Categories
গল্প

অসিত কর্মকারের গল্প

চাঁদবসত

হাজরাতলার মাঠ পেরিয়ে চানুবুড়ি মোল্লাপাড়ায় ঢুকল। হাজি সৈয়দ নিয়ামত শেখের বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে হাঁক পাড়ল, ‘হাজিসাহেব বাড়ি আছেন?’

বৃদ্ধ হাজিসাহেব গাঁয়ের মুরুব্বি মানুষ। মোল্লাপাড়ার মাথা।উঠোনে নেমে এলেন। কুশল বিনিময় হল।

— ‘আপনার দোরে বড় এক আশা নিয়ি এয়িচি হাজিসাহেব।’

— ‘বলুন, আমার সাধ্যিমত ঝতটুকা পারার আমি করব।’

ঘটনাটা ভেঙে বলে চানুবুড়ি। আর্জি জানায়, ‘আপনার গাইটাও বিইয়েচে। ওই বখনা বাছুরির সঙ্গি ভজনের এই এঁড়ে বাছুরটাকিও আপনাকে পালপোষ করি দিতি হবে ঝদ্দিন না দুধ ছাড়ে।দুটোতি ভাইবুনির মতো একই গাইয়ের দুধ খেয়ি বড় হবে। ভজনের চাষের ঝমিঝায়গা নি তাই কড়ার থাকল, ওই এঁড়ে বড় হলি কমা দামে সে আপনাকিই দেবে।’

ভজন বড় করে ঘাড় কাত করে, ‘ঠাগমার কতা আমি রাখব হাজিসাহেব।’

অবলা জীবের সেবা করার সুযোগ পেয়ে হাজিসাহেব খুশি। চানুবুড়ির প্রশংসা করলেন।
বখনা বাছুরটা মনের আনন্দে মায়ের দুধ খাচ্ছে।চানুবুড়ি নিজের হাতে মা-হারা বাছুরটাকে অন্য বাঁটে জুতে দিতে গেলে গাইটা বড়ো করে গলার ঘন্টি বাজিয়ে নেতিবাচক মাথা দোলায়। ভোঁস ভোঁস শব্দ করে মনের কথা উগড়ে দেয়,তার দুধের একমাত্র অধিকারী তার সন্তান, অন্য কেউ নয়!

চানুবুড়ি পরম মমতায় গাইটার গলায়-মাথায় হাত বোলায়, ‘নক্কী মা আমার,অবুঝ হোস নে, ধরি নে এ তোর আরেক ছা, মাই দিয়ি বড়টি করি দে মা,তোর পায়ে ধরি।’

অবলা জীবও কী বুঝে নরম হয়। ক্ষুধার্ত বাছুর ফের বাঁটে মুখ দিতে চাইলে বাধা দেয় না। থির দাঁড়িয়ে থাকে। বাছুর দুটো মনের আনন্দে দুধ খায়। দেখে সবাই অবাক মানে, ‘হ্যাঁ,মানতি হবে চানুঠাগমাকে ভগমান অনেক ক্ষেমতা দিয়ি পিথিমিতি পাটায়েচে!’

পরদিন ভোরে চানুবুড়ি ঋষিপাড়ায় হাজির। ওরা মুচির কাজ করে, জন্তুজানোয়ারের ছাল ছাড়িয়ে বিক্রি করে। পাড়ার সবাই চানুবুড়িকে দেখে অবাক। ঘিরে দাঁড়িয়ে এই সাতসকালে আসার উদ্দেশ্য জানতে চায়।

সহসা চানুবুড়ির চোখেমুখে আশঙ্কার ছায়া ফুটে ওঠে, ‘গোহত্যা হল গিয়ি বোহ্ম হত্যার সমান পাপ। ভজনের দুধেল গাইটাকি কে ঝেন বিষ খাইয়ে মেরিচে। কাল রাতি বড়ো খারাপ সপনো দেকলুম এ্ট্টা, তোদির ঘরের কার ছাওয়ালির ঝায় ঝায় অবস্থা, ঝমে-মানুষি টানাটানি।ছাওয়ালটার মুখটা কেমন ছামাছামা, চিনে উঠতি পারলুম নে। চোখি ছানি, সপনোগুনোও তাই কেমন ঝাপসা দেকি।ঘরে আর টিকতি পারলুম নে, ছুটে এনু। তা তোরা সকলায় ভালো আচিস তো?’

সহসা ভিড়ের মধ্যে ডুঁকরে কেঁদে ওঠে শেফালি।চানুবুড়ির পা দুটো জড়িয়ে ধরে, ’তুমি আমার ছাওয়ালটারি বাঁচাও ঠাগমা। ইদানিন মিনসে আমার কোতায় এক রাঁড় জুটায়েচে। সে-মাগির হাঝারটা বায়নাক্কা মেটাতি মানুষটা এ-সব অপকম্ম করি বেড়াচ্চে। নোকনজ্জার ভয়ি এ্যাদ্দিন কিচু বলতি পারিনি গো ঠাগমা!’

— ‘তা অনন্ত কোতায়?’
— ‘সে মানুষ রাত থাকতি উটি চাকু হাতে বেইরে গেল।ভাগাড়ি গাইটা পড়লিই ঝেঁইপে পড়বে।’

— ‘তার আগেই ও ধরা পড়ি ঝাবে। নোক নাগায়ে এয়েচি, সবাই তক্কে তক্কে আচে। ধরি নেয়ে সোঝা থানায় ঢুইকে দেবে। তুই ওর বিরুদ্দি সাক্কি দিবি। খেতি দিতি পার নে রাঁড় পুষচে! সে নেশাও ঘুচোব তার। তোর কোনো চিন্তানি বউ, ছেলির তোর কিচ্চুটি হবে নে।বাপের পাপের ভাগিদার ও-টুকা ছেলি কেন হতি ঝাবে।’ অভয় দিল চানুবুড়ি।

ঘরের পানে হাঁটতে হাঁটতে মিথ্যা স্বপ্ন বোনার জন্য ভগবানের কাছে ক্ষমা চায় চানুবুড়ি। মা-হারা বাছুরটার কথা মনে পড়ে। চারপাশের ঘরসংসার একে একে জাগছে। এর ওর সঙ্গে কুশল বিনিময় হয়, ভালোমন্দ কথাও হয়।
হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচি, শাষানি, মারমার ধ্বনি।অনন্তকে ধরে-বেঁধে থানায় নিয়ে চলেছে ওরা।পিছনে পিছনে অনন্তর বউ আর ছেলে একরকম ছুটছে। ছেলেটা, ‘ও বাপ,ও বাপ’ বলে কাঁদছে।

— ‘থানায় দিচ্চ দাও, কিন্তুক মানুষটাকি মেরোনি গো, মেরোনি!’ আর্ত চিৎকার করছে শেফালি।
রাগ-ক্ষোভে জ্বলে ওঠে চানুবুড়ি, ‘উহ, রাঁড়পোষা মিনসের ঝন্নি মাগির দরদ ঝ্যান উতলে উটচে!তোরা কবে আর মানুষ হবি লা!’ ধিক্কার দেয় চানুবুড়ি। বলে, ‘খাগ খাগ, খানিগ মার-গুঁতো খেয়ি ঝদি শয়তানটা সিধে হয়!’

মোল্লাপাড়ার গা ধরে খানিক খোলা প্রান্তর।সকালের নরম আলোর লুটোপুটি। এক ধারে হাজিসাহেবের গাইটা খোঁটাবাঁধা হয়ে ঘাস খাচ্ছে। কাছেই বাছুর দুটো লেজ উঁচিয়ে দৌড়-লাফ খেলছে। চানুবুড়ির প্রাণ জুরোয়। ওদের থেকে চোখ ফেরাতে পারে না। মনের সাধ মিটিয়ে দেখবে বলে মাঠের ধারে বসেই পড়ে।
‘ঠাগমা’-র শরীর খারাপ হয়েছে ভেবে পাড়ার লোকজন ছুটে এলে চানুবুড়ি ফোঁকলা মাড়িতে বড় করে হাসে, ‘কত সুন্দর দিশ্শো, দেক সকলায়! দেকলি খারাপ শরীলও ভাল হয়ি ঝায় রে।’

বিকেল হতে চানুবুড়ি অনন্তকে ছাড়িয়ে আনতে থানায় চলল। সঙ্গে পঞ্চায়েত প্রধান, সমিতির দু-জন আর ভজন।অনন্তর রোজগার ছাড়া সংসার যে না খেয়ে মরবে। ওর একটা কাজের ব্যবস্থা করা চাই। সেই সঙ্গে রাঁড় ছাড়ানোর ব্যবস্থা।
সারাদিনে শরীরের উপর ধকল গেছে খুব, বড়ো কাহিল লাগছে চানুবুড়ির। শরীরটাকে চানুবুড়ি বলে, ‘রথ’। তার রশি ধরে বসে আছে উপরওলা। সে যতদিন টানবে ততদিনই ‘রথ’ চলবে। হাত আলগা করে দিল কী প্রাণপাখি ফুড়ুৎ।

রাতে শোয়ার পর থেকে স্বস্তি নেই চানুবুড়ির।বুধির হাবভাব কেমন অন্যরকম, এখন-তখন অবস্থা। রাত তখন তৃতীয় প্রহরের পথে।প্রসব যন্ত্রণায় কাতরচিৎকার বুধির। দুধ সাদা জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চারিদিক। এই সংসারে জন্মে এই সংসারেই মা হতে চলেছে বুধি। নিজের মৃত্যুভাবনাকে থোড়াই কেয়ার করে বিছানা থেকে নেমে এল চানুবুড়ি। ছেলেদের ডেকে তোলে।

খোঁয়াড়ের সামনে সারাবাড়ির ভিড়। ছেলেরা বুধির প্রসব কাজে সাহায্য করছে। পাশটিতে কোল পেতে বসে চানুবুড়ি গর্ভজ রক্ত-রস আর ক্লেদে মাখামাখি ছানা দু-টিকে কোলে তুলে নেয়।নিজের হাতে সাফসুতরো করে বুধির দিকে বাড়িয়ে ধরে। বাৎসল্য রসে তাড়িত হয়ে ওঠে মা।

চানুবুড়ির মনে হয় এই জন্মদানে তাদের গাঁ-গ্রাম আরও একটু ভরাভারা হয়ে উঠল। আর তা দেখতে আকাশের পূর্ণ চাঁদটাও যেন খানিক নীচে নেমে এল। যেন মুখ বাড়িয়ে চাঁদের বুড়ি দেখছে নতুন জীবনের মুখ। নাকি পৃথিবীতে নতুন জীবনের বিনিময়ে চানুবুড়ির দিন ফুরিয়ে এল! হাত বাড়িয়ে তাকে তুলে নিতে চায় ওই চাঁদ। তা নিক। কোনো বাধা নেই চানুবুড়ির। এই পৃথিবীতে অনেকদিন তো হল। পরিপূর্ণ জীবনের সাধ তার মিটেছে। এবার হাসতে হাসতে চলে গেলেই হয়।

চানুবুড়ি চাঁদটাকে ছুঁতে চায়। যেমন করে ছুঁয়ে আছে নতুন জীবন। বাঁচার আহ্লাদে। এই মাটিতে। সবার জন্য!

প্রথম পাতা

One reply on “অসিত কর্মকারের গল্প”

ভীষণ সুন্দর একটা গল্প! গল্পের নামটিও মানানসই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *