লেখক নয় , লেখাই মূলধন

রাস্কিন বন্ডের গদ্য

পাহাড় ফেরতা কিছু শব্দ
[Words From The Hills]

ভাষান্তর: শতানীক রায়

[কিছু কথা: কেন প্রতিবার আমাদের জীবনের কাছে ফিরে যেতে হয়। কেন প্রতিবার ভাবতে হয় কীরকমভাবে বেঁচে আছি। এই রকম দার্শনিক অভিমুখে প্রত্যেক লেখককেই দাঁড়াতে হয় নিজের অভিমুখ বেছে নেওয়ার জন্য। রাস্কিন বন্ডের লেখার সঙ্গে পরিচিত আমি অনেক ছোটো থেকে যখন প্রথম বই পড়া শুরু করি। তখন তাঁর প্রথম দুটো বই পড়ি। প্রথমটি ‘অল রোডস্‌ দ্যাট লিডস্‌ টু গঙ্গা’ আর ওই বইয়েরই অপর পিঠে ‘রোডস্‌ টু মুসোওরি’। এই দুটো বই অমূল্য রত্ন। গাড়োয়াল পাহাড়। পাহাড়ের গ্রামগুলো। মানুষগুলো। এবড়ো-খেবড়ো জীবন। বুনো জীবন এবং বয়ে চলা। গঙ্গা এখানে বয়ে চলার প্রতীক। পাশাপাশি পঞ্চকেদার অবধি পৌঁছোনোর স্মৃতি আজও ভাবাচ্ছে আমাকে। প্রতিটা পাতায় অটুট জীবন। এমনটাই তো চাই। তারপর ওঁর অনেক গল্প পড়ি। দেখি মানুষকে কী করে তিনি আলাদা করছেন ভিড়ের মধ্যে থেকে আর তার সঙ্গে পাহাড় মিশে যাচ্ছে। লেখক যে কোনো গভীর কোনো মর্মার্থে পৌঁছোতে চাইছেন এমনটা নয়। তবে তিনি এই নির্জন মানুষগুলোকে চিহ্নিত করছেন ক্রমাগত। একটি গল্পের কথা খুব মনে পড়ে। এখানে লেখক নিজেই কথক। তিনি পাহাড়ের অনেক উপরে একটি জলাশয় খুঁজছেন। অনেক হাঁটার পর অবশেষে খুঁজে পেলেন। তারপর সেখানে নেমে স্নান করার অনুভূতি এবং নির্জনতার আনন্দ, এটাই হল গল্প। এরকমই ওঁর লেখা। তেমনই এই বইটা ‘ওয়ার্ডস্‌ ফ্রম দ্য হিলস্‌’। এটাকে ডায়েরি বলব না অ্যাফোরিজমস্‌ জানি না। তবে অনুভূতিমালা বলাই শ্রেয় মনে করি। অনুভূতিগুলো তিনি সাদা পাতায় টুকরো টুকরো লিখে রাখছেন। সাদা পাতা সঙ্গে সুন্দর আঁকা কিছু যা অনুভূতি লেখনগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই করা। প্রতি পাতায় ছোটো ছোটো লেখার পাশে অনেক ফাঁকা জায়গা। সেখানে আমি চাইলে কিছু লিখে রাখতে পারি। আবার কোনো কোনো পাতায় শুধুই আঁকা। এই অনুভূতিগুলো বাছাই করে অনুবাদ করার চেষ্টা করলাম সঙ্গে এই লেখাটা দরকার ভেবেই লেখা হল।]


ড্যান্ডিলিওনকে লতানো গাছ হিসেবে জানি কারণ, ওটা দেওয়ালেও গজিয়ে ওঠে। অতএব ওকে দেওয়ালে বাড়তে দিয়ো। আমরা কেন-ই-বা বাঁধা দেব ওর স্বাভাবিক প্রাকৃতিকে? কেন ওপড়াব ড্যান্ডিলিওনকে? এর চেয়ে ভালো দেওয়ালটাকেই সরিয়ে দাও।


আমার রাবার গাছ… একটিই গাছ যেটা আমার ঘরে বেড়ে উঠেছে… ওর লতাগুলো একটু দেওয়াল খুঁজে নেয় বেয়ে ওঠার জন্য… ওর ডালপালা আস্তে আস্তে বেয়ে উঠেছে তবে অবশ্যই দেওয়াল বেয়ে… আমার বিছানার দিকে এগিয়ে আসে… ও কি আমাকে ভালোবাসতে চায়?


আমি জানালা দিয়ে আকাশের তারাগুলোকে দেখছি… আমি জানি আমার অবস্থান শুধু পৃথিবীর এই এক কোণে নয় বরং এই মহাবিশ্বে।


সূর্য প্রবেশ করেছে, ছাদ টপকে, অর্ধেক খোলা জানালা দিয়ে গলে গিয়ে, ডেস্কের কাগজগুলোকে আলোকিত করে, দিনের প্রথম আশ্চর্য… নতুন দিন শুরু হল…


খুব বেশি আগে নয় আমি কয়েকজন জেলেকে বঙ্গোপসাগরে একটি ছোটো নৌকা চালাতে দেখেছি। সেটা আমাকে বাবার একটি উপদেশ মনে করিয়ে দিয়েছিল: ‘নিজের নাও নিজে বাইতে শেখো!’ নিজের কাজ নিজে করো আর কারো ওপর খুব বেশি নির্ভয় হয়ো না। নিজের নাও নিজেকে বাইতে শেখো। যদি ডুবে যাও, সেটার জন্য তুমিই একমাত্র দায়ী থাকবে!


তবে আমাকে সূর্য আর খোলা আকাশ দাও। আমি কেঁচোকে কুর্নিশ জানাই, পাশাপাশি আমি এই বেগুনী প্রজাপতিটাকে দেখতে চাই সে যখন বসছে এই অনন্তে তার মধু গভীরভাবে আহরণ করতে।


একটি ছোটো ছেলের মতো আমি ঘুরে বেড়াতে চাই এই অনন্তে, উপরে এই সাদা, হলদেটে আর লালচে ইশারাবহুল মাথাগুলোর দিকে তাকিয়ে।


এই কচি সবুজ কাণ্ডগুলো হল জীবনের মৌলিক আশ্চর্য। আর আমার মনে হয় এই লঙ্কা হল ভারতের আসল চিহ্নায়ক। যা সকলকে চাগিয়ে রাখে।


আমার বীজ ফেটে অঙ্কুরের প্রস্ফুটন দেখতে ভালো লাগে। মাটি থেকে উপরের দিকে তার হয়ে ওঠা, যদিও সেগুলো শুধুই লঙ্কা আর বিন্স।

১০
আর সব যুদ্ধ মিটে গেলে, একটি প্রজাপতি তখনও সুন্দর থাকবে।

১১
একাকিত্ব আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায়, তবে নিঃসঙ্গতা কিন্তু এমন কিছু যা আমরা বেছে নিই।

১২
হ্যাঁ, আমাদের একটা গোপন জায়গা প্রয়োজন। পৃথিবীর থেকে লুকোনোর জন্য নয়, বরং নিজের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হওয়ার জন্য— নিজেকে আরও জানার জন্য, কারণ আমাদের এই নিত্য হুটোপুটির জীবনে আমরা নিজের কাছে কেমন অপরিচিত হয়ে উঠি।

রাস্কিন বন্ডের গদ্য

আমাদের নতুন বই