অরিন্দম রায়ের গল্প

হতে পারত একটি ভূত
কিংবা একটা বাঞ্চোৎ-এর কাহিনি

“বল মাগি…”

চমক ভাঙল। ভূতটা যেন স্বপ্ন-জগতে ছিল এতক্ষণ।

ভূতেও স্মৃতি হাতড়ায়? এটা ভেবে এ অবস্থাতেও বাচ্চু যেন কিয়দ পরিমাণ হেসে ফেলল। স্মৃতি বড়ও নিঠুর। বোকাও। সময় অসময় না বুঝে নাক গলায়। বাচ্চু তারপর ভাবতে থাকল…

ভূতটা দ্যাখে, নীলুকে দেওয়ালে ঠেসিয়ে দেওয়া হয়েছে যেমন-তেমন করে। কিছুটা কাত হয়ে সব নিগ্রহ সহ্য করছে নীলু। তাকে অর্ধ-বিবস্ত্র করা হয়েছে। ওর রক্তশূন্য স্তন মর্দন করছে দু-জন দু-পাশে দাঁড়িয়ে। আর হোঁৎকাটা বন্দুকের নল এগিয়ে দিচ্ছে সায়ার দিকে। নীলুর চোখে জল। বাচ্চু স্পষ্ট দেখে ভূতটা কিছুই করতে পারে না। নিঃশব্দে অশ্রাব্য খিস্তি দেয় কেবল। বালের সমাজ শালা ভূতে ভয় পায়। ভূত নিয়ে ভয়ঙ্কর সিনেমা বানায়। ঘণ্টা! ভূত শালা কেবল দেখতে পারে। করতে পারে না কিছুই। করতে পারলে তো সমাজটাই শালা বদলে যেত। নীলুর উপর অত্যাচার বাড়ে। বাচ্চুর ভূত খুঁজে পায় না কী করবে!

দেওয়ালে ঠেস দেওয়া বাচ্চু বোঝে ভূতের ফোকালাইজার কেটে যাচ্ছে এবার। নীলুর এভাবে যন্ত্রণা পাওয়া, নিগ্রহ, ও কল্পনা করতে পারছে না আর। অথচ, ও নিশ্চিত জানে এমনই হবে, এমনই হয়। তাই আবার ফিরে যায় বাকিটা দেখতে। অদমনীয় কৌতূহলে…

নীলুর বাঁ ভ্রুতে সিগারেট গুঁজে দিল কে একজন। বোবা নীলু যন্ত্রণায় কাতরায় কেবল। বেঁকে যাওয়া ঠোঁট রক্তাভ। বাচ্চু তার শেষ স্মৃতিচিহ্ন এঁকেছে কিছু আগে। এমন সময় পাশের ঘর থেকে কে আঁতকে উঠে হাঁক পাড়ল— “স্যার! এখানে একটা মেয়ের বডি…”

— নাহ! নীলুকে মরতেই হবে। নইলে বাচ্চুর মরেও মুক্তি নেই। বাচ্চু স্থির সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। নীলুকে রেখে যাওয়া চলবে না কিছুতেই। কিন্তু গুলি তো দুটো। তবে তো মেয়েকে থাকতে হয়… বাচ্চু প্রাজ্ঞ এক ঋষির ন্যায় ধ্যানস্থ হয় মনের তপোবনে… নতুন করে সাজায় মরণ-ঘুঁটি…

ঘরের মেঝে রক্তে ভেসে যাচ্ছে। বাচ্চু পড়ে মেঝেয় চিৎ হয়ে। থকথকে ঘিলু ছিটকে আছে। রক্ত-ঘিলুর উপর ভারী বুটের ছাপ পড়ছে। এ-ঘর থেকে ও-ঘর হেঁটে ফিরছে কতকগুলো পা। একটা হোঁৎকা মতন বিশ্রী লোক। মুখে সিগারেট। বাচ্চুর দিকে ঘৃণিত চোখে একবার দেখে নিয়ে সম্মুখের ঘরে এগিয়ে এল। এসে বসল চেয়ার নিয়ে। বলল—

“কোনো ভয় নেই মামণি। এই, এর মুখের কাপড়টা খুলে দে…”

ঘণ্টা দেড়েক পর বন্ধনমুক্ত হয়। মেয়েটা ভেঙে পড়ে কান্নায়। ও জানে না বাচ্চু মরে পড়ে আছে পাশের ডাইনিং-এ।

“আমার বাবা কোথায়? মা?”

“তোমার বাবা একটা আস্ত শুয়োরের বাচ্চা ছিল। বুঝলে মা? তুমি জানতে না তোমার বাবা কী করত? মালটা খোচর ছিল। কত লোকসান…”

“না, না। বাবা এমন ছিল না”

“চোওপ! ন্যাকামো না। বল তোর বাবার কোথায় সিক্রেট রুম? কী কী এভিডেন্স পেয়েচে দেখতে হবে”

“জানি না, আমি কিচ্ছু জানি না। আমি তো হোস্টেলে থাকতাম। দু-দিন হল বাড়ি এসেছি”

“ধ্যুৎ! কেন যে শালা সহজে কেউ কিছু বলে না! ভালো লাগে না বাল! এই, একটু নাড়াচাড়া কর…”

বাচ্চুর ভূত বোবা হয়ে দেখে যাচ্ছে সব। কান্নার ভাব আসছে। কিন্তু অশ্রু না।

একজন পিস্তল ঠেকায় মেয়ের কপালে।

হোঁৎকাটা আঁতকে উঠে বলে— “এই! এ শালা, কেরে! একটা কচি ডাবকা মেয়ের মাথায় পিস্তল ধরা হচ্চে? বালটা জানো না প্যান্টের নীচে কামান আছে?”

‘‘হাঃ হাঃ হাঃ হা…”

মেয়ে চিৎকার করতে গেল… আর তখনই এক থাপ্পড়। ভয়ে কুঁকড়ে গেল ও। হোঁৎকাটা মেয়ের গালে, গলায়, পিঠে, ঠোঁটে, বুকে হাত ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে গেল। আবার। আবার।

“বলো মা, বলো… কামরা দেখিয়ে দিলেই হল। ল্যাটা চুকে যায়”

“বিশ্বাস করুন আমি কিচ্ছু জানি না’ কান্নায় ভেঙে পড়ল মেয়ে।”

“এই, এ মালটাকে মেঝেতে ফ্যাল।”

বাবা বাচ্চু, ভূতের চোখ দিয়ে মেপে নিতে চায় আগামী ঘটনা-প্রবাহ…

পিস্তলের নল তাক করা। না থাকলেও ক্ষতি ছিল না। তবু রাখে। একটা প্যান্টির পাশে সাময়িক ও ধারাবাহিকভাবে জমা হচ্ছে কতকগুলো জাঙিয়া। ভূতের তো চোখের পাতা থাকে না। তাই নিষ্পলক তাকিয়ে ও। ওঁরাওদের পাহাড় দেবতার মতো নিশ্চল। মেয়ের কোমরের নীচ রক্তে ভেসে যাচ্ছে। ভূতের মনে পড়ল প্রথম কয়েকবার ঋতুস্রাবের সময় মেয়েকে কিছুতেই চুপ করাতে পারেনি ও। সারাক্ষণ কেঁদেছিল। ভয়ে। আর তিনমাস পর, ও আঠারোর হতে পারত…

“লোকসান পুষিয়ে নে ভালো করে তোরা”— মেঝেতে হাঁটু দিয়ে কোলা ব্যাঙের মতো বসল হোঁৎকাটা। হোঁৎকাটার কাঁধের উপর দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে ভূতটা দেখল ওই বিপুল মেদের পাহাড় থেঁথলে দিয়েছে কচি শরীরটা। মেয়ের ক্ষতবিক্ষত বুকের দিকে ভূতটা চেয়ে রইল পাথর চোখের নিষ্পলক ঈশ্বরের মতো…

দেওয়ালে ঠেস দেওয়া বাস্তবের বাচ্চু ভাবে ছেলেবেলায় শালা ফালতু ভয় পেত ভূতকে। প্রকৃতপক্ষে ভূত বড়ো অসহায়। একটা গাছ, একটা ধৃতরাষ্ট্র যেন। কিন্তু চক্ষুষ্মান। বাচ্চু বুঝল ওর পক্ষে আর দেখা সম্ভব নয়। ফোকালাইজার কেটে যাচ্ছে। কিন্তু তখন তার আর কিছু করার নেই। মনের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে ও। তাই বাচ্চু দেখব না দেখব না স্থির করেও দেখতেই থাকল…

ইতিমধ্যে আরও এক হায়না ছোপ ছোপ রক্তে, পায়ের ছাপ এঁকে এগিয়ে এল অর্ধমৃত উলঙ্গ শরীরটার দিকে। মাত্র সতেরোটা বসন্ত… তার মধ্যে কতটুকুই-বা উপভোগ করেছে মেয়েটা! এমন সময়— ‘স্যার! বাচ্চু যে-দরজার মুখে পড়েছিল তার দরজা ভেঙে দেখলাম বোধহয় ওর বউয়ের লাশ…”

— নাহ! কিছুতেই মেয়েকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। ও যদি প্রকৃত পিতা হয় তবে মেয়েকে ওই নরক যন্ত্রণা থেকে বাঁচাতে মারতেই হবে তাকে। কোনো দ্বিধা নয়। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল রিভালভারেতো মাত্র দুটো গুলি। বউ, মেয়েকে মারার পর তবে ও নিজে ধরা পড়বে… আর একবার যদি ধরা পড়ে…

আলো-অন্ধকারময় একটা ঘর। উলঙ্গ বাচ্চু হাত বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে। তার পুরুষাঙ্গ রক্তাক্ত, কিছু চামড়া, মাথার চুল, দু-হাত আর পায়ের ছ-টা নখ ঘরের মেঝেয় ছড়ানো… ডেঁয়ো পিঁপড়ে লাইন দিয়েছে… বাচ্চু এ-সব দেখে আর শিউরে ওঠে। দেখে আর শিউরে ওঠে। কিন্তু দেখে… জ্বর অনুভব করে গায়ে। কিন্তু কী করবে ও? সিদ্ধান্ত নিতে পারে না! কাকে বাঁচাতে পারবে না? স্ত্রী? কন্যা? নাকি, নিজে? সব ওলোট-পালোট হয়ে যায় আবার। দেওয়াল ঘেঁষে বসে বাচ্চু। চূড়ান্ত অসহায় হয়ে কাঁদতে থাকে। দেওয়াল, যা প্রতিবন্ধকতার রূপক হিসাবে বহুল ব্যবহৃত হয় সাহিত্যে, তার গায়ে কিল মারে, মাথা ঠোঁকে… যেন এখুনি ত্রাতা হয়ে আসবে নরসিংহ… বালের ফিল্মে এমন হয় দেখেছিল কখনো। তাই কিল, চড়, থাপড় মারতেই থাকে দেওয়ালে… আর কাঁদতে থাকে… কাকে আরাম-মৃত্যু দেওয়া যায়… কিন্তু তা বলে নিজের বউকে খুন করবে? নিজের মেয়েটাকে… যাকে দেবশিশুর মতো বড় করেছে… অথচ মারা দরকার… কাকে মেরে বাঁচানো যায়… বাচ্চু চোখের জল না মুছে এবার আরও স্থির, ফোকাসড্‌ আর শান্ত হয়। সচেতনতার ঠুলি পরে পুনরায় সাজাতে চেষ্টা করে দৃশ্যপট। এবং পুনঃ তপস্বী হয়… কার কার মৃত্যু প্রয়োজন… ওদিকে বিড়াল পায়ে লোকগুলো উঠে এসেছে হয়তো বারান্দায়— বাচ্চু ভাবে। সময় নেই। দ্রুত ভেবে নিতে হবে বাচ্চুকে… সিদ্ধান্তে পৌঁছুতেই হবে। দুটো গুলি আর তিনটে মানুষ। বদ্ধ গুমোট ঘরে বাচ্চু ভাবতে থাকে…

[মার্জনা করবেন। কে খবর দিল? কারা, কেন বাচ্চুকে চায়ছে?— জানি না। বাচ্চু একটা চুতিয়া হয়তো। গণতান্ত্রিক সমাজের ক্ষতি করছিল। কাঁধে লোগো লাগানো হোঁৎকাটা রক্ষক হতে পারে। আবার হোঁৎকাটা বড়ো ব্যবসাদার হতে পারে, রাজনৈতিক নেতাও হতে পারেন বৈকি। কিংবা… যে কেউই হতে পারে। আপনি খামোখা ও-সব ভাববেন না। বরং ভেবে নিতে পারেন, আপনিই হোঁৎকাটা। শরীর একটু স্থূল হল? তা হোক। মজা নিন। আর ভেবে নিন— বাচ্চু অন্য ধর্মের, অন্য পার্টির, অন্য বর্গের, অন্য বর্ণের বা টিভি, চায়ের দোকানে তক্ক করা, প্রশ্ন তোলা অন্য মতাদর্শের বা ট্রেনের সিটে কমপ্রোমাইজড না করা একটা পিওর বাঞ্চোৎ।]

প্রথম পাতা

Spread the love
By Editor Editor গল্প 1 Comment

1 Comment

  • অসাধারণ অসাধারণ অসাধারণ!
    আর কিচ্ছু বলার নেই।

    Rangan Roy,
  • Your email address will not be published. Required fields are marked *