ্নি করতে আসবে না; ছোটো প্রাণ ছোটো ব্যথা শেষ; পঞ্জিকা থেকে যুগে যুগে শুধুমাত্র প্রেতযোনি বার হয়ে আসে; কোজাগরী দীপান্বিতার দিনে কেন তুমি বারবার আমাদের শাড়ি খুলে নাও? কেন তুমি বারবার অভিজ্ঞ কাওড়ার মতো আমাদের বুকের ভেতরকার ছোটো ছোটো কচ্ছপ টেনে ছিঁড়ে আনো? তোমার হিংস্রতা আমাদের ভালো লাগে না; থাকবে না, তোমার মৃত শুয়োর দড়ি বেঁধে টানবার মতো কেউ আর কোথাও থাকবে না…

লাশ

থাকবে না

থাকবে না, শরৎকাল আর তালপাতার ছাতা মাথায় দিয়ে আমাদের জন্য নদীতীরে বসে থাকবে না; আলতা পরানো মাসির ফুলে ওঠা লাশ ভেসে ভেসে চলে যাবে অতীন্দ্রিয় অগ্নিসংগ্রহে;  থাকবে না, এইখানে মন খুলে কথাবার্তা বলবার মতো নোয়াখালির নৌকা আর থাকবে না; তুমি কি এইসব কিছু বোঝো না? তোমার নৈয়ায়িক প্রস্রাবে আমাদের কৃষ্ণবর্ণ কুয়ো ভরে গেছে; পারছি না- আমরা আর পারছি না; দয়া করে এবার ভূতের ভয় দেখানো বন্ধ করো; মাথাভর্তি বুদবুদ নিয়ে আমরা আর কত জামাপ্যান্ট সেলাই করব? থাকবে না, এইখানে বুনো চাঁদ আর সেই জিরাফের লম্বা প্রেম কোথাও বিন্দুমাত্র থাকবে না…

শিস

থাকবে না

থাকবে না, এইখানে প্রেম ও পরাগের বালুতটে আর কোনো লাল কাঁকড়ার দল থাকবে না; আমাদের পেঁপে গাছে পুনরায় পোকা ধরবে; আমাদের শিউলিগাছে পুনরায় ছেঁড়া জামার কান্না যাবে; তুমি এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তিত নও; বরং লম্বা কাঁচি, হাতে বুনো কামরাঙা চিরে চিরে একসময় তুমি আমাদের পাঁজর দেখলে; যতবার ভাঙা লন্ঠনে আলো জ্বালতে যাই, নিভে যায় বারবার; পীরবাবার আস্তানায় একটা কালো কুকুর জিভ বার করে ঘোরে; তোমাকে ওই কুকুরটার মতো মনে হয়; থাকবে না, স্লেট পেনসিল নামতা কিছু থাকবে না; পুরনো জাহাজের ভেতর ভিজেমাটি রাখবার দিন শেষ; আমরা আর কোনোদিন ওম শব্দ নিয়ে হলুদ চাঁদের জানলায় টিয়াপাখির মতো সারারাত শিস দেব না…

শাড়ি

থাকবে না

থাকবে না, এইখানে ইশকুলফেরত আমার ঝুলন্ত বেণী আর থাকবে না; আমিও পোকায় কাটা পাঁজর নিয়ে বেশিদূর যেতে পারব না; রাস্তায় রাস্তায় ছেঁড়া ব্লাউজ ছেঁড়া শাড়ি পড়ে আছে; তুমি কেন শামুকের মতো করছ? আমরা তো এই মহাবিশ্বের সর্বত্র আমাদের পদচক্র স্থাপন করেছিলাম; যৌন স্বপ্ন দেখতে দেখেতে হুঁকো টেনেছিলাম, যৌন মিলন করতে করতে গাঁজা খেয়েছিলাম; তবুও আমাদের গঙ্গাফড়িং কেন জলে ভেসে গেল? তবুও আমাদের রেশমচাষের ডানা কেন ভেঙে গেল? জানি তুমি উত্তর দেবে না; উত্তর দেবার ক্ষমতাও নেই;  যতদিন বেঁচে থাকব, বারবার অন্ধকার সুড়ঙ্গ ভেদ করে তোমার মহাকর্ষে, তোমার ভূমিচক্রে, ফিরে আসব; ধাক্কা মেরে মেরে ফিরে আসব; থাকবে না, তোমার লোহার দরজা কোথাও থাকবে না…

Spread the love

7 Comments

  • জহর সেনমজুমদার ভাবনাকে ভাবতে শেখান । এই কবিতাগুলোও আমাকে অবগাহন দিল ।

    দিশারী মুখোপাধ্যায়,
  • আনন্দ পেলাম পাঠের পর । বেশ একটা অনুভূতি হল । ওনার বই ‘বৃষ্টি ও আগুনের মিউজিকরুম’ পড়েও ভালো লেগেছে ।

    সঞ্জয় মৌলিক,
  • আশির দশক থেকে জহরের সঙ্গে পরিচয় ওর কবিতা এবং ওর সঙ্গে।।।।বরাবর‌ই অন্যরকম লেখে।।।।। আজ‌ও প্রকাশিত কবিতাগুচ্ছে সেই প্রমান এক‌ই আছে।।।।।।।।।।।

    তীর্থঙ্কর নন্দী,
  • খুব কম লেখকের লেখাই পাঠককে স্নান দিতে পারে। জহর সেন মজুমদার সেই কতিপয় লেখকদের মধ্যে অগ্রগণ্য। কবিতায় বাচ্যার্থ অতিক্রম করে যাওয়ার পরও পাঠককে এতখানি টেনে রাখার ক্ষমতা সহজ কাজ নয়। সশ্রদ্ধ প্রণাম জানাই।

    তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায়,
  • জহর সেন মজুমদার, মানে কবিদের প্রিয় জহরদা। এই যে ‘ থাকবে না দিয়ে শুরু এবং থাকবে না’ দিয়ে শেষএর মধ্যে অনাদির ছাপ ফেলতে ফেলতে চলা আর অহঙ্কার ছাপমার্কা দারুণ শ্লেষাত্মক ও দ্বার্থক প্রতিবাদ, এমন করে কেবলই আমাদের প্রিয় জহরদা-ই পারেন লিখতে।

    sharmistha biswas,
  • সেই একই রকম মুগ্ধ !

    শতদল মিত্র,
  • আহা!জহর সেনমজুমদারের কবিতার একজন ভক্ত আমি।বরাবরের মতো এবার ও পড়ে মুগ্ধ।

    Prabir Majumdar,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *