Categories
কবিতা

পঙ্কজকুমার বড়ালের গুচ্ছকবিতা

গান

কেবলই মনে হয়, গভীর শোক এলে মানুষ গানের কথা ভাবে৷ যেমন তুকনামাই, হাজার বছর আগে তাঁর প্রিয় খরগোশটি নিয়ে গেল চিলে৷ সে তখন মুড়াকিরি পাহাড় থেকে উপত্যকার দিকে, গভীর উদাস করা একটি গান ভেসে যেতে দেখে৷ তাঁর কোনো সঙ্গী ছিল না৷ এমনই নির্জন যে, তাঁর স্তনে কখনো-সখনো মেদুর প্রজাপতি বসে৷ তুকনামাই, যার কেবল একটি খরগোশই ছিল, গভীর শোকের পর সে দেখলো গান, এই মাটি ও আকাশের মাঝে সবখানে ছড়িয়ে রয়েছে৷

আদালত

সমস্ত সাক্ষ্য-প্রমান শেষ

যেন কোলাহল শান্ত হয়ে এল
এবার একটি ফুল দুলবে বাতাসে
তার জন্য আমাদের প্রস্তুত হতে হবে
আমরা ভয়ানক ও তুমুল দেখেছি
কীভাবে একটি রাজহাঁস ভেসে থাকে
তার বিজ্ঞান নয়, ওই শিল্পের জন্য,
একটি শিশুর গড়িয়ে যাওয়ার দৃশ্যের জন্য
আমাদের প্রস্তুত হতে হবে

আদালত এখানেই মুলতুবি হল

অপার্থিব

ছড়িয়ে দিতেছে রোদ
অন্ধকারে, তাহাদের মুগ্ধ বয়স
দু-একটি উল্লাস বাক্য, খিলখিল হাসি
এই হিম, কুয়াশায় ভেসে
গঙ্গার তীর ঘেষে চলিয়া যাইতেছে…

অনতিদূরের ঝাউগাছ, তুমি বলো,
কিছুই কি যায় চলে! এই সব দৃশ্য-কথা,
এইসব অপার্থিব আলো..
থাকে না কী!

শুনিয়াছি, জীবনের বয়স থেমে গেলে
গল্পেরা খুঁজে নেয় নতুন আশ্রয়..

শোভা

মানুষের ক্ষুদ্র সংসারে যে রমনী কিঞ্চিৎ,
বিপুল ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে সে কেবল অসীম হয়েছে৷
হে পুরুষ, দেখো— যতদূর চোখ যায়, তারও ওপারে রহস্য,
তোমার মুঠোর কাছে সে বিপুল তোমাকেই ক্ষুদ্র করেছে৷
ভোগের বিপরীতে যে প্রকৃতি মনোরম,
চিরকাল আশ্রয় লিখেছে, প্রণম্য দূরত্ব থেকে দেখো—
ওই যে নক্ষত্রমণ্ডলী, যেন তার এলায়িত চুলে
কুমকুম শোভা হয়ে আছে৷

উপশম

কিছুতেই পৌঁছাতে পারছি না
সাদা অপেক্ষার পাশে ফুটে আছে
অচেনা ফুলেদের লাল
যেন ওই রক্তিম দূরত্ব নিজেকে বিক্ষত করে
যন্ত্রণার কলিজা সেজেছে

তোমাকে ছুঁতে চেয়ে বাতাসে বেদনা লিখেছি
স্বপ্নের তুলোবীজ উড়িয়েছি একা
তুমি কি দেখেছো সেই কার্পাস?
সেখানে নরম, আমার যাবতীয় যতনে দিয়েছি

এসব দারুণ দিন, প্রখর চৈত্র অসুখ
একদিন শেষ হয়ে যাবে
ভাবি, ঠিক ছুঁয়ে দেব, কোথাও ক্ষত থেকে গেলে
তোমার প্রলেপ দিয়ে লিখে দিও, উপশম হলো৷

বন

যারা বনে গিয়েছিল
তারা আর ফেরেনি
এখন এই নিয়ে নানা তর্ক হতে পারে
আমি ভাবছি, সূর্য ও চাঁদ ছাড়া
আরও কেউ কেউ আমাদের আলো দিয়ে গেছে
ওই নক্ষত্র, যে এখনো পৌঁছায়নি মানুষের চোখে
তার ইশারা দূর-দূর ছায়াপথে ছড়িয়ে গিয়েছে
কেবল কিছু মানুষ,
যারা ফিরে এসেছিল সমুদ্র থেকে
তারা এতক্ষণে মাটি চিনেছে
তাদের গৃহ,উঠোন এবং বিস্তৃত আকাশের নিচে
হয়ত কখনো রচিত হবে সুগহীন বন

8 replies on “পঙ্কজকুমার বড়ালের গুচ্ছকবিতা”

খুব খুব ভালো লাগলো। গান, বন এই কবিতা দুটো মাতিয়ে রেখেছে। শুভেচ্ছা। দেখা হবে।

গান, বন এই দুটি লেখা বেশ লাগলো। বাকিগুলোতে একটা চেষ্টা পেলাম। কিছু লাইন, কিছু দৃশ্য অসম্ভব ভালো। হয়তো পরবর্তীতে তারা আরও জীবন্ত হয়ে পোক্ত হয়ে উঠবে। লেখাগুলোর একটা নিজস্ব ঘোর আছে, এই ঘোর অব্যাহত থাকুক এই কামনা।

পঙ্কজ আমার অত্যন্ত প্রিয় কবি।কিছুক্ষণ আগেও ওর বইটি আবার পড়ছিলাম। দু-একটি শব্দ, দৃশ্যে পঙ্কজ ধরে ফেলে বিস্তৃত চরাচর। অথচ গহন।গভীর।শান্ত।সে যেন এক সহজিয়া কবি।গান,বন,অপার্থিব, আদালত পড়ে বিস্মিত হলাম।অসামান্য কবিতা। অপেক্ষায় আছি কবির নতুন বইয়ের। অনেকদিন হল পঙ্কজ। সাড়া দাও।

বন কবিতাটি বিমুগ্ধ করে দেয়! শ্রদ্ধা জানাই কবি

পঙ্কজ এ সময়ের একজন উজ্জ্বল কবি। ওর কবিতা বরাবরই আমার খুব পছন্দের। এগুলিও ব্যতিক্রম না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *