লেখক নয় , লেখাই মূলধন

রিম্পির গদ্য

হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা

শান্তিনিকেতনের মেঘলা দিন মানেই কোপাই অথবা সোনাঝুরি। বৃষ্টি মানেই লাল মাটির রাস্তা ধরে দলবেঁধে বর্ষার গান। কালবৈশাখীর ঝড় তো এখানে আম কুড়োনোর বাহানা ছাড়া আর কিচ্ছুটি না। এখানে অকারণেই শাড়ি আর খোঁপায় ভিজে গুলঞ্চ। শাল শিমূলের নীচে গল্প মানেই, বন্ধুদের হাহা হিহিতে ফেটে পড়া! সাইকেলের বাস্কেট বোঝাই কদম ফুল, ছেঁড়া পাতায় কয়েক লাইন পদ্য, এখানে সেই তো প্রেম। সেই তো ভেসে যাওয়া…

 ছবি: রিম্পি

কিন্তু সেইসব দিন এখন কই! খাঁচার পাখির মতো আকাশের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকা ছাড়া আমাদের করার নেই কিছু। তবে ঘরবন্দী বলে মনও যে বন্দী থাকবে এমনটা তো নয়। ভাগ্যিস! ভাগ্যিস মনের কোনো লকডাউন হয় না। মন তাই সন্ধ্যের ছাদে একা একা চুপ করে বসে থেকেও একছুটে পৌঁছে যেতে পারে আমাদের ছোটো নদী কোপাই-এর কাছে। সেখানে চাঁদ ওঠে মস্ত। গোল চাঁদের আলোয় ভিজে যায় নদী। তিরতির করে যে-জল বয়ে চলল, সে-জলে তারাদের আলো পৌঁছোয় না। তবে তারাদের ছায়া পড়ে। আমি মনে মনে সাঁঝবেলায় নদীর জলে পা ডুবিয়ে বসি। হাওয়া দেয়…। খোলা চিঠির মতো, অথবা মেঘের মতো উড়ে যায় আমার মনকেমনের আঁচল।

আজকাল ঘুম ভেঙেই এক-একদিন দেখি, কী ঝমঝম বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে পাড়া। শেষ না হওয়া উপন্যাসের মতো অসম্পূর্ণ দুপুরে হঠাৎই না বলে কয়ে ঢুকে পড়ছে বিকেলের কালবৈশাখী মেঘ। ঝড়ের হাওয়ায় তখন গোটা ঘর এলোমেলো! জানলা দিয়ে উড়ে আসে নিমফুল, জামের শুকনো পাতা। রোগা ছিপছিপে জুঁইগাছ, হাওয়ার দাপটে অস্থির! বৃষ্টি আসছে…। আমি জানলার গ্রিলে মাথা রাখি। মনে মনে ভিজতে ভিজতে চলে যাই সোনাঝুরির পথে। সঙ্গে থাকে না কোনো ছাতা। অথবা হয়তো নিই না ইচ্ছে করেই! ভিজে যাওয়া এল খোঁপায় জায়গা পায় পথের পাশের গুলঞ্চ। বৃষ্টি ধরে আসে কিছুটা। দেখি খোয়াইয়ের গা বেয়ে নদীর মতো বয়ে যাচ্ছে জল। সোনাঝুরি পাতায় পাতায় জমেছে বৃষ্টি ফোঁটা। এইসময় রবীন্দ্রনাথের গানই তো ভরসা। আমি গাই না। আমি পড়ি। বর্ষার গান আমার কাছে এক-একটা কবিতা যেন! আকাশে বেদনার বাঁশি বাজে আর আমি মনে মনে বলি,
‘মোর হৃদয়ে লাগে দোলা, ফিরি আপনভোলা—
মোর ভাবনা কোথায় হারা মেঘের মতন যায় চলে।।’

মন আসলে খুব অদ্ভুত। তাকে নিয়মের মধ্যে বাঁধতে চাইলেই সে খালি পালাই পালাই করে! তাই তো এই ঘরবন্দী দশায় দীর্ঘ ছুটি পেয়েও আমরা সবাই হাঁপিয়ে উঠছি। আর সেই সুযোগে মন পালিয়ে যাচ্ছে দূরে কোথাও, দূরে…। ঘরের চৌকাঠ ডিঙিয়ে সে কখনো কোপাই, কখনো সোনাঝুরি, কখনো-বা চলে যাচ্ছে আমার ফেলে আসা ইশকুলের মাঠে। এখন বর্ষা নয়। তবু গ্রীষ্মের বৃষ্টি দেখে মন ফিরে যাচ্ছে বর্ষার পাঠভবনে। দেখতে পাচ্ছি ভিজে থৈ থৈ আমার ইশকুল। ব্যাগের ভিতর বসে বসে ভিজছে বইখাতা। পেন-পেনসিল। ভিজে যাচ্ছে আমার হলুদ শাড়ি। ব্যাগের ছোট্ট চেনটায় জমানো দু-এক টুকরো ভাঙা চক, বকুল বীজের বাঁশি অথবা একটা দুটো জমিয়ে রাখা পাতা বাদাম, ওরাও ভিজে সারা! কদম আর বকুলের গন্ধে ম ম করছে জল হাওয়ার দিন। গৌরপ্রাঙ্গনের মাঠে জমে ওঠা কাদার ওপর যেন গাঢ় হচ্ছে আমার মেয়েবেলার পায়ের ছাপ। জুতো ভেসে চললো জলে…। আর বৃষ্টিতে, হাওয়ায়, শাল-শিমূলের পাতার নাচে আমরা মেতে উঠছি বন্ধুরা!

পুরোনো বইয়ের পাতা ওলটানোর মতো হারিয়ে ফেলা চেনা মুহূর্তরা আবার একে একে ভিড় করে দাঁড়াচ্ছে সামনে। এ যেন আমার কাছে এক টুকরো ঝোড়ো হাওয়া! সে-হাওয়া গায়ে মেখে ইচ্ছে হলেই গিয়ে বসছি বারান্দায়। কখনো-বা বিকেলের নরম রোদ মাখতে একছুটে চলে যাচ্ছি ছাদে। সেখানে গিয়ে দেখি পাখিরা ঘরে ফেরার তোড়জোড় করছে। এমনিতে আমার কোথাও যাওয়ার নেই। তাই ফেরারও নেই। তবে মন যায়…। কিন্তু মনের তো কোনো তাড়া নেই ফেরার। ফলে মনের সঙ্গে সঙ্গে ঘুটঘুটে অন্ধকারে আমি যেমন পৌঁছে যেতে পারি কোপাইয়ের ধারে, তেমনই ভর দুপুরে শুকনো খটখটে রোদ গায়ে মেখে ঘুরে আসতে পারি সোনাঝুরি। দুপুরে ঝড় উঠলে যখন বৃষ্টি শুরু হয়… সেই সুযোগে একদল ছেলেমেয়ের সঙ্গে হৈ হৈ করতে করতে আম কুড়োতে চলে যেতে পারি শান্তিনিকেতনের অলিতে গলিতে। সেই ছোটোবেলার মতো। কে আর বাধা দেবে আমায়! মনের যে দুটো ডানা আছে, আর তার যে উড়ে যেতে একটুও মানা নেই, এ তো আমার জানা।

এখন কল্পনার চোখে দেখতে পাই, গ্রীষ্মের হলুদ অমলতাস, জারুলের উজ্জ্বল বেগুনি বা কৃষ্ণচূড়ার লাল মেখে শান্তিনিকেতন ধীরে ধীরে সেজে উঠছে। কুর্চি, সবুজ ঘাসে বিছিয়েছে তার সাদা আঁচল। মাধবীলতা দুলছে খুশির হাওয়ায়…। এ আসলে এক সুন্দরের ছবি। প্রকৃতির এই সুন্দরকে আমরা যারা বলি প্রেম, যারা প্রকৃতিকে চোখ দিয়ে ছুঁয়ে ভাবি, ভালোবাসাকে ছুঁলাম, তাদের এখন বিরহের কাল। তবু এই যে দেখতে না পাওয়ার বেদনা, সে-ও তো এক পাওয়া। সেই পাওয়াই এখন আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। তাই ঘরবন্দী নিরুপায় মন, ঘরের ভিতর ঘুরছে ফিরছে আর দুটো ডানায় ভর করে চলে যাচ্ছে পুরনো, চেনা দিনগুলোতে। যেন সীমার মাঝে অসীম দিয়েছে হাতছানি…। আর সেই সুযোগে আমি শান্তিনিকেতনকে আবার নতুন করে চিনছি। বুঝতে পারছি যেখানে মানুষের কোলাহল থামে, সেখানে কেবলমাত্র প্রকৃতিই সরব হয়ে ওঠে।

রিম্পির গদ্য

আমাদের নতুন বই