শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তীর গদ্য

অতিমারির উৎসব ও এক ছদ্মকবি

মানুষের মন বিবর্তনশীল। ঠিক তেমনই তার সৃজনশীলতাও। মনের অনুভূতি ও সৃজনশীলতার প্রক্ষেপণ অভিন্ন। ঠিক তেমনই অভিন্ন মনের অবসাদ ও সৃষ্টির অবক্ষয়। মানবজীবন স্বল্পায়ু। তবু এই স্বল্পায়ু সম্বল করেই মানুষ বলতে পারে দার্শনিক রেনে ডেকার্টের মতো ‘আমি ভাবি, তাই আমার অস্তিত্বও আছে’। আবার কখনো-বা সে বলে ওঠে ‘এ মায়া প্রপঞ্চময়’। মানুষের আয়ুকাল সীমিত হলেও তার ভাবনার পরিধি ও কল্পনার ব্যাপ্তি মহাকাশের মতোই অনন্তপ্রসারী। মনোজগৎ ও বিজ্ঞান, বিজ্ঞান ও শিল্প, শিল্প ও সাহিত্যর মধ্যে কোনো অন্তরায় সভ্যতার জন্মলগ্নে ছিল না। এই সীমানা প্রতীষ্ঠা আধুনিক সভ্যতার অপচেষ্টা। প্রতিটি মানুষের মনের কোণে একজন কবি লুকিয়ে থাকেই। তিনি প্রবল হিসেবি গহনাকারই হোন, বা দোর্দণ্ডপ্রতাপ একনায়ক। সারাজীবন এক পঙ্‌ক্তি কবিতা না লিখলেও মানুষমাত্রই কবি। শুধু সেই কবিত্বকে পরিস্থিতি প্রবৃত্তি ঋণীঋতির আবর্তে কেউ কেউ চিরকালের জন্য কণ্ঠরোধ করে দেন। কবিতা যে শুধু লিখতেই হবে এমন কথা কে বলল? আইনস্টাইনের রিলেটিভিটির সূত্র কি পৃথিবীর সুন্দরতম কবিতার একটি নয়? বা মোৎজার্টের যন্ত্রালেখ্য! কবিমন ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব অসম্ভব। তিনি যখন মা, তখনও তিনি কবি। আবার যখন শিশু, তখনও। তবু সেই কবি হওয়া কি সহজ? চারিপাশের অতিমারি। তার ভ্রূকুটি আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা কতটা নিস্পৃহ থাকতে পারবে সেই কবিসত্তাটি? কবি অরুণ মিত্র তাঁর ‘কবিতা, আমি ও আমরা’ প্রবন্ধ শুরু করছেন এইভাবে, ‘আমি মাঝেমধ্যে কবিতা লিখি। যে-সময়ে লিখি না, মাঝেসাঝে ভাবি কেন কবিতা লিখি। নিশ্চিন্ত হতে পারি এমন উত্তর কখনো পাই না। আধুনিক কবিতার কোনো লেখক কি পান? জনসমষ্টির সঙ্গে কবিতার যখন আর যোগ নেই তখন এক মোক্ষলাভ ছাড়া বস্তুত আর কোনো লক্ষ্য খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ‘এই ভয়াবহ সময় কে জানে, সেই ‘মোক্ষলাভ’-এর আশাতেই কি না, কয়েকটি লিখে ফেলা পঙ্‌ক্তি নিয়ে সাজিয়ে নিচ্ছি এই লেখাটি।’

তখন অতিমারির খবর সবে আসতে শুরু করেছে। ইউরোপে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। উড়ে উড়ে ভেসে আসছে ভয়ের শব্দ। কোথাও লটারি করে ঠিক হচ্ছে ভেন্টিলেটর কে পাবে, কোথাও গণকবরের ওপর তৈরি হচ্ছে রাস্তা। সেইরকম এক সময়ে হাসপাতালে রাতে ডিউটির সময় একচিলতে সুযোগ পেয়ে লিখেছিলাম এই কবিতাটি।

দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে

দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে যে-শব্দগুলি
আজ আমার কথোপকথন শুধু তাদেরই সাথে
আমি প্রশ্ন করি ওদের
ফাল্গুন ঝড়ের কথা
দখিনাবাতাসের কথা
জানতে চাই কবে আসবে তুষারপাত
উত্তর ফিরিয়ে দেয় রংচটা গোলাপি দেয়াল
আমি সেই উত্তর শুনতে পাই স্পষ্ট
কিন্তু তাদের অর্থ বুঝতে পারি না কিছুতেই

কবিতার সঙ্গে স্যানিটাইজার দিয়ে ভাবলাম অনেকগুলো ছোটো ছোটো স্কুলপড়ুয়া শিশুর ছবি আঁকব। কিন্তু কী হল কে জানে। ছবি শেষ হলে দেখলাম, প্রতিটি পড়ুয়ার চোখেমুখে ভয়। এটা তো আমি সচেতনভাবে চাইনি! তাহলে কি অবচেতনে আমারও মনের মধ্যে অনিশ্চয়তার ভয় ঢুকে বসেছে? যেমন লিখতে চাইনি ‘রংচটা গোলাপি দেয়াল’। আমি লিখতে চাইনি। তাহলে কে লেখাল! আমি কি তবে হ্যালুসিনেট করছি? অতিবায়বীয় অতিমারির জিনপরি ভর করছে আমার ভিতর!

এর কিছুদিন পর ঘটে গেল একটি দুঃখজনক ঘটনা। আমরা যাঁরা মাঝেমধ্যে শহরের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার জন্য যাই, তাঁরা জানি, সেখানকার সেবায় ব্রতি নার্সরা অধিকাংশই হয় মণিপুরী, নয় কেরলবাসী। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এই সেবিকারা অসম্ভব পরিশ্রমী ও মেধাবী হন। চব্বিশ ঘণ্টা হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর অনায়াসে আবার আরও এক চব্বিশ ঘণ্টা ডিউটি করতে পারেন। ভাষাগত যে-কাঠিন্যটুকু থাকে তা অতিক্রম করতে তাঁরা হয়ে ওঠেন অতিরিক্ত স্নেহশীলা। সংক্রামক ব্যাধিতে ভুগতে থাকা রোগিকে পরম যত্নে হাতে করে খাইয়ে দিতেও দেখেছি আমি। বিনিময়ে আমরা যারা ‘বুদ্ধিজীবী’ জাতি বলে মনে করি নিজেদের, কী দিয়েছি ওদের? সম্মান? স্বীকৃতি? অধিকার? সুরক্ষা? না। এর কোনোটাই হয়তো পারিনি দিতে। শপিংমলে ওদের দেখে আড়ালে ‘চিঙ্কি’ বলেছি, রিসেপশনে ওদের কথা বলার ধরন নকল করে টোনটিটকিরি কেটেছি। সেদিন তেমনই বেশ কিছু সিস্টারদিদিমণি অভিমান করে ফিরে গেলেন তাদের নিজের রাজ্যে। মন ভালো ছিল না আমার। একদিকে অতিমারির মনখারাপের লকডাউন। অন্য দিকে শহরের কোল খালি করে চলে যাওয়া এই সেবিকারা। সেদিন হঠাৎ লিখলাম।

পরবাস

ওরা চলে গেল শূন্য দেউল রেখে
দেউলের বুকে সময়হরণ চাকা
ওরা ছেড়ে গেল একবুক অভিমানে
যুদ্ধক্ষেত্রে রইল চাদর ঢাকা।

ওরা ছেড়ে গেল একবুক অভিমানে
আমাদের ব্রত বুদ্ধিজীবীর মতো
ময়না আর তদন্ত খুঁটে খাওয়া
দেউলের চাকা নিয়তি শরণাগত।

ময়না আর তদন্ত খুঁটে খাওয়া
আমাদের যত পথ্য শোধনাগার
ওদেরকে কেউ পিছুডাক দিল না তো
ওরা চলে গেল স্তব্ধ করল হাওয়া।

ওদেরকে কেউ পিছুডাক দিল না তো
এতোদিন শুধু পিছে ডাক দিয়ে গেছি
যাতায়াত পথে অপমান ভরে দিয়ে
ওদের দু-চোখ করেছি অশ্রুজাত।

যাতায়াত পথে অপমান ভরে দিয়ে
আমরা ওদের পরবাসে ঠেলে দিলেম
আমরা আবার নেমে আসি সমতলে
ওরা চলে যায় স্বপ্ন বোনার দেশে।

হাসপাতাল তো দেউলই আমার কাছে। মনে হল এই হঠাৎ চলে যাওয়া অনেকটা তৃতীয় পানিপথ যুদ্ধে ভরতপুরের জাঠ রাজা সুরজমলের মারাঠাদের একলা ফেলে চলে যাবার মতো। এরপর কী করে যুদ্ধে লড়ব আমরা!

ক্রমশ মৃত্যুর সরণি বয়ে আসছিল আমার দেশের দিকেও। প্রথমে কিছু বিখ্যাত মানুষ। তারপর পাশের রাজ্য। তারপর পাশের পাড়া। তারপর একদিন নিজের আত্মীয়স্বজন। মৃত্যু তখন ঘরে ঘরে। সে এক মৃত্যুনদীর স্রোত যেন। সেই বিষাদঘন আবেশে বয়ে এল নতুন মহামারি আইন। মৃত্যুর পর মৃতদেহ তার নিকটজন দেখতে পারবেন মাত্র তিরিশ সেকেন্ড। তারপর পলিথিন মুড়ে তাকে ফেলে দেওয়া হবে লাশঘরে। সেখানে মৃতদেহর স্তূপ। সেখান থেকে গণদাহর জন্য নিয়ে যাওয়া হবে তাদের। এই যন্ত্রণা অসহনীয়। মনোবিজ্ঞান বলে মৃত্যুর পর মৃতদেহ ঘিরে আপনজনদের আর্তি অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক। সেই আর্তিতে যাঁরা স্বজনহারা হলেন তাঁরা অবচেতনে স্বীকার করে নেন বাস্তব। মনোবিদ এলিজাবেথ কুবলার রোজ এই ঘূর্ণিপাকের কথা বলেছেন। ত্রিশ সেকেন্ডে তা কতটা সম্ভব? তেমনই একটি ঘটনা ঘটে গেল। আমার শিক্ষকের শাশুড়িমা মা গেলেন অতিমারির সংক্রমণে। তার মৃতদেহ কাচের দেওয়ালের ওপার থেকে দেখার অনুমতি মিলল মাত্র ত্রিশমিনিট। কিন্তু তাঁরাই বা দেখবেন কী করে? তাঁরা নিজেরাও তো তখন ঘরবন্দি। তাঁদের দেহেও সংক্রমণ। সেদিন রাতে লিখলাম এই কবিতাটি।

চরণিক

তোমার জন্য সবুজ রেখে গেলাম
যাচ্ছি রেখে কৃষ্ণচূড়ার পাতা
আমার এ-পথ নদ হবে না জেনো
আমি হলাম শেষ না হওয়া খাতা

তোমার জন্য ফুলেল উঠোন রাখি
আমায় তুমি মুড়ছ পলিথিনে
আমার জন্য অন্তমিলের পদ
সাজিয়ে রেখো অন্য টুকিটাকি।

তুমি যাবে সদর সড়ক দিয়ে
তোমার জন্য খুলছি ব্যারিকেড
এতটুকুই আমার কণ্ঠনালি
আর কটা ধাপ বলব আশা নিয়ে।

তোমার জন্য সবুজ রেখে গেলাম
আমার চলা দখিন দুয়ার দিয়ে
ভোগ লেগেছে জগন্নাথের বাসায়
আমার কথা ফুরিয়ে গেল ঘিয়ে।

কবিতাটি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত হবার পর বেশ কিছু মানুষ প্রশংসা করলেন, কেউ কেউ প্রতিক্রিয়া জানালেন। কিন্তু লক্ষ করলাম, আমার মন সেইসব স্পর্শ করছে না। নিস্পৃহ লাগছে সবকিছু। তবে কি এভাবেই শেষ হবে মানবসভ্যতা!

ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম আমরা। মহাকাশে চলতে থাকা যানের মতোই। আলাদা হয়ে গেল সম্পর্কর মডিউলগুলো। হাতে রসায়ন ঘষি, মুখে আবরণ পরি। এই আবরণের একটি সুবিধা। মনের অন্তরের দোলাচলকে আর কষ্ট করে লুকিয়ে রাখতে হয় না। কবিতা আসে না আর। কবিতা ফুরিয়ে আসে। ক্রমশ ক্লান্ত হই। ক্রমশ নিজেকে মনে হয় পরাভূত। তবু জাহাঙ্গীরের দরবারে একটি পাখির ছবি আমাকে জাগিয়ে রাখে। চারপাশে তাকিয়ে দেখি বিচ্ছিন্নতা তার মায়াজাল বিস্তার করেছে। ঘরে ঘরে অবিশ্বাস। ভাইয়ে ভাইয়ে পাড়ায় পাড়ায় অবিশ্বাস। এত বিষ নিয়ে কবি লিখতে পারেন। আমি লিখব কী করে? আমি তো ছদ্মকবি। যাত্রাপালার বিদুষকের মতো আমার বেশভূষা পাগড়ি জহরত, সবটুকুই যে ‘ছদ্ম’। ভাবতে ভাবতে লিখে ফেলি আমার শেষ কবিতা।

মস্যাধার

আমার আঙুলে আর লেখনিশক্তি নেই
তুমি সেই অন্ধকার আগলে রেখেছ কবি
আমি ভগ্ন রাজ উঠোনের একপাশে
ভগ্নচোয়াল ঘিরে জীর্ণ মলিন রাজবেশ।

আমার গোলাপবাগে বেদখল কলতান অসহ্য মনে হয় না আর।
ওদের বেড়ে উঠতে দেখি আমি আঙুলের কোনায় নিভৃতে
ওরা তুলে নেয় রং
আমারই মস্যাধার থাকে
আমার লেখনি নেই
অবিশ্বাস বাস করে সেই শূন্য ঘরটুকু জুড়ে।

লিখে ফেলি। কিন্তু মানবসভ্যতার ওপর বিশ্বাস হারাই না। মনে মনে ভাবি, আমরা কাটিয়ে উঠবই। সেদিন আবার লিখব। কারণ, যতই ছদ্মবেশ হোক, বিদূষকের চলনবলন আমার রক্তে, অনুভূতিতে প্রবিষ্ট হয়ে গেছে। মনে মনে ভাবি। আমি আবার লিখব। নতুন সূর্যের দিনে লিখব। কারণ, লেখা ছাড়া আমার আর কোনো রাস্তা নেই। কোনো মানুষেরই হয়তো থাকে না।

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তীর গদ্য

আমাদের নতুন বই