শতানীক রায়ের কবিতা

প্রবল ভাষার সংসারে কিছু শব্দ


প্রেম এখানে এক বাঁকা নদীর আত্মা হয়। মরা মানুষের কল্পনাহীন কালো সুষুম্নার মতো সব ধূ ধূ করা প্রাণ। ভোর হয় জানার পরও ভোর হবার কথা বলি জানালা আস্তে খোলে জেনেও আলতো খোলে চোখ… এই আমি অপার মানুষের ওপর দুধের সর রেখে যাই বারবার… তখন মৃগনাভির ঘন আঁশ ছাড়ানো প্রেম কখনও দূর্বা ধান পরাগের বিদ্যা ঘেরা জীবনে প্রতিবার আসে, ধানসিড়ি ওহো! ভ্রমের শূন্য পাঁজর জুড়ে সবই আছে সব মাটির আকারেই দীর্ঘ ই হওয়া পাতা খুলল আর আমি ব্রহ্মকীট হয়ে থেকে গেলাম


সে আসে বৃক্ষ হয়ে। আমাদের বাড়ির বাস্তুসাপ ঘুরে বেড়ায় উঠোনে। হা জ্যোৎস্নায় পৃথিবী উন্মাদ হলে রজনীর মৃত্যু হয় আর সে দেহ থেকে উন্মত্ত ভৈরবের উদয়। দ্যাখো কেমনভাবে পুড়ে গেল বাড়ি। আমাদের সন্তান এখনও অসীম উল্লাসে মৃত গাছে জল দিয়ে চলেছে। হে আয়ু, আরও দীর্ঘ হও এভাবে ঠিক আমাদের পোড়া বাড়িতে গাছের আশা বড়ো হবে


আয়নার ভেতর ব্রহ্মকে লালন করো। উদ্যত সাপ দেবতার গান গায় এ গৃহে ও গৃহে নির্মাণ করে বাঁশি পশুর মতো নিরন্ন হয় অথবা লিঙ্গ তুলে ধরে শূন্যে। ভেসে থাকো ভেসে যাও আয়নায় তোমার বয়স আরও শতায়ু দীর্ঘ হবে নরম শাকপাতার স্পর্শে লাঙলের এটাই হয়। পুনরায় ভাবো রাতটুকু নিয়ে পুরাকাহিনি সব শেষ হয়ে যাচ্ছে, কেন তোমার কন্যা জলের কাছে গিয়ে ডাকছে, মা গো মা, স্বার্থহীন কবন্ধ এক লাঙলের ফলার আঘাতে জন্মায়, যোনি তৈরি ক’রে পুরুষের চারণ তবুও প্রজাপতি হয় না । এভাবে ভাবতে গিয়ে অদ্ভুত একটি পুরোনো বনে প্রবহমান নদী হয়ে গেলাম।


সুপ্ত চাদরে মুখ ঢাকি। তোমার শব্দ বহু দূর ভেঙে আসছে মাটিকে পাখিরূপে দ্যাখো, শুয়ে পড়ো… আমাদের বাগানের চন্দনগাছে লেপ্টে আছে ঠাকুমা মাঝরাতে উড়ে বেড়ায় সে এক গাছ থেকে অন্য গাছে চাঁদ ধরতে যায় পুকুরের পাড়ে। গভীর ডুবি আমি ঘুমে মাংস খুঁজি ভুলে যাই, ও যে একটি মানুষ হারিয়ে যায় অভয়ারণ্যে আর মায়ের কাছে গান শেখে মোহ শেখে পাখির আওয়াজ শেখে হেঁটে যাওয়া উজ্জ্বল বকের ডানায় যাপন করে। অনন্তরূপী এই গল্পগুলো ধীরে বেড়ে উঠতে উঠতে তোমার মৃত মুখে ছায়া পড়ে হাতের…


অনেক দিনের কথা, আস্তে আস্তে শবাসন ভেঙে ফেলছে মাছরাঙা পাখি… তির লাগা পাখিটা তার জরায়ুতে সন্ধান করছে পুরোনো দেশ। ক্লান্ত হচ্ছে পুঁজ ঠেলছে। কীভাবে তোমার শরীরে লক্ষ বলি হয়েছিল জানো? পাহাড়ি মেঘ ভেঙে কোথাও একটা লুকিয়ে যাই। পেটের ভেতর বর্ষার জল টুপ টাপ পড়ছেই : নরম হই… কীভাবে তাহলে আমার রূপের কল্পনা করছে মেছো জগৎ… কল্যাণ ঠাটে রাখা শত বছরের বৃষ লগ্ন সে সময় কি বেঁচে থাকবে! টুপটাপ আওয়াজ শোনো ভাঙনের লাশ শোনো নির্ঘুম নির্জন হয়ে আছে কোটি বছর…


শব্দব্রহ্ম, তুমি এসো। গায়ের সঙ্গে কেমন পোকা লেগে আছে ছাড়তে চাইছে না! শব্দের কাছে ঋণ রাখব যাতে রক্ত উঠে আসে দেনায়। কলম ডোবানো কালির দোয়াত উলটে গিয়ে নদী ছড়িয়ে যায়… ছড়িয়ে যায়… কতবার এই একা হওয়ার ভেতর মগ্নতা আছে আবার ক্ষয়ও আছে। আমার রক্তকরবী থেকে লাল উথলে উঠে ছলকে গেল মানচিত্রে জলে ওরকমই ভিজে যাই আমি। এখানে কিছু নেই যা কিছু সব বিলীন হয়ে গেছে আত্মজীবনীর পৃষ্ঠায় মানুষ ভেসে গেছে, ভাসতে ভাসতে তারা অসংখ্য মানুষ হয়েছে…

Spread the love

8 Comments

  • লেখা বদলে গেছে। ভাবনাবৃত্তে মানুষের গল্প এসেছে বলে অভিঘাত আরও তীব্র হয়েছে! সবচেয়ে ভালো লাগছে শেষ লাইনে কোন চমৎকারিত্ব সৃষ্টির প্রয়াস নেই। খুব স্বভাবিক কোন সাপের চলে যাওয়ার মত এই লেখার ঠাঁট….কবিকে শুভে।

    প্রীতম বসাক,
  • একটা ঘোর যেন লেগে গেল! তোমার কবিতায় বরাবর আমি একটা সিদ্ধ জোনাকির দেখা পাই। নিপুণ অন্ধকারে স্নিগ্ধ আলো।

    প্রীতম বসাক,
  • তৃতীয়ে যা বলেছি, আবার বললাম। জয় মা সন্তোষী আর ঋত্বিকের মাদার আর্কিটাইপ কখনো একপাতে রাখা যায়না। যে কোনরকম দক্ষিণপন্থার কেন্দ্রে সুপ্ত ভাববাদ একেবারে শিকড় গেড়ে বসে থাকে৷ প্রবেশপথ দেখানো তো না হয় পাঠকের স্বার্থে, এই প্রস্থানের পথ খুঁজে না পাওয়ার ব্যর্থতা কার স্বার্থে? আগাগোড়া একটা পরিস্থিতি বল যেখানে তুই সামন্ততান্ত্রিক সংস্কার উল্লেখ করার পাশাপাশি তাকে ভাঙার রাস্তাও দেখিয়েছিস? দেখাস নি। তোর লেখা, এমনকি, ইতিহাসাশ্রিত-ও নয়, পুরাণধর্মী রূপকাশ্রিত। ফর্ম নিয়ে কিছু বললাম না। ফর্ম ভাঙার চেষ্টা কোথাও দেখলাম না, তাই।

    অত্রি ভট্টাচার্য্য,
    • আয়না আয়না! আমার কবিতা হল আয়না।

      Shatanik Roy,
  • কম্প্যাক্ট লেখা। ফিলার প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে পাঠককে অধিক মনযোগ সহকারে পড়তে হবে, তবেই এই লেখার কাছাকাছি যাওয়া যাবে। ভালো লাগলো, শতানীক

    Sudip Chattopadhyay,
  • কম্প্যাক্ট লেখা। ফিলার প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে পাঠককে অধিক মনোযোগ সহকারে পড়তে হবে, তবেই লেখাগুলির কাছে যাওয়া যাবে। ভালো লাগলো, শতানীক

    Sudip Chattopadhyay,
  • শতানিক, এই কবিতাগুচ্ছে আমি মানুষ এবং মানুষকেই খুঁজে পেলাম তার আবহমানের হয়ে ওঠার স্বপ্নে, না – হয়ে ওঠার সংশয়ে. ভালোলাগা জানালাম.

    শতদল মিত্র,
  • লেখাগুলো ভাল লাগল শতানীক ৷ আরও লেখ ৷ শুভেচ্ছা ৷

    অমিতরূপ চক্রবর্তী,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *