নারী দিবসের গদ্য: রিম্পি

মেয়ে হয়েও মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি কখনো
মেয়ে হয়ে পৃথিবীতে বেঁচে থাকা খুব সহজ। হ্যাঁ, ‘সহজ’ শব্দটা সচেতনভাবেই রাখলাম। আসলে যেকোনো কঠিনকে সহজ করে নেওয়াটা নিজের উপর নির্ভর করে। এ’জন্য শক্তি প্রয়োজন, ইচ্ছে প্রয়োজন, প্রয়োজন জেদের। হ্যাঁ, তর্ক করতে হবে। পালটা উত্তর দিয়ে, কারো কারো কাছে অপছন্দের মানুষ হয়েও উঠতে হবে। কিন্তু তাতে খুব কি কিছু এসে যায়? আমার তো আসে না। কিচ্ছুটি আসে না।

স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, মেয়ে হয়েও মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি কখনো। আমার কাছে এটা সৌভাগ্যের হলেও সমাজের কাছে তা বড়োই দুর্ভাগ্যের। মেয়েদের ভাগ্যই আসলে গোলমেলে। তা যত না তার নিজের হাতে থাকে, তার চেয়ে বেশি অন্যের দ্বারা চালিত হয়। আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না। আমার ভাগ্য নিয়ে যদি আর কেউ কখনো খেলে থাকেন বা খেলবার চেষ্টা করে থাকেন, তবে সেটা ঈশ্বর নন। সেটা মানুষ। এই মেয়ে হয়েও মেনে এবং মানিয়ে নেওয়া আমার ধাতে সয় না। তাই তাদের সেই খেলা ভঙ্গ করে উঠে গেছি একদিন। আর নিজের ভাগ্য রচনা করতে বসেছি, এই নিজেই।
         ‘মেয়ে’ শব্দটা একটা ধারণার মতো। সেই ধারণার সঙ্গে কোনো এক মেয়ের জীবন যাপনের সুর যখন মেলে না, তখনই বাঁধে বিরোধ। আমি ছোটো থেকে যেহেতু মুসলিম পরিবারের মেয়ে হয়ে বেড়ে উঠেছি, তাই স্বভাবতই নানান প্রশ্ন নানান সময় ঘিরে ধরেছে আমায়। উত্তরও দিয়েছি তার।
        কেউ যখন বলেছে, ‘নামাজ পড়ো না কেন?’ বলেছি, ‘নিয়ম করে গাছে জল দিই জানেন। কবিতা পড়ি। ছাদে গিয়ে পাখিদের খাবার দিয়ে আসি। সেই কি যথেষ্ট নয়?’ এমন উত্তরে ঘাবড়েছে কেউ। কেউ আবার অদ্ভুত হাসি হেসেছে।
       তারপর, এই তো সেদিন, এক পরিচিত কথা প্রসঙ্গে বললেন, ‘মেয়ে হয়েও কোরান পড়তে শেখোনি! ছি! ছি!’ তাঁকে উত্তরে বলেছি, ‘আমার তো রবীন্দ্রনাথ পড়াই এখনো শেষ হল না, এগুলো শেষ করি, তারপর না হয় কোরান, গীতা, বাইবেল… সব পড়ব।’ উনি আমার উত্তর শুনে হয়তো খুব বেশি হলে আর দশ মিনিট বাড়িতে ছিলেন। চলে যাওয়ার সময় আমার মুখের দিকেও তাকাননি। তাতে আমার কী বা এল গেল? কিচ্ছু না।
সকল মেয়েদের জীবনে কখনো না কখনো তুমুল ঝড় আসে। আমার জীবনে ঝড়টা যখন এল, তখন আমি কলেজে পড়ি। বাবা পড়লো বিছানায়। আমরা অথৈ জলে। সেরকম সময়, কে একজন শুভাকাঙ্ক্ষী একটা লাল সুতো এনে আমার হাতে পরিয়ে দিল। আমি নারাজ হলেও দুর্বল মনের কাছে যুক্তি তো বরাবরই হেরো। কে একজন বোঝানোর চেষ্টা করলো যে, বাবার জীবন, এই সুতোই বাঁচাবে। সাময়িকভাবে বুঝলাম। কিন্তু মিথ্যে আর ক’দিন বাঁচে। অন্ধ বিশ্বাসের রং একদিন ফিকে হল। দেখলাম স্নানের জলে সেই সুতোর লাল রং রোজ যত ধুয়ে যাচ্ছে, তত ভেতর ভেতর শুদ্ধ হচ্ছি আমি। বলাই বাহুল্য একদিন সহ্যের সীমা পেরোবার পর সেই সুতো সকলের সামনে টান মেরে ফেলেছিলাম। সকলে বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়েছিল। আমি এক টুকরো হেসে, মাথা উঁচু করে উঠে এসেছিলাম সবার সামনে থেকে।
মেয়ে হয়েও আমি এখনও সেভাবে রান্না করতেও শিখিনি। আমি এখনও উল বুনতে পারি না। আমি এখনও ওভেনের এক হাত দূর থেকে ভাজা বেগুনের পিঠটা ভয়ে ভয়ে উলটে দিই। পেঁয়াজ কাটতে গিয়ে একটুর জন্য হাতটা অক্ষত রেখে ফিরে আসি। তবু এখন সচেতনভাবে বলি, ‘আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আমি নিজেই নিজের জন্য যথেষ্ট!’
আসলে ছোটোবেলার পরিবেশ তো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটা মানুষকে বড়ো করবার সঙ্গে সঙ্গে তার মনটাও তৈরি করে। আমারও বোধহয় তাই। আমি জয় পড়ি, পড়ি সুনীল। পূর্ণেন্দু পড়ি। আরো কতকিছু পড়ি। নীরার চোখের জল, চোখের অনেক নীচে টলমল করে যখন, তখন আমার একটা চাপা কান্না আসে। জয় পড়ে একটা ভ্যাবাচ্যাকা জীবন কাটানোর সাধ হয় আমার। পূর্ণেন্দু পড়ে, নন্দিনীর মতো ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়। যে সবকিছু ছেড়ে-ছুড়ে তার সর্বস্ব দিয়ে শুভঙ্করকে ভালোবাসার সাহস রাখে।
যদিও আমি রান্নাঘরে গিয়ে গোল করে লুচি, রুটি বেলতে পারি। না, মেয়ে হয়েছি বলে নয়, আমি ছোটো থেকে হাতের কাজ পারি বলে, ওটা আমার আপনাআপনি আসে। তারপর কানের কাছে যখন কেউ বলে, ‘বাবা থাকলে তোর জীবনটা হয়তো অন্যরকম হতো। প্রত্যেক মেয়ের যেমন হয়।’ তখন তাকে বলতে পারি, ‘কে বলেছে বাবা নেই? বাবা আছে বলেই আমি একটা অন্যরকম জীবন যাপন করতে পারছি।’
আমি শাড়ি পরি, চুলটা বাড়িয়েছি, মেয়ে বলে নয়। বড়ো চুল, শাড়ি, আমার বরাবরের দুর্বলতা।
মনে পড়ে, একজন বলেছিল, ‘শাড়ির চেয়ে কামিজ পরা ভালো। পিঠ, পেট কোনোটাই দেখা যায় না।’
        একজন কানে কানে বলেছিল, ‘মাসের ওই ক’টা দিন খবরদার কোনো ধর্মীয় পীঠস্থানে যাস না।’
         একজন বলেছিল, ‘আমাদের ধর্মে বলে মেয়েদের শরীরটাকে যতটা সম্ভব ঢেকে রাখা উচিত। তাই স্লিভলেসটা না পরলেই পারিস তো।’
কিন্তু মেয়ে হয়েও এই তিনটে কথারই উলটোটা করেছি আমি। না, জেদের জন্য নয়। করেছি, কারণ, সেটাই আমার ইচ্ছে। সেটাই আমার স্বাচ্ছন্দ্য। কে কী বললো তাতে আমার আসে যায়নি কিছুই।
জীবনে যা যা করব, সেইসবের কৈফিয়ত যদি অন্যকে দিতে হয় তবে জানতে হবে সেই জীবন আর নিজের হাতে নেই। কিন্তু নিজের হাতে, নিজের সমস্তটাই ছিল। এবং আছেও। জীবনে যা কিছু পারিনি, তার জন্য আক্ষেপ হয়নি। বরং ভাবতে ভালো লেগেছে, না-পারার উলটো দিকের পারাগুলো।
নিয়ম ভাঙতে ভাঙতে বুঝেছি আসলে মেয়ে হয়ে বেঁচে থাকা খুব সহজ। শুধু নিজের সঙ্গে নিজের সমঝোতা থাকলেই হয়। আর রইল বাকি অন্যান্য মানুষজন? সেক্ষেত্রে তাদের হাজার হাজার নিষেধাজ্ঞা চুলোয় যাক! নিজের যদি নিজেকে নিয়ে খুশি থাকতে ইচ্ছে হয়, তবে বাকি পৃথিবী যা বলছে বলতে দাও। তুমি শুধু তোমার কথা শোনো। কবিতা নিয়ে বসো। একটা নিরিবিলি বারান্দা খুঁজে নাও। সঙ্গে কেউ যদি নাও থাকে, তবু… তবু মাথার উপর একটা বিরাট আকাশ আছে। আর আছে আলো, ‘সেই তো যথেষ্ট স্বর্গ’… তাই নয় কি!

নারী দিবসের গদ্য: রিম্পি

আমাদের নতুন বই