পাওলো কোয়েলহোর গদ্য

ভাষান্তর: অমিতাভ মৈত্র

মরুভূমির চোখের জল
[The Tears of the Desert]

মরক্কো থেকে আমার এক বন্ধু ফিরে এল একজন মিশনারির গল্প নিয়ে, মারাকেশে পৌঁছে যে-মিশনারি মনস্থ করেন প্রতিদিন খুব সকালে শহরের বাইরের মরুভূমিতে হাঁটবেন। প্রথম দিন বেরোনোর সময় তিনি দেখলেন মরুভূমির বালিতে কান পেতে শুয়ে একজন কোমলভাবে থাবা দিচ্ছে মরুভূমির বালিতে।

— ‘লোকটা নিশ্চয়ই উন্মাদ,’ মিশনারি ভাবলেন।

প্রতিদিন এই দৃশ্য চোখে পড়ত তাঁর, আর একমাস পরে এই দৃশ্যের অভিসন্ধি ও আকর্ষণ যেন হারিয়ে দিল তাঁকে। তিনি ঠিক করলেন কথা বলবেন লোকটার সাথে। আরবের ভাষায় তিনি স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। লোকটির পাশে হাঁটু গেড়ে বসে তাই থেমে থেমে জানতে চাইলেন।

— ‘কী করছ তুমি?’

— ‘এই মরুভূমি খুব নিঃসঙ্গ। তার এ নিঃসঙ্গতা ও কান্নায় আমি একটু সঙ্গ দিচ্ছি, সান্ত্বনা দিচ্ছি, চোখের জল মুছিয়ে দিচ্ছি।’

— ‘মরুভূমি কাঁদে আমি জানতাম না।’

— ‘ও স্বপ্ন দেখে মানুষের সাহায্যে আসার, বিশাল একটা বাগান হতে চায় যেখানে তারা শস্য ফলাবে, ফুলের বাগান তৈরি করবে, ভেড়া চরাবে।’

— ‘বেশ, তুমি মরুভূমিকে বলো ও একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে চলেছে,’ মিশনারি বললেন। ‘যখনই আমি এই মরুভূমির সাথে থাকি, মানুষের সত্যিকারের আকার আমি বুঝতে পারি। তার অপরিমেয়তা আমাকে বলে যায় ঈশ্বরের কাছে আমরা কত ক্ষুদ্র, কত তুচ্ছ। যখন একটি বালুকণার দিকে তাকাই, আমি কল্পনা করি কোটি কোটি মানুষ যারা জন্মের মুহূর্তে সবাই ছিল সমান, কিন্তু পরে পৃথিবী যাদের সাথে সুবিচার করেনি। এখানকার পাহাড়েরা ধ্যানস্থ করে আমাকে, আর যখন দিগন্তে সূর্যের প্রথম আলো দেখা যায়, আনন্দে ভরে যায় আমার মন এবং ঈশ্বরের সান্নিধ্যে হারিয়ে যাই আমি।’

লোকটিকে ছেড়ে মিশনারি তাঁর কাজের জগতে ফিরে গেলেন। পরদিন সকালে সবিস্ময়ে দেখলেন লোকটি সেই জায়গায়, একইভাবে কান পেতে শুয়ে আছে বালির ওপর।

— ‘তোমাকে যে-সব কথা বলেছিলাম, মরুভূমিকে বলেছ?’

মানুষটি মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

— ‘আর এখনও সে কাঁদছে?’

— ‘তার প্রতিটি ফুঁপিয়ে ওঠা শুনতে পাচ্ছি। এখন ও কাঁদছে এ-জন্য যে, হাজার হাজার বছর ও নিজের অস্তিত্বকে অর্থহীন মনে করে নিজের ভাগ্য আর ঈশ্বরকে দোষ দিয়ে এসেছে শুধু।’

— ‘ঠিক আছে, এবার মরুভূমিকে বলো মানুষ হিসেবে আমাদের জীবনের সময় খুব কম, তবু আমাদের সেই মহার্ঘ সময়ের অনেকটা নিজেদের অর্থহীন মনে করে নষ্ট করি। আমাদের নিয়তি আমরা জানি না আর ভাবি ঈশ্বর অন্যায় করেছেন আমাদের সাথে। নিজেকে জানার সেই মুহূর্তটি শেষ পর্যন্ত আসে যখন আমরা জীবনের উদ্দেশ্য অনুভব করতে পারি, তখন অনুতাপ হয় সময় নেই ভেবে জীবনকে ঠিক পথে চালিত করার। মরুভূমির মতো আমরা তখন অভিশাপ দিই, নিজেদের সময় এভাবে নষ্ট করার জন্য।’

— ‘জানি না মরুভূমি শুনবে কি না এই কথা,’ লোকটি বলল। ‘সে যন্ত্রণাতেই অভ্যস্ত, অন্যভাবে দেখার চোখ তার নেই।’

— ‘তাহলে এসো, সেই কাজটাই করি আমরা, যে-কাজ বহুবার করতে হয় আমাকে। যখন টের পাই সবরকম আশা হারিয়েছে মানুষ— প্রার্থনা করি দু-জনে।’

হাঁটু মুড়ে বসে প্রার্থনা শুরু করল দু-জনে। লোকটি ছিল মুসলিম, তাই তার মুখ মক্কার দিকে। মিশনারি ক্যাথলিক, দু-হাত জোড় করে প্রার্থনা শুরু করল। নিজেদের ধর্মের, নিজেদের ঈশ্বরের কাছে যিনি আসলে একই।

পরের দিন প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে মিশনারি দেখলেন লোকটি সেখানে নেই। শুধু যেখানে সে বালির ওপর কান পেতে শুয়ে থাকত, সেখানে বালি মরুভূমির ভেতর থেকে ভিজে উঠেছে। হারিয়ে যাওয়া বন্ধুর জন্য মরুভূমি কাঁদছে।

কয়েকমাস পরে যখন জলস্রোত বেড়ে গেল অনেক, শহরের লোক তখন একটা কুয়ো তৈরি করল সেখানে আর বেদুইনরা তার নাম রাখল ‘মরুভূমির অশ্রু’। লোকে বলে এই কুয়োর জল যে খাবে, তার দুঃখের কারণ বদলে যাবে আনন্দে, আর এভাবেই নিজের জীবনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে উঠবে তার কাছে।

ভোরের মুহূর্ত
[The Moment of Dawn]

একজন ইহুদি শিক্ষক তার চারপাশের ছাত্রদের জিজ্ঞেস করলেন:

‘রাত্রি শেষ হয়ে দিনের শুরুর সঠিক মুহূর্তটি কীভাবে জানতে পারি আমরা?’

‘যখন আলো এমন থাকে যে, ভেড়া থেকে কুকুরকে আলাদা করতে পারে আমাদের চোখ,’ একটি ছেলে বলল।

আরেকটি ছাত্র বলল: ‘যখন জলপাই গাছ আর ডুমুর গাছকে আলাদা করতে পারে আমাদের চোখ।’

‘না, কোনো উত্তরই তেমন ভালো হল না।’ বললেন শিক্ষক।

‘ভালো উত্তর তাহলে কী?’ জানতে চাইল ছাত্ররা।

শিক্ষক বললেন: ‘যখন কোনো অচেনা মানুষ এগিয়ে আসে আর মনে হয় সে আমাদের ভাই, তখনই রাত্রি ভোর হয় আর আলো আসে।’

ধনুকের পথ
[The Way of the Bow]

পুনরাবৃত্তির প্রয়োজনীয়তা
চিন্তাকে যখন প্রকাশ করা হয়, তখন কর্মের শুরু। ভঙ্গির ন্যূনতম পরিবর্তনও প্রতারণা করে আমাদের, সে-জন্য সবকিছু নিখুঁত নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, প্রতিটি অনুপুঙ্খ যেন মনে থাকে। দক্ষতাকে নিয়ে যেতে হবে যান্ত্রিকতার এমন পর্যায়ে যেখানে স্বয়ংক্রিয় জ্ঞানই সব। কোনো নির্দিষ্ট নিয়মিত অনুশীলনে নয়, এই স্বয়ংক্রিয় জ্ঞান এক এমন মানসিক স্থিতি যা ভেতর থেকে জেগে ওঠে।

দীর্ঘ অভ্যাসের পর প্রয়োজনীয় সঞ্চালনগুলো নিয়ে আর ভাবার প্রয়োজন হয় না। অস্তিত্বের অংশ হয়ে ওঠে তারা। কিন্তু এই জায়গায় আসতে হলে অনুশীলন আর পুনরাবৃত্তি দরকার। সেটাও যথেষ্ট না হলে পুনরাবৃত্তি আর অনুশীলন শুরু করো।

যে নাল পরায় ঘোড়ার ক্ষুরে, তাকে মন দিয়ে লক্ষ করো। অনভিজ্ঞের চোখে মনে হবে একইভাবে হাতুড়ি পিটছে সে। কিন্তু দেখার চোখ আছে যার সেই শুধু বোঝে প্রতিবার হাতুড়ি তোলা আর আঘাত করার মধ্যে অনেক সূক্ষ্ম তারতম্য থাকে। প্রতিবার লোহার ওপর নেমে আসার সময় হাত জানে কখন তাকে জোরে আর কখন কোমলভাবে আঘাত করতে হবে।

হাওয়াকলের দিকে মাত্র একবার যে তাকায় তার মনে হবে কলের পাখাগুলো একই গতিতে, একই রকম ঘুরে যাচ্ছে। কিন্তু যে অভিজ্ঞ সে জানে বাতাসের গতির তারতম্যে হাওয়াকলের পাখার গতি বদলে যায়।

যে নাল পরায় সে এই যান্ত্রিকতা আয়ত্ত করেছে হাজার হাজার বার হাতুড়ি ব্যবহার করে। জোরে বাতাসের সময় হাওয়াকলের পাখা দ্রুত ঘোরে, আর বোঝা যায় তার গিয়ার ঠিক আছে।

চাঁদমারির বাইরে যদি কিছু তির উড়ে যায় তিরন্দাজ বোঝে সেটা স্বাভাবিক। ধনুক, তির, ধনুকের ছিলা, চাঁদমারি, তার ধনুক ধরা আর তির নিক্ষেপের ভঙ্গি— সবকিছুর নিখুঁত যান্ত্রিক সমন্বয় আয়ত্ত হতে পারে হাজার হাজার বার একাগ্র অনুশীলনে। তারপর আসে সেই মুহূর্ত যখন সে নিজেই হয়ে ওঠে ধনুক, তির, চাঁদমারি গলে মিশে তৈরি হওয়া নতুন এক অস্তিত্ব।

ছুটে যাওয়া তিরকে কীভাবে দেখতে হয়
শূন্যে কোনো অভিপ্রায়ের দাগ হয়ে তির ছুটে যায়। তির ছোঁড়ার পর সেই তিরের গতিপথ ও লক্ষ্যস্থল অনুসরণ করা ছাড়া আর কোনো কাজ তিরন্দাজের নেই। ছোঁড়ার মুহূর্তের তীব্র টানটান অনুভূতি সেই মুহূর্তে সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে গেছে। স্থিরচোখে তাই সে অনুসরণ করছে তিরকে, তার মন বিশ্রাম নিচ্ছে, তখন হাসি লেগে আছে তার ঠোঁটে।

যদি যথেষ্ট হয়ে থাকে তার অনুশীলন, আর নিয়ন্ত্রণে থাকে তার সহজাত প্রবৃত্তি, তির ছোঁড়ার সময় তার মন যদি একাগ্র ও সহজ থাকে, মহাবিশ্বকে সে অনুভব করবে তার অস্তিত্বে। তার হাত যখন প্রস্তুত হচ্ছে, শ্বাস হয়ে উঠছে ধীর, আর চোখ স্থির হচ্ছে লক্ষ্যে— তার প্রশিক্ষণ আর দক্ষতা তখন কাজ করছে। কিন্তু তির নিক্ষেপের সঠিক মুহূর্ত তাকে জানায় তার সহজাত প্রবৃত্তি।

পাশ দিয়ে যেতে যেতে যদি কেউ এই মুহূর্তের তিরন্দাজকে দেখে তার এলিয়ে থাকা চিন্তাহীন হাত আর বাতাস কেটে ছুটে যাওয়া তিরের দিকে তাকিয়ে থাকতে— তার মনে হবে কিছুই ঘটছে না। কিন্তু তার সঙ্গীরা জানে তির ছোঁড়ার পর তার মনে সমুদ্র পরিবর্তন ঘটে গেছে। সারা ব্রহ্মাণ্ডে ছড়িয়ে পড়ছে তার মন। মন কাজ করে যাচ্ছে, তির ছোঁড়ার মুহূর্তে তার সক্রিয়তা, ইতিবাচকতা, ভুলের সম্ভাব্যতা বুঝে নেওয়া আর দেখা তিরের আঘাতে লক্ষ্যবস্তুর প্রতিক্রিয়া কেমন।

যখন তির ছোঁড়ে সে, তখন তার ধনুকে মহাবিশ্বকে অনুভব করে সে। যখন লক্ষ্যবস্তুর দিকে তির ছুটে যায়, মহাবিশ্ব যেন আরও কাছে চলে আসে তার, জড়িয়ে রাখে তাকে আর ঠিকভাবে সমাধা করা কাজের জন্য সুখী করে তাকে।

যখন তার কাজ শেষ, তার অভিপ্রায় যখন সফল, একজন আলোকিত যোদ্ধার আর কোনো ভয় নেই তখন। সে শেষ করেছে তার কাজ। নিজেকে ভয়ে অসাড় হতে দেয়নি সে। যদি লক্ষ্যস্থলে আঘাত নাও করে তার তির, তার সুযোগ থাকবে পরের বারের জন্য— কেন-না ভয় পেয়ে সরে দাঁড়ায়নি সে।

মিয়ামি বন্দরে
[In Miami Harbour]

‘মাঝে মাঝেই মানুষজন সিনেমায় কিছু দেখে এত মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ে যে, শেষ পর্যন্ত আসল ঘটনাই মুছে যায় তার স্মৃতি থেকে।’ মিয়ামি বন্দরে যখন একসাথে দাঁড়িয়েছিলাম বন্ধুটি বললেন, ‘তোমার টেন কমান্ডমেন্টস মনে আছে?’

অবশ্যই মনে আছে। এক জায়গায় মোজেস— মানে চার্লিয়ন হেস্টন— হাতের লাঠি তুলে ধরেন আর জল দু-দিকে সরে যায়। ইজরায়েলের সন্তানরা তখন পার হয়ে যায়।’

‘বাইবেলে কিন্তু অন্য গল্প,’ বন্ধু বলল। ‘সেখানে ঈশ্বর, মোজেসকে বলেন, ‘ইজরায়েলের সন্তানদের বলো যেন তারা এগিয়ে যায়।’ তারা এগিয়ে যাবার পরেই তিনি মোজেসকে বলেন হাতের লাঠি তুলে ধরতে। আর তখন লোহিত সাগর দু-দিকে সরে যায়। পথের জন্য সদিচ্ছাই পথ তৈরি করে।’

মানুষ যখন মজারু
[The Funny Thing About Human Beings]

আমার বন্ধু জেসি কোহেনকে একজন প্রশ্ন করেছিল:

‘মানুষের সব থেকে মজাদার বিশেষত্ব কী?’

কোহেন বলেছিল, ‘আমাদের স্ববিরোধিতা। বড়ো হবার জন্য বিষম তাড়া থাকে আমাদের, পরে হারিয়ে যাওয়া ছেলেবেলায় ফিরতে চাই আবার। টাকা উপার্জনের মরিয়া চেষ্টায় শরীরকে শেষ করে ফেলি, পরে সব অর্জন খরচ করি আরোগ্যের জন্য। ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা এত উদ্বেগে থাকি যে, বর্তমানকে গ্রাহ্য করি না আমরা— আর এভাবে বর্তমান বা ভবিষ্যৎ কিছুই আর জানা হয় না আমাদের। যখন বেঁচে থাকি তখন মনে করি আমাদের মৃত্যু নেই। আর এমনভাবে মরি, যেন আমরা আদৌ বেঁচে ছিলাম না কখনো।’

হারানো ইট
[The Missing Brick]

আমি ও আমার স্ত্রী যখন ছুটিতে ভ্রমণে বেরিয়েছিলাম আমার সেক্রেটারির থেকে একটা ফ্যাক্স এল।

‘রান্নাঘর সারানোর জন্য কাচের একটা ইট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি আপনাকে মূল নকশা আর নির্মাণ সংস্থা যে-পরিবর্তিত নকশা দিয়েছে এই ক্ষতি সামলাতে, আপনাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’ সেক্রেটারি জানিয়েছেন।

একদিকে আমার স্ত্রীর তৈরি করা নকশা: ইটের সুসংবদ্ধ রেখা আর বাতাস চলাচলের জন্য খোলা জায়গা। অন্য দিকে হারিয়ে যাওয়া ইটের সমস্যা থেকে মুক্তির নতুন নকশা: একটা সত্যিকারের জিগ্ স পাজল যেখানে গ্লাস ব্রিকসগুলো সাজানো হয়েছে জোড়াতালি দিয়ে নান্দনিকতাকে অগ্রাহ্য করে।

‘আর একটা কাচের ইট কিনুন,’ লিখে জানালেন আমার স্ত্রী। তাঁরা করলেন সেটা, আর আগের নকশাও বহাল থাকল।

সেদিন বিকেলে অনেকক্ষণ ধরে ভাবছিলাম বিষয়টি নিয়ে। মাত্র একটা ইট নেই বলে কতবার আমরা আমাদের জীবনের মূল নকশাটিকে বিকৃত করে তুলি।

Spread the love

2 Comments

  • এত ভালো লেখা এবং অনুবাদ যে অতুলনীয়

    Raju,
  • আবার পড়ার ইচ্ছে রইলো

    Raju,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *