লেখক নয় , লেখাই মূলধন

ঈশিতা দেসরকারের গদ্য

সাদা রোগ

গাছে সাদা চুল। চুল জড়িয়ে আছে চোখে। কখনো তুলো কখনো উপুড় হওয়া কলমের ডগায় রামপ্রসাদী বেড়া। বেড়া বাঁধতে গিয়ে মন থেকে খসে যায় এক টুকরো আতস বাজি। স্বরলিপি না মেনে আতাফল খুলবে তার গোপন না পাওয়া। না পাওয়া থেকে যতটা জল চুঁইয়ে পড়ে; ততটুকু জমিয়ে ঢালি আমার ছাদ বাগানের পাণ্ডুলিপিতে। চুষে নেওয়ার তুমুল সাক্ষাৎকার দেখি রোজ। একটা খয়েরি সংক্রমণ আমার না লেখা কবিতা থেকে দৌড়োয় টবের কোমড়ে। টব সরালে বরাদ্দ ঘুমের স্বস্তি। স্থল পদ্মের মাথায় গুঁড়ো ক্ষত কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখবে বলে নুন জল খায়। জবার আঙুলে আমের কাঁধে পেয়ারা পাতার চিবুকে তোলপাড়ের ষড়যন্ত্র আমার ছাদবাগানেও। যদিও ছাদ রাষ্ট্র এখানে দূরত্ব বজায় রাখার কথা বলছে না; দু-এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ওদের ক্ষতি হারিয়ে যাবে চিলেকোঠার সিগারেটে। বৃষ্টির অপেক্ষায় কুচো চারা ডেপুটেশনের বিবৃতি লিখছে। নীলকণ্ঠের লতানো নাভি কিছুটা বোঝে। কিছুটা সময় এলে জবাব দেওয়া গানের রেওয়াজে মন দেয়। গাছেরা সেদ্ধ ভাত খায় শুধু। পথ্য ছাড়াই লাফিয়ে যায় মানুষের দিকে। মানুষ তখন দরজার হেরে যাওয়া দেখছে। মুখস্থ করছে আইসোলেশনের চতুর্থ সূত্র।

বাইরে তখন ধুম ফাগুনের গীতিনাট্য। রাস্তার ইটের সখ্য বেড়েছে হেলে পড়া ঘাসের। হাওয়া এলে টবে টবে খুলে যায় গাছের অন্তর্বাস। কুর্চি ফুল গা সেঁকে নেয় এই সুযোগে। পেটভরতি খিদে পুরু মেঘের মতো।

ওদের ফেলে আসা আলোয় আমার অপারগতার চিরাগ রোজ সন্ধ্যায় গীর্জার নিঝুমে জ্বলে। পোড়া বন্দরের নিঃশ্বাসে গাছ বসায় রাতের ভাত। গাছেরা শক্তিনগরের কালিমন্দিরের আলো; কুমারডাঙ্গির মসজিদের আতরের সাথে উড়ে গেল। শুকনো পাতায় আমার কুঞ্চিত প্রেম নাম। এক। অধিক। সর্বাধিক। চিরাগ জ্বলত গাছে গাছেও। জ্বালাত রতনদা। রতনদা এখন সাদা জোব্বা পরে থাকে। সাদা রোগের সাথে ম্যাচিং করে। প্রতি মাসে টবের গা ধোয় রতনদা। ছাদের উঠোন লেপে দেয়। অবাঞ্ছিত কথাবার্তা সরিয়ে শেকড়ে ঢালে তামরসের হকিকত। পাতার মাথা আঁচড়ায়। দুটো বিনুনি বাঁধে সন্ধ্যা তারা ফুল রঙে;… শেষ ট্রেকার ধরার আগে। সাদা রোগ নিরাময়ের উড়ো চুমু টাঙিয়ে রোগারে জল মিশিয়ে যন্ত্রণাকে করে ‘পাখি হুস…’।

ডেপুটেশনের খসড়ায় রতনদার অনুপস্থিতি ও অপর্যাপ্ত শস্য সংলাপ উঠে আসছে বারবার। গাছ ও রতনদা উভয়েই অদেখার অশান্তিতে কম ঘুমোয়। বেশি রাতে গাছের হৃদয় পায়চারি করাকালীন গায় ‘বনমালী তুমি; পরজনমে হইয়ো রাধা’।

লকডাউনে স্নান বেড়েছে। জলের যোগ্য সন্তান যেন আমরা। স্নানঘরে ফেনার দুঃখ দেখি। কীভাবে মুহূর্তের লাস্য নিকাশি ব্যবস্থায় ফুরিয়ে যায়। এতক্ষণ জন্মসুন্দরী কখনো দেখিনি। যাদের স্নান ঘর নেই; কলতলায় রূপসি ফেনা দ্রুত হারিয়ে যায় অনাবিষ্কৃত শ্যাওলায়।

স্নানের ঘণ্টা বাজছে চারদিকে। তারই মাঝে ডাক শোনা যায় কার যেন!… জলের পেছল আগলে দরজায় যাই। রতনদা দরজার সামনে গণসংগীত রেখে গেছে। ৪৫ দিন ঘরে বসে থাকাত পর নয় কিমি হেঁটে গ্রামের বাড়ি থেকে কাজের খোঁজে শহরের গলিতে কাজফুল কুড়োয়। পরিচিত ছাদবাগানগুলোতে গাছের গলায় ঝুলিয়ে দিতে চায় টিফিনবক্স। মেহনতি হাত দরজার বাইরে হাতুড়ি খুরপির ছাঁচটুকু রাখে। গাছ জল খায়। দলা মাটি ভিজিয়ে খায়। রতনদা খায় অপেক্ষা। জলে মুড়ি ভেজানোর কৃষি কাজ শেখে। মোবাইল ক্যানভাসে রতনদা এবড়ো খেবড়ো রং জড়িয়েছে কেমন!

রতনদা হাঁটছে। হেঁটে আসে। হেঁটে ফিরে যায়। ১৮ কিমি হাঁটতে হাঁটতে কথা বলে। ওর বুকের হারমোনিয়াম; গুপ্তধনে ঢুকে যাওয়া পেটের গন্ধ টের পাই। হাঁফাতে হাঁফাতে ওর বলা কথারা একে-অপরের গায়ে চেপে বসছে। ঘ্যানর ঘ্যানর কোকিলের ডাককে দূরভাষ শাসন করেছে অগ্রিম। ফাগুনের ধুনকর আমার কানে গুঁজে দিয়েছে শিমুল বীজ। শ্বাসগুলো শিশুর মতো নরম। কানের পাটাতনে যে-খিদে-করতাল বাজে; আমি আজ তার সওয়ারি। ছাদে যাই। পাতায় ঝুঁকে পড়া পেটের আর্তি। তুলো ভেদ করে কার্লভাট ডিঙিয়ে চিৎকার আমার ক্লিপে মিশে গেছে কখন!

নিজেকে ছোটো করে জলের ট্যাঙ্কের নীচে বসি। লালন সমগ্র এনে দিচ্ছে না কেউ। সাঁইজি আমার কখন খেলে এই খেলা! প্রতিটা আর্তরব রতনদার। প্রতিটা শব্দে মেনে না নাওয়ার তারস্বর। রতনদা ভাত বেশি খায়। ও গাছের যত্ন করতে এলে দু-কৌটা চাল বেশি লাগে।

‘গতর খাটি তো; ভাতলা বেশি নাগে; ভাতের তানে এঠিনা কাম করতি আসি।’ হাসতে হাসতে বলে রতনদা। বলতে বলতে মুখে গ্রাস তোলার সময় রতনদাকে গ্রিক পুরুষের মতো দেখায়। এত সুন্দর দেখতে রতনদা?! রতনদার ঘেমে যাওয়া কালো পিঠে স্বদেশের সুজলা সুফলা জমিন। এই আবাদ কাজ ঈশিতা জানে না। ব্যর্থ স্বার্থপর আঙুলে একলব্যর অভিমান ঘুমের ওষুধে রান্নাবাটি খেলে কেবল। ওদিকে আরও স্পষ্ট হচ্ছে গাছের সাদা রোগ। পতাকা বদলে যাচ্ছে অধিকারের নামাবলীতে। গাছ অধিকার ফিরে ফেলে রতনদার দুয়ারে বারবার লক্ষ্মী ছাপ আঁকবে পড়ুয়া। লক্ষ্মী রতনদার বড়ো মেয়ে: যে-নামের আমাদের বাড়ির সাদা সন্ধ্যাতারাকে ডাকে রতনদা। আজান শুরু হলে দু-ফোঁটা চোখের জল ফেলতে দেখি মাঝে মাঝে।

সাহস করে জানতে চাইনি।

জানি না কি অথই বেদনা আজানের ডালপালায় পায় রতনদা; আমি জানি না; আমার ছাদবাগানের ডালপালারা জানে ঠিক…

ঈশিতা দেসরকারের গদ্য

আমাদের নতুন বই