Categories
কবিতা

হাসান রোবায়েতের সনেটগুচ্ছ

একলা শাওন

তোমার মিনারে মেঘ একলা শাওন
ভিজে গেছে লেবুগাছ, পুরোনো রেডিয়ো
না দেখা মাঠের পর ঠিকানাটা দিয়ো
কুয়াশায় নিভছে যে রেলস্টেশন—
পেঁপের উষ্ণ গোল মেয়েটার বুকে
উড়ছে তালাক যেন ভেড়ার আলোয়
দুপুরের বল ধুয়ে শিশুরা ঘুমোয়
বঁধুয়া ডুকরে ওঠে চির-কিংশুকে—

যদি বলি নিখিলের ভালোবাসারাশি
ধীরে ধীরে পচে যায় বোধ-ব্যাকরণ
ব্রিজের কলাম ধ্বসে যেন কৃষি-লোন
ফাঁপরে চিকরে কাঁদে যূথ বানভাসী
নতুন ব্যথায় পরো যেন নাকফুল:
অদূরে মরণ তার ফুটছে জারুল—

সমস্ত ফুলের মধ্যে

সমস্ত ফুলের মধ্যে কূট গন্ধ থাকে—
বুঝে নিতে চলে গেল পাথরের কাল
ওভার ব্রিজের মেঘে শিলাগুল্মজাল
হাকাও মনের যেন পড়ল তোমাকে
বালিতে ঠুমরি ফুল ফিরে পেল চোখ
হাওয়া পচে লাল হল টমেটোর মন
লোহার ডাহুক ডাকে চিরটা জীবন
শিশুর কাজলে ভেজে বঁধুর গোলক—

শূন্যযোগে ভিজে যাও গার্হস্থ্যের তুমি
ঘরের বিদেশ নিয়ে শরিরীনী একা
লেবুর বিরহ কেটে মায়ার জুলেখা
সহসা উথলে ওঠে ইউসুফের ভূমি—!
নদীর উরোত ধরে না আসো ঘাটের
হাওয়া-পাখোয়াজ বাজে অনাথ কাঠের—

আয়না

এখানে শূন্য মাঠ, ভেজে সংশয়—
কাঠের গভীরে হাওয়া কাঁদছে বিষাদ
শিশিরের বন ভুলে কে রামপ্রসাদ
মুখ থেকে ছুড়ে দেয় মূক অভিনয়
ফুলের বরুণ ঝরে হাওয়ার উপর
নতুন শাড়ির পাশে ঘুমিয়েছে স্নান
খরগোশ পিঠে নিয়ে বনের আজান
ফেরেশতার বাহুমূলে উড়ে যায় ভোর—

কীভাবে সাকিন ভুলে ধুলাপথ-তারা
ব্লেডবৃক্ষে আঁকে ফুল বঁধু ব্যতিরেকে—
মানুষ আয়না কিনে প্রথমেই দেখে
নিজের বেদনা আর গোল হিংসারা
কীভাবে নামছে প্রতিবিম্বে তখন
দূরের শাওনে ভেজে কাদের জীবন—

অবসর

তোমাকে ভাবতে গিয়ে দেখি তারপর
অবসর বলে কিছু নাই এ সময়
নিরর্থের ভাষা দিয়ে গড়ছে বলয়
চিতা শেষ তবু নাভি অনন্ত দোসর—
আগুন একাকী ওড়ে আনগ্ন টোটেম
এখানে বেলের শব্দে টুপছে দুপুর
মাড়াতে পারার ছায়া দূর-বহুদূর
কেউই ফেরে না, ফেরে প্রাচীন অপ্রেম—

অনেক কালের মেঘ অতিকায় খাঁ খাঁ
রুহেরা জড়িয়ে আছে কুকুর-লালায়
সাপিনী সবুজ চেরা জিভের ভাষায়
দিনমান থরথর কাঁপছে বিশাখা
তোমাকে ভাবার কথা, মহাকাল ঠাঁয়
কারা যেন ঘষে দেয় শিরিশে-রেঁদায়

যে পাখি ডাকছে

যে পাখি ডাকছে তার শুনি নাই মীড়—
তোমাকে মনের পড়ে হাকাও বিরহে
দুনিয়ার যত ব্যাধি, জাতকের মোহে
ডেকে যায় চিরকাল ঘুঘুর শরীর
ভাঁড়ামো বিবেক আর কূট মিলমিশ
ফিরেছে সোনার নদী কামলার হেম
দোঁহের শুধাও ব্যথা হারাকিরি প্রেম
আমাকে বলিও সোনা নয়ান কী বিষ—!

পাশায় শোনার নদী, চালে পরাজয়
রূপের প্রতিটা কথা ঘুম গায় দেহে
ভোলার তুমিই ছিলে মিন সন্দেহে
বিবমিষা ঢেলে দেয় পাখির প্রণয়
যে পাখি ডাকছে আমি নাই তার মনে
শরিরীনী তুমি ছিলে ক্লিশে আয়োজনে—

তুমি চলে গেলে

তুমি চলে গেলে উষ্ণ কাঁথাটি সরিয়ে
কাফের কাফের খাঁ খাঁ করছে রেহেল
তুমি কি ভাষার অর্থ—? লাল সাইকেল—?
নিয়ে গেছো ধন-ধান্য-পুষ্প, মরমি হে
আমি কি তুলার রাশি—? করি জাদু-ভান—?
তোমাকে ভুলেই যাবো অস্থি-মজ্জা অব্দি
মায়ার কয়েদি তুমি চলে যাও যদি
কী দিয়ে খুঁজবো সোনা, বাটির চালান—?

জীবন ঝিমায় দূরে কালো মহিষের
তাদের চোখের হাওয়া ঘুমিয়েছে রোদে
আবার হবে না দেখা খালি আমাদের
নিখিল কলহ আর ফাঁপা প্রতিশোধে
কেবলই শরীর ছিল এ জীবনের ভাগে—
মৃত্যুকে ভাষার সবচেয়ে ভালো লাগে

তখনো তোমাকে বলি

তখনো তোমাকে বলি ভালোবাসো সোনা
যখন পুড়ছে চক, কৃষি-রসায়ন—
মেদের মোহিনী বাঁকে তোমার শাসন
সাপিনী পাকায় বেড় সুগোল বাসনা
ঝিম মারে ক্লোরোফর্ম বাতাসে ফনার
উড়ে উড়ে ছায়া করে ফাঁপা যোনিমূল
আধির ভেতরে গায় বিদেহ বাউল
শিমুল ফুটছে যেন জিহ্বা খনার—

রাধা ও রমণ যেন বিষয়-আশয়
মোষের তুখোড় চোখে খাঁ খাঁ ভূমি-জলা
সিমার পড়শি মূলে মরমে উতলা
ছিল কূট আফিমতা বঁধুয়া না সয়
আমরা শাফল খালি নিখিল তাসের
অহেতু হলেও বলি ভালোবাসো ফের—

ধুলার রাসুল

‘ভালোবাসা মরে যায় সুনিদ্রার পর—?’
হয়তো নিবিড় শ্লেষে দূরে যাওয়া যেত
যেখানে প্রায়াম-পিতা ঘুমে সমবেত
বাতাসে ভাসছে লীন ইয়াকুবের স্বর—
তোমার দু চোখ ভাসে আলিফ ও লামে
পাহাড়ি মেষের থেকে ভিন উপকূল
উড়োমান শাদা মেঘে ধুলার রাসুল
পাখির কুটুম সুরে ডাকে কার নামে—

হাওয়ার ড্রাগোন এসে বঁধু অনায়াসে
কলিজা কামড়ে ধরে মোহিনী আগুন
জ্বলছে কূটিল হাওয়া মরমে দারুণ
কাউন শীষের রেণু কাঁপে পরিহাসে—
গমের আড়ালে ডোবে সূর্যের যূথ
তোমার গ্রীবার প্রতি পড়ছি দরুদ—

মেজবান

এখানে ধুধুল বন খুঁড়ো না কবর
কাফন সরায়ে রাখো দূরে মেজবান
কোথাও ফুটছে ভাষা হলুদ বাথান
থরে ও বিথরে কাঁপে সোনালুর জ্বর
হাওয়ায় ভাঙছে ধীরে তুলার পাঁজর
সেসব আওয়াজ শুনি পাখির জবান
কাঁঠাল মুচির ঘ্রাণে ভাটিয়ালি গান
ক্ষমায় রাখিও সোনা আমার ওজর—

সন্ধ্যার আকাশ যেন ট্রানজিস্টার
হাতির মতন রাত নামছে পাড়ায়
শিশুফুল নিমগাছে ঝরে বেশুমার
বাতাস বাতাস ডাকি আমূল খড়ায়
চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ে হাহাকার
কারা যেন সারারাত ডিজেল ছড়ায়—

আলতামিরা

নিছক বাতাস তুমি জানতে চাও নি
কীভাবে সকাল নামে ফ্যাসিস্ট সমাজে
যেন কোনো ইহুদির মুঠে জমা আছে
ইজরাইলের ফনা, বিত্রস্ত পারানি
কোথাও টুপছে রোদে হাওয়ার শুনানি
এলিয়ে পড়ছে দিন ঘাসের নামাজে
কে এক বাউল গেল মনীষার কাজে
মাটিতে কাঁপছে দূরে জীবনের গ্লানি

দুপুর কাঠের পাশে থেমে আছে বেল
আতার শাওন ঘিরে শিশিরের হিরা
আলোর সোহাগ দিয়ে খুলছে রেহেল
গোধূলি চাটছে মোষ, নিশির পাখিরা
ঘুমাও ঘুমাও সোনা মায়ার মিশেল
বাইসনের রক্তে লাল হয় আলতামিরা

কসম-কিরাতে

কীভাবে তোমাকে চাই কালপরিখাতে
খরিপ হাওয়ার বুকে দ্বিদল দোসর
যদি না বাজছে মনে চোখের কাসর
হঠাৎ উট্কে দেখি নাই মাঝ রাতে
বরুণ ফুলের ছায়া ভাসছে জলাতে
তখন উদাম নামে মেঘের হাসর
তোমার হাতাশে ঝা ঝা বিরহ-বাসর
ইশকের কী যায় আসে কসম-কিরাতে—

নিয়রে ভিজছে ব্রিজ দূরের বাতাস
চালতার রঙে ঝরে পাখির খবর
মরণ জারুল যেন বেগনী সুবাস
বালিহাঁস উড়ে যায় দু’ফাঁক কবর
পালকে তাদের কাঁপে সুরা ইখলাস
সারাটা আকাশ জুড়ে জের ও জবর

বনের ধুধুল পথে

একদিন, অকস্মাৎ এই মুখ আর
তোমার রাস্তার ধুলা, বাড়ির ঠিকানা
হারায়ে সাকিন-সাং নিধুয়া নিশানা
পুঁথির চলনে ভাঙে নদীর দু ধার
ফেরার ছিল না ঘর অঙ্গুরি কে তার
নিয়ে গেছে দূর হ্রদে কচুরির পানা
হয়তো পাতার ঝরা কাকাতুয়া-ডানা
বনের ধুধুল পথে বাজায় সেতার—

কারা যেন ফেলে গেছে ধানের জিকির
জুমার ঘরের ধারে ওয়াক্ত নামাজ
টোকানো জুতার ফিতা, শিশুর চিকির
দূর রাতে ভিজে গেছে কায়েদার ভাঁজ
তোমার গন্ধের দাম আধুলি-সিকির
পড়ে পাই নিমতটে আজান, আওয়াজ—

সুবহে সাদিক বঁধু

সুবহে সাদিক বঁধু নাভির সে তিল
সুবহে সাদিক বঁধু জানু মায়াবীর
সুবহে সাদিক বঁধু ত্রিভুজের চিড়
সুবহে সাদিক বঁধু বুকের আঁচিল
সুবহে সাদিক বঁধু চুমু-আবাবিল
সুবহে সাদিক বঁধু নোনতা প্রাচীর
সুবহে সাদিক বঁধু সরল হাঁচির
সুবহে সাদিক বঁধু মোহিনী বেদিল

এখানে উনুন-বীথি থেমে গেছে গান
খাঁড়ির ওপারে মেঘ নয়ান পোড়ানি
ব্লাউজ উপচে বোঁটা সুগোল সিঁথান
মরমে উথলে ওঠে কী যে বান জানি—!
শরীরে হাতাশ নিয়ে খুঁজেছি নিদান
তোমার টোলের পাশে হই কুরবানি—

রাসুল, রাসুল

খুব সুরে নিভে গেছে জলের প্রহর
কাফের তাকায় যদি আঁচিলের দিকে
বেরহম ভান করো কী ছোবল-শিকে
অনায়াসে মিশে যাবে মীন, তারপর—
তোমার কোমর বেয়ে গোখরা-নজর
ছুড়ে দেয় লকলকে জিভ-পাখিটিকে
ভাষার ভেতরে নদী ঢেউয়ের অলিকে
চিতল নয়ানে করে অবাক সফর—

কোথাও কামের দিন পাকছে গোধূম
রোদের ভেড়ারা এসে ফেলে গেছে উল
গহনা খুলছে মেয়ে বাসর-উশুম
আগুন পোড়ায় লোহা নুনের ত্রিশুল
সোনার নদীর দূরে শাহ মাখদুম
জিকির করছে স্রোতে—রাসুল, রাসুল

4 replies on “হাসান রোবায়েতের সনেটগুচ্ছ”

হাসান ভাইয়ের দুটো বই পরে পাগলা হয়ে গেছি। সনেট প্রথম দুটো মারাত্বক। “আলতামিরা” আপনাকে ভীষণ টেনেছে। এই সনেট গুলি যদি একটা বই হিসেবে প্রকাশ করা যায় কেমন হয়? হাসান ভাইয়ের আরো লেখা পড়তে চাই।

অতি দক্ষ ও অনন্য ভাষার লেখা পড়লাম।বিশেষ করে সনেটে এমন শব্দ ও ভাষার প্রয়োগ আমাকে মুগ্ধ করলো।কবিকে আরো পড়বার আগ্রহ রইলো।শুভেচ্ছা রইলো তার প্রতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *