লেখক নয় , লেখাই মূলধন

অর্ক চট্টোপাধ্যয়ের গল্প

টিকটিকি প্র-সঙ্গ

সকাল সকাল চায়ের জল ভরতে গিয়ে দেখি টিকটিকিটা বেসিনের গায়ে তেরছা হয়ে আটকে রয়েছে। প্রথমে মনে হল হয়তো ব্যাটা আমারই মতো চা খেতে চায়। তারপর দেখলাম জলে বিশেষ আগ্রহ নেই তেনার। কলের জল ছেটানো সত্ত্বেও কোনো উচ্চবাচ্চ করলেন না মহারাজ। কোনোরকমে পাশ কাটিয়ে জল ঢেলে চা বানিয়ে তৃপ্ত হলাম বটে কিন্তু কেটলি কাপ ধুতে এসে দেখি মালটা তখনও বেসিনে আটকে পড়ে রয়েছে। বেঁচে আছে তো নাকি? নাহ, চোখের পাতা দিব্বি ওঠানামা করছে। ভয় পেয়েছে? আমায় নাকি অন্য কিছুকে?

বেশ কয়েকবার গায়ে জল ঢালার পরও যখন নো নড়ন চড়ন তখন মনে হল হয়তো টিকটিকিটা বেসিনের মধ্যে পড়ে গিয়েছে, আর উঠতে পারছে না। আমার মানুষের চোখে ওটা ছোটখাটো বেসিন হতে পারে, ওর সাইজে ওটাই হয়তো গভীর এক গহ্বর। দেওয়াল থেকে পড়ে গিয়ে ভয়ে সিঁটিয়ে আছে কি? হয়তো পড়ার পরই ওমন ভেবলে গেছে!

এরপর শুরু হল টিকটিকি উদ্ধারপর্ব। কোদাল বেলচা তো আর নেই, বড়ো একটা ট্রে-তে করে মালটাকে তোলার চেষ্টা করতে লাগলাম। কিছুতেই ওঠে না? খালি ভয়? ট্রে বাড়িয়ে ধরলে সমানে উলটোদিকে সরে যায়। বারবার একই কান্ড। উঠতে চায় না চায় না? কোনটাকে বেশি ভয় পায়? গহ্বরের ভেতর মরে যাওয়াকে নাকি ওপরে উঠে বেঁচে যাওয়াকে নাকি এই দানবকে যার শরীরে ওর জীবন মৃত্যুর প্রভেদ মুছে গেছে?

মানুষ চিন্তাপ্রক্ষেপ পছন্দ করে। বিশেষত সে চিন্তা যখন প্রক্ষিপ্ত হয় মনুষ্যেতরর ওপর। আমিও হয়তো সেটাই করছিলাম। অনেক কষ্টে বেরিয়ে এলো টিকটিকিটা। ট্রের কোণা ধরে উঠে এসে মেঝেতে ঝাঁপ দিল তা নয়। ট্রেটাকে বিরাট চামচের মতো ব্যবহার করে ওকে বাইরে ছুঁড়ে ফেললাম। তারপর ঝাড়ু দিয়ে সরাতে সরাতে বারান্দায় ছেড়ে এলাম। ওর বাকি পথ ও নিজেই খুঁজে নিক। মনে চিন্তাপ্রক্ষেপণের প্রশ্ন ঘুরঘুর করতেই লাগল, ও কী চাইছিল? থাকতে চাইছিল না যেতে? বাঁচতে চাইছিল না মরতে?

বিকেলবেলা বারান্দায় এসে হালকা খোঁজাখুঁজি করে কোথাও পেলাম না টিকটিকিটাকে। চলে গেল না মরে গেল জানা যাবে না কোনোদিন। পরের দিন বেসিনে আরেকটা টিকটিকি পড়ে থাকলেও বোঝা যাবে না ঐ টিকটিকিটাই কিনা? মনুষ্য-একক এবং টিকটিকি-এককের দার্শনিক প্রভেদের কথা ভাবতে ভাবতে বাকি রবিবার কেটে গেল।

পরদিন সকালে আবার চায়ের জল ভরতে গিয়ে দেখি একটা টিকটিকি বেসিনের ভেতর তেরছা হয়ে আটকে রয়েছে। উদ্ধারপ্রকল্পে না গিয়ে এবার দু’কাপ চা বানালাম। একা লোকের চায়ের আড্ডার সঙ্গী পাওয়া গেছে। আর কী চাই?

অর্ক চট্টোপাধ্যয়ের গল্প

আমাদের নতুন বই