পিয়াল রায়ের গুচ্ছকবিতা

ঘুম

মাঝেমাঝে ভাবি ঘুমিয়ে পড়ব এবার
স্বপ্ন দেখব
স্বপ্নে সব ভাঙা জুড়ে দেওয়া যায় সহজে
খুব সহজে ছুঁয়ে থাকা যায় প্রতিবেশির হাত
স্বপ্নে প্রেমিকের চোখ খুব কাছাকাছি আসে

ঘুমোতে ঘুমোতে চলে যাব আরও কোনো
শক্ত ঘুমের দেশে
এক একটা গহন আয়ু যেখানে এক একটা জন্মতে এসে মেশে

দশম জন্ম পরে তাকাব পিছনে
যেখানে কাটাছেঁড়ার ভাঁজে নক্ষত্র বিভূতি
মুঠো মুঠো রয়েছে ছড়ানো শোকে ও সন্তাপে

তবু আমার শরীর, আমার জীবন্ত শরীর
আছে জেগে
ততোধিক উজ্জ্বল প্রানময়ী তাপে

***

অন্তহীন…

… অন্তহীন, তবু এ অপেক্ষার বিরাম নেই
সৃষ্টি স্থিত হতে হতে আজ এই মৃত্যুসন্ধ্যায়
তুলসীর মূলে জ্বালিয়েছে অনন্ত প্রদীপ
শিখা নেই, সলতের ধূসরে কেবল কেঁপে কেঁপে ওঠে
সন্ন্যাস গহীন এক প্রাচীনা বাতাস

কানে কানে কথা হয়, ফিসফিস
প্রেমমন্ত্র ছায়াদরবারী
পুরাতন সে তো ঈশ্বরেরও অভিধান হতে
আরও একবার ঝলকালে আলো
বুঝে নিতে চায় ঘুমন্ত দেবতার ঘ্রাণ
কোথা থেকে এত এত ঘিরে ধরে এসে

গাছেরা বোঝে না প্রেম, গাছেরা নির্বোধ
বনের বিপুল গাথা নিদারুণ চৈত্রের দাহে
কখন যে খেলামনে ভেঙেছে প্রতিরোধ
ভেঙে গেছে খানখান অন্তহীন এ রুধিরার সমস্ত আশ্রয়, আকুল প্রবাহের

***

বিষণ্ণ নৌকো

আমাকে ডেকো না আর
খেলা ছেড়ে সরে দাঁড়িয়েছি আমি
অনেকদিন আগেই

অনেকদিন আগেই আমি আগামীর সমস্ত ভূত
ঝেড়ে ফেলে দিয়েছি খালি পাতার স্তূপে
আমাকে ডেকো না আর অন্ধদের কূপে

স্মৃতি যদি বেদনার হয়
স্মৃতি কিছু না থাকাই ভালো
নিজেরও তো সান্ত্বনা চাই
যেখানে মানুষের মন ঘোরাঘুরি করে
সেখানে না থাকার পক্ষে জোরালো যুক্তির
যেন কমপক্ষে জেনে যেতে পারি
প্রকৃতি বড়োই শূন্যতাপ্রেমী

আমাকে ডেকো না আর
জনৈক মেঘের দেশে আমি একরত্তি পোকা
বসে আছি ঘোলা জলে ডোবানো শরীর
বিষণ্ণ নৌকোর মতো

ব্যবহারের পর যার আর ব্যবহার বেঁচে নেই কোনো

***

পরলৌকিক

যদি এখুনি মরে যাই
এই নিঝুম সশব্দ রাত্রপ্রহরে
পুড়িও না আমায়, মাটিও দিয়ো না

যে মন আজীবন জ্বলেছে শঙ্খশুভ্র লোভে
বিষাক্ত তার শরীর না-জানি কত হেলায়ফেলায়
মৃত্যুর পরে সে বিষ ছাড়া আর কী ছড়াবে?

তবে কেন বাতাস রিক্ত হবে আমার ধোঁয়ায়?
আমার গরলঘ্রাণে মাটি হবে নীল?
আরও কিছু অভিলাষ কেন ছাই হবে জন্মজন্মান্তরের
শুধু শুধু আমার সাদা বিষে?

আমাকে ছুঁড়ে ফেলো অন্য কোনো গ্রহে
যেখানে মানুষ কোটি স্তরে কোটি সাধনার বশে
ভুলেছে বোকাদের প্রেমউচ্ছ্বাস
যেখানে আমোদের হাতে হাতে মন নিয়ে
উজবুক খেলে না মানুষ
ছলনায় ভরে না তুলে অবাধ আকাশ

সেখানেই থেকে যাব আমি দিব্যি বেমানান

এমন নিয়তি যার বেমানান হওয়া
সর্বখানে সর্বপাত্রে গরল সাজানো আছে তার

Spread the love
By Editor Editor কবিতা 11 Comments

11 Comments

  • দারুণ

    Sudipta Chatterjee,
  • বাহ!বেশ ভালো কবিতা❤

    Prabir Majumdar,
    • প্রতিটি লেখার ভেতরেই মেদুরতা এক অনির্দিষ্ট যাত্রায় নিয়ে যায়। কবির বিষণ্ণতার দৃশ্য পেরিয়ে যেতে যেতে কোথাও আমরা যেন আমাদেরই মুখোমুখি হয়ে যাই বারবার। আমাদের বিষণ্ণতাগুলি যেখানে আর আমাদের মত দেখতে নেই। “বিষণ্ণ নৌকো” লেখার কিছু পঙক্তি বিশেষ ভাবে মাথায় রইল। সফর অব্যাহত থাকুক

      – ঋষি সৌরক অরণ্য

      ঋষি সৌরক অরণ্য,
      • অনবদ্, পিয়াল। পড়তে পড়তে একটা ঘোরে মধ্যে তলিয়ে যাওয়াই এই পাঠের নিয়তি। এগিয়ে চলুক এইসব কবিতারা নতুনের দিকে। আলোদের দিকে।

        বিকাশ নায়ক,
  • খুব ভালো। প্রত্যেকটা।

    Arunima Chowdhury,
    • খুব ভালো, পিয়াল। কবিতাগুলোর স্রোতময়তা অনন্য।

      ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায়,
  • তোর কবিতা মানে একটা অন্য জগতে হারিয়ে যাওয়া। বিষণ্ণ নৌকা দারুণ, ঘুম অসাধারণ। অন্তর্মনের কিছুটা মনখারাপের প্রকাশ পেলাম নিজের মধ্যেই। বেশ ভালো। আর‌ও পড়াস।

    Sanyal,
  • বেশ লাগলো পিয়াল।

    SOUMANA DASGUPTA,
  • সবকটা কবিতাই খুব ভালো। সবচেয়ে ভালো লেগেছে কবিতার ইমেজারি। অসম্ভব ইমেজারি দেখি যখন শিখহীন প্রদীপে কেঁপে কেঁপে উঠছে প্রাচীনা বাতাস। সে শুধু প্রাচীনাই নয়, সন্ন্যাসের ধূসরতার সঙ্গে জুড়ে যেন এক প্রকৃত নিঃসঙ্গ আবহ তৈরি করলো, ‘গাছেরা বোঝে না প্রেম, গাছেরা নির্বোধ ‘ অনেকদিন মনে থাকবে। ভুলবো না। কিছু কিছু লাইন যেন সময়কে উত্তীর্ণ করে চলে যায় এরকম সহজ কথাতেই।

    ‘বিষণ্ণ নৌকো ‘ দারুণ ‘আগামীর সমস্তভূত’ – কি অদ্ভুত কন্ট্রাস্ট! আর ‘প্রকৃতি বড়োই শূন্যতাপ্রেমী’ অহো।
    বিজ্ঞান-সম্মতভাবে জানি প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না। কিন্তু কবিতায় পেলাম একেবারে উল্টো বক্তব্য। যতদিন যাচ্ছে মানুষের মন ততই যে ক্রমশ শূন্যতার দিকে এগোচ্ছে, এ যেন তার-ই বার্তা।

    সানি সরকার,
  • খুব ভালো, পিয়াল। কবিতাগুলোর স্রোতময়তা অনন্য।

    ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায়,
    • “প্রেম মানে প্রতিক্ষা,অবসান নেই।”
      পিয়াল,
      আরও প্রতিক্ষায় আমি।

      নীল,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *