Categories
গদ্য

সরোজ দরবারের গদ্য

বইপাড়ার সংকট ও সাক্ষী ডুমুরগাছের কথা

এ-কথা আর কারো অজানা নেই যে, বইপাড়া সংকটে। তবু, এ-কথা অনেকেরই জানা নেই যে, বইপাড়া কেমনতর সংকটে। বইপাড়ার সঙ্গে আমার পেশাগত সংযোগ ও সম্পৃক্তি খুব বেশিদিনের নয়। স্বল্প অভিজ্ঞতায় যা বুঝেছি, বইপাড়ার মূল সংকট হল, বইপাড়ার প্রধান সংকটের মুখোমুখি না-হওয়া।সব পাখি ঘরে ফেরে; সব প্রকাশনার লোকেরাই একে অন্যের ঘরে ঘরে ফেরে; কাজের মাঝে যখন খানিক ফুরসৎ। তখন মুখোমুখি বসিবার থাকে দু-চারজন সমমনস্ক; এবং গল্প হয়। মূলত দুঃখযাপন; বইপাড়ার প্রধান সংকট সেখানেই স্বরূপ পায়। প্রায় ইতিহাস পরীক্ষায় লেখা উত্তরের মতো পয়েন্টে পয়েন্টে উঠে আসে।

কিন্তু মুখ ফুটে কেউ-ই তা প্রকাশ্যে বলে না বিশেষ। কেন বলে না? ভেবে দেখেছি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সে-সব কথা বলা যায় না। যায় না যে, তা ঠিক কোনো ভয়ে নয়। এমন নয় যে লেখক বা পাঠক হারানোর বিপুল ভয় আছে। অধিকাংশ প্রকাশনাই স্বাবলম্বী নয়। স্বর্ণলতার মতো জড়িয়ে আছে অন্য ব্যবসায়; ফলে ভয় বিশেষ থাকার কথা নয়। তাহলে? ভেবে দেখেছি, এ এক সংস্কার; অনেক সময় ঘোর সংকটে থাকা রোগীর পরিবারকেও মুখ ফুটে তিক্ত বাস্তব কথাটি বলে ওঠা যায় না। অথচ, যা হওয়ার, তা-ই হয়।

যাই হোক, আশু সংকট এই যে, মহামারীর দরুন কাজ প্রায় বন্ধ; ফলে বিপুল ক্ষতি এবং বইপাড়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত মানুষদের কর্মহীন হওয়ার আশঙ্কা। অবধারিত ছিল। তবু চলছিল, চলে যাচ্ছিল— এই পর্যন্ত। এখন জোরকদমে বিকল্পের খোঁজ চলছে। প্রযুক্তির অলিগলি ঘেঁটে দেখে নেওয়া হচ্ছে, কোন পথে আছে ক্রমমুক্তির আলো; সত্যিই কি আলো আছে! সন্দেহ থেকে যায়। উনুন, গ্যাস বা মাইক্রোওভেন— রান্না যেখানেই করা হোক না কেন, গোড়ায় গুছিয়ে বাজার করা আবশ্যক। তা সেরকম বাজারসফর আর কোথায়! কেবল মাধ্যম বদলের ইঙ্গিতে বেনিয়াটোলার মাথায় জ্বলে ওঠে হলদে-রং বিষণ্ণতা।

বাজারসফর বলতেই শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, এবং তাঁর সেই ডুমুর গাছের গল্পটা মনে পড়ল; সাক্ষী ডুমুরগাছ। নিজের সন্তান, সম্পত্তি লিখিয়ে নেওয়া অন্তে প্রায় স্মৃতিভ্রষ্ট বৃদ্ধ বাবাকে মেয়ে তুলে দিয়েছে কালকা মেলে। অমৃত নামের এক ব্যক্তি তাঁকে নির্দিষ্ট স্টেশন থেকে নামিয়ে নেবেন। গল্পের শেষ অনুচ্ছেদে লেখক বলেন, ওই অমৃত নামের কেউ আছে কি না কেউ জানে না। বৃদ্ধ তার কাছে পৌঁছায়ওনি, কারণ পুলিশ নিরুদ্দেশ ঘোষণায় জানিয়েছে সেই বৃদ্ধের কথা। বৃদ্ধ তাহলে এখন কোথায়? কেউ জানে না। শুধু এই পুরো ঘটনার, নিষ্ঠুরতার সাক্ষী হয়ে থাকল লেখক আর ডুমুরগাছ। এই নিষ্ঠুরতা ঘটিয়ে তুলল বৃদ্ধের কন্যা, সেই রমণী, যার ফেলে যাওয়া গন্ধ রুমাল একদিন লেখক কুড়িয়ে নিয়েছিলেন ভারী আপন ও গোপন সম্পদ হিসেবে। বই-বই আবেগের গন্ধরুমালখানা কতজন যে বুকপকেটে তুলে রেখেছেন, ইয়ত্তা নেই। কিন্তু এটা ঠিক যে, বইপাড়াকেও কেউ কালকা মেলে তুলে দিয়েছে। আমরা জানি না, সে কেমন আছে, কোথায় আছে। সেন্ট্রাল মেট্রো থেকে বাটার মোড় হয়ে শিয়ালদা অবধি শুধু হেঁটে চলেছে অগণন সাক্ষী ডুমুরগাছ।

কে না জানে, যে পড়াশোনার অভ্যেস কমেছে। আবারকে না জানে যে, হাজারে হাজারে বই নিঃশেষ হওয়ার বিজ্ঞাপনও দেখা গিয়েছে। তাহলে! অসুবিধা কোথায়! সূচ আর সুতোর মিলজুল হওয়ার ভিতর তবু কেন যেন জেগে থাকে এক-আধটুকু বেয়াড়া আঁশ। ফলত, বাঁধাই খুলে যায় চেনা হিসেবের। ইতিউতি ছড়িয়ে পড়া পৃষ্ঠা হাতে তুলে নিলে দেখা যাবে বাস্তবলিখন। কিন্তু আমরা পড়ে দেখি কম, কেন-না পাঠ্যাভাস সত্যিই কমেছে।

আবার বেড়েওছে বটে; লেখকদের তরফে। কবি বা প্রিয় গল্পকারের মুখে দু-লাইন শোনার বাসনা এখন পূরণ হয়ে হাতে রয়েছে পেনসিল এবং সারপ্লাস। সকলেই পড়ছেন। যা লিখিত আকারে পাঠকের সামনে ধরা দিয়ে গড়ে তুলত যোগাযোগ, তা এখন দৃশ্য-শ্রাব্য মিলিত ফর্ম্যাটে গিয়ে পৌঁছোচ্ছে। বদল হচ্ছে অভ্যাস। সেই বদলানো পর্ব সারা হলে আবার যদি সময়-সুযোগমতো লিখিত অক্ষরের প্রতি তন্নিষ্ঠ প্রেম প্রত্যাশা করে বসা হয়, তবে কি যৌক্তিক কাজ হবে? এর উত্তরে কয়েকটা রাধাচূড়া কেবল ঝরে পড়ে সমস্ত ডাঁই করে রাখা বইয়ের উপর।

স্কুল বন্ধ হতেই অনলাইন ক্লাসের ধুম লেগেছে ফোনমহলে। ফলে কোনো কোনো সংস্থা ক্লাসের প্যাকেজ নির্মাণেও মন দিয়েছে। অর্থাৎ, শিশু যে অভ্যাস করছে, সেই অভ্যাসেই তার কাছে বিষয়বস্তু পৌঁছানো। পাঠকদের জন্য একই অভ্যাস তৈরি করছেন লেখকরাও। প্রসঙ্গত, একজন অভিনেতা এই সময়ে সামনে এসে কিন্তু অভিনয় ছাড়া তাঁর চিত্রনাট্য পড়ছেন না। কিংবা একজন গায়ক এসে গান ছাড়া স্বরলিপি পড়ে চলে যাচ্ছেন না। অর্থাৎ প্রতিটি শিল্প মাধ্যম যেভাবে প্রকাশিত হত, সেভাবেই প্রকাশিত হচ্ছে, বদলে যাচ্ছে শুধু প্রকাশের মাধ্যম। স্টেজের জায়গায় এসেছে ভিডিয়ো কি সোশ্যাল মিডিয়া। সিঁদুরে মেঘ তবু লিখিত অক্ষরের শিল্পের কপালেই। তার সমস্ত স্বাতন্ত্র ভেঙেচুরে দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে অন্যান্য ফর্মের উপস্থাপনা। মুদ্রিত বইয়ের বদলে নয় ই-বুক হবে, কিন্তু পড়ার বদলে শোনা কি দেখার অভ্যেস তৈরি হলে, বই নামক ধারণাটির কী হবে! বইপাড়া এ-সবে মুচকি হাসে। বলে সেই জাহাজের গল্পটা জানো তে হে! একটা জাহাজকে ভেঙে আবার জোড়া লাগালে সে কি সেই পুরোনো জাহাজটাই থাকবে! এ-সব প্যারাডক্সকে আমরা বইপাড়ার সংকট হিসেবে দেখব কিনা, সে-বিচারের জন্য ঢের কাপ কফি খাওয়া এখনও বাকি থেকে গেছে।

যারা বলেন বরং যে, বইপড়ার অভ্যেস কমে গেছে, তাঁদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া যায় লাইব্রেরি পারচেজের তালিকা। আবার প্রতিযুক্তি এই যে, পারচেজ তো হল, কোন বই ইস্যু হচ্ছে, আদৌ হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে কি! সংকটের খতিয়ানে এ-সব আলোচ্য হবে কিনা, আমরা জানি না। যদি হাতে হাতে বই পৌঁছোনোই একমাত্র লক্ষ হয়, যার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা অবধারিত বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে, তবে সেই একই কাজ জেলায় জেলায় সম্প্রসারণ করে হয় না! শুনলাম, এ-দেশের একটি বড়ো সংস্থা নাকি বাড়িবাড়ি মুদির জিনিস পৌঁছে দিতে, পাড়ার মুদি দোকানগুলিকে পয়েন্ট অফ সেল করবে! সেই একই কথা বইয়ের ক্ষেত্রে ভাবা যায় না কেন! অনেকে বলবেন, শিয়রে শমন হয়ে আছে মহামারী। তবু মারী মাথায় করেই সবই চলছে। কিছু কিছু পদ্ধতিগত বদলের কথা ভাবা হচ্ছে বা হবে। কেবল বই বা সংস্কৃতির অন্যান্য ক্ষেত্রেই পুরোপুরি বিকল্পের ভাবনা, আরও বহুতর ভাবনা উসকে দিচ্ছে।

হয়তো বইপাড়ার এ-ও এক সংকট যে, তার নাম বইপাড়া; যারা বই পড়ে না, তাদের কাছে সে অচ্ছ্যুৎ। অথচ, এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু কেউ কোনো কথা দিয়েছিল কি না, আমরা জানি না। পরন্তু এতদিনে এ-ও জেনে গেছি, কেউ কথা রাখে না।

বই থেকে যাবে; বইপড়াও থেকে যাবে; বইপাড়াও; যে-কোনো একটা রাস্তা সে ধরে নেবে ঠিকই। শুধু কোনো কোনো সাক্ষী ডুমুরগাছ লিখে রাখবে একখানা আদত নিষ্ঠুরতার গল্প। বইপাড়ার বিশ কি পঁচিশ বছরের প্রজন্ম তা জানবে, তারপর হয়তো শ্রাগ করে বলবে, নেভার মাইন্ড। অথবা, কিচ্ছুটি বলার মতো, তাদেরও হয়তো আর কিছু থাকবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *