Categories
গদ্য

অমিতরূপ চক্রবর্তীর গদ্য

নাম

বৃষ্টির দিনে মনে একটা বিষণ্ণ কালো গাড়ি ঢুকে পড়ে। এমন কালো গাড়ির প্রতি ছেলেবেলায় আগ্রহ ছিল। মনে আছে আমাদের কাঁচা রাস্তায় এমন গাড়ি এসে একপাশে স্থির হয়ে দাঁড়ালে আমরা হাতে গোনা কয়েকজন সেই গাড়িটাকে ছেঁকে ধরতাম। তার বাষ্পায়িত কাচে আঙুল দিয়ে নাম লিখতাম আর পরক্ষণেই নাম জলবিন্দু হয়ে গড়িয়ে নেমে আরেকজনের নামের সাথে মিশে যেত। তারপর আর নাম লেখার সুযোগ থাকত না। অন্যের নামের সঙ্গে মিশেই থাকতে হত, যতদিন আরেকবার আরেকটি গাড়ি না আসছে। এখন কারো নামের সাথে এভাবে মিশে যেতে তীব্র দ্বিধা হয়। অন্য নামটি এই মেশাকে ভাল চোখে দেখতে নাও পারে বা তারও হয়তো তৃতীয় অন্য আরও একটি নামের সঙ্গে মিশে যাবার ইচ্ছা। শৈশব পেরোনো মানে এমনই অজস্র ডালপালা ঘেরা একটা ভূতুড়ে জঙ্গলে ঢুকে পড়া। পোড়ো বাড়ি, শুকনো পাতার খসখস আর বাদুরের মতো চাঁদের দিকে উড়ে যাওয়া তীব্র অট্টহাসি নিয়ে বেঁচে থাকা।

                 বর্ষায় আর যাইহোক, মাছের বাজারে যেতে ইচ্ছে করে না। বর্ষায় জলকাদা ভরা মাছের বাজার উপস্থিত সভ্যতাকে মনে করায়। ছাতায় ছাতায় যুদ্ধ। অন্যের ছাতার জল আমার জামায় মানচিত্র হয়ে থেকে যায়। অন্যের পাহাড়-পর্বত, মরুপ্রান্তর, সমুদ্র, বনভূমি, ফেরিঘাট, কয়লাখাদান আমার অস্তিত্বে জমা হয়। অন্যের কুয়াশা আমার চশমার কাচ ঝাপসা করে ফেলে। এমন প্রায়ান্ধ অবস্থায় টাকা গুনে দিতে হয়। ভুল হলে আমার ক্ষতি। মৃত মাছের স্তূপের ওইপাড়ে বাতি ঝুলিয়ে যে মানুষটি বসে আছে, সে কখনও গাড়ির বাষ্পায়িত কাচে নাম লিখতে গিয়ে ভেঙে জলবিন্দু হয়ে গড়িয়ে অন্য কারো নামের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল কিনা জানি না। এমন অলংকরণ সবার জীবনে নাও ঘটতে পারে অথবা ওর অলংকরণ আমার জীবনে হয়তো ঘটেনি। সুতরাং ভুল হলে সেই মানুষটি আমাকে বাড়তি টাকা ফেরাতে নাও পারে। প্রায়ান্ধ আমাকে কালো প্লাস্টিকে মুড়ে খণ্ড খণ্ড মাছের দেহ ধরিয়ে দেবে আর আমি তারপরেও অনেকদিন ধরে ওই মানুষটাকে স্বপ্নের মধ্যে দেখব। কালো প্লাস্টিকে পুড়ে একটা বাষ্পায়িত গাড়ির জানালার কাচ ধরিয়ে দিয়ে বলছে— ট্রাই এগেইন, ট্রাই এগেইন!
শৈশব পেরোনো ভূতুড়ে জঙ্গলে ঢুকে আমিও সবার মতোই অনেক সম্পর্ক, আত্মীয়তা হারিয়েছি। নীলাভ অন্ধকারে পোড়ো বাড়ির চূড়া, শুকনো পাতাদের খসখস, মলিন ডিম্বাণুর মতো চাঁদের পেছনে। রহস্যময় ডালপালা সরিয়ে সরিয়ে যতবার খুঁজতে গিয়েছি তাদের , কারো হাতঘড়ি, কারো হেয়ারপিন, কারো গরদের ফালি— এসব পেয়েছি। এমনকি মৃত গাছের ডালে দেখেছি কারো ফেল্টের টুপি আটকে আছে। এরা হল আমার সেইসব নাম— যাদের সঙ্গে আমি অনায়াসে মিশে যেতে পারতাম। এদের সঙ্গেই আমি রাস্তার পাশে স্থির হয়ে দাঁড়ানো কালো গাড়িটিকে ছেঁকে ধরে মহোল্লাস করতাম। তাকে ভয় পাইয়ে দিতাম। যখন সে ছেড়ে দিত, আমরাও ছুটতাম ভয় দেখাতে দেখাতে। এখন বৃষ্টির দিনে সেই-ই ফিরে এসে মনে জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। সাঁ সাঁ করে তুলে দেয় জানালার বাষ্পায়িত কাচ, কিন্তু আমি একবিন্দুও আঙুল বাড়াতে পারি না।

3 replies on “অমিতরূপ চক্রবর্তীর গদ্য”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *