Categories
উৎসব সংখ্যা ২০১৯ গদ্য

শতানীক রায়ের গদ্য

আরও বেশি জীবন্ত

চিত্র: জর্জিয়ো দি চিরিকো

আমি জানি। দীর্ঘ সময় পেরোনোর পর তোমরা ঠিক আমাকে অক্ষরে অক্ষরে খুঁজে পাবে। এখন নয়। অনেকটা সময় না পেরোলে সমকালের কুয়াশা কাটে না। একে আমি দ্বন্দ্ব বলি। আবার কুহকও বলা চলে। জীবনানন্দের হাজার বছরের পথ চলা এরকমই। ভেতরে ভেতরে চলেছি কিংবা পাহাড়ের হিমশৈলর মতো সারা শীত সারা গ্রীষ্ম সারা বছর এতটাই স্তব্ধ হয়ে আছি যে, কেউ তার মর্ম বুঝতে পারছে না। আর যখনই সূর্যের আলো বিশেষ বিশেষ মুহূর্ত তৈরি করে দিচ্ছে তখনই সবাই দেখছে বাইরের রংটুকু প্রতিফলনটুকু বাঁকা ইতিহাসের রহস্য হয়ে লুকোনো আড়াল ভেঙে রক্তমাংসের খুব অল্পই জাহির করছে। তাই প্রতি মুহূর্ত আমি গড়ে উঠতে গিয়ে আবারও যখন ভেঙে ভেঙে টুকরো হচ্ছি নিজেকে জাগিয়ে তুলব বলে আহাম্মক একটা সময়ের সামনে কুহকেরও আরও গভীর কুহক করছে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘খেলনা’ নামে একটি কবিতার সারকথা মনে পড়ে গেল। দীর্ঘ অনেক বছর পরে আমার জীবনে একজন সত্যিকারের বন্ধু পেয়েছিলাম। একটা অন্তরঙ্গ কারণে আমাদের মধ্যে মতানৈক্য হয়। সম্পর্কের জৌলুস কমে আসে। এই কবিতার একটা লাইন আছে: ‘পাবো না কখনো তারে আর, একবার পেয়েছিনু, যেন বাল্য দূরদেশে/গর্ভের সমান কাছে বারেবারে আসা তার হয় না কখনো জানি তবু ডাকি-ডাকি’। আজই কাকে যেন ফেসবুকে কমেন্ট করে বসলাম। ও গৌরবকে। গৌরবের স্বভাববশে ও নিজের সাদা-কালো ছবি তোলে আর ছায়ার আভাসে ঘেরা থাকে। সেরকম ছবি ও ফেসবুকে পোস্ট করে। তবে, আগে একটা ছবি পোস্ট করেছিল। সেটা রঙিন। আজ আবার ছায়াময় ছবি পোস্ট করায় আমি কমেন্ট করে বসলাম: ‘আবার আলো ক্রমে আসিতেছে’। আজ ইউলিসিস পড়লাম অনেকটা। কয়েক পাতা পড়া মানে অনেকটা জানা হয়ে গেল। শেক্সপিয়র নিয়ে যেভাবে নানারকম ছিনিমিনি খেলছেন জয়েস তা আমাকে আশ্চর্য করল। শব্দের প্রয়োগ। ইউলিসিস আমাকে বহুদিন পর অদ্ভুত শান্তি দিল।
জানি আমি। অন্ধকারের খোঁজ আমাকে শেষ করে দিচ্ছে। ক্রমাগত যে-বোধকে লালন করতে করতে এগিয়ে চলেছি বহুকাল। শব্দ হারিয়ে ফেলছি। বাক্য হারিয়ে ফেলেছি অনেক। আসলে এখানে আমি কতটা বেশি গড়ে উঠেছি তার মূলে আমি নেই। আছে বহু মানুষের বাক্যবোধ তারা সময়কে নির্ধারণ করে দিয়েছে। তারপর তার রেশ অনেকদিন চলেছে। চলতেই আছে। এর সঙ্গে তাদের বাক্যবোধের পেছনে লুকিয়ে থাকা শরীরবোধ তার একটা বিপন্ন আরোপ আছে। ধীরে ধীরে আমাদের সমস্ত বাইরের আলোড়নকে ত্যাগ করে বা পোশাক খোলার মতো খুলে রেখে নিজস্ব জীবনে নামতে খুব কম মানুষই পারে। বললাম না! বোধের সংঘাত থেকেই বোধ স্থিরতা পায়।
পিকাসো যেভাবে ছবি আঁকতেন ভায়োলেন্ট সেক্সুয়্যালিটি। ইদানীং আমার ভেতর একটা অসম্পূর্ণ থাকার বোধ সৃষ্টি হচ্ছে। বুঝতে পারছি না কীভাবে ট্যাকেল করব। ঘোড়া দেখলে আমার কখনই যৌনতার প্রসঙ্গ মনে পড়ে না। ঘোড়ার লোম, গায়ের বিচিত্র গন্ধ আর চুল এক অমোঘ দূরন্ত আবেগ ডেকে আনে। কবিতা আমি এমনই লিখতে চাই। সুপ্ত একটা ঘোড়া দৌড়াবে গোটা খাতা জুড়ে। আহা!! কত আরাম হবে। ধীরে ধীরে কবিতাময় ছেয়ে যাবে আত্মমগ্ন অলস একটা সময়।

বিয়ন্ড অল সেনসেস কী আছে? কী থাকতে পারে? যে-শূন্যতা তুমি কিংবা আমি রপ্ত করব সেখানে সবচেয়ে প্রথম কী অনুভব করব আমি? আদৌ কিছুই হবে না। শূন্যতাকে বোধ করা কোনো সহজ কাজ নয়, তুমি কেউ নও, আমিও না, আমরা কোথাও কিছুই দেখছি না কিন্তু ঘটে চলেছে সবকিছু। আয়না তবে তোমাকে দেখছি আর মনে মনে ভাবছি কীভাবে আলোকিত করব এই খোলটাকে যাকে দেহ বলে ভেবে এসেছি তা কোনো অর্থেই দেহ নয়। অনেক অনুষঙ্গ এসে ভিড় করছে। গতকাল মধ্যরাতে বার্তোলুচ্চির ‘দ্য লিট্‌ল বুদ্ধা’ দেখলাম। আবিষ্কার করলাম কীভাবে সংকটের সৃষ্টি হল। যতই আমি মুক্তির কাছে যেতে চাইব ততই দূরে চলে যাব। প্রতিবিম্বের পেছনে দৌড়ানোর মতো। সূর্যও এই একটা সময়ে এসে শিখিয়ে যায়, পৃথিবী আর সূর্যের সম্পর্ক পৃথক কোথাও কোনো যোগ নেই। উদ্দেশ্য ছিল না। কেবল মৌলের প্রতি আকর্ষণ আছে বলে পৃথিবী এমন একটা পথ তৈরি করল যেখানে তাকে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে হবে। মানুষও তাই। কোনো কারণকে অবলম্বন করেই ওর থাকা। বাড়ি, রাস্তা, আত্মীয়, অন্ন, জল, আত্ম সবকিছু নিয়ে একটা ঘোর তৈরির কথা। আমি ভাবব না তবুও মৌলের প্রতি আকর্ষণ আমার শরীরকে দিয়ে করিয়ে নেবে। রামকৃষ্ণ বলতেন, মনটা দুধের মতো… আহা! প্রচণ্ড বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য। অবশ্য আমি যেটা দেখছি সেটাও তো ওই আয়নারই প্রতিফলন যা আমি সচেতন হয়েই দেখছি। এমন নয়। আমি যখন ঘুম থেকে উঠে এসে কোনো কাজ করে সেটা কিছু হলেও তার ‘আমি’ ফুটে উঠবে। দিনের পর দিন মাসের পর মাস আমি একা হতে হতে শান্ত হয়ে গেছি, কেন আমি শয়তানে পরিবর্তিত হচ্ছি। অনেকটা অ্যান্টি-হিরো। আমি যে নির্মোহ দেখা অবলম্বন করে পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি তার প্রতি একটা রিরংসা কাজ করবে যারা একেবারেই নির্মোহ নিরপেক্ষ নয় সন্দেহ করবে আমার বোধকে নিয়ে। রোলাঁ বার্ত ‘প্লেজার অব রাইটিং’ বইতে বলছেন অ্যান্টি হিরোর কথা। আমি যে নতুন একটা অর্থ তৈরি করলাম সেটাও ওই বিপরীত প্রক্রিয়ার জন্য। এবার যাকে বলব বশীভূত হওয়া আরকী… সমান্তরাল নদী হওয়া।
আরও বেশি জীবন্ত মনে হয় মানুষকে। বিশেষ করে সুষুপ্তি ভেঙে দেখলে যেমন হয়। ধীরে ধীরে পুরোনো স্মৃতির সঙ্গে একই মানুষের অবয়ব আর বহিঃপ্রকাশ মিলিয়ে দেখার খেলা। আবার যে নেই তার কথা উঠলে কীভাবে আরও সংশয় পরিস্ফুট করব বা সময়বিশেষে কীরকম প্রকাশভঙ্গির আশ্রয় নেব যাতে তার না-থাকাটা আরও বেশি সুন্দর হয়ে ওঠে তার থাকার চেয়েও অধিক প্রতিক্রিয়াশীল। রোলাঁ বার্ত নিজের বাবাকে নিয়ে ‘রোলাঁ বার্ত বাই রোলাঁ বার্ত’ বইতে স্মৃতিচারণ করেছেন এবং তা কোনোমতেই শুধু স্মৃতির রোমন্থন নয় তা মুহূর্তের প্রেক্ষিতে তাঁর স্মৃতির সংমিশ্রণ ঘটেছে জীবনের কোনো বিশেষ ক্ষণকে আরও বেশি করে সংযুক্ত করার জন্য। এর ফলে আমরা প্রয়োগশৈলী নিয়ে যতটা ভাবছি তার পাশাপাশি স্মৃতির ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধির প্রেক্ষিতও বেশি করে দেখছি।

ধীরে ধীরে আমাদের সমস্ত বাইরের আলোড়নকে ত্যাগ করে বা পোশাক খোলার মতো খুলে রেখে নিজস্ব জীবনে নামতে খুব কম মানুষই পারে।

যোনি আর স্তন ঠিকভাবে আঁকতে পারেন না কৌশিকদা! এমন বলে নিজের মকারি করেন কৌশিকদা, আসলে রোলাঁ বার্ত কথিত অ্যান্টি-হিরো সেজে পিকাসোর স্তন আঁকার সুচারু বৈশিষ্ট্যকে খুলে বলার মধ্যে কী যে সুন্দর একটা বোধ আছে তা কল্পনা করলেই আমোদ হয়। এইভাবে দিনগুলি এগোতে থাকে। ফুলে-ফেঁপে এগোনোর দিকে সুপ্ত কারুকার্য ভরা বোধ কাজ করে। ঘুম আসলে একটি এমন ক্রিয়া যা জয় করতে পারলে কিংবা সেটা নিয়ে ক্রমাগত খেলা করে গেলে মানুষ হিসেবে যে কেউ এমন কিছু বোধের সম্মুখীন হয় যাকে কোনোদিন খণ্ডন তো দূরের কথা সেখানে সে নিজেই আত্মতুষ্টির প্রসাদ খেয়ে আরও বেশি একাকিত্ব তাকে নেশা, ভাঙন আর আবিষ্কার করার দিকে নিয়ে যাবে। মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে গেলে সময়ে যে-সব কথা বা চিন্তার কাছে ঋণী হয়ে থাকি। আলো আর অন্ধকার মিশিয়ে আরও একখান ডাক শুনি।


তুমি কোন ভাষায় কথা বলো। এতটা এগোতে গিয়েও অন্ধকার হয়ে বসি। আর আমার হওয়ার তীব্রতা আমাকে আবার গড়ে তোলার চেষ্টা করে চলেছে। ঘুম নিয়ে খেলা করবে বলে, আরও বেশি ঘুমের কবলে যাব। এখানে ফাঁদ ছিল সব জেনেই এখানে এসেছি আমি। সব মনস্কামনা পূরণ হলেও থেকে যেতে চেয়েছি। সংশয় আর নৌকা ডোবানো ঘরে। এত যৌন আচরণ করে চলেছি সব শাকপাতা বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড ওলট-পালট করে এগোবে এখন দক্ষিণ দিকে। ওই দিকে তোমার হাসির কবলে পড়ে গেছি। গাছ আর সান্ধ্যভাষার অপজ্যোৎস্না সব… সর্বঅঙ্গ দিয়ে দিনরাত আমি হয়ে উঠছি সমুদ্রের কাছে গিয়ে মাকে চাইছি, জল দাও জল দাও। আর অনেক উপর থেকে উড়ে এসে বসলে মানুষের তখন ভ্রমের পুতুল জন্মায়। রি রি শব্দের সনাতনি ঘোর ভাষার সংসারকে ভাসিয়ে দিয়ে যায়। আরেহ! খুবই নরম তো সমস্ত কথা। কথা রান্না করতে করতে সংসারে আগুন ধরে যাওয়ার মতো। ক্ষত আর সন্ন্যাস। বিভাস রাগে বাঁধা সুর। তাল লয় কোথাও কিছু নেই। বুদ্ধের দিকে শরণাপন্ন ভিখারি আমি সাপ হয়ে নামতে চাই। কোথায় সে-সব ভাষা রঙিন বিধাত্রী সঙ্গম করার বোধ নিয়ে চলা। ভেবেছ কি এখন কীভাবে তুমি বড়ো হয়ে উঠবে খঞ্জনী হাতে মানুষের পেট চিরে ঘুম অথচ সঙ্গম… আর কিছু নয়।
তুমিই পারবে যদি চাও। সমস্ত দরজা খুলে একে একে সর্বাগ্রে পৌঁছে যাওয়া। কী শুনবে? কত? বাইরের সব শব্দই আত্মমোক্ষ থেকে দূরে। ঘাস বড়ো হচ্ছে এই লেখা যত খুলছি আমি ততই কোথাও না কোথাও গাছ বড়ো হচ্ছে। কত কী করব রক্তমাংস নিয়ে আর। শবও তার অতিরিক্ততায় এসে গলে যায়… যখন কথা হচ্ছে জীবিত মাংস নিয়ে তখন বৃদ্ধির কথা উঠবে। তুমি দেখতে পাবে অনেক কথা খুলতে খুলতে হারানোর সীমা অতিক্রম করে চলে যাচ্ছে অনেক দূর। আত্মপ্রাপ্তি হচ্ছে আমার। আর এখানে নদীগুলোর সমস্ত ত্বক খুলে গিয়ে এক-একজন রাম জাগছে। অহর্নিশ ঘোর দেখা দাসের মতোও মনে হয়। এই লেখা চলবেই। ব্রহ্মাণ্ড যতদিন আছে।

8 replies on “শতানীক রায়ের গদ্য”

দুরন্ত।এটা পড়ে বেশ কয়েকটা কবিতা লিখে ফেলা যায়।

একদম। আমারও এটাই মনে হলো, অনেকগুলো কবিতা লেখা যায় এই গদ্য পাঠ করে।

খুব আত্মমগ্ন লেখা। অনেক ভাবনার রসদ পেলাম। খুব ভালো লাগলো।

খুব ভালো লাগল পড়ে। বিশেষ করে ‘মৌলের প্রতি আকর্ষণ’ জেনে মুগ্ধ হলাম।

অসম্ভব ভালো লেখা। আপাদমস্তক ঝাঁকি দিল। এত ভালো গদ্য বহুদিন পর পড়লাম। আবারও পড়তে হবে, আরও কয়েকবার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *