Categories
গদ্য ধারাবাহিক ফর্মায়েসি

অনিন্দ্য রায়ের ধারাবাহিক: ফর্মায়েসি

তৃতীয় পর্ব

পিঙ্গল/ ফিবোনাচ্চি কবিতা
(The Fib)

গণিতে ফিবোনাচ্চি রাশিমালার কথা আমরা জানি। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ইতালীয় গণিতবিদ লিওনার্দো বোনাচ্চি ‘ফিবোনাচ্চি’ এর প্রস্তাব করেন। এই সিকোয়েন্সে প্রতিটি সংখ্যা তার আগের দুটি সংখ্যার যোগফল: ১, ১, ২, ৩, ৫, ৮, ১৩, ২১…
ফিবোনাচ্চি কবিতার ধারণাটি আমাদের সামনে আনেন আমেরিকান কবি Gregory K. Pincus।
২০০৬-এর ১ এপ্রিল তিনি বাচ্চাদের একটি সাহিত্য-ব্লগে এই বিষয়ে প্রথম পোস্ট করেন। ৬ লাইনের কবিতা, দলসংখ্যা (Syllable) ফিবোনাচ্চি রাশিমালা মেনে, প্রথম লাইনে ১টি দল, দ্বিতীয় লাইনে ১টি, তৃতীয় লাইনে ২টি, চতুর্থ লাইনে ৩টি, পঞ্চম লাইনে ৫টি, ষষ্ঠ লাইনে ৭টি।

তাঁর লেখা:

Fib Time

Tell
Fibs.
What time?
Every day
Two seconds before
Clock hits 11:24.

(১১টা ২৪ মিনিটের ২ সেকেন্ড আগে সময় হয় ১১: ২৩: ৫৮, যা ফিবোনাচ্চি সিকোয়েন্স)

এই ফর্মটি তার অনন্য গঠনের জন্য দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। ৬-য়ের থেকে বেশি লাইনেও ফিব লেখা হতে থাকে।

Alan Reynolds-এর লেখা:

This
form
forces
fine feelings
into abstruse lines
each longer longing to affix
a meaning to creations made live by febrile minds
and for this new spring trick I thank both you and SlashDot. Well done.
Though if continued cumbersome.

খ্রিস্টীয় দ্বিতীয়/ তৃতীয় শতকে রচিত ‘ছন্দসূত্র’ গ্রন্থে ভারতীয় গণিতজ্ঞ আচার্য পিঙ্গল এই রাশিমালানির্ভর ‘মাত্রা মেরু’ ছন্দবিন্যাসের কথা লিখেছিলেন।
তাঁর নাম অনুসারে আমরা বাংলায় কবিতার এই ফর্মটিকে বলতে পারি পিঙ্গল কবিতা।

আমার নেগেটিভ

না
হ্যাঁ
থেকে
বেরিয়ে
শূন্যের দিকে
এগিয়ে আসছে দেখি।
আমার কাজ তো তাকে কনকগড়
পার করে আয়নার অপর পিঠে নির্বিঘ্নে নিয়ে যাওয়া।
যেন যুক্তিবিম্ব দেখে চিনে নিতে পারো প্রতি পদার্থের মতো আমার নেগেটিভ অনিন্দ্য রায়

(মাত্রাবিন্যাস মিশ্রকলাবৃত্ত নির্ভর)

পাইতা
(Piem)

π (পাই) গ্রিক বর্ণমালার একটি বর্ণ। গণিতে একটি ধ্রুবক, বৃত্ত যত ছোট অথবা বড়ই হোক না কেন সেটির পরিধি এবং ব্যাসের অনুপাত সবক্ষেত্রেই অভিন্ন, এই অনুপাতটিকে বলা হয় ‘পাই’।
একে কোনও ভগ্নাংশে ঠিকঠাক প্রকাশ করা যায় না। তবু বাইশের সাত(২২/৭)— এই ভগ্নাংশটি পাইয়ের কাছাকাছি।
আর দশমিকে? সেভাবে পাইয়ের প্রকৃত মান তো নিষ্পত্তিই হতে চায় না।
৩.১৪১৫৯২৬৫৩৫৮৯৭৯৩২৩৮৪৬২৬৪৩৩৮৩২৭৯৫০২৮৮৪১৯৭১৬৯৩৯৯৩৭৫১০৫৮২০৯৭৪৯৪৪৫৯২৩০৭৮… এইভাবে বড় হতে থাকে, শেষ হয় না।

ইংরেজিতে পাইয়ের নিয়ম মেনে লেখার স্টাইলকে বলে Pilish। নিয়ম মানে পাইয়ের মানে সংখ্যাগুলি যেভাবে থাকে, সেই ক্রমে সমানবর্ণের শব্দ লেখা।
প্রথম শব্দটি হবে ৩ বর্ণ (Letter) দ্বিতীয়টি ১, তৃতীয়টি ৪, চতুর্থটি ১, পঞ্চমটি ৫, পরেরগুলি যথাক্রমে ৯, ২ , ৬, ৫ , ৩ … এইভাবে। অথবা কখনও বর্ণের বদলে মাপের একক দল (Syllable) হতে পারে।
বিংশ শতাব্দীর শুরুর থেকেই পাইলিশে লেখার চল আমরা দেখতে পাই।
ইংরেজ পদার্থবিদ Sir James Jeans-এর লেখা
“How I need a drink, alcoholic in nature, after the heavy lectures involving quantum mechanics!” তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিত।

বাংলায় এই লেখার নাম দিতে পারি আমরা πলা, পাইলা।
‘কখন যে আমাদের মা পারিবারিক অভিরুচিবোধসম্পন্ন কাজে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করেন অবোধগোম্য।‘
‘Not A Wake: A Dream Embodying π’s Digits Fully For 10000 Decimals’ এই শিরোনামে পাইলিশে একটি উপন্যাস লিখেছেন Mike Keith, নামটিও পাইয়ের মান মেনে।

এই গঠন মেনে কবিতাও লেখা হয়েছে।
১৯৬০-এ Joseph Shipley-এর ‘Playing With Words’ বই থেকে নীচের চারটি লাইন:

But a time I spent wandering in bloomy night;
Yon tower, tinkling chimewise, loftily opportune.
Out, up, and together came sudden to Sunday rite,
The one solemnly off to correct plenilune.

কেউ কেউ এই Pilish poem-কে piem বলেন।

পাইলায় লেখা কবিতাকে আমরা বলব পাইতা।
বাংলায় আট, নয় অক্ষরের কবিতার উপযোগী শব্দ বিরল। তাই পাইতায় লাইনের অক্ষরসংখ্যা হবে পাইয়ের ক্রম মেনে। প্রথম লাইন ৩ অক্ষরের, দ্বিতীয় লাইন ১ অক্ষরের, তৃতীয় লাইন ৪ অক্ষরের… এইভাবে।

আগুনের খেলা

আমাকে
কে
ভেঙে ফেলে
কে
জুড়েছে আরো
নদী পাহাড় মরুভূমি
বন
শরীরে সাজিয়ে
সেই ভূগোল
পড়ায়
চুমুতে কে যে
ছিঁড়ে নিয়েছিল জিভ
উনোনে ঢেলেছিল মেদ
ধমনীতে বারুদ
জ্বলে-ওঠার জন্যে তৈরি
করে কে
বলো
আমাকে
দাহ করার জন্যে কে
তৈরি করে
নিজে নিভে গেছে

সব্যসাচী হাজরা লিখেছেন ‘দল্পাই’, ‘দল’কে নির্ভর করে কবিতাটি লেখা হয়েছে এভাবে যাতে লাইনগুলিতে পরপর পাই-য়ের সংখ্যা অনুসারে দল থাকে।

দ্রিম্‌ দ্রিম্‌

চেতনা
তল
এলোমেলো
পাই
ভরা নদীতে
চিৎকার থেকে পরিমল পড়ে
পাঠপুর
থাক ধরাধরি যাক
মিতালিদুপুর
পড়ে দিক
টানা পরিমল
ভরা ঢলগুলো চেতনার

চুপ        আদিমতলার দ্রিম্‌ দ্রিম্‌ শুনি
ভরানদীতে ভরপুর

পাই-কে নিয়ে কবিতায় ভাবা যায় আরও অন্যভাবে। বাইশের সাত পাই-য়ের এই মানটিকে ব্যবহার করা যায় লাইনের দৈর্ঘ্যে, এমনভাবে— দুটি পঙ্‌ক্তির স্তবক, প্রথম পঙ্‌ক্তি ২২ মাত্রার, দ্বিতীয় পঙ্‌ক্তি ৭ মাত্রার।

পাই-কে জেনেছি যত, যতটুকু মাপা যায় বাইশের সাত
অধিকন্তু পারি না

পারি না বৃত্তের থেকে খুলে নিতে জ্যা-জীবন, শাঁখের করাত
অঙ্কের পরাধীনা

কাটে যা, সামনে পিছে, যোগবিয়োগের স্পর্শে রক্তমাখা হাত
বাজাল তা ধিনা

গণিত শব্দের মানে ভালবাসা বুঝি আমি; ঘাতে প্রতিঘাত
তুমি বললে ঘৃণা

পাইকু
(Pi-ku)

হাইকুর সঙ্গে সাযুজ্য রেখে ৩-১-৪ সিলেবল বিন্যাসে লেখার ফর্ম পাইকু।

Mark Wendel-এর

we will rest
here
on shore of pond

বাংলায়:

টেবল ক্যালেন্ডার

গতকাল
কে
উলটে রাখে?

পাইকু লেখার আরেকটি রীতি, একটু বড় পঙ্‌ক্তিতে, ৩-১৪-১৫ মাত্রায়।

Mike Keith-এর

It’s a moon,
A wheel revolving on golden earth, and lotus blossoms.
Mountains embrace windmills, and it all reflects this number, pi.

বাংলায় লিখতে পারি

পাইয়ের মান
আমরা এখনও শেষ অব্দি বার করতে পারিনি
অথচ জানি, তার পরিবর্তন হয় না, সে ধ্রুবক

Pilish haiku আবার একটু আলাদা, এখানে পরপর শব্দগুলির বর্ণসংখ্যা পাইয়ের মানের সংখ্যার ক্রম অনুসরণ করে, কিন্তু মাত্রাবিন্যাস হাইকুর চিরাচরিত ৫-৭-৫ মেনেই হয়।

Mark Wendel–এর

was a poem I wrote
gibberish in pilish verse
was haiku diffused

প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় পর্ব

5 replies on “অনিন্দ্য রায়ের ধারাবাহিক: ফর্মায়েসি”

দারুণ, এই কাজগুলো অসম্ভব দরকারি ও মূল্যবান

ভালো লাগলো। নির্মাণের রহস্য ও কৌশল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *