Categories
উৎসব সংখ্যা ২০২০ গদ্য

পঙ্কজ চক্রবর্তীর গদ্য

একটি রক্তিম মরীচিকা


রবীন্দ্রনাথের গান আমায় ঘুমোতে দেয় না। আশ্চর্য সুরে শব্দের প্রান্তর ছেড়ে কতবার ছুটে গেছি। তারপর একসময় দেখি শব্দের দিকে, অর্থের দিকে পৌঁছতে বড়ো বেশি দেরি হয়ে গেছে। তবুও জেগে থাকি। কত অপ্রত্যাশিত শব্দ ছুটে আসে। ভাবি আমি কোনোদিন রবীন্দ্রনাথের মতো ‘শ্রাবণসন্ন‍্যাসী’-র মতো শব্দ দিয়ে গান রচনা করতে পারতাম কি? কত আশ্চর্য এক অনুভবে তিনি লিখতে পারেন— ‘ঝিল্লি যেমন শালের বনে নিদ্রানীরব রাতে/অন্ধকারের জপের মালায় একটানা সুর গাঁথে’। অন্ধকারের জপের মালা সেই অপ্রত্যাশিত এক অনুভূতির মায়ায় ছুটিয়ে বেড়ায়। যখন গাই— ‘ওরে জাগায়ো না, ও যে বিরাম মাগে নির্মম ভাগ‍্যের পায়ে’ তখন মনেই থাকে না এই গানটির একটি কবিতা রূপ আছে ‘সানাই’ কাব‍্যগ্রন্থে। যেখানে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন— ‘জাগায়ো না ওরে, জাগায়ো না।/ও আজি মেনেছে হার/ক্রূর বিধাতার কাছে।’ চমকে উঠতে হয় এমন অরাবীন্দ্রিক ‘ক্রূর’ শব্দের ব‍্যবহারে। আবার যখন লেখেন ‘এসেছিলে তবু আস নাই’ গানটি, তখন অনায়াসে কবিতারূপে ঢুকে যায় ‘উপহাসভরে’-র মতো শব্দ। শুষ্ক পাতার সাজাই তরুণী থেকে শুধুমাত্র মাইক্রোফোনের কথা ভেবে যখন ‘ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী’ লেখেন তখন ওই ছিন্ন শব্দ ঘিরেই এক অপ্রত্যাশিত ভাবনার আলিপন শুরু হয়ে যায়। ‘এসেছিলে তবু আস নাই’— এই বিরোধাভাস পেরিয়ে একদিন যখন সুর থেমে যায় তখন ফুটে ওঠে অবগুণ্ঠিত এক ছবি: ‘তখন পাতায় পাতায় বিন্দু বিন্দু ঝরে জল,/শ‍্যামল বনান্তভূমি করে ছলোছল্।’

তারপর একদিন শুরু হল স্বর্ণযুগের গান। কয়েক দশক জুড়ে আকাশবাণীর অবশ‍্যম্ভাবী অনুরোধের আসর। ‘বেতার জগৎ’ পত্রিকার অনুষ্ঠানের পরিচিতিতে লেখা হল ‘আধুনিক বাংলা’ গান। ১৯৩০ সালের ২৭শে এপ্রিল। শিল্পী হৃদয়রঞ্জন রায়। রবীন্দ্রনাথ-অতুলপ্রসাদ-নজরুল পরবর্তী গানের দিন। যখন কথায় একই রবীন্দ্র নির্ভরতা। সুর আর শিল্পীর গায়কীর আধুনিকতা কথার গায়ে লাগেনি। কিছুটা ব‍্যতিক্রমী সলিল চৌধুরী। আর মাঝে মাঝে অপ্রত্যাশিত শব্দের ব‍্যবহার। মনে পড়ে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ‘উজ্জ্বল এক ঝাঁক পায়রা’ গানটির কথা। যেখানে অনায়াসে কবিতার মতো এসে পড়ে ‘অশান্ত সৃষ্টির প্রশান্ত মন্থর অবকাশ’ কিংবা ‘একফালি নাগরিক আকাশে’-র মতো শব্দব‍্যবহার শ্রোতার কানের তোয়াক্কা না করেই। সলিল চৌধুরীর সুরে এই গানের কথা লেখেন কবি বিমলচন্দ্র ঘোষ। এই বিমলচন্দ্র ঘোষেরই লেখা ‘শাপমোচন’ ছবির ‘শোনো বন্ধু শোনো’ গানটি। রবীন্দ্রনাথ যে-শব্দ গানে রাখেননি, এখানে অনায়াসে এল ‘ক্রূর’ শব্দটি। তিনি লিখলেন আর উত্তমকুমারের লিপে হেমন্ত গাইলেন— ‘জীবনের ফুল মুকুলেই ঝরে সুকঠিন ফুটপাতে/অতি সঞ্চয়ী ক্রূর দানবের উদ্ধত পদাঘাতে’। সুবীর সেনের গলায় একদিন ভেসে এল ‘নগর জীবন ছবির মতো হয়তো’ গানটি। আর সেখানে কথার একটুকরো আধুনিকতা: ‘রাজপথে পোষা কৃষ্ণচূড়ায় বসন্ত আসে নেমে/তবু এখানে হৃদয় বাঁধবে না কেউ শকুন্তলার প্রেমে।’ কৃষ্ণচূড়ার আগে পোষা শব্দের এই অপ্রত্যাশিত ব‍্যবহার বাংলাগানের কথার সামর্থ্যের একটুকরো উজ্জ্বল দলিল। কত আশ্চর্য লাগে যখন দেখি সত্তরের দশকে লেখা হয়— ‘সেদিন তোমায় দেখেছিলাম ভোরবেলা/তুমি ভোরের বেলা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলে’। ভোরের বেলা হয়ে কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচে দাঁড়িয়ে থাকে একটা গোটা জীবন, একটা গোটা দশকের গান। মাঝে মাঝে মনে হয় যখন জীবনানন্দ ‘শতভিষা’ পত্রিকার পাতায় লেখেন— ‘আমারই হৃদয় দিয়ে চেনা তিন নারীর মতন;/সূর্য না কি সূর্যের চপ্পলে/পা গলিয়ে পৃথিবীতে এসে/পৃথিবীর থেকে উড়ে যায়।’ এই অপ্রত‍্যাশিত চপ্পলের মতো শব্দটিকে ধারণের মতো শক্তি সেই পঞ্চাশের দশকে স্বর্ণযুগের বাংলা গানের ছিল কি?


কচ্ছপ বুকে নিয়ে মানুষ বেরিয়েছে অফিসের পথে। মুখের উপর দিয়ে চলে যায় লেডিস স্পেশাল। হাঁটু অবধি জড়ানো কাপড়ে একটি মৃত মানুষ বাথরুমের বিজ্ঞাপনের পাশে উবু হয়ে বসে। তবু একান্ত রোদ্দুরের অভাব এই গন‍্যমান‍্যের দেশে। বহুদূর পথ। গন্তব্য ভিজে আছে বর্ষাবাদলে। এইবার কথা হোক। শিক্ষা বিষয়ে আমাদের হাতে আছে আগ্নেয়গিরির সমান লাভা নিঃসরণ। তারপর সন্ধ‍্যার ভিড় পেরিয়ে থলেভরতি রঙিন আপেল নিয়ে বাড়ি ফেরা। ভাঙা সাঁকো পেরিয়ে তোমার হলুদ বাড়ি লুকিয়ে রেখেছি অপ্রস্তুত গেঞ্জির ভিতরে। আজ উড়োজাহাজের দিনলিপি উড়ছে খেলনার চারপাশে। লিপিকর জানে রাতের শরীর দু-জনের মাঝখানে, অবুঝ সন্তান, প্রতিটি ভোরের রাতে ঘুমিয়ে পড়ার অপরাধ।

আটটা দশের লোকাল ছেড়ে দিয়ে বসে থাকি পানের দোকানে। বাথরুম সারি। দু-একটা ফোন আসে নগ্ন বাহু মেলে। এই বিপুল সংসারে আমি চাই নিছক অজুহাত। পালাবার নগন্য রেখা সুযোগসন্ধানী। সন্ধ‍্যার মেঘে আলোর পোকায় আমি নষ্ট হয়ে যাই।

ছলনার ডানা তুমি জানো যে-কোনো ফলের দু-দিকে রয়েছে ঢালু পথ। তর্কচূড়ামণি জানেন গাছের সন্দেহ। জানলায় বসে দেখি সামান্য উঠোনের ডালপালা সেও চলেছে পরবাসে।


আমরা মফস্‌সলের ছেলে। সেখানে তখন কথায় কথায় রুমাল, সেন্ট, পাউডার, সাবান দেখা যেত না। আমার মাসির দুই ছেলে আর এক মেয়ে। মেয়ে লতিকাদি। দিল্লির রাইসিনা কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী। কথায় কথায় পাউডার, সেন্ট মাখত লতিকাদি। আমি নীচু ক্লাসের বালক। লতিকাদির সুগন্ধে আচ্ছন্ন হয়ে থাকতাম। একদিন দেশভাগ হয়ে গেল। আমরা সপরিবারে কলকাতায় এলাম। মেসো এলেন কলকাতায় বদলি হয়ে। লতিকাদির বিয়ে হয়ে গেল। লতিকাদি আমার স্বপ্নের প্রথম রমণী। কলকাতা যাবার পথে প্ল‍্যাটফর্মে পড়ে গিয়েছিল লতিকাদির রুমাল। সেই সুগন্ধী রুমাল স্বপ্নের ভিতর বহুদিন যত্নে রেখেছিলাম আমি। আমার প্রথম প্রেম লতিকাদির কুহকে আচ্ছন্ন।

একদিন মাসি মারা গেলেন। মেসোমশাই একা। ব‍্যাঙ্কে ছেলেদের পাঠানো টাকা পড়ে থাকে। তোলার কেউ নেই। ছেলেরা বাবার দায়িত্ব নিতে চায় না। বরং পাউন্ড ডবল করে দেয়। অনিচ্ছুক লতিকাদি শেষপর্যন্ত বাবাকে হাওড়ার নিজের শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে রাখে। একদিন তার চিঠি পেয়ে হাওড়ায় লতিকাদির বাড়িতে গেলাম। স্বপ্নের লতিকাদি এখন গিন্নিবান্নি। বড়োছেলের বিয়ে দিয়ে ঘরে বউ এনেছে। দোতলায় মেসোকে দেখে চমকে উঠলাম। লতিকাদির অত‍্যাচারে মরণাপন্ন। স্মৃতিভ্রষ্ট একজন মানুষ। লতিকাদি দুই ভাইকে বঞ্চিত করে বাবাকে দিয়ে সব সম্পত্তি লিখিয়ে নেয়। তারপর একদিন হুইল চেয়ারে বসিয়ে স্মৃতিলুপ্ত বাবাকে বেওয়ারিশ তুলে দেয় কালকা মেলে। পরদিন নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপন। আমার স্বপ্নের নারী কাজ হাসিল করে বাবাকে নিরুদ্দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। কত অমানবিক, কত নিষ্ঠুর। এই রমণী আজ এক পাষাণ। শুধু সেই অপ্রত্যাশিত নিষ্ঠুরতার সাক্ষী আমি আর একটি ডুমুর গাছ।

সকালে উঠে একদিন অমিতাভ বুঝতে পারল সে কথা বলতে পারছে না। অথচ গতকাল রাতপর্যন্ত সে কথা বলেছে। কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ নয় শুধু বাষ্প বেরোচ্ছে। হতাশ হয়ে পড়ল অমিতাভ। সমস্ত শব্দ তার কণ্ঠ ছেড়ে গেছে। তার কান্না পেল। তারপর চুপচাপ বসে রইল বিছানায়। স্ত্রী রমলাকে এখনই কিছু বলা দরকার। অথচ শব্দ নেই। মনোবিদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েও যায় না সে শেষপর্যন্ত। শুধু রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। তারপর অনেক দৃশ্যের ভিতর দিয়ে বাড়ি ফিরে আসে অমিতাভ। রমলা জানতে চায় ডাক্তারের কাছে সে গেছে কি না। অমিতাভ মাথা নাড়ে। কিছুক্ষণ পর অপ্রত্যাশিত অমিতাভ বুঝতে পারে অনেক কথা বলছে তার হাত আর প্রতিটি আঙুল। আবার শুরু হয়েছে নতুন এক কথা বলা। চৌত্রিশ বছর পর আর এক অপরূপ আনন্দ বেদনায় বোবা ভাষার অবচেতনায় অপ্রত্যাশিত আলো এসে পড়ে। শুরু হয় না-কথার এক ভাষাতীত জীবন।

১০
কারুবাসনা আমাকে নষ্ট করে দিয়েছে। সবসময়ই শিল্প সৃষ্টি করার আগ্রহ, চিন্তার দুশ্ছেদ‍্য অঙ্কুরিত বোঝা বহন করে বেড়াবার জন্মগত পাপ। কারুকর্মীর এই জন্মগত অভিশাপ আমার সমস্ত সামাজিক সফলতা নষ্ট করে দিয়েছে। আজও কারেন্টের বিল পড়ে আছে তোষকের নীচে। যাওয়া হয়নি। কত উদ‍্যম নষ্ট হয়ে গেছে। আজ সন্ধ‍্যার অলৌকিক বিছানা পেরিয়ে আমি টের পাই জলের অশৌচে ভরে উঠেছে শহর। সামান্য খ‍্যাতির জন‍্য মনে হয় দাঁড়াই বৃত্তের ভিতরে; তবু পথ শেষ হয় না। সাদা পাতার দিকে তাকিয়ে আজ আমি ভুলে যেতে চাই সমস্ত মনোবেদনার কথা। জানলার বাইরে অসুখ। দরজা পেরিয়ে দেখি শৈশবের অন্ধকার বসে আছে হেলানো বটগাছের গায়ে। কত অপরাধ সিঁড়ির নীচে লুকিয়ে ফেলেছি একদিন। আজ এতদিন পর সমস্ত উদাসীন দুপুরের চারপাশে আমি জানলা খুলে দিই। কী চেয়েছিলাম আমি! যেন সমস্ত অপ্রত্যাশিত চুম্বন এসে জড়ো হয় সভ‍্যতার উলটো দিকের সাদা পাতায়। সেই দিন ছলনার বিরুদ্ধে আমি মেলে দেব জন্মের দু-কূল ঘেরা রঙিন পোশাক। তোমার অবলুপ্ত ভাষার শরীরে পেতে দেব সাঁকো। সে আরেক জীবনের বৃত্তান্ত। যখন বাসি বিস্কুটের ছায়া পেরিয়ে উটের মালিকের জন্য আমরা দরজা খুলে দিই।

ঋণ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ, বনফুল, বিমল কর, বিমলচন্দ্র ঘোষ, সলিল চৌধুরী, অমিতাভ সমাজপতি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শ‍্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, রাধানাথ মণ্ডল, সুকান্ত সিংহ।

প্রথম পাতা

One reply on “পঙ্কজ চক্রবর্তীর গদ্য”

অসাধারণ লেখা, অসামান্য!
আমার নমস্কার নেবেন পঙ্কজ বাবু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *