লেখক নয় , লেখাই মূলধন

সেলিম মণ্ডলের গদ্য

রাস্তা কারো একার নয়

কলেজ স্ট্রিটে কাজ সেরে আমহার্স্ট স্ট্রিট থেকে রাজা রামমোহন সরণি ধরে হাঁটছি। মাথাটা ভীষণ ভার। শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে। মাঝরাত্রিরে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর আর ঘুম ধরেনি। সকালে থেকে চুয়া বমি। শরীরটা ভালো না। কয়েকবার গলায় আঙুল দিয়েও বমি হল না। যেদিন শরীর ভালো থাকে না, সেদিন পৃথিবীর সকল মানুষ ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তবে একমাত্র রাস্তা যে সবার কথা রাখে। তুমি একা একা যতটাই পথ হাঁটো রাস্তা তোমাকে ছেড়ে পালাবে না।

অঘোষিত ছুটি। জামাইষষ্ঠীর। শিয়ালদার অর্ধেক দোকান বন্ধ। জ্যোতি প্রিন্টের অর্ধেক কর্মচারী আসেনি। এইদিনে আমিই একমাত্র ব্যস্ত প্রানী। সকাল থেকে হন্তদন্ত হয়ে কলকাতা তোলপাড় করছি। সেন্ট পলস কলেজের ঠিক উলটোদিক দিয়ে হাঁটছি। মানে, মারোয়ারি হাসপাতালের ঠিক সামনের রাস্তা দিয়ে। ওই রাস্তায় অন্যদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেভাবে কাউকে দেখা যায় না। শুধু ব্যস্ত মানুষ, তার ক্লান্তি অথবা তাড়া নিয়ে গন্তব্য চলে। কিছুটা সামনে এক চায়ের দোকান, কেউ ডিমটোস্ট বা ঘুগনি খাচ্ছে, এটুকুই… তবে যেটা দেখা যায়—পথের দু-পাশে জড়ো করা বাসনপত্র, জামাকাপড়, বিছানাপত্র এবং বস্তা ভর্তি অন্যান্য সব জিনিস। রাস্তায় মানুষ চলাচলে তেমন অসুবিধা হয় না। কিন্তু যে মানুষগুলো থাকে? আসলে তারা যে যার মতো বেরিয়ে যায়। মহিলা, পুরুষ, বাচ্চা সকলেই। পুরুষরা বেশিরভাগ ভ্যান টানে, মহিলাগুলো দোকানো-টোকানে কাজ করে, আর বাচ্চাগুলোর অধিকাংশ ভিক্ষা করতে বেরোয়। ফেরে সন্ধ্যার পর।
নিজেকে ভীষণ একা লাগছে। দুপুরের গাছগুলো সকলে অভিমান করে আছে। দরদর করে ঘামছি। সাদার উপর সাদার দাগ বোঝা যায় না বলেই হয়ত রেহাই। না হলে কতবার যে জামাটা জলন্যাকড়ার মতো ভিজে গেছে! এই ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে ফুটপাতবাসী আজ ঘুমিয়ে পড়েছে। কী সুন্দর ঘুমোচ্ছে! আসলে আমাদের চাহিদার উপর নির্ভর করে প্রয়োজনীয়তা। কে কীভাবে সুখী! কারো একশো টাকাতে চলে কারো এক হাজার টাকাতেও চলে না। কারো একটু মাথা গোঁজার জন্য ফুটপাত হলেই চলে, কারো পালঙ্কতেও ঘুম ধরে না। হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ল, একটি পরিবারের তিনজন শুয়ে আছে। স্বামী-স্ত্রী আর মেয়ে। মেয়েটির বয়স কত? ওই বড়োজোর বারো বা তেরো। মোবাইল নিয়ে খুটখাট করছে। পাশেই শুয়ে ওর বাবা-মা। চোখ বুজে সম্ভবত৷ ওর মায়ের তামাটে পেটে বাবা আলতোভাবে হাত দিয়ে রয়েছে। আর নাকটা কানের কাছে দিয়ে৷ কী অদ্ভুত রোমান্স! আমরা ছেলেমেয়দের সাত- আট হলেই অন্যঘরে শোয়ানোর ব্যাবস্থা করি আর এরা রাস্তার উপর এভাবে কী করে! রাতে যখন সঙ্গম করে তখন? যাইহোক আর দু-পা এগোলাম। এবার দেখলাম— মাঝবয়সি এক লোক। লুঙ্গি পরে ঘুমিয়ে আছে। এমনভাবে ঘুমোচ্ছে মনে হচ্ছে বহুদিন সে এভাবে ঘুমোয়নি। লুঙ্গি উঠে যৌনাঙ্গখানা বেরিয়ে এসেছে। সে কি স্বপ্ন দেখছে? জানি না। ভোরের যৌনাঙ্গের মতো উত্থিত। তাঁকে শান্ত করার জন্য এই দুপুরের কোনো শাসন আজ কার্যকর হবে না। সে নিজেই রাজা। মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। এই ফুটপাত আমি কোনোদিন দেখিনি। আরও কিছুটা এগিয়ে গেলাম। এক দম্পতি শুয়ে খুব বেশি বয়স না। বউয়ের কুড়ি আর স্বামীর পঁচিশ মতো। একে অপরকে জড়িয়ে শুয়ে আছে। কে ওদের দেখল বা দেখল না— তোয়াক্কা কীসের! প্রেম বা রোমান্সে বেশি কাঁচুমাচু কি চলে? আরও একটু এগিয়ে গেলাম। বেশিরভাগ পরিবারের লোকজন ঘুমোচ্ছে। চোখে পড়ল একটি রোগা, সুন্দরী মেয়ে। গায়ে পুরানো কোঁচকানো জামা। স্তনযুগলও এই কমবয়সেও আকর্ষণীয়। মেয়েটির চোখ যেন কাউকে প্রেমের ইশারা করছে। এই ঘুমন্ত ফুটপাত আর এই জনশূন্য পথে কার জন্য এই প্রেম? কিছুটা এগিয়ে যেতে মানে আরও তিন চারটে পরিবার… ওর থেকে বছর দুই বয়সি এক ছেলে। কিশোর বেলার এই প্রেম একটু বেশিই রোম্যান্টিক। যে পথ যেতে মিনিট পাঁচ লাগে আজ দশ মিনিটেও ফুরোচ্ছে না। আমি যেন নিজের জগতে নেই। আমার অস্তিত্বজুড়ে শুধুই এই পথবাসী। এভাবেই এগোচ্ছি। কিছুদূর যেতেই দেখি, রাস্তা অবরোধ। অবরোধ করে রেখেছে এক মাঝবয়সি লোক। কাঁচাপাকা চুল। খালি গা। পরনে শুধু ফুলপ্যান্ট। আমাকে ফুটপাত থেকে বেরিয়ে মেন রোড দিয়ে যেতে হবে কি? লোকটি বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। লম্বালম্বি না, আড়াআড়ি। আর আমাকে যেন ঘুমের ঘোরে বলছে: রাস্তা কারো একার নয়।

কেন জানি না মনে হচ্ছিল ওরাই স্বাধীন আর আমরা পরাধীন। আমাদের স্বাধীনতা দিবস নেই। ওদের আছে।

ফুটপাতে ছেড়ে মেন রোডে পৌঁছালাম। তাপসদার প্রেসে প্রায় চলে এসেছি। মাথা ছেড়ে গেছে। শরীর অনেকটা হালকা লাগছে। আর ঘামছি না। ব্যাগ থেকে জলের বোতল বার করে কয়েক চুমুক খেয়ে নিলাম। তাপসদা ‘গোপাল ভাঁড়’ সংখ্যার ড্যামি দেখাল। জীবনের ত্রিশটি বছরে এসে কোথাও যেন প্রথমবার মনে হল, আজ আমার ষষ্ঠীর দিন।

সেলিম মণ্ডলের গদ্য

আমাদের নতুন বই