Categories
কবিতা

সঞ্জনা রায়ের গুচ্ছকবিতা

বেপরোয়া রাত্রিগুলি

আর কোনো ইশারায় তোমাকে ডাকতে চাই না, চাই যে
খরস্রোতা আমার নিশ্বাস আছড়ে পড়ুক
তোমার স্নায়ুর সূক্ষ্ম বুননে।
ঈষৎ হেলানো হিজল গাছ সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
অরণ্যের মায়াতে নিজেকে মিশিয়ে দেওয়ার বাসনায়
দীর্ঘদিন ডুবে থাকতে থাকতে
সে ভুলে গেছে আমাদের চারপাশ,
ভুলে গেছে কী বিস্ময়েই-না জগতের একেকটি
রহস্য ভেদ করতাম দুজনে ছায়ার অতলে গিয়ে!
তীব্র জলোচ্ছ্বাসে প্রায় অচেতন হয়ে যেতে যেতে
বুঝে নিয়েছি বুকের ভেতরে থাকা বাতাসের গতি—
হিজলের বুকে ওঠাপড়ার শব্দে বুঁদ হতে চেয়ে
রাত্রিগুলি বড়ো বেপরোয়া এখন।

প্রণয়কালীন মুদ্রা

ঘরের সব ক-টা জানালা খোলা আছে
এই প্রখর রৌদ্রেও— লালচে রাস্তার মাঝখানে
দুটি পাখির বিস্তৃত ডানায় প্রণয়কালীন মুদ্রা ফুটে উঠছে।
তুমি কি আদৌ এসে পৌঁছোবে ওই পথ পেরিয়ে ?
সাদা পর্দাগুলো শব্দ করে করে দুলছে।
বয়স আমাদের আর শুধু দূর থেকে ভালোবাসার
পক্ষপাতী নয়, প্রতিরাতে
আমার জাম গাছের ছায়ামাখা বিছানায় তোমার উন্মুক্ত শরীর
কচি পাতার মতো কাঁপতে দেখি, তার বুকে
আঁচড় কাটতে কাটতে ঘুমিয়ে যাই। এও জানি যে,
প্রতিটি ভোরে স্তনবৃন্তের চারপাশে
নক্ষত্রদের আলো রেখে দিতে চেয়ে
ঘুমের ভেতরেই আমার রাতপোশাকের ফিতে খুলে ফেল।

এখন পর্দাগুলো আরও ওলোটপালোট করে দুলছে,
আড়াল থেকে দেখছি— পাখিদুটি
ডানায় কিছু দাগ এঁকে দিতে চাইছে ঠোঁট দিয়ে।

আধফোটা ফুলের কাতরতায়

আমার ফ্রকের কোনা ধরে টেনে নিয়ে এসেছ
এই গম খেতের আড়ালে। সূর্য ডুবতে সামান্য বাকি,
এরকম মরা আলোয় তোমার আঙুল জড়িয়ে বসে থাকলে
স্বভাবতই অন্যমনষ্ক হয়ে পড়ি—
আচ্ছা, এই উজ্জ্বল গম খেতের ছায়া আকাশে পড়লে
তুমি কি সেখানে আমাদের আদল খুঁজে পাও না ?
আমার এলোমেলো চুলগুলোকে ভালোবাসতে-বাসতে
পোশাকের অবশেষটুকু আর সহ্য করতে পার না,
উঁচুনীচু উপত্যকা পেরিয়ে
একটা আধফোটা ফুলের কাতরতায় মুখ ডোবাও—
সময় সশরীরে সেই স্বর্গীয় সুখ অনুভব করে।

ধীরে ধীরে গম গাছের মাথায় ঢেউ থেমে এসেছে,
হলুদ ফ্রকে আমার বুকের একদিক আলগাভাবে
ঢাকা পড়ে আছে— অন্য অংশে আঙুল বোলাতে বোলাতে
তুমি কি সেই নক্ষত্রপুঞ্জের কথা ভাবছ, যার
প্রতিটি নক্ষত্র আমাদের প্রেম প্রত্যক্ষ করবে বলে
দীর্ঘসময় নিজেদের অন্ধকারে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।

ভালোবাসার মুদ্রাগুলি

ছোটো টিলাটির মাথায় গড়িয়ে গড়িয়ে তুলে রাখলাম
লাল সূর্য— এমন রং আমার শাড়ি থেকে
তোমার চামড়া ভেদ করে রক্তে গিয়ে মিশে যেতে পারে।
শিরশিরে হাওয়ার জঙ্গুলে পথ ধরে
এই শেষবিকেলেই তুমি এসে পৌঁছোবে, সূর্যের আড়ালে গিয়ে
বুনো ফুলের গয়না বানাব আর পায়ের আঙুল দিয়ে
আমার ছড়ানো পায়ের পাতায় কী জানি কী এঁকে দিতে চাইবে !

কেমন ভারী হচ্ছে পাখিদুটির মিশে-যাওয়া বুক,
সূর্য নিজেকে লুকিয়ে ফেলেছে
আমাদের কল্পনার বাড়ির পাশের জলাশয়ে।
সুগন্ধি এক সময়ের দিকে চলে যাওয়ার জন্য
তোমার প্রবেশ আরও অনিবার্য হতে চাইছে—
চাঁদ কুঁকড়ে যাচ্ছে দুটি ভিন্ন তরঙ্গের ধাক্কার শব্দে।
তবু আমরা নগ্ন থাকব ততদিন, যতদিন-না
আমাদের ভালোবাসার মুদ্রাগুলি
কালো-হয়ে-আসা পৃথিবীকে রপ্ত করে নিতে পারবে।

যেভাবে হিজল গাছ

আধখোলা দরজার সামনে গিয়ে
তোমার কথা জিজ্ঞেস করি, হিজল গাছ নড়েচড়ে ওঠে ভেতরে।
কোনোদিন স্পর্শ না করেও জানি তোমার শরীর
হিজল গাছের গমগমে অন্ধকার। যে-দিন খালি গায়ে
ঘুমোবে আমার ছড়িয়ে রাখা হাতের ওপর মাথা রেখে—
হাওয়াভর্তি ফুল ফোটার শব্দ এসে জড়ো হয়ে বসবে
তোমার সুনির্মিত বুকের পাটায়, আমার অসহ্য বোধ হবে—
আকাশের সবচাইতে গম্ভীর মেঘের দুয়ারে
কেন রেখে আসতে পারি না তোমার সহজ সবজে গন্ধ !

হঠাৎ টের পাই, দামাল হিজল গাছ আমার দেহে
ফুটে ওঠা উঁচুনীচু কারুকাজে ভিজে ঠোঁট বোলাচ্ছে—
এভাবেই সে অন্যত্র এঁকে দেবে সুরম্য নকশাগুলি।

6 replies on “সঞ্জনা রায়ের গুচ্ছকবিতা”

বেশ লেখা। বহুদিন পর এতগুলো একাগ্র প্রেমের কবিতা পড়লাম। ভালো লাগলো।

চমৎকার। সবগুলোই এমন ভালো যে দ্বিধায় পড়তে হয় কোনটি বেশি ভালো এই সিদ্ধান্তে আসতে ❤

সঞ্জনার কবিতার প্রকৃতি নাক্ষত্রিকচেতনা আমাদের শাশ্বত জৈবজীবনকে আদিম মায়াবন্দরে পৌঁছে দেয় । তাঁর একমাত্র কবিতা পুস্তিকা ও বর্তমান কবিতাগুলোতে এ কথাই অহরহ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *