ঈশিতা দেসরকারের গদ্য

গান

ভোরের আজান শুনতে পাই না আজ একমাস। রেল লাইন পেরিয়ে কুমারডাঙ্গি থেকে বেশ কয়েক বছর চলে এসেছি এ-পাড়ায়। আমার কিশোরীবেলা পর্যন্ত নানাবিধ মেঘমল্লার ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কুমারডাঙ্গির এধারে ওধারে। ও-পাড়াতে একটা মসজিদ আছে। দীর্ঘদিন রোদে রাখা পেস্তার মতো তার রং। মসজিদের কাঁধ ঘেঁষে জুনিয়ার হাই স্কুল। উলটো দিকে আটচালা ঘর। মসজিদের পাশ দিয়ে দিদার সঙ্গে রবিবারের হাটে যেতাম মাঝে মাঝে। খই-এর মোয়া আর মাটির পুতুলের লোভে। ওই রাস্তা মসজিদের গলি বলে পরিচিত। গলির বাতাস জুড়ে থাকত তামাকের গন্ধ। দিদা বলেছিল আশেপাশের বাড়ির মেয়েদের বিড়ি বাঁধার তামাক থাকে মসজিদের বারান্দায়। লায়লা; কালোন মাসি; রুবিয়া দিদি; মণিদি; লালদার মেয়েরা বিড়ি বাঁধত। ছোটো মাথায় ওদের বিড়ি বাঁধার নামচা বেশি দূর মাদুর পেতে বসতে পারেনি। শুধু বিকেলে অনেক বিড়ি বাঁধতে হবে জন্য লায়লা যেদিন খেলতে আসত না আমার সঙ্গে; মনখারাপে পুতুলের সরঞ্জামে পিঠ ঠেকাতাম। লায়লা স্কুলে পড়েনি। আমার কাছে কিছু বাংলা ছড়া শিখেছিল। মণিদির কাছ থেকে সই করা ও নাম ঠিকানা লেখা। লায়লা এখন স্কুলে যায়। শহরের এক উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের মিড ডে মিল রাঁধার সহায়ক হিসেবে। আমি স্কুলে যাই ছোট্ট একটা ঘরে তামাম দুনিয়ার রহস্য ওত পেতে নিতে। প্রতিটা পড়ুয়া আমাকে শেখায় কীভাবে বানান ভুল করার পরেও জীবনের গদ্য লেখা যায় সহজেই। ইরেজার সেখানে মেহগনি পাতায় ঘুমিয়ে থাকে। এই অসময়ের ঘুমের পাশে মানুষ নক্ষত্রের খোঁজ পায়। খুঁজতে খুঁজতে নাম বাড়ির ঠিকানা মাসিক আয়ের হিসেব আসে। তালিকাভুক্ত করি আমার শ্রেণিকক্ষের ভেতরে অক্ষর হয়ে থাকা বিড়ি শ্রমিক পরিবারের নাম। ওদের নামে সরকারি স্কলারশিপ আসে। আসে স্কুলের ঘরে ঘরে ফর্ম ফিলাপের নোটিশ। নোটিশের নীচে সই করতে গিয়ে কলমের ডগায় উঁচু হয়ে থাকে আমার পাড়ার মসজিদের তামাক গন্ধ। দু-পাড়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা অভিভাবক রেল লাইনের স্থির চিত্রনাট্য।
রেললাইন একটা হার। ওর দু-পাশের মুলি বাঁশের বেড়া দেওয়া আস্তানাগুলো অবিকল চন্দ্রচূড় লকেট। লকডাউনে লকেটের ভেতর হাওয়া ঢুকছে। ফুলে ফেঁপে উঠছে পেট। এক দল যুবক ভ্যানে ভরতি দানা-পানি আনে। ছলাৎছল শব্দে হারের গিঁট গান গায় মরমিয়া ভাওয়াই।

লাইন দুটো হাঁ করে তাকিয়ে আছে। সিঁদুর টোকাটুকি খেলার মতো; কার ডাক কখন আসবে। বাড়ি বন্দি ফুরসতে স্মৃতি তোরঙ্গের বাটি ঘটির ঠনঠন আওয়াজ আসে তুমুল। মনে পড়ে পুরোনো পাড়া। মসজিদের উঠোনে লুকোচুরি খেলা। মসজিদের দেওয়ালের ফাঁক-ফোকর দিয়ে কান পেতে টুটুল ভাইয়ের বাঁশিতে ফুঁ দেওয়ার বিকেল। ফাঁক-ফোকর বরাবর আলোর কারিগর। আজান শুনতে পাই না। ভোরের আলোতে ভেন্টিলেটরের ফাঁকে গুঁজে রাখা পাখির আনাজপাতি দেখি। সব পাখিই ঘরামি। গাছের কাছে গচ্ছিত রাখে জমানো সুদ আসল। মানুষ পাখিদের কাছে ভোরের দোতারা শিখতে চায়। সুর পালটে পালটে সরগম গায়।

টোটো চালক ছেলেটা ‘সবজি নেবে সবজি’ বলে যে তেহাই এ পৌঁছোনোর চেষ্টা করে; সহজেই বোঝা যায় এই বিলাবিল সে নতুন শিখেছে। প্রত্যন্ত ভোর থেকে হাফ বেলা অব্দি সবজি-ফুল-ফল-মাছ-দুধের প্যাকেট-পাউরুটি-বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে একের পর এক চারণ কবি আমার বারান্দা ঘেঁষে চলে যাচ্ছে। কড়াইয়ে তেলের সাহস জমিয়ে আস্ত কবিয়াল দেখার জন্য ছুটে যাই। এত রাগ; এত খেয়াল একসঙ্গে শুনিনি কখনো। পটল আহিরি ভৈরব তো পাউরুটি কাফির দরবারে। সুর-সাধকের মেহফিল ছেড়ে কড়াইয়ের যুদ্ধ বিউগলে জলের ফোঁটা দিই। শান্ত হয় ফোঁড়নের কৌতূহল।
বারান্দায় হেলে পড়েছে গ্রিলের কালো পা। মাটির প্রতিমা বানাত যে-বৃদ্ধ শিল্পী; বিস্কুটের প্যাকেট বোঝাই করে দরবেশি গান গাইতে গাইতে চলে গেল। দুধের প্যাকেট ভ্যানে চাপিয়ে বেটোফেনি মিহিদানা বেচছে গ্যারেজে কাজ করা তরুণ। বিড়ি শ্রমিক লালাদা রিক্সায় খন গান তুলে নিয়েছে আঙুর খেঁজুরের ঠোঙায়। জগৎ অসুস্থ হলে মানুষ বুঝি সংগীতের রেওয়াজ করে!

হাড় উঁচু হওয়া গলা কোঁচকানো জামায় ঢুকে যাওয়া পেটে গোপন ছিল স্বরলিপি। রান্নাঘরে মাছ ভাজার দ্রিদ্রিম। খিদে পেলে মানুষ খায়। খিদে পেলে মানুষ কাঁদে। খিদে পেলে মানুষ সুরেলা হয়ে ওঠে। হাঁড়ির গলা থেকে ঝকঝকে ভাতের স্তবক পড়ছে থালায়। রাস্তা জুড়ে পড়ে আছে সারাদিনের ফিউশন। কোহেনের নোটেশনে মিশে থাকা লালনের দোহার খুঁটে নিল ভাঙাচোরা লোহা টিনের কিশোর ক্যানেস্তারা। গান আর গানে দুপুরের মেঘে সর পড়ছে নরম। ভেজা মসজিদ আমার অপেক্ষার গন্ধ পায়। অসুস্থ সময়ের ওপর বিদঘুটে সময় বসিয়ে তক্তপোশ বানাচ্ছি রোজ। রোজ পেট ভরে খাই। ঘুমোতে যাই শিরোনামের সংখ্যা; ঘুমন্ত; মা-বাবার বুকের ওঠা নামায় চোখ রেখে। আচমকা চোখ গেল পাখির আহ্লাদে রাতের পায়চারি শ্লথ হচ্ছে। মসজিদ এবার ছাড়া কাপড় কাচবে। আযানে তালা চাবির জল ছেঁটাবে। দরজা খুলে দেখি বারান্দা জুড়ে সুর সাধকেরা যে যার বাদ্য যন্ত্র রেখে গেছে।
বাজাতে পারি না বলে নিজের গায়ে হাত বুলাই।
নাহ! আমার গায়ে কোনো সুর লেগে নেই।
হাওয়ারা চিন্তা মুক্ত হলে আযান আমাকে নিয়ে যাবে সুস্থ কার্তিকের টহল সংকীর্তনে…

Spread the love
By Editor Editor গদ্য 2 Comments

2 Comments

  • “জগৎ অসুস্থ হলে মানুষ বুঝি সংগীতের রেওয়াজ করে !” খুব ভাল লাগল।

    দেবজ্যোতি রায়,
  • হাওয়ারা চিন্তা মুক্ত হলে আমি আসবো তোমার সাথে হাঁটতে হাঁটতে ঐ গলির তামাকের গন্ধ শুকতে…….

    sanatan ullash,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *