করোনার দিনগুলিতে: পাপড়ি রহমান

লকডাউন দিনরাত্রির মর্সিয়া

অতিমারির এই দিনগুলোতে সবকিছুই কেমন ধীরে অথচ নিঃশব্দে বদলে যেতে শুরু করল। ধুপছায়া মেঘের একটা বিশাল চাঙারি উড়ে এসে যেন আচানক আড়াল করে দিল প্রত্যহের দেখা নীল আসমান। এখন ব্যালকনিতে দাঁড়ালে নীলের সামান্য চূর্ণও আর নজরে পড়ে না, আসমান দূরে থাকুক। দৃষ্টির সীমানায় শুধু সারি সারি দালানের ম্লান-মূক দাঁড়িয়ে থাকা। সম্প্রতি অঢেল ক্লান্তি এসে তাদেরও যেন একেবারে গ্রাস করে ফেলেছে! চিরচেনা রাজপথটা ক্রমে হয়ে উঠল জনশূন্য। অথচ একদা এই পথ তুমুল কোলাহলে মুখর ছিল! আর তাতে নিয়তই শোনা যেত জীবনের সংরাগ। কী এক পাথর সময়কে বুকে ধারণ করে বাতাসও এখন স্থির। যেন সে বইতে চেয়েও আর বইতে পারে না। নড়তে চেয়েও নড়তে পারে না একচুল! যেন কোনো পরাক্রমশালী দৈত্য বড়ো বড়ো জারের ভেতর বাতাসকে পুরে কৌশলে ঢাকনা লাগিয়ে দিয়েছে। ফলে দিনের শরীরে, রাতের শরীরে নিরবিচ্ছিন্ন দমবদ্ধ গুমোট! দূরতর দ্বীপের মতো এখন এক-একজন মানুষ। জলমগ্ন, অস্থির, ভয়ার্ত! সময়টা যেন নিজেকে চেনার, নিজেকে দেখার আর খুব ভালো করে উপলব্ধি করার। জীবনের ভুলগুলি অনুধাবনের জন্য যেন মোক্ষম এক সময়। আবার বহু শ্রমে জীবনের যে-ফুলগুলি ফুটেছে, সে-সবের সৌন্দর্য নিবিড়ভাবে দেখার প্রকৃষ্ট প্রহর। কেন আমাদের এই মানবজন্ম? আমরা কোথা থেকে আসি আবার কোথাই-বা ভেসে চলে যাই? ‘এই মানবজন্ম আর কি হবে? যা কর ত্বরায় কর এই ভবে’— এই অনুভবে নিজেকে জারিত করার এমন স্কোপ ইতোপূর্বে আর আসে নাই! দূরতর দ্বীপের চারপাশে অবিরাম জলের ম্রিয়মান ঘুঙুর শুনতে শুনতে এ-সব নিয়ে নতুন করে ভাবা যেতে পারে। স্থবির সময়ের এই লকডাউন কেমন যেন শংকাজনক, ভয়াবহ এক একাকিত্বে পূর্ণ। অথচ বন্দীত্ব কিন্তু আমার কাছে হঠাৎ বজ্রপাতের মতো নতুন কোনো ঘটনা নয়! এক অর্থে আমি চিরকালই অন্তর্গত লকডাউনের মানুষ। যদিও সবকিছুই বাইরে থেকে সবাই নরমালই দেখে আমার, কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি লকডাউনেই থাকি। এই লকডাউন হল নিজের কাঙ্ক্ষিত লেখাটি লিখবার প্রস্ততি। নিজের না-পড়া বইটি পড়বার আকুতি। বা নিজের অত্যন্ত প্রিয় মানুষটির সাথে দেখা হবার প্রস্তুতি। কিংবা যে-অন্তহীন বেদনা আমি সারিয়ে তুলতে পারি না, তাদের নিয়ে নিভৃতে আহাজারি! অথবা এই সমাজসভ্যতার কিছু অনিয়ম, কিছু অত্যাচারের প্রতিবাদ করতে না পারার অক্ষমতার জন্য নিজের ভেতরের যন্ত্রণাকে দমিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা। এমনিতেই আমি ভিড়ভাট্টা একদম ভালোবাসিনে। খুব একাকী কোথাও চুপচাপ বসে থাকতেই ভালো লাগে। এই একাকিত্ব হল আমার ভাবনার জাবর কাটার জন্য দরকারি। তবে কোভিড ১৯-এর লকডাউন, আমার বহুকালের চেনা সেই অন্তর্গত স্বেচ্ছা-লকডাউন নয়। এই লকডাউন একেবারেই অচেনা। অত্যন্ত অন্যরকম! নিদারুণ ভীতিকর ও মুমূর্ষু প্রায়! এর কারণও নানাবিধ। এত দীর্ঘ সময় কর্মহীন থাকলে আমাদের এই দরিদ্র দেশের নিম্ন আয়ের বেশিরভাগ লোকজন অনাহারেই মারা পড়বে। বিষয়টি উভয় সংকটের মতো। যেন জলে কুমির আর ডাঙায় বাঘ! এই লকডাউনের কারণেই দেশের অর্থনীতিতে ধ্বস নামছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাষ্ট্র। এইসব ভাবনা আমাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে তুলছে ক্রমান্বয়ে। জীবন নিয়ে শংকা, দেশ নিয়ে শংকা, দেশের মানুষ নিয়ে শংকা, আশপাশের পরিবেশ নিয়ে শংকা, পরিবার ও প্রিয়জনদের নিয়ে শংকা, এরকম দুর্যোগকাল খুব বেশি আসেনি আমার জীবনে। নিউজ দেখে মন খারাপ করে বসে থাকছি। কত হাজার হাজার মানুষ মরে গেল, তারা খামাখাই তাদের আয়ু ফুরিয়ে ফেলল! অথচ এমন অপঘাতে মরবার কথা হয়তো তাদের ছিল না। তারা নিজেরাও ঘুণাক্ষরেও এমন মৃত্যু নিয়ে ভাবেনি কোনোদিন। এইরকম ক্রান্তিকালে পড়া বা লেখা কিছুতেই সম্ভব নয়। বই টেনে নিচ্ছি, দুই লাইন পড়েই বন্ধ করে রাখছি। বাইরে যেতে পারছিনে এ নিয়ে কোনো আক্ষেপ অবশ্য আমাকে আক্রান্ত করতে পারছে না। আমার বিষণ্ণ লাগছে তাদের কথা ভেবে, যারা অসুস্থ হচ্ছে, আর মারা যাচ্ছে বিনাচিকিৎসায়। হাসপাতালে স্থান সংকট! চিকিৎসা সংকট! ফলে এই বন্দীত্ব মৃত্যুর বিভীষিকা নিয়ে আমাকে ক্রমশ অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। যেন এ থেকে আমার আর মুক্তি নেই! মুক্তি ঘটবে না ইহজীবনে। হয়তো কোনোদিন আর আমি দেখব না সুস্থতা ভরপুর আলোকিত কোনো সকাল! জীবনের ঔজ্জ্বল্য নিয়ে ফুটে থাকা রাত্রির তারকারাজি। কালো তোরঙ্গে আমাদের মহার্ঘ্য জীবন তালাবদ্ধ করে রেখেছে এক অদৃশ্য শত্রু। মহাঅসুখ এসে পৃথিবীর আয়ু ক্রমে খেয়ে দিচ্ছে! আমরা কি আর কোনোদিন সেই আগের মতো নির্ভার জীবনে ফিরে যেতে পারব? ছোয়াছুঁয়ির বিধিনিষেধের বাইরের সেই তরঙ্গিত জীবন! যদি আসে তেমন কোনো সুদিন, তেমন কোনো জীবন যদি ফিরে পাই, তবে পড়িমরি দৌড়ে চলে যাব কোনো নদীর কাছে। জলের হিল্লোলের ওপর ভাসতে ভাসতে খোলা আসমান দেখব। আর ভালো করে খেয়াল করব, কতটা নীলের চূর্ণ উড়ে এলে আকাশকে অতটা পরিপূর্ণ নীল দেখায়!

Spread the love

1 Comment

  • অনবদ্য গদ্যবুনন

    মাহমুদ হাফিজ,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *