অনিরুদ্ধ সাঁপুইয়ের গদ্য

রাত্রি

রাত্রি একটা তাৎপর্যময় ধারাবাহিক আদর। উচ্চতা সম্পর্কে যা কিছু আবেগ ও সম্পত্তি তা একটি গাছের পাতার মতো। শিশির জানে তার কতটা অনুকূল একটি গাছ এবং পাখি জানে কীভাবে প্রত্যাবর্তন। আমার মাথায় প্রকৃতই যে-দুটো ডানা তার কোনো অবয়ব নেই, আমি যখন উড়ি— সে খুব শৈশবের আকীর্ণ আখ্যানে যেমন পুঞ্জীভূত, তেমন পতঙ্গের ডানা খসা রঙের আবহে আমি একটা পতনের প্রত্নপ্রেম নিয়ে ফিরে যাই অন্ধকারের দেহে। পুনরায় যেভাবে আলো কোনো চকচকে দেহ থেকে উৎসারিত; ফিরে আসি গঠনের পুং অস্তিত্বে। আমাকে সোনামুখি ধানের গন্ধ তার আকাঙ্ক্ষা দেয় জীবনের ক্ষুধা সঞ্চালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে। তার শীষ স্বপ্নিল শিকড়ের প্রশ্বাসের দিকে টানে, আসলে যা আঁধারের সুর, যা রাত্রির অধিকৃত মঙ্গলকাব্যের ছন্দ; যা কেবল একটি তির তার তীব্র সংঘর্ষমূলক অনুচ্ছেদে পাণ্ডুলিপির আকার। এভাবে কত শতাব্দীর হলুদ প্রান্তরে মৃত বালকের মতো স্মৃতির উষ্ণীষ পরিহিত একটি পাতা, যা কেবলমাত্র হেমন্তের বিষাদ অথবা একাকী পিঁপড়ের অভিমানী যাত্রা— এ-সব। তবুও, তবু আমার তালুর দিকে যে-দৃষ্টি তা যেমন চোখ নিম্নগামী হয়; জলোচ্ছ্বাসের মতো এগিয়ে যায় মোহানার দিকে এবং আমি একটা মাছের শরীর হয়ে প্রতিকূলে; মোহে; আবেশে… এক কালো, যা অন্ধকারের— তা রাত্রির তা একটা ফড়িং-এর অন্ধত্ব প্রাপ্তির দোসর হয়ে ঢুকে পড়ে কোনো পরিত্যক্ত নীল ঘরে। এভাবে একটি মাছ ও ফড়িং মিশে যায় অঙ্গাঙ্গী একে-অপরে। অথবা একটি ফড়িং যা আমি হয়ে যাই এবং যা একটা মাছ হবার সম্ভাবনা কিংবা মৎসের শরীর হারাবার প্রবল দুঃখ নিয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকি। এই একমাত্র আত্মধ্বংসী বিবরণ হতে পারে একটি চাঁদ। পূর্ণ গোল নয় মেঘের ফসল কেটে ফেলার পর যে-মাটির আস্তরণ, তার তল থেকে উঠে আসা যে-চাঁদ। যার আলোছায়ায় হাজার বছরের বৌদ্ধ ভিক্ষুরা তাদের প্রাণ ফিরে পায় এবং এগিয়ে যায় ভবিষ্যতের দিকে। তাদের আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে কাদার মতো আমি লেপ্টে থাকি। তাদের ছন্দে আমি আমার প্রজন্মের ভাষা হয়ে উঠি আমি একটা শরীর হয়ে পুঞ্জীভূত হই অথবা অসংখ্য আলোর বিভাজনে মিলিয়ে যাই। আমি একটা পর্দার নড়ে যাওয়াটুকু প্রত্যক্ষ করি আর জলের কম্পনের শব্দ শুনি; ফড়িং-এর ডানার থেকে যা আলাদা করা যায় না যেভাবে শরীরের ভেতর শরীরের সংঘর্ষ যা অগোচর যা নিভৃত। রাত্রি হয়ে ওঠে একটি লোমশ বেড়ালের মতো, যার থাবার নীচে মুখ রেখে ঘুমে অচেতন থাকি কিংবা একটা তিব্বতি ঘণ্টার ঢেউয়ের মধ্যে দিয়ে প্রার্থনা হয় শরীর। একটা অদৃশ্য রাত্রির হাত যা স্বতঃ শূন্য করে আমাকে যা আমাকে অখণ্ড অক্ষরবৃত্তে তার ঠোঁট ছুঁয়ে থাকে— একটা শুকনো পাতার মতো; এ ক্ষেত্রে হাওয়ার অপেক্ষমানতা কিংবা মূল কাণ্ডের নিকটবর্তী আলেখ্য।

অনিরুদ্ধ সাঁপুইয়ের গদ্য

আমাদের নতুন বই