Categories
উৎসব সংখ্যা ২০২০ গদ্য

তমাল রায়ের গদ্য

কে জন্মায় হে বিপ্লব?

‘লুকিং আউটসাইড ইজ ড্রিমিং, লুকিং ইনসাইড ইজ এওকেনিং’

দাদুর হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে, ছ-বছরের মেয়েটি। সম্পর্ক হয়তো একটা কিছু আছে। এও সত্য সব সম্পর্কের নাম হয় না। পথ যেমন হয় উঁচু বা নীচু। সব পথেরই শেষ থাকে। অথবা থাকে না। এও হাইপোথিসিস! সে তুমি গল্পই লেখো বা ছবি আঁকো বা মুভি নির্মাণের সময় কিছু স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন মাস্ট। কিন্তু চূড়ান্ত নয়! ধরো দাদুর নাম ইগো আর শিশুকন্যা কনসাসনেস। বাকিটা সময় বলবে। মানে কাহিনিতে রং ঢং লাগাবে সময়। ধরা যাক দাদুর স্ত্রী বিগত হয়েছেন প্রায় বছর ত্রিশ। তার নাম ছিল আনকনসাস। তার সন্তানদের কেউ ছিল লিবিডো, কেউ ইডিপাস বা ইলেক্ট্রা। সময় নামক গণৎকার এদের বড়ো করায় বাঁধা হননি। কেবল যার গর্ভ থেকেই কনসাসনেসের বাপ কাকার জন্ম, সেই আনকনসাসকে তুলে নিয়েছিলেন ঈশ্বর। ঈশ্বরও এক আপেক্ষিকতা। যে থাকলে আমাদের মত খেঁদা, প্যাঁচা বা টেঁপা, টেঁপিদের সুবিধে। যা বলার প্রয়োজন তা হল, যে-কোনো জার্নিই হল একটা ইনডেফিনাইট মেকিং! যাতে বাতাসের মিহিগুঁড়োর মতো অজান্তেই লেগে থাকে সাররিয়েল বা সুপার রিয়েল। দূরে একটা পাহাড়। ধরা যাক তারও উত্তরে জনপদ। পাহাড় টাহার যদি এনসার হয় খামখেয়ালির, তাহলে বলা যাক, এনারা উত্তরেই জেনারালি অভিষিক্ত। যেমন ধ্রুব তারা। যদিও ধ্রুব এক ফলস্‌হুড। এখানে বলা বাহুল্য মিসোজিনি আছে। মিথোজীবিতাও আছে। ধরা যাক পাহাড়ের কোলে একটি গ্রাম, গ্রামের নাম ইচ্ছেবাড়ি অথবা নকশালবাড়ি। আর ইগো নামক প্রৌঢ় কনসাসকে নিয়ে হেঁটে চলেছেন স্মৃতিসৌধ প্রদর্শনে। নাত্নি কনসাসনেস। আপাতত আঙুল তুলে দেখাচ্ছে একটি নদী। জল বয়ে যেত কখনো। এখন খটখটে শুকনো। দাদু অবশ্য আকাশ ভরা সূর্য তারার নীচে দাঁড়িয়ে সে-সব কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। কারণ, সন্ধ্যে নামছে, পাখিরা ঘরে ফিরছে। আর কুয়াশা জড়ো হয়েছে অনেক। শীত আসার আগে যেমন হয়। ধানক্ষেতে মৃত্যুর নোটিস বা বিপ্লব! কেবল কুয়াশায় হারিয়ে গেল কনসাসনেস। স্বজন হারানোর দুঃখে শোকে ইগো কিংকর্তব্যবিমূঢ়! তোমার মহাবিশ্বে প্রভু হারায় না-কো কিছু। কুয়াশার দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে বলে চলেছেন: ‘কালেক্টিভ কনসাসনেসের কথা। আর কনসাসনেস শুকনো নদী পেরিয়ে ইগোকে খুঁজতে গিয়ে হাতে পেয়েছে চিরকুট। লেখা লুকিং আউট সাইড ইজ ড্রিমিং, লুকিং ইনসাইড ইজ এওকেনিং। শেষ আলোটুকু সম্বল করে, কনসাসনেস এপারে, আসতে চেষ্টা করছে। পেরে উঠছে না। বয়সোচিত কারণেই সে নিরুদ্বিগ্ন। ইগোকে এলোপাথাড়ি দৌড়াতে দেখে, সে হাসছে। ভাবছে এও এক খেলাই। সমাজ সভ্যতা বা বিপ্লবের ইতিহাসে যেমন হয় আরকী!

ফ্রেদরিকোর তেমন ভরসা ছিল না বর্ষায়। গ্রীষ্ম আরামদায়ক হলে সে বসে থাকত সমুদ্রতীরে। একা বসে থাকার সময় আলো আঁধারিতে চোখে পড়ত, একটা উজ্জ্বল আলোর অবিরাম ঘুরে যাওয়া। মার কাছেই শোনা, বাবা না কি অমনটাই ছিলেন, শুনে সরে যাওয়া আলোর সিঁড়ি বেয়ে সে পৌঁছতে চেয়েছিল টাওয়ারে। সেখান থেকে সমুদ্রকে চেনা যায়। দূরত্ব যেভাবে চেনায় সময়কে। একটানা সোঁ সোঁ সুরের মাঝে অক্ষরের পর অক্ষর গাঁথলে জন্ম নেয় ব্যালাড। যুদ্ধ তেমন বৃহৎ হয়ে ওঠে না কখনোই। কিন্তু লড়াইটা থেকে যায়। ফলে টবে লঙ্কা গাছ, তার পাশে নয়নতারা, তারও পাশে ক্রিসানথিমাম। চিঠি আর আসত না। পাগলের মতো মাথা নাড়াতে নাড়াতে ফ্রেদরিকো সময়ের কাঁটা কে উলটো করে দিতে চাইত। সে চাইত হাতদুটো হোক আরও লম্বা, প্রেম বা বিরহে দীর্ঘ হাতই একমাত্র অবলম্বন অথবা আলিঙ্গন। তারপর ফট ফট কিছু শব্দ। আর ঘুম ছড়িয়ে গেল শহরে। বৃষ্টির ছাঁট লাগতে যখন হুঁশ ফিরল টবে ফুটেছে মৃতদেহ। সমুদ্র থেকে টবের দূরত্ব মাত্র কয়েক মিটার। বাকিটা ক্যামেরায় দেখানো হয়নি। কেবল বিশাল তারাভরতি কসমিক এম্ফিথিয়েটারে তখন কেবল সমুদ্র গর্জন। ক্যাওসের জন্ম হচ্ছে ফ্রেদরিকো ফুলের পাশেই…

যে বা যারা ভীতু, সর্বদা দর্শনকে যুক্তি হিসেবে খাড়া করে, এছাড়া উপায়ই বা কী!

: কাম্যু।
: হুঁ
: সত্য বড়ো প্রকট, আলোর মতোই। চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। মিথ্যে বরং দূর নক্ষত্রের মতো, যা আশপাশের অনেক কিছুই চেনায়।
: কে?
: বলো দেখি।
: বুঝি না।
: কে, সার্‌ত্র? সিমন দি বোভোয়া?
: কাম্যু।
: সত্যি বলে কি সত্যি কিছু আছে?
: জানি না।
: কেন?
: আর মিথ্যে?
: এত জেনে কী হয়?
: কিছুই হয় না হয়তো। তবু তো মানুষ জানে।
: ইয়ং ইটালি কে গঠন করেন?
: জানি না।
: মাৎসিনি।
: ইউ এন ও কবে প্রতিষ্ঠা হয়?
: জানি না।
: ১৯২০, ১০ জানুয়ারি।
: আচ্ছা!
: পৃথিবীর স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধ কোনটি?
: জানি না।
: ১৮৯৬। ব্রিটেন আর জাঞ্জিবার। ৩৮ মিনিট। ব্রিটেন জিতেছিল।
: আচ্ছা!
: আমেরিকায় ক্রীতদাস প্রথার অবসান ঘটান কে?
: জানি না!
: আব্রাহাম লিঙ্কন।
: বুঝলাম। জাতি সংঘ বলে কি আদৌ কিছু আছে? না কি বড়োলোক দেশের দালালি করাই জাতি সংঘ!
: হুঁ
: কী হুঁ?
: যুদ্ধ কি শেষ হয় আদতে?
: কী জানি!
: ক্রীতদাস প্রথার অবসান হয়েছে? ইজ ইট?
: তোমার কী মনে হয়?
: এপ্রিল ১৪, ১৮৬৫। গুড ফ্রাইডের প্রেয়ারে তাকে কেন খুন হতে হল?
: বেশ!
: আর জানো, যুদ্ধ টুদ্ধ কখনোই শেষ হয় না। চলতেই থাকে।
: আর মৃত্যু?
: কী?
: কিস্যু না, যেদিন প্রেম থাকবে না। আত্মমর্যাদাবোধ থাকবে না, সেটাই মৃত্যু! সে তুমি যতই বেঁচে থাকো। আপাতত ছায়ার সাথে ছায়ার যুদ্ধ ল্যান্ডস্কেপে। কেবল বৃষ্টি পড়ছে অঝোরে। কেউ হয়তো কাঁদছে। কেউ কান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছে সংগোপনে।

ভিজে ক্যানভাসে হেঁটে যাচ্ছে ছোট্ট চড়াই। ধোঁয়া উঠছে। জীবন না মৃত্যুর কে জানে!


চলন্ত জানলার রডে আপাতত বসে একটি পাখি। ট্রেনের গতি খুব মন্থর! উপায়ও নেই। লাইনের দু-ধার জুড়েই অসংখ্য মানুষ অভিনন্দন জানাচ্ছে… ফুল ছুঁড়ে দিচ্ছে… পাখি খানিক ঘাবড়ে কামরার মধ্যে ঢুকে ওড়াউড়ি করল। ধাক্কা খেল, সার দিয়ে রাখা বন্দুকে। তারপর কী করে যেন উড়ে গেল বাইরে! যাবার আগে পিচিৎ করে খানিকটা পায়খানাও করে দিয়ে গেল। ভেতরে গান চলছে, চেনা সুর, মনে পড়ছে না কিছুতেই… কেউ খাবার ছুঁড়ে দিচ্ছে, কেউ-বা সদ্য কেনা জামা বা ট্রাউজার্স। মাইকিং হচ্ছে। ফুল ছুঁড়ছে লোকজন, কী উন্মাদনা। ওরা বিশ্বাস করে, এ-দেশ তাদের মাতৃভূমি, আর মাতৃভূমির বীর সন্তানরা এই ট্রেনে করে এগিয়ে চলেছে… প্রশস্তিমূলক কথা আর গানের মাঝেই পোয়াতি মেয়েটা কী কুক্ষণে কেঁদে উঠল এরই মাঝে, কে জানে! হঠাৎ ভাবগম্ভীর পরিবেশ! সকলের চোখেই জল। কুমারী মেয়েটা তার ইউ এস জি রিপোর্টের প্যাকেটটা ট্রেনের দরজায় দাঁড়ানো যার হাতে তুলে দিল তার বাম বগলের তলায় ধরা ক্রাচ! ট্রেন চলছে। আবার স্লো বিটে প্যাট্রিওটিক সং বাজছে। ট্রেন এগোচ্ছে, সামনে কিছু দূরেই তো ওয়ার ফ্রন্ট…

2 replies on “তমাল রায়ের গদ্য”

মিস করে গেছিলাম লেখাটা তবে দেরিতে হলেও পড়ার সুযোগ মিস করিনি। ইনফ্যাক্ট এই স্টাইলের গদ্য সচরাচর পড়া হয় না। নিজের জন্যই এই পাঠ জরুরি ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *