অরূপ চক্রবর্তীর ধারাবাহিক: জলসাঘর

চতুর্থ পর্ব

মোহর-কণিকা

(পরবর্তী অংশ)

রেকর্ডে প্রথম প্রকাশিত গান:

১৯৩৭ সালে কণিকার গাওয়া গান প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ডে যখন প্রকাশিত হয় তখন কণিকার মাত্র ১৩ বছর বয়স।কাকা গোকুল মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে এসেছিলেন কলকাতায় বেড়াতে। সেই সময় তার কাকা তাকে নিয়ে আসেন হিন্দুস্থান কোম্পানিতে (পরবর্তীকালে ‘ইনরেকো’)। উদ্দেশ্য ছিল কীভাবে গান রেকর্ড করা হয় তা ভাইঝিকে দেখানো। সেই সূত্রে কোম্পানির মালিক চন্ডীচরণ সাহা ও ট্রেনার যামিনী মতিলালের সঙ্গে পরিচয়। তাঁরা কিশোরী কণিকার গান শুনে এতটাই মুগ্ধ হয়ে যান যে, তখনই তাঁরা স্থির করেন কণিকাকে দিয়ে গান রেকর্ড করাবেন। কিন্তু তাঁরা রবীন্দ্রনাথের গান রেকর্ড করানোর ব্যাপারে একটু দ্বিধাগ্রস্থ ছিলেন। তাই তৎকালীন বিখ্যাত গীতিকার নীহারবিন্দু সেন ও সুরকার হরিপদ চট্টোপাধ্যায়কে দু-টি আধুনিক গান তৈরি করেন এবং সেই দু-টি গান দিয়েই কণিকার প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়। গান দু-টি হল: “গান নিয়ে মোর খেলা” ও “ওরে ওই বন্ধ হল দ্বার”। ১৯৩৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এই রেকর্ডটি বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পায়। গান দু-টি প্রশংসিত হয় এবং বাণিজ্যিক সফলতাও পায়। একই সময় হিন্দুস্থান কোম্পানি থেকে প্রকাশিত ‘ফুলপরি’ নামের শিশু গীতিনাট্যের রেকর্ডেও কণিকা কণ্ঠদান করেন।

এই ঘটনায় কবি মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন এবং তিনি মোহরকে বলেন যে, “তুমি যদি এইসব গান গাও তবে আর আমার গান গেয়ো না”।

এর পরে ওই বছরেই রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তিগত উদ্যোগে কণিকাকে নিয়ে হিন্দুস্থান কোম্পানিতে আসেন এবং তাঁর দু-টি গান কণিকার গলায় রেকর্ড করা হয়। গান দু-টি হল— “মনে কী দ্বিধা রেখে গেলে চলে” এবং “না না না ডাকবো না”। তৎকালীন মাসিক রেকর্ড ক্যাটালগে রেকর্ডটির পরিচিতি দেওয়া হল এইরকম: ‘কুমারী কণিকা মুখার্জির প্রথম রেকর্ডখানি সকলের তৃপ্তিসাধন করিয়াছে। এবার তাহার আর একখানি রেকর্ড বাহির হইল। এই গান দুখানি শুনিয়া সকলেই প্রীতিলাভ করিবেন’। রেকর্ডের লেবেলে শিল্পীর নাম লেখা হল এইভাবে: ‘কুমারী কণিকা মুখার্জী (মোহর)’। আরও উল্লেখযোগ্য তা হল, রেকর্ডে রবীন্দ্রসংগীত না লিখে বলা হল ‘বেঙ্গলি সং’, কথা ও সুর: রবীন্দ্রনাথ।

১৯৩৯ সালে একই কোম্পানির ব্যানারে প্রকাশিত হয় কণিকার গাওয়া আরও দু-টি রবীন্দ্র সংগীত— “ওই মালতীলতা দোলে” ও “ঘরেতে ভ্রমর এলো গুনগুনিয়ে”।

এর পরে ১৯৪০ সালের ২৮শে জুলাই বোলপুরে টেলিফোন চালু হবার দিন। সেদিনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ নিজে আবৃত্তি করেছিলেন এবং মোহরকে দিয়ে “ওগো তুমি পঞ্চদশী” গানটি গাইয়েছিলেন। এই অনুষ্ঠানটি রেডিয়োতে প্রচারিত হয়েছিল।

এরপরে ১৯৪১ সালে উদয়নের বারান্দায় মঞ্চস্থ হয় ‘বশীকরণ’ নাটক। তাতে মোহর অভিনয় ও গান করেছিলেন। অসুস্থ শরীর নিয়েই রবীন্দ্রনাথ উদয়নের বারান্দায় এসে বসেছিলেন। অসুস্থ শরীরেই মোহরকে “ওই মহামানব আসে” গানটি শিখিয়েছিলেন এবং গানটি ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধ পাঠের দিন পরিবেশিত হয়েছিল।

ইন্দ্র পতন:

তারপর সেই অসীম দুঃখের দিন ঘনিয়ে এল— ২২শে শ্রাবণ। মোহরের কথায় “এক ঝড় বৃষ্টির দিনেই আমার তাঁর কাছে যাওয়া। আজকের ঝড় বাদল তার না-থাকার খবর নিয়ে এল। এমন একটা খবরের জন্য রোজ শঙ্কিত হয়ে থাকতাম আমরা। বৃষ্টির মধ্যে নীরবে নিঃশব্দে পুরোনো লাইব্রেরির সামনে পৌঁছে গেলাম আমরা। সেই যে ডাকঘরের রিহার্সাল দিতে দিতে কতবার গাইতেন আর বলতেন, আমার মৃত্যুর পর তোমরা গেয়ো— “সমুখে শান্তি পারাবার”। আজ এই দুঃসহ দিনে সেই গানই গাইলাম আমরা। গাইলাম না কাঁদলাম জানি না”।

কণিকার কর্ম ও সংগীত জীবন:

পাঠভবন-শিক্ষাভবন পার হয়ে সংগীতভবন থেকে ১৯৪৩ সালে রবীন্দ্রসংগীত ও ভারতীয় মার্গ সংগীত নিয়ে উত্তীর্ণ হন এবং বিশ্বভারতী সংগীতভবনের অধ্যাপিকা রূপে যোগদান করেন। সেই বছরেই কণিকা আকাশবাণীর রবীন্দ্রসংগীত বিভাগের নিয়মিত শিল্পী রূপে নির্বাচিত হন।

তাঁর গানের খ্যাতি ক্রমেই শান্তিনিকেতনের গণ্ডী ছাড়িয়ে সারা বাংলা সমগ্র ভারত ও বহিঃবিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এদিকে শিক্ষিকা কণিকার ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ওঁর গান শেখানোর পদ্ধতিও অন্যদের চেয়ে আলাদা ছিল। তিনি প্রথমে দুরূহ গানগুলি শেখাতেন। পরবর্তীতে অপেক্ষাকৃত সহজ এবং সবশেষে সহজ গানগুলি শেখাতেন। কারণ, তিনি বলতেন কঠিন গান আগে শিখলে সেইগুলি চর্চা করার এবং কণ্ঠে ধারণ করার জন্য সময় বেশি পাওয়া যায়।

টপ্পাঙ্গ, মুক্তছন্দের গানে তাঁর যে সুবিপুল খ্যাতি সেই গোত্রের গান “আমি রূপে তোমায় ভোলাবো না” তিনি ১৯৫০ সালে প্রথম রেকর্ড করেন। ১৯৫৬ সালে এইচ.এম.ভি. থেকে প্রকাশিত গান “আনন্দধারা বহিছে ভুবনে” তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দেয়।

সুরপ্লাবী কণ্ঠে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অলংকারের প্রয়োগ, মীড়ের ব্যঞ্জনা, আত্মমগ্নতা ইত্যাদি মিলিয়ে গানে এমন এক ধারা সৃষ্টি করেছিলেন যা একান্তই ওঁর নিজস্ব। ওঁর গায়নে গভীর অনুভবের সঙ্গে এক বিমূর্ত ছবিও ফুটে ওঠে যার উদাহরণ লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। বিভিন্ন ধারার রবীন্দ্রগান, গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্যের গান ওঁর কণ্ঠে ধৃত আছে গ্রামোফোন রেকর্ডে। তার মধ্যে কয়েকটি গানের কথা উল্লেখ করছি যেগুলি আজও মানুষের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে। যেমন— “দূরে কোথায় দূরে দূরে”/“নীলাঞ্জন ছায়া”/“বন্ধু রহো রহো”/“ওগো তুমি পঞ্চদশী”/“আমার সকল নিয়ে বসে আছি”/“আমার অঙ্গে অঙ্গে কে বাজায়”/“আজু সখী মুহু মুহু”/“আজি দক্ষিণ পবনে”/“চিরসখা হে”/“বারতা পেয়েছি মনে মনে”/“তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায়”, ইত্যাদি।

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষে গ্রামোফোন রেকর্ডে রবীন্দ্র গীতিনাট্যের মধ্যে সর্ব প্রথম প্রকাশিত হয় ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্য। এতে শ্যামার ভূমিকার গানগুলি কণিকা গেয়েছিলেন। ‘শ্যামা’ লং প্লে রেকর্ডের একটা ঐতিহাসিক মূল্য আছে। তা হল এই রেকর্ড শুধুমাত্র রবীন্দ্রসংগীতের নয়, সমগ্র বাংলা গানের প্রথম লং প্লে রেকর্ড আর জনপ্রিয়তার তালিকায় এশিয়ার মধ্যে দ্বিতীয় স্থানাধিকারী।

এরই মধ্যে তিনি ১৯৫২, ১৯৫৮ ও ১৯৬১ সালে কয়েকটি হিন্দি ভজন গান রেকর্ড করেন। যেমন, “অব কে ঠেক হমারী”/“আজ সুহাগ”, “মোরি চুনরি মে পার”/“জিন প্রেম কিয়ো”, “গোবিন্দ কবহুঁ মিলে”/“প্যারে দরশন দিজো”। অতুলপ্রসাদের গান— “ওগো নিঠুর দরদী”/“রইল কথা তোমারি নাথ”/“যখন তুমি গাওয়াও গান”/“মোরা নাচি ফুলে ফুলে”/“পাগলা মনটারে তুই বাঁধ”/“মিছে তুই ভাবিস মন” ও কাজী নজরুলের গান— “তোমার মহাবিশ্বে কিছু”/“হে বিধাতা, হে বিধাতা”/“কেন আনো ফুলডোর”/“কেউ ভোলে না কেউ ভোলে”, ইত্যাদিও রেকর্ডে গেয়েছিলেন। এছাড়া কীর্তন, উপাসনার গান ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানও রেকর্ড করেছিলেন। কণিকা সংগীত জগতে আধুনিক গান গেয়ে আত্মপ্রকাশ করলেও পরবর্তীতে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সুরে দু-টি গান ও সলিল চৌধুরীর সুরে একটি গান (প্রান্তরের গান আমার) রেকর্ড করেন। কিন্তু বিশ্বভারতীর কিছু নিয়মাবলীর কারণে এই গানগুলি প্রকাশিত হয়নি।

কয়েকটি চলচ্চিত্রেও তাঁর গাওয়া রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহৃত হয়েছে।

১৯৮৪ সালে সংগীতভবনের থেকে নিয়মমাফিক অবসর গ্রহণের পরেও আরও কয়েক বছর সাম্মানিক অধ্যাপিকা হিসেবে গান শিখিয়ে গেছেন। আকাশবাণীর রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষার আসর পরিচালনার ভার নিয়েছিলেন এবং আকাশবাণীর অডিশন বোর্ডের সদস্য ছিলেন। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এল্মহার্স্ট ইন্সটিটিউট অফ কমিউনিটি স্টাডিজ-এর চেয়ারপার্সন ও সক্রিয় কর্মী রূপে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন।

১৯৯৩ সালে বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষ তাঁকে নিয়ে ‘মোহর’ তথ্যচিত্রটি নির্মাণ করেন।

বিদেশে অনুষ্ঠান:

১৯৭২ সালে প্রথম দেশের বাইরে সংগীত পরিবেশন করতে যান বাংলাদেশে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উনার গানের একনিষ্ঠ অনুরাগী ছিলেন। এছাড়াও ১৯৭৩, ১৯৭৪, ১৯৮৬ ও ১৯৯৪ সালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে বাংলাদেশ সফর ও সংগীতানুষ্ঠান করেন।

১৯৭৪, ১৯৭৮ ও ১৯৮৪ সালে তিনি আমেরিকা ও কানাডাতে অনুষ্ঠান করতে যান।

১৯৭৬ সালে ইংল্যান্ড যান সংগীত পরিবেশন করার জন্য।

১৯৮০ সালে, ইংল্যান্ড, জার্মানি, ডেনমার্ক ও সুইজারল্যান্ডে সংগীতানুষ্ঠান করেন।

উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পুরস্কার:

মানুষের শ্রদ্ধা, সন্মান ও ভালোবাসা যে-কোনো শিল্পীর জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার যা তিনি দু-হাত ভরে পেয়েছেন। তার বাইরে নিম্নলিখিত পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন—

১. বি. এফ. জে. এ. এ্যওয়ার্ড (‘বিগলিত করুণা জাহ্নবী যমুনা’ ছায়াছবিতে গানের সূত্রে)— ১৯৭১
২. গোল্ডেন ডিস্ক ই. এম. আই. গ্রুপ— ১৯৭৮
৩. সঙ্গীতনাটক একাডেমি পুরস্কার— ১৯৭৯
৪. পদ্মশ্রী পুরস্কার— ১৯৮৬
৫. শিরোমনি পুরস্কার— ১৯৯৬
৬. দেশিকোত্তম— ১৯৯৭

তাঁর রচিত গ্রন্থ:

১. রবীন্দ্রসংগীতের ভূমিকা
২. রবীন্দ্রসংগীতের নানা দিক
৩. রবীন্দ্রসংগীত কাব্য ও সুর
৪. আনন্দধারা (স্মৃতিকথা)

২০০০ সালের ৫ই এপ্রিল এই কিন্নরকণ্ঠী শিল্পী মর্ত্যলোক ছেড়ে অমৃতলোকে প্রস্থান করেন। এর সঙ্গেই একটি যুগের অবসান হয়। যদিও আমরা বিভিন্ন মাধ্যমের সাহায্যে তাঁর কণ্ঠনিঃসৃত সুরের ধারা নিয়ত শুনে চলেছি এবং তাঁর শিক্ষায় শিক্ষিত ছাত্রছাত্রীরা তাঁর সেই ঘরানাকে সঠিক মর্যাদায় বহন করে চলেছেন আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে।

ঋণ: মোহর (সম্পাদনা— সুমিতা সামন্ত)

প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় পর্ব

তৃতীয় পর্ব

Spread the love

1 Comment

  • চারটি পর্বই পড়লাম। অনেক অজানা তথ্য জানতে পারলাম। আর আলোচনাটিও খুবই সুন্দর

    জা তি স্ম র,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *