Categories
গদ্য

রোদ্দুর মিত্রের গদ্য

পুকুরঘাটে আঁকার খাতা

সেই যে তখন থেকে পুকুরঘাটে জল নিয়ে ছেলেখেলা শুরু হয়েছে, থামার নামই করছে না কেউ। ভরা রোদ্দুরে দেহের সমস্ত জড়তা বিলিয়ে দিতে বসেছে এক বৃদ্ধ। গত আধঘণ্টা ধরে সর্ষের তেল প্রথমে দুই কানে, নাকের গোড়ায় জোরসে টেনে নিলেন। তারপরে বুড়িয়ে যাওয়া নাভিতে সামান্য ছুঁইয়ে সূর্যের দিকে মুখ করে বিড়বিড় করে কী সব আওড়ালেন। মন্ত্রই হবে বোধহয়। বেশি না, আর পাঁচটা বছর যেন লড়ে যেতে পারি। তেল চকচকে এই দুটো হাত যেন আর পাঁচটা বছর বাজারের ব্যাগ হাতে বাড়ি ফিরতে পারে। এইটুকুই তো চাওয়া। তাই শরীর ডলে ডলে মৃত্যুচেতনাটাকে পরিষ্কার করতে হবে।

যদিও কাঁঠাল পাকা গরমের দুপুরেই চোখে পড়ে নতুন সাঁতারু, তবে শীতকালেও তাদের দিব্যি দেখা মিলছে। এই যেমন, এখন এক হাত দিয়ে নাকটা যতটা সম্ভব শক্ত করে চেপে ধরে ডুব দিচ্ছে, জলের ভাষার সাথে একাত্ম হতে শিখছে, আবার উঠে পড়ছে মুখটা ইয়াব্বড়ো করে। এক, দুই, তিন… মোট পাঁচটা ডুব দেওয়ার পরে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে তাকে। লাইফবয় সাবানটা পাড় থেকে তুলে নিয়ে এবার তথাকথিত স্নান শুরু হবে। আজ আবার পায়ে একটা শামুক ফুটেছে। ভালো করে হাঁটতে না পারলে কাল পুকুরে আসায় নিষেধাজ্ঞা জারি। এটা যে কোনোমতেই হতে দেওয়া যায় না। এখনও সে ভাসতে পারে না। ভাসতে না পারলে যে ডুবে যেতে হবে। তাহলে যে তিন্নির লেডি বার্ডের পিছু নেওয়া যাবে না!

সামান্য কোমর বেঁকিয়ে, সার্ফে চোবানো জামাকাপড়ের গামলাটা বেশ কায়দায় সেখানে এঁটে ধরে ঘাটে এসেছিল আলোর মা। এসেই সশব্দে গামলাখানা পাড়ে রেখে ধপাস করে বসে পড়ল। চুলে পাক ধরেছে অনেকদিন। কলপ করার সামান্য চেষ্টাও যে করা হয়নি, তার ছাপ দারুণ স্পষ্ট। কাজের বাড়ির লাথি-ঝ্যাঁটা, অন্দরের নোংরা, অন্তরের ধুচ্ছাই মাখার পরে চুলগুলো এমনিই কালো দেখায়। কৃত্রিমতা ওই কালিকে নিশ্চয় ঈর্ষা করে। কেউ সহজে তার সাথে মুখ লাগতে চায় না। আসলে মেয়েটা যেদিন থেকে হারিয়ে গেল, আলোর মায়ের মুখটাও কেমন বিশ্রী হয়ে গেছে। মুখের ভাষাও যথারীতি রূপ পরিবর্তন করতে বাধ্য হল। নইলে এ সমাজে টিকে থাকা বড়ো দায়। তবুও অনেক কটা দিন এখনো বাঁচতে হবে। আলতারঙা দাঁত নিয়ে এখনও সদ্যজাতর মতো হাসতে হবে।

আরও দু-তিনজন এমনি মানুষ, এমনি এমনিই পুকুর ঘাটে বসে থাকে। তাস খেলে। খিস্তি ওড়ে। বিড়ির ধোঁয়ায় মাছরাঙার যে কষ্ট হয়, কেউ বোঝে না। ভীষণ রোদে পুড়ে যাওয়ার জোগাড় হলে অন্যের ছায়ায় মুখ লুকোয়। নিজের ছায়ার দিকে কখনো ঘুরেই দেখল না এ জীবনে। তাই ওরা এমনি মানুষ। নির্দিষ্ট কোনো কাজ নেই, তাই বেঁচে আছে, ইচ্ছেমতো। বেলা পড়ে এলে, ঝুপ করে এক ডুব মেরে উঠেও আসছে। কখনো রঙের মিস্ত্রির রামধনুর মতো প্যান্টের দিকে তাকিয়ে থাকে আনমনে, কখনো আবার বিরাট নারকেল গাছের দিকে ক্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকে। এই গাছটা বোধহয় দুয়ো দেয় ওদের। জীবনটা আরেকটু উঁচু হতেই পারত। তাই না?

হইহই করে ছেলেপিলেরা এই শীতে ঝাঁপের পর ঝাঁপ না মারলেও ক্ষতি নেই! ক্ষতি নেই স্নান করতে নেমে পুকুরের জলে হিসি করে দিলেও। এইটুকুই তো ছবি বেঁচে আছে এখনও আঁকার খাতায়। এইটুকু অপেক্ষাই রোজ চুপটি করে বসে আছে জীবনে। আমার, মাছরাঙার, তিন্নির, লেডি বার্ডের…

One reply on “রোদ্দুর মিত্রের গদ্য”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *