তন্ময় ভট্টাচার্যের গদ্য

ধ্বস্ত


দরজা খুলে ঢুকলেই বারান্দা, ইদানীং যার মানে খুঁজে পাচ্ছ না। এতদিন যা ছাদ বলে চিনতে, অনেক দূরের একটা আকাশ আজ ভরাট করছে তা। ছাদ অর্থে অ্যাজবেসটজ, যার খাত বেয়ে বৃষ্টি নেমে আসত সামান্য হলেই। গালের মতো। মোছানোর কেউ ছিল না বলে এখানে-ওখানে চিড়। রোদের বেলায় বুঝে নিতে, কীভাবে রাত্রির অপেক্ষা করতে হয়। আজ, যখন খাতগুলো একই থেকে গেছে কিন্তু ছাদ নেমে এসেছে মাটিতে, ইটের পিছনে মুখ লুকোতে চাইছে কিন্তু পারছে না কারণ আশ্রয় নেওয়ার বদলে দিতেই অভ্যস্ত ছিল এতদিন; মাথায় হিম পুষছ। কাশির উটকো দমকে ঢুকে যাচ্ছ ভেতরঘরে। সারা বাড়ির সঙ্গে এক করে দেখতে গিয়ে, বারান্দাকেও ধ্বংস ছাড়া কিছুই দিতে পারছ না তুমি।


দরজারও কি মানে আছে আর? খুলে ফেলা হবে দু’দিন পরেই, দেওয়ালে ফ্রেমের ছাপ সাদা হয়ে থাকবে যতক্ষণ না ছেনি-হাতুড়ির শব্দ কুঁকড়ে দেয়। ছিটকিনি তুলে দিলে। খিলে হাত যেতে, পরিয়ে দিলে মুখ-বাড়ানো খোপে। অভ্যাস তোমাকে এমন কিছু ব্যবহার শিখিয়েছে, যা একেবারে শেষ না-হওয়া পর্যন্ত যায় না। একদিন এই দরজাই একের পর এক ধাক্কা সহ্য করেছিল; আজ ভেতরের কথামতো তার পায়ে জমিয়ে রাখছ একস্তূপ অন্যান্য দেওয়াল। যেভাবে তোমাকেও অপমান করেছিল কেউ– যাতে মানিয়ে নিতে পারো, ছেড়ে চলে গেলে ঘেন্নার অভাব না হয় কোনো। চলে আসছ। আইহোলে চোখ রেখে, অন্ধকারের গায়ে কলিংবেল বসিয়ে দিচ্ছ এখন। কেউ ডাকল ভেবে, উঁকি দিচ্ছ খিল ও ছিটকিনি খুলে। পাশে জানলা হাট বসিয়েছে।


হাট, কিন্তু তাতে স্থির হচ্ছে না তোমার মুখ। যেন আড়ালই ভালো; পাল্লা না থাকলে জানলার দরকার ফুরিয়ে যায়। মেঝেয় ছড়িয়ে আছে গতকাল অব্দি যারা তোমার স্নানের ছিটে নিয়েছিল। বেরোনোর সময়, হাওয়ায় মাথা ঠেকিয়ে যারা বলেছিল ‘দুগ্গা দুগ্গা’। একটা পর্দা, খোলা হয়নি বলে তোমার হাত মোছার সাক্ষ্য দিতে দাঁড়িয়েছে। দেওয়াল ঝুঁকে আছে ঘুঁষি মারা মনে করাবে বলে। সে-রাগ তোমার আর নেই। সময়ের হাতে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া, আসলে এমন কিছুই নেই যা তোমায় নিশ্চিন্ত করতে পারে। ভেঙে পড়ছ। একরাশ ইট-বালি-সিমেন্টের মধ্যে আরেকটুখানি ধুলো হয়ে পড়ছ তুমি। বারান্দা তোমাকে দেখে ভুলে যাচ্ছে, কাল আর হবে না।

Spread the love
By অ্যাডমিন গদ্য 0 Comments

0 Comments

Your email address will not be published. Required fields are marked *