লেখক নয় , লেখাই মূলধন

শুভশ্রী পালের গদ্য

অ্যাসাইলাম থেকে বলছি ১

যেদিন খুব খিদে পায় আমি টেবিল সাজিয়ে বসি। প্রথমে ফ্রেঞ্চফ্রাই৷ লম্বা লম্বা, সরু সরু। ছাঁকা তেলে ভাজা। তারপর একটু নরম গ্রিল করা খাবার। ঠিক যেন মনে হয় প্যাশনেট চুমু খাওয়ার সময় প্রেমিকের ঠোঁট কামড়ে ধরছি। এরপর লেগপিস। তন্দুরি। বাটিতে মাছের তেলের মতো একটা অংশ, তা দিয়ে ভাত মেখে গোগ্রাসে খাই। লাল থকথকে চাটনিটা খেতে গিয়ে সারা মুখে লেগে যায়। প্রচুর খেয়ে পেট আইঢাই করে। ঢেঁকুর না উঠলে আবার আমার ঠিক খেয়ে সুখ হয় না। এই অবস্থায় টেবিল থেকে উঠে ঘরে যাওয়া বেশ মুস্কিল হয়ে পড়লে পাশে এসে দাঁড়ায় মৃত প্রেমিক। হাত ধরে নিয়ে যায় বেসিনের কাছে। মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে আমার গলায় আঙুল ঢুকিয়ে বমি করিয়ে বের করে আনে তার অর্ধপাচ্য প্রাক্তন প্রেমিকাকে। সস্নেহে আমাকে বকুনি দেয় রাস্তায় বিক্রি হওয়া জাঙ্কফুড খাবার জন্য।

কেন জানি না আমার সমস্ত প্রেমিক এবং প্রিয়বন্ধুদের প্রাক্তনদের সঙ্গে আমার এক অদ্ভুত সুসম্পর্ক তৈরি হয়।
এইসব খিদের মুখে ওরা আমাকে বাঁচিয়ে তোলে।

অ্যাসাইলাম থেকে বলছি ২

মফস্‌সলি দুপুরগুলোয় ঘুঘুর ডাক বড়ো বিষাদ ভাসিয়ে দেয় হাওয়ায়। গুঁড়ো গুঁড়ো একাকিত্ব দমবন্ধ করে দিতে এলে চলে যেতে হয় জীবন-মৃত্যুর মাঝে যে-টানেল, তারই ভেতর। টলতে টলতে জ্ঞান হারাই সেখানে। এখানে দৃশ্যদের স্লাইড শো-এর আনাগোনা বেশ কম এবং ধীর গতির। বরং টানেলের যেদিক থেকে আলো আসে সেখানে রক্ত জমে জমে লাল মার্বেলের জমিন গড়ে তুলেছে। পা পিছলে যায় ওখানে পায়চারি করলে। আর ফেটে যাওয়া মাথার ভিতর থেকে একে একে বেরিয়ে আসে খিদে চেপে রাখায় জন্ম নেওয়া পিত্তরস। এ-সব খিদের মুখোমুখি হওয়ার মতো বাড়ি বা রান্নাঘর কোনোটাই আমার নেই। তাই বড়ো ভয় লাগে ওই মার্বেলের মেঝের চলাচল।
টানেলের এদিকে ভোরের কিচিরমিচির ভেসে এলেও সমস্যা হয় না খুব একটা। যেদিন যেদিন পুরো বডিটা টানেলের ভিতর অবধি আসতে পারে না, এক অসতর্ক মুহূর্তে আলোর দরজার ওপার থেকে পা ধরে টানতে থাকে কেউ। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দুম করে চোখে আলো এসে পড়লে চোখে ঝিলমিল লেগে যায়। অবস্থান ঠাউর করতে করতেই টলে যায় পা। আধবোজা চোখে যে-সব দরজায় বেল বাজাই তাদের থেকেই জানা যায় ‘ভুল ঠিকানা’-র চিরকুট হাতে আমি হেঁটে চলেছি দিগন্ত জুড়ে। কানে মাথায় প্রতিধ্বনি হওয়া ‘ভুল ঠিকানা’-রা একে-অন্যের গায়ে উঠে পড়ে ছোটো দেখালেও ওজন বেড়ে যায় অস্থিরতার। এভাবে ঠিকানাবিহীনভাবে আলোয় থাকা যায় নাকি? ফলত লাশ সৎকারের জন্য কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। মৃতদেহও তখন পারে না টেলি যোগাযোগের মাধ্যমে শ্মশানযাত্রীর মেলা বসাতে।

অ্যাসাইলাম থেকে বলছি ৩

দুপুরের খাওয়া সেরে ছাদের কাপড় তুলতে আসার অলস সময়ে ঘুঘুর ডাক ঝিম ধরায়। ছুটির দিনের এইসব সময় মারাত্মক ঘোর এঁকে দেয় মনে। ঘুমের ভিতর জেগে ওঠা সত্তারা জেগে থাকা চোখে ঘুম এঁকে দেয় অলৌকিক তুলির টানে।
সাদা রঙের ফুল আঁকা নীল জমিনের ছাপা শাড়ি আঁচল অভ্যস্ত রাঁধুনির হাতমোছা হয়ে হলুদ ছোপ পেয়ে আধভেজা সুখ পায়। দুটো ওভেনে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে জ্বলতে গিলে ফেলে আমার সুখের সংসার৷ ভাতের ফ্যান উপচে উঠলে ঢাকা ফেলে দিই হাঁড়ির৷ আরেক দিকে কড়াইতে মাংস কষার গন্ধে চারিদিক মেতে উঠলে মৃত প্রেমিক আব্দারী মুখে বাটি হাতে এসে দাঁড়ায় নুন-ঝাল-মিষ্টির তদারকি করতে। খানিক আগে সে এসে দাঁড়িয়েছিল আমার পিছনে। যখন আমি শিল-নোড়ায় মশলা বাটছিলাম। মশলা বাটার সময়ে আমার দু- হাতে দু-গাছা চুড়ি রিনঝিন আওয়াজ তুলে অ্যায়লান করছিল সাংসারিক সমৃদ্ধির কথা। এ-সব দৃশ্যে সন্তানসুলভ প্রেমিক ধ্রুবক হলেও, স্নানঘামে ভেজা মুখে লেপ্টে থাকা চুল সরিয়ে দেনেওয়ালা কুছ পল কা মেহেমান জাতীয় চরিত্রের স্লাইড শো অব্যাহত। কখনো কফির চুমুকের কাল্পনিক সঙ্গী, কখনো-বা ‘ভাল্লাগছে না’ বাণীর মনোটোনাস সুরের গানের শ্রোতার মুখ ভেসে আসে দৃশ্যে। এইসব সিনে থ্রি ডি ইমেজ ঠিকঠাকভাবে ফুটে ওঠার আগেই মিলিয়ে যায় নেটওয়ার্কের অস্থিরতায়।
রান্না শেষে সব নিকানো হয়ে গেলে স্নানে যাই, শাওয়ার খুলে গেলে দূরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে না-বলা আপাত ভালোলাগা মুখেরা। রুপোলী নায়িকাদের থেকে শেখা ছলা-কলার অনভ্যস্ত প্র্যাক্টিস চলে তখন। জল ছাড়া আর কী-ই-বা আছে এ-সব দৃশ্য ধুয়ে দেওয়ার মতো। সব ধুয়ে যায়। ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেলে বড়ো শান্ত হয়ে আসে মন-শরীর। অতঃপর বালিশ জাপ্টে তলিয়ে যাই জলের নীচে। প্রতিবার শ্বাসরুদ্ধকর সিনে ঘুম ভেঙে যায়। আবার পরের দৃশ্যে আসে ওয়ান সিন স্যান্ডের চরিত্ররা। অথচ আমার এবারে তলিয়ে যাওয়ার কথা ছিল গঙ্গার বুকে। জন্ম-মৃত্যুর মাঝে যে-টানেল সেখানে চিঠি রেখে গেছে মৃত প্রেমিক অথবা মৃত প্রিয় বন্ধু। যে-সব কথা বলে ওঠা হয়নি কনসাস মাইন্ডের চোখ রাঙানিতে সেইসব কিছু বলে ফেলার জন্য আমার টানেলে প্রবেশ ম্যান্ডেটরি। টানেলের মুখ থেকে প্রতিবার ফিরে এলে বড়ো ক্লান্ত লাগে। ভয় হয় ডাকবাক্স হারিয়ে ফেলার। যে-বন্ধু জীবৎকালে প্রতি স্বপ্নে এসে চুল ধরে টানত, অপার শান্তি খুঁজে পাওয়ার আগের ভোররাতে সে এসেছিল চুলে বিলি কেটে ঘুম পাড়াতে। বাকি কথা চিঠিতে বলার ইঙ্গিত।
অথচ আমি এখনও ঘুমের মধ্যে জলের নীচে তলিয়ে যেতে পারছি না। একটা আস্ত সত্যি সংসার আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকলেও, আমি পাখির ডাকের নেশায় তলিয়ে যাচ্ছি। খাবি খাচ্ছি এপাড়ের বেঁচে থাকা নামক হ্যালুসিনেশনে…

শুভশ্রী পালের গদ্য

আমাদের নতুন বই