Categories
কবিতা

নিয়াজুল হকের কবিতা

পাখিদেখা

পাকারাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা
কতকগুলো গ্রাম দেখে
তোমরা হো হো করে হেসে ওঠো

একজন নকল সালিম আলির পাখি দেখার মতোই

পাখি দেখতে দেখতে
পাগল জনগণ কত পাখি যে মেরে ফেলল… !

কালো জলের মৃত্যু

অনবদ্য ঝড় এবং বৃষ্টিতে
নায়ক-নায়িকা পরস্পরকে প্রবলভাবে জড়িয়ে ধরে

বলিউডের মতো নির্মিত
এই সিনেমাগুলোই আমাদের প্রেম

যতবার আয়নার সামনে দাঁড়াই
ভিনগ্রহের মুখ ভেসে ওঠে

আমাদের নিজস্ব রক্তপাত সমূহ
শুধু প্রকাশ্য অথবা গোপনে
নদী হয়ে বয়ে যায়

কালো জলের মৃত্যু দেখে
আমরা মাঝে মাঝে থমকে দাঁড়াই

ধান ঝেড়ে নেওয়া খড়

ধান ঝেড়ে নেওয়া খড় পড়ে আছে
রাস্তায়

কত কত বাতিল কবিতার মতোই
শোভা পাচ্ছে ধুলোয়

তারা পাঠকের ভেতরে
শবদেহের মতো
লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যাবে একদিন

‘আগামীকাল’ এক ভয়ংকর শব্দ

কান পাতলে
তার বিস্ফার শোনা যায়

এই পাহাড়

মিথ্যে অজুহাতগুলোকে
মুখ ফসকে বলে ফেলেছিলাম পাহাড়

শরীরে তারই কালচে পোড়া দাগ

ভাবলাম
ঈশ্বর সম্বোধন করে সামনে দাঁড়াই

কিন্তু কাজ হল না

রক্তচক্ষু এড়িয়ে
পাহাড়কে সমতল করতে চাইলাম হাসি দিয়ে
পাহাড় পাহাড়ই থেকে গেল

এই পাহাড়
ভূগোল থেকে একদিন ইতিহাস হয়ে যাবে

খোয়া যাওয়া

মাঝে মাঝে
ভিক্টোরিয়াকে ব্লেড দিয়ে চিরে

দু’ভাগ করে ফেলি

একবার পূর্ব-পশ্চিম বরাবর
আর একবার উত্তর-দক্ষিণ

আমার পছন্দের দিক পূর্ব এবং উত্তর

আমার অন্তত তিন-চারটে বইমেলা
একটা-দুটো এক্সপো
ওখানেই হারিয়ে গিয়েছিল

আর খুঁজে পাইনি

খোয়া গেছেই বলা যায়

পাথর ও ফুল

পৃথিবী যে বদলে গেছে
তার দু’চারটে উদাহরণই কি যথেষ্ট ?

তা বোধহয় নয়

আরও উদাহরণ তুলে ধরলে
পৃথিবীটাই ওলট-পালট হয়ে যাবে

মৃতদেহের ওপর রাখা ফুলগুলো যে
পাথর হয়েছিল সে উদাহরণ তো আছেই

মৃতদেহ থেকে ফুল সরিয়ে নিয়ে
পাথর রেখে দিন

দেখবেন পাথরও ফুল হয়ে গেছে

হাসরের ময়দান

জীবন এবং মৃত্যুকে
ছাগলের মতো বেঁধে রাখি নিজের শরীরে

আমাকে ওরা গাছ ভেবে নেয়
আমিও ওদের পাতা খেতে দিই

পাতা খেতে খেতে ওরা
আমাকে দেখে মেমায়
খুনসুটি করে

মাঝে মাঝে গোঁজ ভেবে
উপড়েও নিতে চায়

মনে মনে ভেবেছি
ওদের একদিন মাছ করে
চৌবাচ্চায় ছেড়ে দিয়ে বলব

তোমরা সাঁতার কাটো

আমি ততক্ষণ লাস্টমোমেন্ট সাজেশন দেখে
হাসরের ময়দানে গিয়ে জড়ো হই

কিচ্ছু নয়, সামান্যই

একটা ফুল, একটা পাখি
অথবা একটা পাহাড়

এদের নিয়ে আমি কী করব জানেন?

কিচ্ছু নয়
সামান্যই

এরা আমার খেলার সঙ্গী
এরা আমার খেলনাও

এদের আমি
ভাঙব, গুঁড়ো করব, মশলার মতো পিষব

সবশেষে গোটা করব

বাটালি এবং ছেনি-হাতুড়ি
শুধুই যন্ত্রপাতি
ওদের শরীর খুঁড়বে মন

এভাবেই ওদের এক একজনের
হাজারটার কাছে পৌঁছে যাব

আমাকে তোমরা
মারবে, কাটবে, ছুঁড়ে ফেলে দেবে

সে তোমাদের ব্যাপার

একটা গাছ

একটা গাছ
হাজার হাজার বছর বন্দি করে রেখেছে জনগণকে

কেউ প্রশ্ন করল না

হেসে উড়িয়ে দিয়ে বোঝাতে চাইল
একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে

ততক্ষণ ছাগল হয়ে পাতা খাও

গাছটা হঠাৎ একদিন জেলখানারূপে আবির্ভূত হয়ে বলল
আমি একটা ঘরই
আমার দরজা-জানালাগুলোই প্রমাণ

জনগণ একটা ফর্মূলাতেই আটকে থেকেছে
‘একদিন’ মানে ‘আগামীকাল’

‘আগামীকাল’ মানে নতুন একটা গাছ

রমণীয়

কল্পনা করি
সরু এবং মোটা

ভাবি
সরু এবং মোটা কীভাবে হয়

কল্পনার লতা বহুদূর গিয়ে
বড্ড রমণীয় হয়ে ওঠে

9 replies on “নিয়াজুল হকের কবিতা”

অসাধারণ কবিতাগুলো । এমন লেখার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করে বহুক্ষ।

দুর্দান্ত লেখা সব নিয়াজুলদ! লেখাগুলো পড়তে পড়তে আপনার গলা শুনতে পাচ্ছিলাম। লিখতে থাকুুন দাদা।

ভালো লাগলো। আরও লেখা পড়বার অপেক্ষায় রইলাম।

বাইরের আলো কমে গেলে ভেতরের আলো জ্বলে ওঠে। বাইরে যখন আর কিছু দেখার থাকে না, তখনই আমরা ভেতরের দিকে তাকাই। নিয়াজুল হক সেরকমই কবি। আবেগ বিবৃতি অতিকথন মুছে দিয়ে বিশুদ্ধ উপলব্ধির আলোয় স্নাত করেছেন তাঁর কবিতাকে। দার্শনিক বোধের একেকটি মোচড়ে তাঁর জীবনভূমি তীর্থক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। কবিতায় এসেছে এক মেদুর স্বচ্ছতা, সান্দ্র আর্দ্রতা। প্রাত্যহিক দর্শনকে তিনি চিরন্তনতায় উত্তীর্ণ করতে পেরেছেন। কথা ফুরিয়ে গেছে, কিন্তু উপলব্ধির তরঙ্গ বিস্তৃত হয়েছে। যা ঘনীভূত এবং নিবিষ্ট ও অনপনেয়।

গভীরতম উপলব্ধির ভারহীন প্রকাশ,সুন্দর কবিতা ।

বলিষ্ঠ, সংযত লেখনী। গভীর ব্যঞ্জনায় দ্যুতিময়। সুচিন্তিত, যথাযথ শব্দচয়ন।সৃজনশীলতায় অনন্য। সার্বিকভাবে উৎকৃষ্ট সৃষ্টি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *