তৃপ্তি সান্ত্রার গদ্য

সহজ রান ফোঁড়ে ভাষ্যের দিনলিপি

রাত অনেক রকম। ৫০ মিটার ব্যালেন্স রেস। ১০০ মি. হার্ডল। হাজার। দু-হাজার। পাঁচ হাজার মিটার ম্যারাথন…

তবে এটা মাথায় রেখো, রাত হাঁটলেই সকালে পৌঁছায় না। কে সকালে পৌঁছাতে চায়?

ধবধবে সাদা সকালের আর যা-ই থাক রহস্য নাই। আকুল ব্যস্ততা আছে। শস্য ফসল মাঠ বৃষ্টির ব্যস্ততা হারিয়ে একটা ধাতব ব্যস্ততা। একটা চাম উকুন পিরিতি। বাড়ির। ইশকুল কলেজের। ওই খপ্পরে পড়লে, ভোর দেখার তাগাদায় ৮টায় রাতের খাবার সাবাড়ে মশারির গোরস্থানে। দমবন্ধ মৃত্যু রোজ। জন্ম রোজ।

রাত হাঁটলে, মৃত্যুহীন পর্যটন ডানা… আমাদের সুখ, আমাদের অসুখ… ছিল। থাকে। থাকবে!!!??

শীতে খদ্দরের আর ফানেলের দিন শেষ হয়। গরমে হাত পাখা আর মাটির কুঁজোর দিন। খাটা পায়খানার নিরাসক্ত দিন। বিজবিজে ঘামাচি দিন। ছাদে হাওয়ার রাত। মোড়ে মোড়ে দুঃসহ গরমের মহড়ায় তপ্ত রাজনীতি। কেউ কেউ কখনো পাখা পারে না। ছোড়দি, বড়োমা যারা এক নাগাড়ে পাখা পারে, তাদের পাশে শোয়। তালপাতা বাতাসের সুখ। ঘন অন্ধকার। একটা ছোটো লম্ফ জ্বলে। বাথরুম গেলে সেটুকু লাগে। তখন অভিযানপ্রিয় নাবিক যেন— অন্ধকার ঠেলে ঠেলে উজানে ভাসার রোমাঞ্চ। রাত্রিটা তখন টেনে টেনে বড়ো করে নিলে ভালো। ছোটোরা অন্ধকার হাতড়ে হাতড়ে শরীর হালকা করে আবার তক্তপোষের কোলে ঘুমে কাদা। কোনো জাদুকাঠিতে বড়োদের ঘুমন্ত শরীর জেগে গেলে আর ঘুমোতে চায় না। শরীরের ঘুম নেই। সে রাত্রেও ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে জাগে। দিনেও জেগে জেগে জাগে।

বিজলী বাতি আসার আগের জগৎ যেন কথামালা। লেবুগাছে ঝেপে ফুল এসেছে। যত্ন আত্তি। পিতু তো সুজাপুরে যায়। কুচো মাছ অনেক না ওদিকটায়— নিয়ে আসতে বলিস। শম্ভুর ন্যাবা রোগ। মালা পরায় ছ্যাচড়ার বাপ, হা হা, ওই যে মনসা গান গায় সেই-ই— বড়োমা একদিন লিট্টি খাওয়াবা? মুখভরতি ছাতু-লঙ্কা-তেলআচারের সুখ।

অন্ধকার ফুঁড়ে হাহাকার— মা-মা গো, শান্তি দিবি না মা— শান্তি দিবি না?

ঠাম্মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে— আর শান্তি! যুবতী বউটা মরে গেল— তোর আর শান্তি কোথায় রে নিমাই!

চারটে ছেলেমেয়ে রেখে মায়া কাকিমা মারা গেলেন। জরায়ু ক্যান্সার। শেষ স্টেজে ধরা পড়লে, আর কী হবে। বনজগন্ধ লতা ঝিপঝিপে বৃষ্টির মধ্যে গুহাপথ— টান। আর সমপর্ণ… সে-সব হবে না… না?

এইসব কাব্যি-কথা পদ্যমদ্য রেজিস্টার অফিসের এলডি জানে না… শরীর কামড়ায়। চ্যাটের কামড়। খারাপ পাড়ায় যাবার মুরোদ নাই। দেওয়ালে দীর্ঘ সময় ধরে হিসি সারে নিমাই বোস। নিমাই বসু— ঘষে হিসু… বউ মরা পুরুষের দুঃখ। তা নিয়ে আহা উহু এবং রগড়…

আর এই অবস্থায় মেয়েরা কী করে? তার তো শরীরই নেই। সে অশরীরী দক্ষতায় সংসার সামলায়। সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে। এক্কেবারে ১০০ ভাগ সত্যি। কিন্তু তার রাত যে মাগুর মাছের মতো খলবলও করে, আঁষবঁটিতে টুকরো হবার জন্য— তার বেলা? তখন টুকরো শব্দ নিয়ে মজা করা যায়…, অসতী নারীর কিস্‌সা খাওয়া যায় চেটে চেটে।

ঝিকিমিকি তারার মাধবী রাতে সত্যি সত্যিই পাড়ার নায়িকা মাধবী, আধুনিক গ্যাজেটের মতো ছিপছিপে না, বেশ ভারী চ্যাটালো লাঙল হাল ডিঙা কাছি ধরা পুরুষ থাবার মাপে তার বিরাট টাল বুক আর নিতম্বের দুই প্রবল প্রাচীরের গভীর গিরিখাত এবং তার শরীর জুড়ে কলঙ্কের শস্য পোড়া ঘ্রাণ যা তুলনাহীন কারণ ঈষৎ রহস্য কারণ কি সেই পাঁচের দশকে মোটর গাড়ি যেন রবার সোল পরা আততায়ী মাধবীকে নিয়ে হাওয়ার গতিতে শহরতলি পেরিয়ে যাচ্ছে। মাধবীর মোহময় শরীর জুড়ে আঁষটে চ্যাটচেটে রক্ত দুধগন্ধ আর কোলভরতি চাঁদের মতো শিশু, তার মাথার তালু ধক্‌ ধক্‌ করছে, তলতলে তালুতে পিন ফুটিয়ে দিলে গাড়ির দরজা খুলে লাফিয়ে পড়ছে শিশু আর গড়াতে গড়াতে দ্বৈরথে অবৈধ জন্ম। আর মাধবীরা ত্রিভুজ খেলা শেষে লড়ে যাচ্ছে স্ত্রীশিক্ষা বাস্তুহারা শিক্ষা ভার নিয়ে। তখন এক বানান ১০৮-বার লিখছে ছাত্ররা-ছাত্রীরা, অষ্টোত্তর শতনাম যেন! সারা জীবন সে শ্যাম রাত্রির মোহজাল পদ পদাবলী কীর্তন জারি গান সারি গান যেন লীলা পদাবলী। গাইছে খোলাহাট পালাকার।

এর এক দশক পর যারা স্কুল কলেজ পাশ দিয়ে বিদ্যেধরী স্রোত— আনাজপাতি, বাসন-কোসন, নুন লঙ্কা নাড়তে নাড়তে দেখে ফেলেছে তেকোণা আকাশ, তেকোণা স্ত্রী অঙ্গের মতো নিষিদ্ধ আর সবকিছু। তার ভালো লাগছে না কোঁচড় ভরা মিথ্যার স্তবস্তুতিগান। সে জেগে আছে শুধু না। চেতন আছে তোল্লার ফানুস ফাটিয়ে নিতে চাইছে দগদগে সত্যের গনগনে আঁচ…

দূরে পেটা ঘড়ির ঘণ্টা। ঘুমিয়ে পড়ার সংবিধান। গৃহপালিত আর রাস্তার কুকুরদের সশব্দ কথোপকথোন…

এক টেবিল অক্ষর সমুদ্র। ডোবার। ভাসার। ঘুমিয়ে পড়া। জেগে ওঠার। তীব্র ছাতিম ঘ্রাণ সুখ। এই প্রাচ্য। এই পাশ্চাত্য। গীতিকা। তুলুনীগান। লোককথা। আধুনিক উত্তরাধুনিক দুর্বোধ্য থিয়োরি কামড়ে চিবিয়ে খেতে গিয়ে ঠোট জিভ ফেটে গেলে নুনচা রক্ত… তখন যেন খোলসা হচ্ছে মাথা, টাকরায় উঃ আঃ আর ঘুম ভয়ে আড়ষ্টরা তখন পেয়ে যাচ্ছে মঁমার্তের আড্ডার স্বাদ…

‘অমাময়ী নিশি সৃজনের শেষ কথা’… ফুলে ওঠা মশারির পাল ছেড়ে ঝুল বারান্দার শৃঙ্খলে ঝুঁকে ঝুঁকে নক্ষত্র খোঁজে কুহকিনী। গরমের রাতে ছাদে শপ পেতে নক্ষত্র দেখেছে সে অর্ধশতক আগে।

ছাদ নেই।

শপ নেই।

সাদা কালো অ্যালবামের শুশনি আমরুল, বিশল্যকরণীর সবুজ শরীররা মিলিয়ে যায়…

উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাণী ভবানী হস্টেলের টানা বারান্দার পাশাপাশি ঘরগুলো যেন বড়োসড়ো কোনো বজরার খোপ। সামনের রাস্তা নদীর মতো। ঘরের জানালা খুললে ঝকঝকে কাঞ্চনজঙ্ঘা… আকাশ পরিষ্কার থাকলে সে সারাদিনই ঠোঁট দেখায়, চোখ দেখায়, দেখায় মাথার ঝলমলে কিরীটখানি…।
কিন্তু সে মৌন পুরুষের চেয়ে বারান্দার লোভ টানই বেশি… কবিতা, নাচগান নাটক সবই হয় সে-সাম্পানে…। আবার এক-একদিন একলা হবার সুখ। শব্দ ছুঁয়ে ছুঁয়ে কাকে দেখি? কার স্পর্শ? এই শরীর মস্তিষ্ক ও মন… কত যে খোঁজ তাদের।

হই চই দিনে শুধু পৌনঃপুণিকতার দায়িত্ব। আমাদের রাত্রি দেখা বারণ। ঘর থেকে বার হওয়া বারণ। মেয়েদেরই কেন বারণ অথচ রাত্রি তো নারীই… ‘সেই এক তিল আর্ত রাত্রি তুমি’… রাত্রি যেন দেবী… রাত্রি দেব তো শুনি না…!

এইসব দিন ও রাত নিয়ে এক তিল সুখ এক কুচি অসুখ… সহজ রান ফোঁড়ে ভাষ্যের শিলালিপি।

Spread the love

4 Comments

  • চমৎকার গদ্য! বুনন মুগ্ধ করলো আমাকে।

    শানু চৌধুরী,
    • Ratri deb to sunita……anobaddo.valo thakun aro aro likhun.

      Sabyasachi MOZUMDAR,
  • অসাধারণ লেখা । তৃপ্তি সাঁতরা একজন অসামান্য গদ্য লেখক ।

    অমিতাভ মৈত্র,
  • কী অসামান্য গদ্য। দারুণ লেখা দিদি। জাত লেখকের লেখা

    প্রীতম,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *