রণজিৎ অধিকারীর গদ্য

বাল্যকাল কিংবা এক কাল্পনিক অতিভুজ


শুশুনিয়া পাহাড়ের পায়ের কাছে রাস্তা, আর রাস্তার পর থেকেই গ্রাম শুরু হয়েছে। ঢালু রাস্তা নেমে গেছে, রাস্তার দু-দিকেই ছড়িয়ে বাড়ি, এইভাবে কিছু দূর গ্রাম ছাড়িয়ে গেলেই গন্ধেশ্বরী নদী। গ্রীষ্মে প্রায় জল থাকে না, অতি শীর্ণ। এই গ্রামে একবার মাসাধিক কাল ছিলাম এক দরিদ্র মূর্তিশিল্পীর বাড়িতে। শুশুনিয়া পাহাড়ের গা থেকে পাথর কেটে এনে বাড়িতে বাড়িতে এই মূর্তিশিল্প। রোজগারের একটা সহজ শিল্পিত পথ। এখানে অনেক রাষ্ট্রপতি পুরস্কার প্রাপ্ত শিল্পীর বাড়ি ঘুরে ঘুরে তাঁদের কাজ করা দেখেছি বসে বসে। রাস্তা দিয়ে হাঁটলে প্রায় প্রতি ঘর থেকেই পাথর কাটার ঠুকঠুক শব্দ কানে আসবে।

যাঁরা খুব নিপুণ শিল্পী তাঁরা খুব ছোটো ছোটো মূর্তি আর সূক্ষ্ম কাজ করেন।

আমার সংগ্রহে আছে তেমন কিছু মূর্তি। কিন্তু যাঁদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি আমরা তাঁরা শিল্পী হিসেবে তেমন কিছু নন, ভালো করে দেখলে তাঁদের কাজের অনেক ত্রুটি ধরা পড়ে। প্রায় দিন আনি দিন খাই অবস্থা।

শুশুনিয়া পাহাড়ের কোলে যেখানে মন্দির আর প্রতিদিনই দর্শনার্থীদের ভিড়, সেখানে তাদের পাতা দোকান। যতটুকু যা বিক্রি।

তো ওঁদের বাড়িতেই দেখেছি মূর্তি তৈরির আগে ছোটো ছোটো করে মাপমতো পাথর কেটে রাখা— তারপর একেকটাতে ধীরে ধীরে ফুটিয়ে তোলা হয় একেক দেব দেবীর মূর্তি।

মাত্র দুটো ঘর, আর ঘেরা দুয়ার নিয়ে কানু কর্মকারের বাড়িখানা, সামনে বেড়া দেওয়া সামান্য উঠোন। স্ত্রী আর দুই ছেলে নিয়ে সংসার।

বাবার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই ঠুকঠুক করে পাথর কাটেন শিল্পী, কিছুক্ষণ পরই একটা মূর্তি হয়ে যায়, স্ত্রী সেটাকে সরিয়ে রাখেন। তেমন সৌখিন কাজ নয় তাঁর।

রাতে একটা ঘরে তাঁর দুই ছেলের সঙ্গে আমি আর বাবা শুই।

একদিন খুব রাতে ঠুকঠুক শব্দে ঘুম ভেঙে গেল, বিছানা থেকে নেমে দুয়ারের কোণের ছোট্ট কুঠুরিটাতে উঁকি দিই, এত ছোটো যে সেখানে একজন বসে কেবল কাজ করতে পারে, বাকিটা নানা আকারের পাথরে ভরতি।

একটা হ্যারিকেন-এর আলোয় শিল্পী কানু যেন একটা ঘোরের ভেতর ঝুঁকে পড়ে পাথর কাটছেন।

আমিও পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। জগতে যেন আর কোথাও কিছু ঘটছে না, খুব দূর থেকে কোনো মাতালের জড়ানো চিৎকার নৈঃশব্দ্যেরই একটা অংশ মনে হয়, আর এখানে ঠুক ঠুক…।

পাথরের টুকরো আর সাদা গুঁড়ো শিল্পীর দু-পায়ের ফাঁকে জমছে। কিছুক্ষণ পরই মূর্তিটা একটু রূপ পেল, ক্রমে শিল্পীর হস্তচালনা আরো সাবধানী হয়ে উঠল।

খুব মগ্ন হয়ে কাজ করছেন তিনি, কোনো দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। যেন এক মস্ত বড়ো সাধনা। আরও একটু পরে যখন মূর্তিটা সম্পূর্ণ হয়ে এল, তখন সেই অল্প লালাভ আলোয় দেবী মূর্তি যেন ঝিকমিক করে উঠল। একটু আগে যা ছিল পাথরের টুকরো, তারও আগে পাহাড়ের ভেতর স্তব্ধ জমাট অন্ধ, কোটি কোটি বছর… আজ তার মুক্তি ঘটল। অল্পবয়সী চোখে দেখা সেই দৃশ্য সেই উপলব্ধি আজও আমার কাছে অলৌকিক।

সেই জ্যোতিতে ভরে যাওয়া মলিন কুঠুরি, সেই মুহূর্ত আমি কখনো ভুলব না। দিনের আলোয় পরে ওই মূর্তি দেখে হতাশই হয়েছি। ত্রুটি ধরা পড়ে যে-চড়া বাস্তবের আলোয়, সেই বাস্তবই তো আমাদের জীবনকে চালিয়ে নিয়ে যায়, তার থেকে মুক্তি নেই। তবু একেকটি দিনের উদ্ভাস অবাস্তব সুন্দর হয়ে থেকে যায় মনে।


শুশুনিয়া গ্রামের এক দিকে পাহাড়, উলটো দিকে গন্ধেশ্বরী নদী। সন্ধ্যের আগে আগে বাবার সঙ্গে নদীর দিকে নেমে যাই। নদীর দিকটাতে বেশ কয়েকটি বড়ো পুকুর। বিকেলের দিকে যাতায়াতের পথে দেখেছি— পুকুরের একদিকে নারীরা স্নানের জন্য ব্যবহার করে, কিছু দূরে পুরুষেরা। আমাদের যাতায়াতের পথে স্নানের জায়গাগুলো পড়ে। আর এখন বিকেলের পর মহিলাদের ভিড় জমে পুকুরে। উঁচু আলপথ দিয়ে আমি একটু আগে আগে চলেছি। বাবা বেশ পিছিয়ে পড়েছে। কিন্তু কেনই-বা আমি সেদিন অতখানি এগিয়ে গিয়েছিলাম এতদিন পর আর বলা সম্ভব নয়। মনে কোনো পাপচিন্তা ছিল!—

মনের অন্য দিকটা আজও তা মানতে চায় না। স্নানরতা নারীকে দেখার অনীহা সাধুতার পর্যায়ে পড়ে, আর আমি সাধু নই। সামনের ঝোপটা পেরোলেই পুকুর, সমবেত নারীদের হাসি আর কথার শব্দ আসছে।

তবে আমি যে অন্যমনস্ক ছিলাম— সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আলপথ থেকে নীচে নেমে কিছুটা জমি পেরিয়েই পুকুরপাড়। পা-টা নামাতে গিয়েই চকিতে তুলে নিলাম আর স্তম্ভিত হয়ে গেলাম।

ভাবলে এখনও গা শিউরে ওঠে, শ্বাস বন্ধ করে আমি দাঁড়িয়ে— ফণা তুলে যে আমার সামনে— অত বড়ো বিষধর কি জীবনে আর কখনো দেখেছি?

বাবা এখনও কেন আসছে না! এত কান্না পাচ্ছে।

আর কখনো একা একা এভাবে এগিয়ে আসব না। পুকুর থেকে উঠে একজন প্রৌঢ়া এদিকে পা বাড়াতেই ফণা নামিয়ে সে চলে গেল। আমি তখনও দমবন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছি। বাবা কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে লক্ষ করিনি।— কী হল? চলো। আমি ভয়ে ভয়ে ঘটনাটির কথা বলতেই বাবা বলল— তোমার মনের মধ্যে কোনো কুচিন্তা ছিল। এসো।— বলেই বাবা এগিয়ে গেল।

আমি কিচ্ছু না বলে চুপচাপ বাবার পেছনে চলতে লাগলাম। তখন অন্ধকার হয়ে এসেছে।

বাকি পথ, এমনকী নদী থেকে ফেরার পথেও বাবা এ-বিষয়ে আর একটি কথাও বলল না। কিন্তু তারপর থেকে যখনই বাবার সামনে যাই, মনে হয় আমার যা কিছু গোপন ভাবনা তার সবকিছুই বাবা স্পষ্ট পড়ে নিতে পারছে।


বর্ষায় শালবনের সে এক রূপ হয়। বেলপাহাড়ি পেরোলেই বৃষ্টিভেজা শালপাতার রং মনকে এক সজীবতায় ভরে দেয়। শুধু বাসের জানালার দিকে বসতে পাওয়া চাই, দক্ষিণ-পশ্চিমে তাকিয়ে মন কেমন করে ওঠে— থরে থরে মেঘের মতো পাহাড়ের শিরা। কিছুটা এগিয়ে বাঁ-দিকে রাস্তা গেছে ওদলচূয়ার দিকে— কী নির্জন আর রাস্তার দু-দিকে প্রকৃতির রূপ আশ্চর্য সুন্দর।

ভাবি, ভ্রমণবিলাসী বাঙালি কত কত দূর বেড়াতে যায় প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের জন্য অথচ বাড়ির কাছে ওদলচূয়া কাকরাঝোড় দলমা পাহাড় অবহেলায় চুপ করে পড়ে থাকে অভিমানে।

যাক, বাঁ-দিকে না বেঁকে সোজা রাস্তা এঁকেবেঁকে উঠে নেমে চলে গেছে ভূলাভেদা হয়ে বাঁশপাহাড়ি। বাঁশপাহাড়ি থেকে ঝিলিমিলি খুব কাছে। এইসব অঞ্চলের নিবিড় প্রকৃতির ভেতরে আমি দিনের পর দিন ঘুরে বেড়িয়েছি।

ভূলাভেদার পরের ছোট্ট স্টপেজ তামাজুড়ি, দু-একটা দোকান ছাড়া তখন কিছু ছিল না, তবে বাঁ-দিকে যে-সরু পাথুরে রাস্তাটা ঢুকে গেছে তার দু-দিকে বেশ কিছু বাড়ি।

১৯৯০-৯১ সালে আমার বাবা এই নির্জন শান্ত পরিবেশে একটি আশ্রম গড়ে তোলে। বাবা তার কয়েকজন শিষ্যকে নিয়ে বছরের অনেকটা সময় এখানেই কাটাত।

আমি এই আশ্রমে আসি তারও দু-একবছর পরে।

স্কুলের ছুটি থাকলে আমি এখানে এসেই থাকতাম।

মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার পর প্রায় টানা দু-মাস ছিলাম মনে আছে। পরবর্তী কালে আমার মধ্যে যখন ধর্ম বিষয়ে সংশয় দেখা দিতে শুরু করে, উপবীত ত্যাগ করি, তারপর থেকে ওই আশ্রমে আর যাইনি বললেই চলে। কিন্তু সে-সব অনেক পরের কাহিনি।

বাল্যে মনের মধ্যে যখন এ-সব জটিলতা দেখা দেয়নি, সহজ দৃষ্টিতে চারপাশটাকে দেখি ও নির্মল আনন্দ পাই, তখনকার স্মৃতিগুলি এখনও উজ্জ্বল হয়ে আছে।

আশ্রমে সারাদিন শিষ্যদের আনাগোনা আর সন্ধ্যেতে কীর্তনের আসর বসে। এই আসরে গানের চেয়ে কথা বা তত্ত্ব আলোচনা হয় বেশি, শিষ্যদের নানা প্রশ্নের উত্তর দেয় বাবা।

ফলে আমার ছুটি, বাজাতে হয় না। সারাদিনই প্রায় আমি লাগামহীন ঘুরে বেড়াই, আশেপাশের গ্রাম, কারুর উঠোনে গিয়ে বসে থাকি দড়ির খাটিয়ায়। কোথাও নির্জন একটা গাছের তলায় চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি। প্রকৃতপক্ষে এই সময়গুলোই আমার জীবনকে শান্ত এক তারে বেঁধে দেয়।

একটা ঘটনার কথা বলি। ওইসব অঞ্চলে দেখেছি পুরুষেরা খুব অল্পবয়স থেকেই নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে।

এখানে যারাই বাবার শিষ্য হয়েছে, তাদের অধিকাংশই নেশায় আচ্ছন্ন থাকত এককালে, বাবার সংস্পর্শে এসে ধীরে ধীরে নেশা থেকে মুক্ত হত।

অবশ্য এমন উদাহরণও আছে যে, কেউ পুনরায় নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে আবার কান্নাকাটি করে নেশা ছাড়ার শপথ করেছে… আবার… আবার।

এদের স্ত্রীদের যন্ত্রণার শেষ থাকত না। স্বামী নেশা করে সারা সারা দিন ঘরে, এদিকে হাঁড়ি চড়ে না। প্রায়ই তারা বাবার কাছে এসে পায়ে পড়ত। কিন্তু এ-সব ক্ষেত্রে বাবাই-বা কী করতে পারে— বুঝতাম না!

কখনো তারা স্বামীকে আশ্রমে আনত, বাবা সারাদিন ধরে তাদের বোঝাত, দেখেছি।

তবে একবার একটা ঘটনায় আমি আশ্চর্য হই, এবং বাবাকে অন্যভাবে আবিষ্কার করি।

পাশের গ্রাম থেকে একটি রুগ্ন বউ এক সন্ধ্যায় এসে কান্নাকাটি করে বাবার কাছে। বাবা তাকে কথা দেয় যে যাবে তার বাড়ি কোনো একদিন।

দু-একদিন পরেই বাবা সেখানে গেল, এবং আমাকে কোনোমতেই সঙ্গে নিতে চাইল না।

আমি সারা সকাল এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ালাম, দুপুরে স্নান করে খেলাম। কিন্তু দুপুর গড়ালে আর ভালো লাগল না। এক শিষ্যের সঙ্গে গেলাম সেখানে।

গিয়ে দেখি, তার ছোট্ট ঘর, সামনেটা ফাঁকা অনেকটা জায়গা। একদিকে অনেকগুলো মহিষ, অন্য দিকে একটা গাছের নীচে খাটিয়ায় বাবা শুয়ে, নীচে একটি লোক চোখ লাল, ইনিয়েবিনিয়ে কী সব বলে চলেছে।

বাবা কিছুক্ষণ পর বলল, তুই যদি নেশা না ছাড়িস এখানেই শুয়ে থাকব, জলগ্রহণও করব না তোর ঘরে।

স্পষ্ট সব কথা মনে নেই, তবে সন্ধ্যের পর আমরা ফিরে আসছিলাম, বাবা চুপচাপ সামনে হেঁটে যাচ্ছিল। বাবার মুখেই পরে শুনেছি, সে না কি নেশা ছেড়ে দিয়েছিল। যদিও অনেকেই পুনরায় আগের জীবনে ফিরে যেত সঙ্গদোষে— এরকম আক্ষেপ করতেও শুনেছি বাবাকে।

ধর্মে আমার বিশ্বাস নেই। কিন্তু সেদিন সারাদিন রোদে খাটিয়ায় শুয়ে যে-চেষ্টা বাবা করেছিল, তার সাফল্য ব্যর্থতা মাথায় রেখেও বাবার ওই রূপকে শ্রদ্ধা না করে পারি না। কেন-না নেশা ধ্বংস করে দেয় এক-একটা সংসারকে— নিজের চোখে দেখেছি।


আরেকটি ঘটনার কথা বলি, তাকে দৃশ্য বলাই ভালো— যা আমাকে এক ঝটকায় অনেকটা বড়ো করে দিয়েছিল। যা ছিল এতদিন রহস্য আমার কাছে আর বাল্যের কৌতূহল মাত্র, শরীরে একটা অনুভূতি আনে কিন্তু কুয়াশাচ্ছন্ন হয়েই থেকে যায়— তা হঠাৎই স্পষ্ট প্রকট রহস্যহীন হয়ে ওঠে সেই দৃশ্য দেখবার পর।

একটা সাইকেল জোগাড় করতে পারলেই হল, তামাজুড়ি হয়ে যে-পিচ রাস্তা পশ্চিমে বাঁশপাহাড়ির দিকে চলে গেছে, ওই পথে কয়েক কিমি গেলেই চাকাডোবা। তার একটু আগে ডান দিকে রাস্তা ঢুকেছে, পায়ে চলা পথ, নুড়ি পাথরময় সেই পথে সাইকেল চালানো খুব কঠিন। ঘন জঙ্গল, দূরের কিছু দেখা যায় না।

দিনের বেলাও এত শান্ত চুপচাপ চারিদিক, মনে হয় একটা পাথরে বসে সারাদিন কাটিয়ে দিই। ওই পথে কিছুটা এগোলেই লালজল পাহাড়। অমন নাম কেন জানি না। পাহাড়ের অনতিদূরে একটি গ্রাম— পাহাড়ে উঠলে পুরো গ্রামটা ছবির মতো স্পষ্ট দেখা যায়। ছোট্ট পাহাড়, যেন বড়ো বড়ো আখাম্বা কালো পাথর এলোমেলোভাবে কেউ সাজিয়ে তুলেছে।

লোকবিশ্বাসের ওপর কথা চলে না। ওই পাহাড়ের গুহায় না কি কোনো সাধু এককালে সাধনা করত। আমি নিজে চোখে দেখেছি— সেই গুহা এত সংকীর্ণ যে, সেখানে বছরের পর বছর কারুর পক্ষে বাস করা অসম্ভব মনে হয়। তার ওপর লম্বা চ্যাটালো পাথরগুলোর বিন্যাস এমন যে, দেখলে মনে হবে এই বুঝি ধ্বসে পড়বে একটু ধাক্কা দিলেই। ভয়ে ভয়ে কতবার উঠেছি, কখনো একা, কখনো সঙ্গে দু-একজন থাকত।

একেবারে ওপরের পাথরটা এমনভাবে বাইরের দিকে বেরিয়ে আছে, যেন একটা বারান্দা। একটু ঢালু কিন্তু বেশ বসা যায়। তাতে যে কত অজস্র প্রেমিক-প্রেমিকার আঁচড়! সবাই নিজেদের প্রেমকে স্থায়ী করতে চেয়েছে তাদের নাম লিখে। কিছু পড়া যায়, কিছু দুর্বোধ্য লিপির মতো, পড়া যায় না।

এর নীচেই একটা পাথর আছে, ওপর থেকে চট করে দেখা যায় না। সেবার একাই গিয়েছি, আনমনে পাথরটার ওপরে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকাই।

কিন্তু যেন একটা ঘষটানির শব্দ আর ফিসফাস, খুব কাছেই।

কীসের শব্দ বুঝতে না পেরে পাথরের এক প্রান্তে সরে যাই— আর চমকে উঠি। যে-দৃশ্য দেখবার জন্য মন প্রস্তুত ছিল না তেমন কিছু যদি ঘটতে দেখা যায় তাতে মনের যে-অবস্থা হয়, আমার সেই বর্ণনাতীত অবস্থা তখন। সেইসঙ্গে বহুদিন মনের ভেতর জমতে থাকা শরীরী রহস্য— দুটো নগ্ন শরীরের আঁচড়কামড় আর ছন্দোময় ওঠানামায় যেন সেই রহস্য উন্মোচিত হয়ে যায়। ওরা তখন ভ্রূক্ষেপহীন, তাদের হুটোপাটিতে যেন আস্ত পাথরটাই ধ্বসে পড়বে অনেক পরে একটা লেখায় পড়েছিলাম, পিকাসো ষোলো বছর বয়সে গুস্তাভ কুর্বে-র আঁকা একটি নগ্ন ছবি (Origin of the World) দেখে পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলেন, আমারও সেই দশা তখন।

একটা যৌনক্রিয়া— যা বালকের দেখা প্রথম যৌনদৃশ্য যে কীভাবে মস্তিষ্কে ক্রিয়া করে তা টের পেয়েছিলাম আমি। বহুদিন পর্যন্ত ওই দৃশ্য আমার মাথাজুড়ে উথাল-পাথাল করত। অমন উন্মুক্ত, অমন উদ্দামতা। যখনই একা থাকতাম তাদের শীৎকারধ্বনিগুলো আমাকে উত্তেজিত করে দিত।

ওই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে অমন মুক্ত যৌনতা এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা হয়ে থেকে গেছে আজও— এবং তা আমার মধ্যে এই ধারণার জন্ম দেয় যে, অর্গলবদ্ধ অন্ধকার ঘরের ভেতর ঘটে চলা যৌনক্রিয়া কখনো পূর্ণতায় উন্নীত হতে পারে না।

প্রথম পাতা

Spread the love

7 Comments

  • ব্যক্তিগত কথনের ভিতরে ইতিহাস, সময়, রাজনীতি ও সংস্কৃতির কি চমৎকার প্রলেপ; বারবার যেন কবিতার কাছেই ফিরে এসেছে এ গল্পের, গদ্যের সমস্ত আবরণী।

    বিশ্বজিৎ দাস,
  • আমরা তো কবি রণজিৎ অধিকারী নিয়ে দিব্যি ছিলাম।।। বেশ আড়াল, ইশারায় কী কথা কহে গেল।।।

    প্রাবন্ধিকও দিব্যি ছিলেন।।।
    কিন্তু এ কী! ব্যক্তিগত কথনে আরো উন্মোচন সম্ভব, মানি।।। কিন্তু সুন্দরীর লজ্জাবস্ত্র টান মেরে খুলে নিলে কী বিশেষ থেকে যায় পড়ে।।। গদ্যেও আড়ালটুকুর সীমা আয়ত্ত করা কি আর সহজ কথা।।।

    কীর্তনের আসর পেরিয়ে পাহাড়ি টিলার যে অর্গল তিনি খুলেছেন, তাতে কি কেবল শরীরই ছন্দোময় হয়েছে, প্রকৃতি হয়নি!
    হে উদাসী পাঠক, আধেক আঁখির ভুলে ঘুরে তাকাবার জন্য এ বন প্রান্তর তিনি কলম নিয়ে ছোঁয়েননি।।।

    Srutyananda Dakua,
  • কবিতা পড়ে আনন্দ পেয়েছি। আংশিক গদ্য পড়ে মন চঞ্চল হল। বাকিটা পড়ার উপায়?
    শুভকামনা।

    Chiranjoy Chakraborty,
  • কবিতা পড়ে আনন্দ পেয়েছি। আংশিক গদ্য পড়ে মন চঞ্চল হল। বাকি টা পড়ার উপায়?
    প্রথম অংশ পাওয়া যাবে?
    শুভকামনা।

    Chiranjoy Chakraborty,
  • খুবই ভালো লাগলো এই গদ্য । স্পর্শকের মতো লেগে থাকবে এই গদ্যের অনুভূতিসমগ্র বেশ কিছুদিন । বছর পনেরোর ছেলের শৈশব , তার যৌবনোদগম ফুটে উঠছে প্রকৃতির মতোই । এও এক রহস্যময়তা !

    kuntal mukherjee,
  • জঙ্গলে ঘাস পাতা কাঠ ফুল ফলের যে এক অজানা মিশেল সুবাস আপনার লেখা গদ্য তেমনি মাদকতাময়।
    কৈশোর মনের আলোআঁধারিতে উঁকি দেওয়া আঁকিবুকি, ট্র্যাভেলোগ আর আত্মকথন মিশিয়ে আপনার লেখার ধরণ খুব মন টানে। এখন দেখার দড়ি টানাটানি করে কে লেখককে কার দিকে টেনে নিয়ে যায়।

    জিৎ সত্রাগ্নি,
  • চমৎকার লেখা। এমন স্মৃতিচিত্রে মিশে আছে ভ্রমণ আর আখ্যানের নিবিড় যোগাযোগ। খুবই ঋজু এবং টানটান গদ্য। এই লেখাটি আরো বড়ো কোনো লেখার প্রস্তুতিপর্ব।

    Pankaj Chakraborty,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *