পার্থজিৎ চন্দের গুচ্ছকবিতা

ঋণ

শকুনিসমূহ ব্যাধ লোহাগাছ লোহা-ডালপালা
অন্তরাল থেকে আমাকে দেখেছ, ক্ষত
তোমার জন্মের আগেই নির্মিত হয়েছে অস্ত্র
তোলা ছিল চৈত্যে। বালি-সংযমে, বিষ-মাখা
তোমাকে খুঁজেছে এত দিন, এত রাত হিস হিস
শব্দ থেকে জন্ম নেয়া সাপ, বোবা সাপ
তির যদি হারিয়েছ তবে সে সাপের গা’য়ে
বার বার স্নেহ ঢাল, স্নেহ-শক্ত সাপ
ধনুকে যোজন করে লোহাঝোপ থেকে ছোড়

শুষে নাও জন্ম-জন্মান্তর কাম-ঋণ অভিশপ্ত বিষ

পিঙ্ক মুন

                    চাঁদ উঠেছিল, সোনালি চাঁদের
ক্ষুব্ধ লাভা-আভা গলা বেয়ে নেমে গিয়েছিল
বহুদূর। সেখানে ক্ষুধার্ত মহাদেশ। শিকলের
এক প্রান্ত শান্ত। আরেকটি মুখে বাঁকানো বঁড়শি
স্তব্ধ চরাচরে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র। ছেঁড়া
ভূর্জপত্রে কুকুরের বহুজন্ম রেচনের ফোঁটা
গড়িয়ে চলেছে। আলোছায়ামায়াভরা গাছ
বল্মীকের কাছে পড়ে আছে রক্তমাংসভরা গ্রাস
নরম পাথর স্তনে বারবার আলো পড়ে, গলে যায়

তার পরিধীর দিকে নিষ্পলক চেয়ে আছে চিরমুগ্ধ ব্যাস

আবিষ্কার

তখনও পোতাশ্রয়ে তার নোঙরের দোলাচল
আমাকে অধীর করেছিল। অথচ আহত-নদী
                            শুষে নিই স্টিমার-সন্ত্রাস
ঝড় ওঠবার আগে আবিষ্কার করি নাভিবিন্দু-লাল
বাতাসে ধাতু-শিকলের ঝনঝন
হাঁ-মুখের কালো গুমঘরে তাকে গিলে নিই, ফলে
সার সার ঝাউবন ছড়ানো পানের পাতা বেড়া-বাঁধা কুঁড়ে
                                                  সব অটুট থেকেছে

অসেতুসম্ভবের পথে স্টিমার ভেসেছে জল-পাথরের বুকে
জলের ভেতর পাথরের চাঁদামাছ পাথর-জ্যোৎস্না
পাথরের গায়ে খোদিত তারার সার

কিছুই ঘটেনি শুধু ফুরোবার আগে
একটি আহত রাত রক্তবমি করে মরে গিয়েছিল

দোতারা

জীবন কী আশ্চর্য দেখ, সে আবার সাত-ঘাট ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ঠিক টেনে নিয়ে এল ছেঁড়া-তার দোতারার ঘরে। দু-একটি নয়নতারার ঝোপ, মাটির দাওয়ায় পিঠ রেখে ঘুম নিদ্রা-ঢলে গেছে। তোমার আঙুলে এত সূক্ষ কারুকাজ আজ জানলাম। হলুদ কাপড়ে এত হলুদ হরিণ… সুতোর হরিণ… যেন তারা এক্ষুনি পলাশের বনে ঘুরতে বেরুবে। জীবন কী আশ্চর্য দেখ, গতজন্মে হঠাৎ যখন তার ছিঁড়ে গেল আঙরার গনগনে স্তূপে তোমাকে বসিয়ে আমি পালিয়ে গেলাম। আজ তোমাকে দেখার পর সে আমার চোখে জল ভরে আসে। তুমি যেন ঠিক ব্যর্থ-আত্মহত্যা শেষে ফিরে আসা মেয়ে। দড়ি ছেঁড়া। মৃত্যু অনেক কষ্টে যাকে জীবনের কাছে বসিয়ে রেখেছে

Spread the love
By Editor Editor কবিতা 11 Comments

11 Comments

  • ভাল লাগল। বিশেষ ক’রে ‘আবিষ্কার’।

    জা তি স্ম র,
  • চমৎকার লেখা। শেষ দুটি লেখা তুলনাহীন ভালো। এখনও একই মুগ্ধতা পার্থজিৎদার লেখার প্রতি।বিষাদ হন্তারক এমন লেখার জন‍্য আন্তরিক ভালোবাসা রইল।

    Pankaj Chakraborty,
  • জমতে জমতে মধু শেষ লেখায় এসে যেন পরিপূর্ণ হল কলস। হলুদ হরিণ হল! সত্যি অনেক কষ্টে এই জীবনের কাছে বসে আছি কবি! শুভেচ্ছা জানবেন…

    প্রীতম বসাক,
  • প্রতিটি কবিতায় অনবদ্য। আন্দোলিত করে। শ্রদ্ধা, প্রিয় কবি….

    কৌশিক সেন,
  • মুগ্ধ

    ভজন দত্ত,
  • অসীম মুগ্ধতা

    মনোতোষ আচার্য,
  • শেষ দুটি কবিতা খুব সুন্দর। সকালে উঠেই পড়ে মন ভাল হল। দ্বিতীয় কবিতায় বানানটা ‘পরিধি’ হত কি? নাকি ‘পরিধী’ শব্দের আলাদা মানে আছে?

    Ratul Ghosh,
  • দেখবার মতো বিষয় হলো এই কবিতাগুলির গঠন, ভাববার কথাও এত ঠাস বুনোটের কবিতা যার শব্দব্যবহার পাঠককে গভীর চিন্তার ভেতরে নিয়ে আসে!
    কবিকে ভালোবাসা।

    Ranajit Adhikari,
  • ভালো লাগল। দোতারা কবিতাটি বিশেষ উল্লেখ্য।

    শতানীক রায়,
  • সবকটা কবিতাই খুব ভালো। তবে একবার পড়ে এ কবিতার রসাস্বাদন পুরোপুরি হয় না। সেভ করে রাখলাম।

    SOUMANA DASGUPTA,
  • অপূর্ব কবিতা সব। আহা দোতারা!

    উজ্জ্বল ঘোষ,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *