রিমঝিম আহমেদের কবিতা

জলমঙ্গলধ্বনি

অহমের ভিতর তোমার ডুবে যাওয়া আমাকে বিচলিত করে। কত পাতাঝরার কাল ফিরে গেল, পিঠখোলা বারান্দার খোলা চিঠি হাওয়ায় উড়ে যেতে উদ্ধত— তুমি তাকে ফেরালেও না। কী আছে লেখা ওতে, কত বাক্য অপচয়, কত কাটাকুটি আর পরিশ্রম শেষে ডাকবাক্সে গেল, তুমি তার মোমের হিসেবটুকুও নিলে না।

মহামারিকালে কত উড়ো অর্চনা, নিবেদন হলো মানুষের তল্লাটে! না হয় তোমার কাছের-দূরের কেউ নই। একরত্তি প্রাণে তবু বাঁচার আকুতি। কেন যে একমুঠো ধান, এক আঁটি দুব্বা তুলে দিলে না আশীর্বাদের ধোঁয়া!

হাওয়ায় খুলছে-বাঁধছে জানালার কবাট। ছায়াচক্ষু ভেবে তুমি ভয় পেয়ে ফুঁ দিয়ো বুকে। আমি আছি তালপাতায় হাওয়া দিয়ে, সোনারুপা জল দিয়ে বিপদ তাড়াতে।

স্ফটিক ভোরের গল্প করপুটে পড়ে রইল। তুমি বললে— গ্রহের সবার আলস্যদোষ। অসুখ সারেনি কারো। অথচ ভুলে যেতে চেয়ে সবাই নিপাট ঘুমোতে যায় ঘর অন্ধকার করে। ঘুমের ভিতরে নদী আসে, মশলার বন ঘেঁষে স্রোতসুর বয়ে যায় । হাঁসের সফেদ পালকে জমে ওড়ার বাসনা। তুমি বললে— ঘুম মানে চোখ বুজে থাকা নয়।

ভোর স্পষ্ট হলে তেড়ে আসবে ভাষাজ্ঞান। পাঠশালা, মুখস্থবিদ্যা, কথার ভিতর কথা। পাতার গান বুঝতে যদিও কারুর বর্ণমালা লাগে না।

বেঁচে থাকা মানে আবার তোমাকে দেখা নয়। কেবল পাতার ফোঁকরে উদ্বেল রৌদ্র ও হিম। এত গাঢ়, এত স্তব্ধতার দানা। বাতাসে সহাস্য মৌরির দোলন। এই যে নীলাভ মৃত্যু বাঁচিয়ে ফের শ্বাস, ফের বেঁচে থাকা মানে তো তোমার কাছে যাওয়া নয়! সে প্রয়োজন ফুরিয়েছে গত হৈমন্তী বিষণ্নতার পরে। একঝাঁক জংলি পাখির উড়ে যাওয়া, ঘোর ও ঘরে রোষাগ্নির আলো— পেতে রাখা ঈর্ষার পিপাসাসিম্বল। দৃষ্টির অতল গ্রাসের অলক্ষ্যযাত্রা বিষণ্ণ পতন শেষে যে বিন্দু মিলিত হয়েছে শুভ ও অশুভে।

অনেকটা বর্ষাকাল পার হয়ে বুড়ো হয়ে যাচ্ছি । নদীতে একা একা ভেসে যাওয়া হয় না। মাঝরাতে চাঁদের আলোর নিচে হেঁটে হেঁটে দূরে— বন্ধ ঝাঁপ খুলে দোকানিকে বলা হয় না— অনেক তো ঘুমিয়েছ, বাপু! এক কাপ কড়া করে চাও দাও দেখি! নিয়ন আলোর নিচে আমার নারীর ভেতর আড়মোড়া ভাঙে পুরুষ। চুন-মনোমোহন জর্দা মেখে পান খায়। তারপর আয়েশ করে বিড়ি টানে। মুখ-জিভ লাল করে অন্ধকারে হাঁটে। বেশ্যার বিভূতি হাতভরে নিয়ে মেখে দেয় নিজস্ব নারীর আঁচলে। অনেক বসন্ত পার হয়ে কুঁচকে যাচ্ছি। চোখের সামনে বড়ো হচ্ছে সন্তানের নখ। ছোটোবেলার শুকিয়ে যাওয়া নদীর স্বরগ্রামে সরস্বতী সাঁতার সেরে বসে। তার ভেজা আঁচল লেগে থাকে ঘাসে, চুলে । আর… আমার অসুখে।

নিজেকেও মনে নেই। আমিই আমাকে কোথায় হারিয়ে এসে স্তব্ধ হয়ে বসে আছি! কোন নদীর ধার ধরে হাঁটতে হাঁটতে কী করে অরণ্যে ঢুকে পড়লাম! এই তারাফোটা ভ্যাপসা আলো, ধুলোর অন্ধকার হাতে নিয়ে বসে আছি। পেট থেকে বুক, বুক থেকে জিভ অব্দি জরার গন্ধ পাই। স্মৃতিভ্রষ্ট সোনালি মাছের মস্তিষ্ক কালের সমস্ত হিসেব গুঁড়িয়ে দিতে দিতে একবার বলে ওঠে— আরও নৈকট্যে এসো! নিজের ঠোঁট থেকে আলজিভ আরও গহীন রক্ত কণিকার ভিতরে, খুঁজে নাও নিজেকে। যেখানে মানুষ আর পৃথিবী বলে আলাদা কোনো শব্দ নেই।

Spread the love
By Editor Editor কবিতা 6 Comments

6 Comments

  • ভালো লাগলো। পড়ার পর অনেকক্ষন রেশ থেকে যায়।

    Kaushik Sen,
  • মর্মছোঁয়া লেখা

    গৌতম চৌধুরী,
  • অন্যরকম ছোঁয়া। ভালো লাগা।

    শীর্ষা,
  • কী সব লেখা ! চমৎকার ! আহা ! পিপাসাসিম্বল তো চমৎকৃত করে দিল !

    অমিতরূপ চক্রবর্তী,
  • আরে বাপরে,দারুন লেখা সব…

    সোহেল,
  • খুব খুব ভালো লাগলো লেখাগুলি। মায়াময়, শান্ত।

    কৌশিক বাজারী,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *